গতানুগতিকতা
থেকে বের করে আনা হচ্ছে দেশের উচ্চশিক্ষাকে। উচ্চশিক্ষায় ব্যাপক পরিবর্তন
আনা হচ্ছে। বর্তমানে সরকারি-বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের যে সব বিষয়ে ও কোর্সে
উচ্চশিক্ষা প্রদান করা হচ্ছে, তা সেকেলে। তথ্যপ্রযুক্তি-প্রকৌশল প্রযুক্তি
এবং জ্ঞান- গবেষণানির্ভর বিশ্ব চ্যালেঞ্জ মোকাবেলায় যোগ্যতা অর্জন করতে
পারছেন না দেশের শিক্ষার্থীরা। এ বিষয়টিকে বিবেচনায় রেখে উচ্চশিক্ষার
বর্তমান কারিকুলামে ব্যাপক পরিবর্তন আনার পরিকল্পনা হাতে নেয়া হয়েছে। এর
জন্য আর্থিক সহায়তাও দেয়া হবে বলে বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশন (ইউজিসি)
সূত্রে জানা গেছে। ইউজিসি চেয়ারম্যান অধ্যাপক আবদুল মান্নান নয়া দিগন্তকে
বলেন, উচ্চশিক্ষায় বিশ্বমানের সক্ষমতা অর্জনের জন্য আর্থিক সীমাবদ্ধতা
সমস্যা নয়। সমস্যা হচ্ছে কর্মপরিকল্পনা আর উদ্যোগের। সরকারের পাশাপাশি
বৈদেশিক সহায়তা ও বিশ্বমানের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর সাথে সহযোগিতার মাধ্যমে
শিক্ষার্থীদের মানসম্পন্ন উচ্চশিক্ষা নিশ্চিত করা যায়। এ লক্ষ্যে ইউজিসি
কাজ শুরু করেছে। এ ছাড়া উচ্চশিক্ষার মানোন্নয়ন প্রকল্পের (হেকেপ) অধীনে
বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর শিক্ষার মান নিশ্চিত করতে ব্যাপক সহায়তা পাওয়া যাচ্ছে।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, বর্তমানে দেশের সরকারি-বেসরকারি যে বিশ্ববিদ্যালয় রয়েছে
তার প্রত্যেকটিতে যে কারিকুলামে পাঠদান চলছে, তা ১০ থেকে ১৫ বছরের পুরনো। এ
কারিকুলামে উচ্চশিক্ষা দেশে ব্যাপকহারে শিক্ষিত কিন্তু প্রযুক্তি আর
প্রকৌশলীহীন জনশক্তি তৈরি হচ্ছে। কিন্তু এদের শ্রম বাজার অত্যন্ত সীমিত ও
অনেক ক্ষেত্রে নেই বললেই চলে। ফলে কোটি কোটি টাকা সরকারি বিনিয়োগ পানিতে
যাচ্ছে বলে মনে করেন উচ্চশিক্ষা বিশেষজ্ঞরা। তারা বলেন, দেশে
প্রযুক্তিনির্ভর জনশক্তির অভাবই শুধু নয়, অন্য সঙ্কটও বিদ্যমান। অথচ এ
সঙ্কট মোকাবেলার জন্য চালু বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতেও কোনো গবেষণা নেই। এমনকি
কোনো পরিকল্পনাও নেই।
ফলে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে গতানুগতিক সিলেবাস দিয়ে
বিভিন্ন বিভাগে স্নøাতক ও স্নøাতকোত্তর কোর্স পরিচালিত হচ্ছে। সংশ্লিষ্টরা
আরো জানান, এতেই শেষ নয় একেক বিশ্বিবিদ্যালয়ে একেক পদ্ধতিতে উত্তরপত্র
মূল্যায়ন করা হচ্ছে। সেমিস্টার, কোর্স ক্রেডিট ও গ্রেডিং পদ্ধতিতেও রয়েছে
ভিন্নতা। কোনো প্রতিষ্ঠানে ৮০ নম্বরে এ-পাস আবার কোথাও ৯৫ নম্বরে এ-পাস ধরা
হচ্ছে। এতে করে শিক্ষার্থীদের মানের দিক থেকেও সমতার অভাব দেখা দিয়েছে।
এরই পরিপ্রেক্ষিতে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর মূল্যায়ন ভিন্নতায় শিক্ষার্থীদের
ফলাফলেও পরিবর্তন দেখা যায়। এর পাশাপাশি রয়েছে কিছু বেসরকারি
বিশ্ববিদ্যালয়ের মানহীনতা ও সার্টিফিকেট বাণিজ্য। সার্টিফিকেট বাণিজ্যের
কারণে দেশে-বিদেশে বাংলাদেশী জনশক্তির ব্যাপারে বিরূপ প্রতিক্রিয়াও দেখা
যাচ্ছে। তাই শিক্ষার গুণগতমান নিশ্চিত করার জন্য দেশের সব সরকারি ও
বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে অভিন্ন কারিকুলামে চিন্তা করছে উচ্চশিক্ষা তদারকি
প্রতিষ্ঠান বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশন। এ ব্যাপারে সংশ্লিষ্ট সবার মতামত ও
সুপারিশও নেয়া হবে। এর পরই চূড়ান্ত পদক্ষেপ নেয়া হবে। ইউজিসি সূত্রে জানা
গেছে, বিজ্ঞান-প্রকৌশল-প্রযুক্তি বিষয়ে সেমিস্টার, ক্রেডিট এবং
স্ট্যান্ডার্ড গ্রেডিং পদ্ধতি নির্ধারণ করে দেবে কমিশন। তারই আলোকে গবেষণা
কার্যক্রমকেও জোরদার করতে প্রয়োজনীয় আর্থিক সহায়তা দেয়া হবে। এর জন্য
নীতিমালা-বিধিমালারও প্রয়োজন হতে পারে, তা করতেও উদ্যোগ নেয়া হবে। দেশে
৩৭টি পাবলিক ও ৯৬টি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় রয়েছে। এর মধ্যে ৮০টি বেসরকারি
বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষাকার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে। হাতেগোনা কয়েকটি
বিশ্ববিদ্যালয় ছাড়া মানসম্পন্ন শিক্ষাকার্যকমে এবং গবেষণানির্ভর দক্ষ
জনশক্তি তৈরিতে পিছিয়ে রয়েছে তারা। আন্তর্জাতিক মানদণ্ডে স্থান করে নিতে
পারছে না দেশীয় এসব উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠান। আর অধিকাংশ বেসরকারি
বিশ্ববিদ্যালয় দেশের উচ্চশিক্ষাকে প্রশ্নের সম্মুখীন করছে। কিছু কিছু
প্রতিষ্ঠানে শিক্ষা ও গবেষণার ক্ষেত্রে ন্যূনতম মান নিশ্চিত করতে ব্যর্থ
হচ্ছে। ইউজিসি সূত্রে জানা গেছে, ইউজিসির সদস্য অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ ইউসুফ
আলী মোল্লার নেতৃত্বে একটি বিশেষজ্ঞ দল উচ্চশিক্ষার কারিকুলামের গাইডলাইন
প্রণয়ন করছেন। রিসোর্সপারসন হিসেবে ইউজিসি সাবেক সদস্য অধ্যাপক ড. এম.
মুহিবুর রহমান, বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক মোজাহার আলী,
ঢাকা
বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা ও গবেষণা অনুষদের অধ্যাপক ড. মো: ছিদ্দিুকুর রহমান
কাজ করছেন। উচ্চশিক্ষার মানোন্নয়ন প্রকল্পের (হেকেপ) আর্থিক সহযোগিতায় এ
কাজটি হচ্ছে। এ বিষয়ে সরকারি ও বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের স্টেকহোল্ডারদের
নিয়ে জাতীয় কর্মশালাও করা হবে ইউজিসির উদ্যোগে। ইউজিসি চেয়ারম্যান অধ্যাপক
আব্দুল মান্নান বলেন, বর্তমান কারিকুলাম বিশ্ববিদ্যালয়পর্যায়ের স্নাতক
শিক্ষার্থীদের জন্য যথাযথ নয়। আমাদের কারিকুলামগুলো ১০ থেকে ১৫ বছরের
পুরনো। ক্রমবর্ধমান বিশ্বের দক্ষ ও জ্ঞানভিত্তিক শিক্ষার্থীদের সাথে টিকে
থাকতে দেশে আধুনিক কারিকুলাম প্রণয়ন জরুরি হয়ে পড়েছে। তিনি বলেন, বেসরকারি
বিশ্ববিদ্যালয়ে অনেক বিষয় পড়ানো হলেও তাদের সিলেবাস নিয়ে নানা বিতর্ক
রয়েছে। দেশে-বিদেশে চাকরি বাজারে প্রবেশের জন্য দক্ষ জনশক্তি হিসেবে আমাদের
ছাত্রছাত্রীদের গড়ে তোলার জন্য সবাইকে সমন্বিত উদ্যোগ নিতে হবে। অধ্যাপক
মান্নান জানান, এখনো প্রায় চার লাখ বিদেশী জনশক্তি আমাদের দেশে বিভিন্ন
খাতে উচ্চ বেতনে চাকরি করছেন। এসব বিষয়কে গুরুত্ব দিয়ে আমরা যুগোপযোগী
বিজ্ঞান ও প্রকৌশল বিষয়ের সিলেবাস, সেমিস্টার, ক্রেডিট এবং গ্রেডিং পদ্ধতি
নির্ধারণ করা হবে। বিজ্ঞানের বিষয়গুলোতে সেমিস্টাসের সময় কমিয়ে আনা হবে।
বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে এসব নির্দেশনা অনুসরণে সুপারিশ করবে ইউজিসি। যারা এসব
নির্দেশনা অমান্য করবে, মানের দিক থেকে তারা পিছিয়ে পড়বে বলে তিনি মনে
করেন।

No comments:
Post a Comment