Tuesday, February 28, 2017

প্রশ্ন ফাঁস শিক্ষা ব্যবস্থা ভেঙে পড়ার পূর্ব লক্ষণ?

একটি দেশকে উন্নতির শিখরে নিয়ে যেতে হলে সে দেশের শিক্ষার দিকে প্রথমে তাকাতে হয়। দেশটির জনগোষ্ঠীকে প্রকৃত শিক্ষায় শিক্ষিত করে তুলতে হয়। কাগজে-কলমে শুধু শিক্ষার হার বাড়ালেই দেশ এগিয়ে যায় না, বরং সুশিক্ষা ও স্বশিক্ষায় শিক্ষিত করে তুলতে পারলেই দেশকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়া যায়। গত কয়েক বছর ধরে দেশের পাবলিক পরীক্ষার প্রশ্নপত্র ফাঁস নিয়ে সারা দেশে ব্যাপক আলোচনা-সমালোচনা হচ্ছে। দেশের বিশাল একটি শিক্ষিত জনগোষ্ঠী বলেছিল, প্রশ্নপত্র ফাঁস রোধে ব্যবস্থা নিন। এর বিপরীতে দায়িত্বপ্রাপ্ত মন্ত্রী উত্তর দেন, প্রশ্নপত্র ফাঁস হয়নি, হচ্ছে না! মাননীয় মন্ত্রী একে নিছক সাজেশন হিসেবে অ্যাখ্যায়িত করেছেন, যা প্রশ্নপত্র ফাঁসকারীদের একরকম বাহ্বা দেয়ার সমতুল্য। অধ্যাপক ড. মুহম্মদ জাফর ইকবাল থেকে শুরু করে অনেকেই এ নিয়ে লেখালেখি করেছেন, প্রতিবাদ করেছেন। তারপরও অজ্ঞাত কারণে থেমে থাকেনি প্রশ্নপত্র ফাঁস। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুকে পর্যন্ত ছড়িয়ে পড়েছিল সেই প্রশ্ন। ফলে শিক্ষার্থীরা রাত জেগে অনলাইনে প্রশ্নপত্র সংগ্রহে ব্যস্ত ছিল। এমন অনেক শিক্ষার্থীকে দেখেছি, যারা শুধু প্রশ্নপত্র পেয়ে তারপর পড়ার টেবিলে বসতে গেছে। বর্তমানে পাবলিক পরীক্ষার প্রশ্নপত্র ফাঁস যেন সংস্কৃতি হয়ে দাঁড়িয়েছে! ছোটকাল থেকেই শিক্ষার্থীরা বুঝতে শুরু করেছে, পড়াশোনা না করেও বিকল্প পদ্ধতিতে ভালো ফল করা যায়। শুধু প্রাথমিক শিক্ষা সমাপনী নয়, এখন অন্যান্য পরীক্ষার প্রশ্নও ফাঁস হচ্ছে, এমন কথা অহরহ শোনা যায়। উদ্বেগজনক হলেও সত্য, এখন আর শিক্ষার্থীরা পড়াশোনা করতে চায় না, তারা ফাঁসকৃত প্রশ্নপত্র হাতে পেয়ে ভালো ফল করতে চায়। কিছুদিন আগেও এক শিক্ষার্থীকে পড়াতে গিয়ে দেখেছি সে কীভাবে ফাঁসকৃত প্রশ্নপত্র হাতে পাবে সেই ফন্দি খুঁজছে। প্রশ্নপত্র ফাঁস হওয়ার কোনো পদ্ধতি থাকলে শিক্ষার্থীরা সে পথে পা বাড়াবে, এটা আমাদের দেশের প্রেক্ষাপটে অনেকটাই স্বাভাবিক। যেখানে প্রাইমারি থেকে শুরু করে বিশ্ববিদ্যালয়ের ভর্তি পরীক্ষার প্রশ্নপত্র ফাঁস হয়, সেখানে শিক্ষা ব্যবস্থা কতটুকু অগ্রসর হয়েছে তা সহজেই অনুমেয়। শিক্ষা ব্যবস্থার আধুনিকায়ন, পরিবর্ধন, পরিমার্জন, পরীক্ষা-নিরীক্ষার নামে চালানো হচ্ছে পরীক্ষামূলক নির্যাতন। এ দেশে শিক্ষা পদ্ধতি নিয়ে যতবার পরীক্ষা-নিরীক্ষা হয়েছে, ততবার শিক্ষা নিয়ে ভাবা হয়েছে কিনা তাতে সন্দেহ রয়েছে! বলা হয়ে থাকে, প্রকৃতিই মানুষের শ্রেষ্ঠ শিক্ষক। কিন্তু বর্তমান শিক্ষা ব্যবস্থায় দেখা যায় প্রকৃতির কাছে যাওয়ার সুযোগই পায় না শিশু-কিশোররা। অনেক অপ্রয়োজনীয় পরীক্ষার যাঁতাকলে পিষ্ট হয়ে শিশুরা তাদের শৈশব-কৈশোর হারিয়ে ফেলছে, নষ্ট করে ফেলছে তাদের সৃজনশীলতা। চার দেয়ালে বন্দি থেকে মানসিকভাবে বিকলাঙ্গ হচ্ছে আমাদের আগামী দিনের স্বপ্ন। শিশুদের ওপর থেকে যতটা সম্ভব লেখাপড়ার চাপ কমাতে হবে। এ জন্য সময়ের কথা বিবেচনায় রেখে তাদের পাঠ্যপুস্তক তৈরি করতে হবে।
সিলেবাস প্রণেতারা কিশোর শিক্ষার্থীদের বয়স ও সামর্থ্যরে সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ সিলেবাস প্রণয়ন করেননি। বর্তমানে এসএসসির পদার্থ, রসায়ন ও উচ্চতর গণিত এবং এইচএসসির পদার্থ, রসায়ন, জীব ও উচ্চতর গণিত বিষয়ের সিলেবাস দেখলে মনে হয়, মাধ্যমিক বা উচ্চমাধ্যমিক পর্যায়েই একেকজন শিক্ষার্থীকে তারা আইনস্টাইন, নিউটন বানাতে চান। অনেক ক্ষেত্রে প্রশ্ন পদ্ধতিতেও আনা হচ্ছে জটিলতা। এমন অনেক বিষয় সেখানে অন্তর্ভুক্ত, যা বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ে পাঠ্য হওয়া সমীচীন। একজন কিশোর শিক্ষার্থী যখন কোনো একটি বিষয় সঠিকভাবে বুঝতে পারে না, পড়াশোনার মাঝে যখন সে আনন্দের পরিবর্তে বিশাল বোঝা অনুভব করে তখন সে আস্তে আস্তে ওই বিষয় থেকে দূরে সরে যেতে চায়। বর্তমান শিক্ষা পদ্ধতি শিক্ষার্থীদের জন্য আনন্দের পরিবর্তে বোঝা হয়ে দাঁড়িয়েছে। এই আনন্দহীন শিক্ষা ব্যবস্থা, অসুস্থ প্রতিযোগিতা যতদিন বন্ধ না হবে, ততদিন নেপালের রাজধানী হবে নেপচুন, পিথাগোরাস উপন্যাস লিখবেন, ২৬ ডিসেম্বর বিজয় দিবস হবে, নিউটন আপেল নিয়ে দৌড়াদৌড়ি করবেন, অপারেশনের সময় লাইট জ্বালানোকে ‘অপারেশন সার্চ লাইট’ বলা হবে এবং ‘আমি এ প্লাস পেয়েছির ইংরেজি হবে ‘আই অ্যাম এ প্লাস’! বর্তমান সৃজনশীল শিক্ষা ব্যবস্থা হয়ে উঠেছে জিপিএ ফাইভমুখী। বাগাড়ম্বর আর ঢাকঢোলের বাদনে চাপা পড়েছে শিক্ষার প্রকৃত উদ্দেশ্য ও আকাক্সক্ষা। শিক্ষার হার বেড়েছে, বাড়ছে ডিগ্রিধারীর সংখ্যা। বেড়েছে স্কুল-কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ের সংখ্যাও। কিন্তু শিক্ষার এত বিস্তৃতির পরও পুরো সমাজ অমানবিক হয়ে উঠছে কেন? স্বার্থপরতা, সাম্প্রদায়িক সহিংসতা, ধর্মান্ধতা, জঙ্গি কর্মকাণ্ডের মতো ভয়ংকর অমানবিক অপরাধ কর্মকাণ্ড বাড়ছে কেন? এসব প্রশ্নের উত্তর পেতে সমাজ, রাষ্ট্র ও শিক্ষা ব্যবস্থার রোগ নির্ণয় জরুরি। একটি অসুস্থধারার শিক্ষা ব্যবস্থায় ভর করে পুরো জাতি আগামীতে কোথায় গিয়ে দাঁড়াবে সে বিষয়ে এখনই পরিকল্পনা করা দরকার। এখনই যদি শিক্ষার প্রতি নজর দেয়া না হয়, প্রশ্নপত্র ফাঁস বন্ধ করা না হয়, তাহলে অচিরেই দেশের শিক্ষা ব্যবস্থা ভেঙে পড়বে। ডিজিটাল বাংলাদেশ গড়ার যত রকম প্রচেষ্টাই নেয়া হোক না কেন, শিক্ষা ক্ষেত্রে পর্যাপ্ত গুরুত্ব না দিলে তা কখনোই বাস্তবায়ন সম্ভব হবে না।
মামুনুর রশিদ : শিক্ষার্থী, গণিত বিভাগ, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়
mamunurrashidmiajee@gmail.com

No comments:

Post a Comment