উত্তর
কোরীয় নেতা কিম জং উনের সৎ ভাই কিম জং ন্যাম হত্যার তদন্ত নিয়ে বিপাকে
পড়েছে মালয়েশিয়ার পুলিশ। রহস্যময় এ হত্যাকাণ্ডের সমাধান প্রায় তাদের হাতের
মুঠোয়। একজনকে জিজ্ঞাসাবাদ করলেই খুলে যাবে জট। সেই ব্যক্তির নাম জানে
পুলিশ। কোন দেশের নাগরিক, কোথায় থাকেন, কিভাবে গ্রেফতার করা যাবে- সব তথ্যই
আছে তাদের কাছে। কিন্তু সমস্যাটা হচ্ছে, তিনি উত্তর কোরিয়ার কূটনীতিক।
একজন কূটনীতিকের বিরুদ্ধে অপরাধের অভিযোগ থাকলেও তাকে গ্রেফতার করে
জিজ্ঞাসাবাদ করা একটি দেশের পক্ষে প্রায় অসম্ভব। কারণ এর পেছনে রয়েছে
কূটনৈতিক দায়মুক্তি। উদাহরণস্বরূপ দুই বছর আগের একটি ঘটনা উল্লেখ করা যাক।
ভারতে নিযুক্ত সৌদি কূটনীতিকের বিরুদ্ধে একজন নেপালি গৃহকর্মীকে ধর্ষণ ও
নিপীড়নের পৌনঃপুনিক অভিযোগ উঠেছিল। অথচ কূটনৈতিক দায়মুক্তি নিয়ে তিনি রাজার
বেশে নয়াদিল্লি ত্যাগ করেছিলেন। ২০১৫ সালে ঢাকায় উত্তর কোরীয় দূতাবাসের
ফার্স্ট সেক্রেটারি তার ব্যাগে ১৪ লাখ ডলার মূল্যের অবৈধ স্বর্ণ নিয়ে ধরা
পড়েছিলেন। তাকে আটক করলেও বাংলাদেশের পুলিশ কোনো অভিযোগ গঠন করেনি। নিরাপদে
ঢাকা ত্যাগ করেছিলেন তিনি। ওই বছরেই একই দূতাবাসের আরেক কর্মকর্তাকে
বাংলাদেশ বহিষ্কার করেছিল। কারণ তিনি ১০ লাখ টাকার সিগারেট চোরাচালানের
সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। গত বছর গ্লোবাল ইনিশিয়েটিভ অ্যাগেইনিস্ট
ট্রান্সন্যাশনাল অর্গানাইজড ক্রাইম জানায়, দক্ষিণ আফ্রিকায় উত্তর কোরিয়ার
একজন কূটনীতিক গণ্ডারের শিং চোরাচালানে জড়িত। অথচ তারও কিছুই হয়নি। আইনগত
দায়মুক্তি নিয়ে দেশে ফিরেছিলেন। মালয়েশিয়ার আলোচ্য উত্তর কোরীয় কূটনীতিক
হাইওন কোয়াং সং। কিম জং ন্যাম গত ১৩ ফেব্রুয়ারি বিমানবন্দরের লবিতে
আক্রান্ত হয়ে নিহত হন। মালয়েশীয় পুলিশের তদন্তে যেসব সন্দেহভাজনের নাম
এসেছে, তাদের প্রায় সবাই উত্তর কোরীয় নাগরিক। এদের অধিকাংশই দেশে ফিরে
গেলেও কূটনীতিক হাইওন ও জাতীয় পতাকাবাহী বিমান এয়ার কোরিও’র এক কর্মচারী
মালয়েশিয়াতেই আছেন। এটি কল্পনা করা মোটেই কঠিন নয়, তারা কোথায় আছেন। আছেন
উত্তর কোরীয় দূতাবাসের হলুদ দোতলা ভবনে। ন্যাম হত্যার খবরের পরপরই একদল
সাংবাদিক ও ফটোগ্রাফার দূতাবাসের বাইরে অবস্থান নিয়েছেন। কিন্তু মালয়েশিয়ার
পুলিশ সেখানে তল্লাশি করতে পারছেন না।
কারণ এজন্য উত্তর কোরিয়ার অনুমতি
লাগবে। আর তা সম্ভব না। পুলিশপ্রধান খালিদ আবুবকর অবশ্য বলেছেন, তারা
পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে ওই কূটনীতিককে জিজ্ঞাসাবাদের অনুরোধ
জানিয়েছেন। তিনি বলেন, ‘আপনার যদি কিছু গোপন করার না থাকে, তবে ভয় পাবেন
কেন? আপনার তো সহযোগিতা করা উচিত।’ কিন্তু আন্তর্জাতিক রীতি-নীতি যা বলে,
তাতে এ পদক্ষেপ বাস্তবায়ন হবে না। ভিয়েনা কনভেনশনে কূটনৈতিক সম্পর্ক বিষয়ে
বলা হয়েছে- ‘একজন বিদেশী কূটনীতিক সব ধরনের আক্রমণ থেকে মুক্ত। কোনো
অবস্থাতেই তাকে আটক বা বন্দি করা যাবে না। স্বাগতিক দেশকে অবশ্যই
কূটনীতিকের যথাযোগ্য সম্মান দেখাতে হবে। যে কোনো ধরনের ব্যক্তি আক্রমণ,
স্বাধীনতা ও মর্যাদার প্রতি আঘাত থেকে তাকে সুরক্ষা দিতে হবে।’ সেখানে আরও
বলা হয়েছে- ‘কূটনৈতিক কর্মকর্তা স্বাগতিক দেশ থেকে সব ধরনের অপরাধ ও
বিচারের দায়মুক্তি পাবেন। তাকে কেবল তার নিজের দেশের সরকার প্রত্যাহার করে
নিতে পারবে।’ ন্যাম হত্যায় উত্তর কোরিয়ার দুই মন্ত্রণালয়-সিউল : উত্তর
কোরিয়ার নেতা কিম জং উনের সৎভাই কিম জং ন্যামকে হত্যার পেছনে বিচ্ছিন্ন
দেশটির নিরাপত্তা ও পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জড়িত বলে দাবি করেছে দক্ষিণ
কোরিয়া। রয়টার্স জানায়, এ হত্যাকাণ্ডে উত্তর কোরিয়ার যে আটজনকে সন্দেহ করা
হচ্ছে, তাদের মধ্যে নিরাপত্তা মন্ত্রণালয়ের চারজন ও পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের
দুজন কর্মকর্তা রয়েছেন। গত ১৩ ফেব্রুয়ারি জং ন্যাম কুয়ালালামপুর
বিমানবন্দরে ম্যাকাওগামী ফ্লাইটের জন্য অপেক্ষা করছিলেন। এ সময় দুই নারী
তার মুখমণ্ডলে বিষাক্ত উপাদান ছড়িয়ে দেন। এরপর ১৫ থেকে ২০ মিনিটের মধ্যেই
তার মৃত্যু হয়। তার লাশ কুয়ালালামপুরের একটি হাসপাতালের মর্গে রয়েছে।

No comments:
Post a Comment