কোনো
এক বৃহস্পতিবার রাতে সাত ভ্রমণ পাগলা মাইক্রোতে মৌলভীবাজার ছুটি,
কৈয়ারকোণা পাখিবাড়ি দেখব বলে । ছুটছে মন, দেহ শুধু গাড়ির আসনে হেলান। রাত
প্রায় বারোটা। যাওয়ার পথে আড়াইহাজারের বাসিন্দা এন্টিক শাহনূর ভাইয়ের
খেজুরগাছের বাগানে হানা। আগেভাগেই জানিয়ে রাখায় গাছি ভাইও বাগানে ছিলেন
অ্যাকশন মুডে।
এন্টিক ভাইয়ের প্রতি আমাদের আবদারও ছিল বেশ মারাত্মক। যাওয়ার
আগেই রস নামানো চলবে না। আমরা যাওয়ার পরই রসের হাঁড়ি গাছ থেকে নামবে। তাই
রাত দুপুরেও মডেলপাড়া সোসাইটি গ্রামটিতে ছিল অন্যরকম ভাব। গাছের তলায় গ্লাস
নিয়ে সবাই প্রস্তুত। ঘুটঘুটে অন্ধকার রাতে টর্চের আলোতে গাছি রস নামালেন।
রস নামাতে যতটুকুন দেরি কয়েক চুমুকে সাবাড় করতে খুব একটা সময় লাগেনি।
সুস্বাদু রস পানে সব ফুর্তিতে মশগুল। এরপর শুরু হল মুরগি পোড়া আর লেটকা
খিচুড়ি। উদর পূর্তি করতে করতে রাত প্রায় চারটা। পাখিবাড়ি যেতে হবে অথচ
ফুর্তিবাজগুলোর নেই কোনো তাড়া। আর দেরি নয় চারটা পাঁচ মিনিটে আবার গাড়িতে।
গাউছিয়ার শাখা রোড ধরে উঠে যাই মহাসড়কে। ঘন কুয়াশা ভেদ করে গাড়ি চলে কচ্ছপ
গতিতে। চোখ বন্ধ করে ঘুমানোর নিষ্ফল চেষ্টা। ফজর পড়ি বি-বাড়িয়া জেলার শেষ
সীমানার পথের ধারের মসজিদে। কুয়াশার চাদরে মোড়ানো পথে চলতে চলতে বেলা ১১টা
৩০ মিনিটে পৌঁছি বড়লেখা উপজেলার দক্ষিণ বাজারে। স্থানীয় সাংবাদিক শ্রী তপন
কুমার দাস আগেই হোটেলে রুম বুকিং করে রাখায় বাড়তি ঝামেলা ছাড়াই সোজা রুমে।
তপনদা জানালেন দাশের বাজার এলাকায় প্রায় চারশ বছর আগের লঘাটি মসজিদে চলুন,
সেখানেই জুমার নামাজ পড়বেন।
বলেন কী? যেই কথা সেই কাজ ছুটছি মসজিদ মুখী।
কিন্তু আফসোস সময়ের গ্যাঁড়াকলে হয়েছি প্যাকেটবন্দি। অবশেষে পথেই এক মসজিদে
জুমা আদায় করি। নামাজ শেষে যাই ঐতিহাসিক লঘাটি শাহ্ জামে মসজিদ প্রাঙ্গণে।
মসজিদটির ভেতরে-বাইরে ছাদে উঠে খুঁটে খুঁটে দেখি। স্থানীয়দের মাধ্যমে জানতে
পারলাম প্রায় চারশ বছর আগে মোগল আমলে এর নির্মাণ কাল। পাশেই সবুজ ঘেরা এক
বিশাল দীঘি। কালের সাক্ষী ঐতিহাসিক লঘাটি মসজিদ দর্শন শেষে ছুটি এবার
হাকালুকি। বিশাল হাকালুকি হাওরেরই একটি অংশ কৈয়ারকোণা বিল। সেই বিলের পাশেই
পাখিবাড়ি। বড়লেখার তালিমপুর ইউনিয়নের হাল্লা গ্রামের পথ দিয়ে হাওরে ঢুকি।
প্রথমেই চোখে পড়ে পানিশূন্য ধু ধু হাওরের বুকে দাঁড়িয়ে থাকা উঁচু এক
পর্যবেক্ষণ টাওয়ার। পাশেই বিট অফিস। যতটুকু পানি আছে এতে করেই দৃষ্টিনন্দন
এক ক্যানেলের সৃষ্টি হয়েছে। টাওয়ারে গিয়ে উঠি, দেখি চারপাশ। পড়ন্ত বিকালে
অন্যরকম ভালোলাগা। ভরা বর্ষায় থাকে সাগরের মতো রূপ আর শীত- বসন্তে ফসলের
মাঠ। হাকালুকি নামকরণের বেশ কিছু ধারণার মধ্যে অনত্যম হল ‘লুকিয়ে থাকা
সম্পদ’- থেকেই হাকালুকি হাওরের নাম এসেছে। তবে যাই হোক হাকালুকি হাওর
বাংলাদেশের জন্য অফুরন্ত সম্পদের ভাণ্ডার।
রাতে তাঁবু গাড়ব হাওরের পাশে
মনোহর আলী মাস্টার বাড়ির আঙ্গিনায়। স্থানীয়রা পাখিবাড়ি বলেই চিনে। বিট
কর্মকর্তার আমন্ত্রণে চা-চক্র শেষে বিদায় নিয়ে যাই পাখিবাড়ি। পশ্চিম আকাশে
সূর্য হেলে পড়ার পরপরই দেখি শত শত পাখির দল ছুটে আসছে সেই বাড়ির দিকে।
অবিশ্বাস্য সব ব্যাপার, ঝাঁকে ঝাঁকে পাখির দল মাস্টার বাড়ির গাছের ডালে
বসছে। নানা জাতের প্রায় আড়াইশ গাছ নিয়ে দুই একর আয়তনের বাড়িটি যেন পাখিদের
রাজ্য। স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে জানা গেল প্রায় ৪০ বছর ধরে এ বাড়ির গাছে
পাখিদের নিরাপদ আশ্রম। হরেক জাতের পাখিদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য নিশীবক,
সাদাবক, পানকৌড়ি, জলকুড়া, সরালি, কুদালিসহ আরও বিভিন্ন প্রজাতির বাস।
শীত-বসন্ত মৌসুমে অতিথি পাখির ঝাঁক দিনের আলোতে আশপাশের বিলগুলোতে বিচরণ
শেষে সন্ধ্যায় ফেরে এ বাড়িতে। পাখিবাড়ির কেয়ারটেকার জানালেন, পাখির দল এ
বাড়ির গাছ ছাড়া পাশের বাড়ির গাছেও বসে না। তার কথায় আশ্চর্য না হয়ে পারি
না। নানা পাখির কিচির-মিচির শব্দ, সুরেলা কণ্ঠের ডাক সত্যিই শুনতে লেগেছে
অসাধারণ। আমরা গাছের ফাঁকফোকর দিয়ে পাখি দেখায় ব্যস্ত। বাড়িটির জমিন অসংখ্য
পাখির বিষ্ঠা দিয়ে ঢেকে গেছে তবুও পাখিদের প্রতি রয়েছে বসবাস করা
মানুষগুলোর গভীর ভালোবাসা। সন্ধ্যা হওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই পাখিবাড়ির পাশে
তাঁবু ফেলি।
শুরু হয় বোয়াল আর রুই মাছের ফিশ বার-বি-কিউ আর মজার মজার খেলার
প্রতিযোগিতা। বিশাল হাওরের বুকে রাতের তাঁবু বাস- সে এক ভয়ানক মজাদার
আনন্দ। হাকালুকি হাওর এশিয়ার মধ্যে অন্যতম বৃহত্তম মিঠা পানির জলাভূমি।
শুধু বিলের আয়তনই ৪ হাজার ৪০০ হেক্টর। প্রায় ৩২২ প্রজাতির মিঠা পানির মাছের
আবাস। জীববৈচিত্র্যে ভরপুর। সেই রকম এক অপার্থিব পরিবেশে হিজল করচগাছের
তলায় রান্নার আয়োজনে কেউ কাটে পেঁয়াজ, কেউ বাটে আদা-রসুন, কেউবা আবার
হাঁড়ি-পাতিল নিয়ে মহাব্যস্ত। সবাই যেন আজ- আদি ঢাকার ওস্তাদ বাবুর্চি সাজার
চেষ্টায় মরিয়া। সারা দিন ঘোরাঘুরি শেষে বিনোদন পর্ব- যেমন খুশি তেমন সাজো,
হাত পাঞ্জা আর মার্শাল আট খেলা উপস্থিত সবার মাঝেই বাড়তি আনন্দের রসদ
জুগিয়েছে। পাঞ্জায় জসিম উদ্দিন যেমন খুশি তেমন সাজতে রনি মৃধা ও মার্শাল
আর্টে আমি জাভেদ হাকিম বিজয়ী হই। দে-ছুট সংগঠনের সৌজন্য বিনোদনমূলক
পুরস্কার বিজয়ীদের মাঝে বিতরণ করেন সাংবাদিক শ্রী তাপস, মো. খলিল এবং মো.
লাভলু। ইতিমধ্যে ভাত-তরকারি ডাল-ফিশ বার-বি-কিউ রেডি। প্রথমে বার-বি-কিউ
ভোজ। পরে সমান তালে চলে ভাত-গোশত-মুগ ডাল দিয়ে উদর পূর্তি।
সতর্কতা
কোনো অবস্থাতেই পাখিদের বিরক্ত ও পরিবেশের ক্ষতি হয় এরকম কিছু থেকে বিরত থাকবেন। বর্জ্য পুঁতে ফেলবেন নতুবা চটের ব্যাগে করে নিয়ে আসবেন। স্থানীয়রা যে স্থানে তাঁবু ফেলার পরামর্শ দেবেন ঠিক সেই জায়গাতেই গাড়বেন। আশপাশে কোনো বাজার নেই সুতরাং সঙ্গে করেই সদাইপাতি নিয়ে যাবেন।
যোগাযোগ
ঢাকার সায়েদাবাদ থেকে বড়লেখা উপজেলা সদরে বিভিন্ন পরিবহনের বাস সার্ভিস চলাচল করে। ভাড়া ৫০০ থেকে ৫৫০ টাকা মাত্র। পাখিবাড়ির দূরত্ব উপজেলা সদর থেকে মাত্র পনেরো কিলোমিটার পশ্চিমে। দক্ষিণবাজার সিএনজি স্ট্যান্ড থেকে কাননগোবাজার। ভাড়া নেবে ২০ টাকা। সেখান থেকে আবারও ২০ টাকা ভাড়ায় সিএনজিতে খুটাউরা। কিছুটা পথ হেঁটে হাওরের কৈয়ারকোণা বিলের পাশেই পাখিবাড়িটির অবস্থান। সবচেয়ে সুবিধা হবে ভ্রমণপিপাসুরা যদি প্রথমেই নিজস্ব বা রেন্ট গাড়ি রিজার্ভ নিয়ে নেন।
থাকা-খাওয়া
উপজেলা সদরের দক্ষিণ বাজারে মোটামুটি মানের বেশ কিছু আবাসিক হোটেল ও রেস্টুরেন্ট রয়েছে। খরচ নাগালের মধ্যেই। এ ছাড়া স্থানীয়দের সহায়তায় রাতে হাওরে তাঁবু বাস ও নিজেরাই রান্না করে খেতে পারবেন।
পাখি দেখার সময়
পাখিবাড়িতে সারা বছরই নানা প্রজাতির দেশীয় পাখির দেখা মেলে আর অতিথি পাখির প্রাচুর্যতা মিলবে মার্চের শেষ সপ্তাহ পর্যন্ত। ছবি দে-ছুট ভ্রমণ সংঘ
সতর্কতা
কোনো অবস্থাতেই পাখিদের বিরক্ত ও পরিবেশের ক্ষতি হয় এরকম কিছু থেকে বিরত থাকবেন। বর্জ্য পুঁতে ফেলবেন নতুবা চটের ব্যাগে করে নিয়ে আসবেন। স্থানীয়রা যে স্থানে তাঁবু ফেলার পরামর্শ দেবেন ঠিক সেই জায়গাতেই গাড়বেন। আশপাশে কোনো বাজার নেই সুতরাং সঙ্গে করেই সদাইপাতি নিয়ে যাবেন।
যোগাযোগ
ঢাকার সায়েদাবাদ থেকে বড়লেখা উপজেলা সদরে বিভিন্ন পরিবহনের বাস সার্ভিস চলাচল করে। ভাড়া ৫০০ থেকে ৫৫০ টাকা মাত্র। পাখিবাড়ির দূরত্ব উপজেলা সদর থেকে মাত্র পনেরো কিলোমিটার পশ্চিমে। দক্ষিণবাজার সিএনজি স্ট্যান্ড থেকে কাননগোবাজার। ভাড়া নেবে ২০ টাকা। সেখান থেকে আবারও ২০ টাকা ভাড়ায় সিএনজিতে খুটাউরা। কিছুটা পথ হেঁটে হাওরের কৈয়ারকোণা বিলের পাশেই পাখিবাড়িটির অবস্থান। সবচেয়ে সুবিধা হবে ভ্রমণপিপাসুরা যদি প্রথমেই নিজস্ব বা রেন্ট গাড়ি রিজার্ভ নিয়ে নেন।
থাকা-খাওয়া
উপজেলা সদরের দক্ষিণ বাজারে মোটামুটি মানের বেশ কিছু আবাসিক হোটেল ও রেস্টুরেন্ট রয়েছে। খরচ নাগালের মধ্যেই। এ ছাড়া স্থানীয়দের সহায়তায় রাতে হাওরে তাঁবু বাস ও নিজেরাই রান্না করে খেতে পারবেন।
পাখি দেখার সময়
পাখিবাড়িতে সারা বছরই নানা প্রজাতির দেশীয় পাখির দেখা মেলে আর অতিথি পাখির প্রাচুর্যতা মিলবে মার্চের শেষ সপ্তাহ পর্যন্ত। ছবি দে-ছুট ভ্রমণ সংঘ

No comments:
Post a Comment