একের
পর এক বিয়ে করার কারণে খুন হন রাজধানীর কামরাঙ্গীরচর নিবাসী কবিরাজ বাচ্চু
মিয়া। ভাড়াটে খুনি দিয়ে নিজের ছেলে আল-আমিন তাকে খুন করায়। আদালতে দেয়া
আল-আমিনের দেয়া জবানবন্দিতে এমন তথ্যই বের হয়ে এসেছে। গত ২৯ ডিসেম্বর
কামরাঙ্গীরচরে বাসার সামনেই খুন হন কবিরাজ বাচ্চু মিয়া। আল-আমিনের দেয়া
স্বীকারোক্তি থেকে জানা যায়, চিকিৎসার নাম করে বাচ্চু মিয়া দেশের বিভিন্ন
এলাকায় ঘুরে বেড়াতেন। যেখানেই যেতেন চিকিৎসা নিতে আসা দরিদ্র পরিবারের
কুমারী মেয়েদের প্রেমের ফাঁদে ফেলে বিয়ে করতেন। তিনি কয়টি বিয়ে করেছেন তার
হিসাব নেই। সর্বশেষ দেড় বছর আগে বাচ্চু মিয়া সিলেটে গিয়ে ডলি নামের এক
তরুণীকে বিয়ে করেন। বিয়ের এক বছর পর গত আগস্টে ডলিকে কামরাঙ্গীরচরের বাসায়
নিয়ে আসেন। এরপর তিনি বড় স্ত্রী জোহরা বেগমকে তিন সন্তানসহ আলাদা করে দেন।
এমনকি তাদের ভরণ- পোষণও বন্ধ করে দেন। একের পর এক বিয়ে এবং ছোট স্ত্রীকে
বাসায় নিয়ে আসার কারণে ক্ষিপ্ত হয়ে ওঠে বাচ্চু মিয়ার ছোট ছেলে আল-আমিন।
বিষয়টি নিয়ে আল-আমিন তার মামা (জোহরার ভাই) আলমাসের সঙ্গে আলোচনা করে।
হত্যার এক মাস আগে ভাড়াটে খুনিদের দিয়ে হত্যার পরিকল্পনা করে দু’জন। গত ২৯
ডিসেম্বর দেড় লাখ টাকায় বাস্তবায়ন করা হয় হত্যার মিশন। ভাড়াটে খুনি প্রিন্স
বয় সাইদ ছুরি দিয়ে পেছন থেকে ঘাড়ে কোপ দিয়ে বাচ্চু মিয়াকে খুন করে।
পুলিশের লালবাগ জোনের অতিরিক্ত উপ-কমিশনার (এডিসি) মোহাম্মদ নাজির আহমেদ
খান যুগান্তরকে বলেন, ঘটনার পর বাচ্চু মিয়ার ছেলে আল-আমিনকে জিজ্ঞাসাবাদ
করা হলে সে মাথা নিচু করে কথা বলছিল। কোনোভাবেই চোখে চোখ রেখে কথা বলছিল
না। এ থেকেই তাকে ঘিরে সন্দেহ শুরু হয়। প্রযুক্তিগত তদন্তের মাধ্যমে ঘটনার
২২ দিন পর এ ঘটনার রহস্য উদ্ঘাটন করা হয়। এদিকে হত্যার মিশন বাস্তবায়নের
সঙ্গে যুক্ত আল-আমিনের বন্ধু রাজন, তার ভাই সুজন ও ভাড়াটে খুনি প্রিন্স বয়
সাইদকে গ্রেফতার করেছে পুলিশ। রাজন ও প্রিন্স আদালতে ১৬৪ ধারায়
স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছে। হত্যার পরিকল্পনার সঙ্গে যুক্ত
আল-আমিনের মামা আলমাস সৌদি আরবে পালিয়ে গেছে। পুলিশ জানায়, কবিরাজ বাচ্চু
হত্যায় কোনো ক্লু পাওয়া যাচ্ছিল না। প্রথমে ধারণা করা হচ্ছিল জঙ্গিরা এ
ঘটনা ঘটিয়েছে। প্রযুক্তিগত তদন্ত ও দফায় দফায় জিজ্ঞাসাবাদ করার পরও তারা
ঘটনার কথা স্বীকার করছিল না। প্রযুক্তিগত তদন্তের মাধ্যমে ঘটনার সময় তাদের
অবস্থান চিহ্নিত করা হয়। পরে এসব তথ্য তুলে ধরা হলে প্রথমে রাজন ঘটনার কথা
স্বীকার করে। জানা যায়, বাচ্চু মিয়া দেশের বিভিন্ন এলাকায় একের পর এক বিয়ে
করলেও সব স্ত্রীর বিষয়ে তথ্য জানে না পরিবারের সদস্যরা। তবে পাঁচ স্ত্রীর
সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগের বিষয়ে পরিবারের সদস্যরা জানত।
এর মধ্যে দু’জন
কামরাঙ্গীরচরের মাদ্রাসাপাড়ার হাকিম ভিলা নামে চারতলা বাড়িতে থাকত। কবিরাজি
চিকিৎসা করেই ওই বাড়িটি তৈরি করেন বাচ্চু মিয়া। রাজন ও প্রিন্স বয় সাইদ
স্বীকারোক্তিতে বলেছে, ঘটনার দিন সন্ধ্যা থেকেই বাচ্চু মিয়ার ওপর নজর
রাখছিল রাজন। ওই সময়ে বাচ্চু মিয়া লালবাগের কেল্লার মোড়ে ‘আল-আমিন দরবার’
নামে নিজের দাওয়াখানায় অবস্থান করছিলেন। ৯টার দিকে দাওয়াখানা থেকে বেরিয়ে
কেল্লার মোড় টেম্পোস্ট্যান্ড থেকে তার সহকারী তারা মিয়াকে নিয়ে রিকশায়
ওঠেন। এ সময় আরেকটি রিকশা নিয়ে কবিরাজের পিছু নেয় রাজন। কবিরাজের অবস্থান
সম্পর্কে মোবাইল ফোনে রাজন তার ছোট ভাই সুজনকে জানাচ্ছিল। সুজন আবার এসব
তথ্য প্রিন্সকে জানাচ্ছিল। প্রিন্স ওই সময় কামরাঙ্গীরচরের মাদ্রাসাপাড়া
খালপাড়ে বাচ্চু মিয়ার বাড়ি ‘হাকিম ভিলা’র সামনে অবস্থান করছিল। সাড়ে ৯টার
দিকে রিকশা থেকে নেমে কবিরাজ বাড়ির গেট দিয়ে ঢুকতে গেলেই পেছন থেকে ঘাড়ে
কোপ দেয় প্রিন্স। তখন প্রিন্সের সঙ্গে ছিল সুজন। ঘাড়ে কোপ দিয়েই প্রিন্স ও
সুজন পালিয়ে যায়। ঘটনার সময় ঘটনাস্থলের ২০০ গজের মধ্যে অবস্থান করছিল রাজন।
বাচ্চু মিয়াকে হাসপাতালেও নিয়ে যায় সে। ওই সময় বাচ্চু মিয়ার ছেলে আল-আমিন
সাভারে তার মামা আনসারের সঙ্গে ছিল। সেখান থেকে রাজনের সঙ্গে মোবাইল ফোনে
সার্বক্ষণিক যোগাযোগ রাখছিল আল-আমিন। ঘটনার পর মামার কাছ থেকে এক লাখ টাকা
এনে রাজনকে দেয় আল-আমিন। ওই টাকা থেকে পাঁচ হাজার টাকা দেয় প্রিন্সকে।
ঘটনার কয়েক দিন পর আল-আমিনের মামা আলমাস সৌদি আরবে পালিয়ে যায়।

No comments:
Post a Comment