বীমা
গ্রহীতাদের প্রিমিয়ামের টাকা লুটপাট করছে শেয়ারবাজারে তালিকাভুক্ত
কোম্পানি ফেডারেল ইন্স্যুরেন্স। আইন লংঘন করে গত সাত বছরে ৬৬ কোটি টাকা
অতিরিক্ত ব্যয় করেছে প্রতিষ্ঠানটি। আর অতিরিক্ত ব্যয় খতিয়ে দেখতে
কোম্পানিটির বিরুদ্ধে নিরীক্ষক নিয়োগ দিতে যাচ্ছে নিয়ন্ত্রক সংস্থা
ইন্স্যুরেন্স রেগুলেটরি অথরিটি (আইডিআরএ)।
বিশেষ একটি চার্টার্ড
অ্যাকাউন্টেন্ট ফার্মকে এ দায়িত্ব দেয়া হচ্ছে। আইডিআরএ সূত্র জানায়, এই
কোম্পানির বিরুদ্ধে ব্যাপক অভিযোগের মধ্যে আর্থিক রিপোর্টেও বড় ধরনের
কারসাজি রয়েছে। এসব কারসাজি খতিয়ে দেখতেই বিশেষ নিরীক্ষক নিয়োগ দেয়া হচ্ছে।
দু-একদিনের মধ্যেই কোম্পানিটিকে চিঠি দেয়া হবে। নাম প্রকাশ না করার শর্তে
প্রতিষ্ঠানটির একজন শীর্ষ কর্মকর্তা যুগান্তরকে বলেন, নিরীক্ষক নিয়োগ বন্ধ
করতে জোর তদবির করছেন ফেডারেলের এমডি একেএম সারওয়ার্দী চৌধুরী। কিন্তু শেষ
পর্যন্ত তিনি ব্যর্থ হয়েছেন। শিগগির নিরীক্ষক টিম কাজ শুরু করবে। ওই
কর্মকর্তার মতে, অনিয়মের কারণে এর আগে একটি কোম্পানির সনদ বাতিল করা হয়েছে।
প্রয়োজনে ফেডারেলের বিরুদ্ধেও এ ধরনের সিদ্ধান্ত নেয়া হবে। এদিকে গ্রাহকের
প্রিমিয়ামের টাকা অতিরিক্ত ব্যয়ের কারণে আর্থিকভাবে সমস্যায় পড়ছে ফেডারেল।
কোম্পানির আয়ও কমছে। ফলে শেয়ারবাজারে বিনিয়োগকারীদের লভ্যাংশও কমিয়ে
দিচ্ছে এই কোম্পানি। বিশ্লেষকরা বলছেন, এভাবে চলতে থাকলে এক পর্যায়ে
দেউলিয়া হতে পারে কোম্পানিটি। এতে প্রতিষ্ঠানটির কয়েক হাজার বীমা গ্রহীতা
এবং শেয়ারবাজারে থাকা প্রায় ১২ হাজার বিনিয়োগকারীর ভাগ্য অনিশ্চিত হয়ে
পড়বে। জানতে চাইলে সাধারণ বীমা কর্পোরেশনের সাবেক ব্যবস্থাপনা পরিচালক ড.
মো. রেজাউল করিম যুগান্তরকে বলেন, প্রতিটি বীমা কোম্পানি প্রিমিয়ামের টাকা
কত শতাংশ ব্যয় করতে পারবে, আইনে তার সীমা নির্ধারণ করা আছে। এই সীমা
অতিক্রম করলে নিয়ন্ত্রক সংস্থাকে ব্যবস্থা নিতে হবে।
তিনি বলেন,
প্রিমিয়ামের টাকার মালিক গ্রাহক। কেননা দুর্ঘটনা ঘটলে ক্ষতিগ্রস্ত
বীমাকারীকে তার যথাযথ ক্ষতিপূরণ দিতেই হবে। বীমা খাতের নিয়ন্ত্রক সংস্থা
আইডিআরএ সূত্র জানায়, বিদ্যমান আইন অনুসারে একটি সাধারণ বীমা কোম্পানি, তার
গ্রস প্রিমিয়ামের ১৫ শতাংশ পর্যন্ত ব্যয় করতে পারে। কিন্তু প্রতি বছর এই
সীমা লংঘন করেছে ফেডারেল ইন্স্যুরেন্স। কোনো কোনো ক্ষেত্রে প্রতিষ্ঠানটি
গ্রাহকের প্রিমিয়ামের ৭০ শতাংশই ব্যয় করে ফেলেছে। আর ২০০৯ থেকে ২০১৫ সাল
পর্যন্ত গত ৭ বছরে ব্যবস্থাপনা খাতে ১৪৩ কোটি ১৪ লাখ টাকা খরচ করেছে
ফেডারেল। কিন্তু আইন অনুসারে প্রতিষ্ঠানটির ব্যয়ের সীমা ছিল ৭৭ কোটি ৩১ লাখ
টাকা। এ হিসাবে প্রতিষ্ঠানটি অতিরিক্ত ব্যয় করেছে ৬৫ কোটি ৮০ লাখ টাকা।
এসব অর্থই গ্রাহকের বীমা পলিসির টাকা। আর পলিসি করার সঙ্গে সঙ্গে গ্রাহকের
টাকা এভাবে লুট করে খাওয়ায় ক্ষতিগ্রস্তদের বীমা দাবি পূরণ করা নিয়ে
টালবাহানা করছে। এর ফলে আইডিআরের কাছে এই প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে অভিযোগের
পাহাড় জমে আছে। অথচ এখন পর্যন্ত ফেডারেলের বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা নেয়া
হয়নি। জানতে চাইলে ফেডারেল ইন্স্যুরেন্সের ব্যবস্থাপনা পরিচালক একেএম
সারওয়ার্দী চৌধুরী যুগান্তরকে বলেন, আইনে অনেক কিছু থাকে। কিন্তু বাস্তবে
তা মেনে চলা সম্ভব হয় না। তিনি বলেন, আইন মেনে ব্যবসা করলে বাংলাদেশে কোনো
কোম্পানিই টিকতে পারবে না। তার মতে, বিদ্যমান আইনটি বীমা খাতের জন্য উপযোগী
নয়। ফলে এই আইনের পরিবর্তন সংস্কার জরুরি। এদিকে তার এ বক্তব্য বিশ্লেষণ
করলে এটিই প্রতীয়মান হয়, তিনি জেনেশুনে অনিয়ম-দুর্নীতি করছেন। এজন্য
পৃথকভাবে তদন্তের প্রয়োজন পড়বে না। তার এ মন্তব্য অনেকটা সরল স্বীকারোক্তি।
এর ভিত্তিতে আইডিআরএ দ্রুত ব্যবস্থা নিতে পারবে। জানা গেছে, ২০০৯ সালে
ফেডারেল ইন্স্যুরেন্স ব্যবস্থাপনা ব্যয় করেছে ১৫ কোটি ৪০ লাখ টাকা। কিন্তু
ব্যয়ের সীমা ছিল ৮ কোটি ৫৪ লাখ টাকা। এ হিসেবে অতিরিক্ত ব্যয়ের পরিমাণ ছিল ৬
কোটি ৮৬ লাখ টাকা।
একইভাবে ২০১০ সালে অতিরিক্ত ব্যয় ৭ কোটি ১৫ লাখ, ২০১১
সালে ৫ কোটি ৪৫ লাখ, ২০১২ সালে ৮ কোটি ২৭ লাখ, ২০১৩ সালে ৮ কোটি ৭৫ লাখ,
২০১৪ সালে ১২ কোটি ৮০ লাখ এবং ২০১৫ সালে ১৬ কোটি ৬০ লাখ টাকা অতিরিক্ত ব্যয়
করেছে কোম্পানিটি। এদিকে অতিরিক্ত ব্যয়ের ফলে ক্রমেই প্রতিষ্ঠানটির আর্থিক
সক্ষমতা কমছে। কমেছে কোম্পানির সম্পদও। ২০১৪ সালে মোট সম্পদের পরিমাণ ছিল
প্রায় ১১৯ কোটি টাকা, কিন্তু ২০১৫ সালে তা কমে ১০৯ কোটি টাকায় নেমে আসে।
অর্থাৎ ১ বছরে প্রতিষ্ঠানটির ১০ কোটি টাকার সম্পদ কমেছে। আর্থিক সক্ষমতা
কমায় চরম বিপাকে পড়েছে প্রতিষ্ঠানটির শেয়ারে বিনিয়োগকারীরা। কারণ প্রতি
বছরই বিনিয়োগকারীদের লভ্যাংশ কমিয়ে দিচ্ছে ফেডারেল ইন্স্যুরেন্স। ২০১২ সালে
বিনিয়োগকারীদের ১২ শতাংশ লভ্যাংশ দিয়েছিল প্রতিষ্ঠানটি। ২০১৩ সালে তা কমে
১১ শতাংশ, ২০১৪ সালে ১০ শতাংশ এবং সর্বশেষ ২০১৫ সালে বিনিয়োগকারীদের মাত্র ৫
শতাংশ লভ্যাংশ দিয়েছে ফেডারেল ইন্স্যুরেন্স। এ কারণে প্রতিষ্ঠানটির শেয়ারে
বিনিয়োগ থেকে মুখ ফিরিয়ে নিচ্ছেন বিনিয়োগকারীরা। ২০১৩ সালে প্রতিষ্ঠানটিতে
বিনিয়োগকারীর সংখ্যা ছিল ১৬ হাজার ২৯৫ জন। ২০১৪ সালে তা কমে ১৪ হাজার ৪৭৫
জনে নেমে আসে। ২০১৫ সালে তা আরও কমে ১১ হাজার ৯৮৩ জনে নেমে আসে।

No comments:
Post a Comment