রংপুরের
কাউনিয়ার চাঞ্চল্যকর জাপানী নাগরিক হোসিও কোনি (৬৬) হত্যা মামলায় ৭
উগ্রবাদি জেএমবির বিচারের জন্য সাক্ষ্য গ্রহন সমাপ্ত হয়েছে। মোট ৫৫ জন
সাক্ষি সাক্ষ্য দিয়েছে। দশম ও শেষ দিনে মামলার চার্জশিট প্রদানকারী
কর্মকর্তা কাউনিয়া থানার ওসির সাক্ষ্য ও জেরা সম্পন্ন হয়েছে। তিনি আদালতকে
হত্যাকান্ডের পরিকল্পনা, হত্যাকান্ড ও পরবর্তী প্রতিটি তদন্তের বিষয়ে
সাক্ষ্য দিয়ে বলেন জেএমবির সাংগঠনিক নির্দেশে জেএমবির সাংগঠনিক নির্দেশে
দেশে অরাজক পরিস্থিতি তৈরি করতেই কোনিকে হত্যা করা হয়। সোমবার রংপুর
স্পেশাল জজ আদালতের বিচারক নরেশ চন্দ্র সরকার তার স্বাক্ষ্য গ্রহন করেন।
আগামী ১৩ তারিখ ৩৪২ ধারায় আসামীদের পরীক্ষা অর্থাৎ তাদের বিরুদ্ধে দেয়ার
সাক্ষের বিষয়ে তাদেরে বক্তব্য প্রমান, কিংবা তারা কোন সাফাই সাক্ষ্য দিতে
চান কিনা তার দিন ধার্য করেছে আদালত।
এর মাধ্যমে চাঞ্চল্যকর এই
হত্যাকান্ডটির বিচার কার্য খুব দ্রুত শেষ হওয়ার পথে। রংপুর স্পেশাল পাবলিক
প্রসিকিউটর এ্যাডভোকেট রথিশ চন্দ্র ভৌমিক নয়া দিগন্তকে জানান, সোমবার সকাল
সাড়ে ১১ টা থেকে দুপুর ২ টা পর্যন্ত মামলার চার্জশিট প্রদানকারী তদন্ত
কর্মকর্তা কাউনিয়া থানার অফিসার ইনচার্জ আব্দুল কাদের জিলানী সাক্ষ্য
প্রদান করেন। এনিয়ে ৫৮ সাক্ষির মধ্যে ৫৫ সাক্ষির সাক্ষি গ্রহন সমাপ্ত হলো।
বাকী ৩ জনের সাক্ষ্য গ্রহন করা হবে না। আদালতের বিচারক আগামী ১৩ ফেব্রুয়ারী
৩৪২ ধারায় আসামীদের শুনানীর দিন ধার্য করেছেন। ওইদিন আসামীরা তাদের
বিরুদ্ধে দেয়া সকল সাক্ষ্য, তথ্য-উপাথ্যের বিষয়ে তাদের বয়ান তুলে ধরার
সুযোগ পাবেন। এছাড়াও তারা চাইলে সাফাই সাক্ষিও দিতে পারবেন। পিপি জানান,
মামলার চার্জশিট প্রদানকারী তদন্ত কর্মকর্তার আব্দুল কাদের জিলানী আদালতকে
জানিয়েছেন, বিদেশী নাগরিক হত্যা করতে পারলে দেশে অরাজক পরিস্থিতি সৃষ্টি
হবে। অর্থনীতি মুখ থুবড়ে পড়বে। তখন বাংলাদেশে ইসলামী হুকমাত কায়েম করা
যাবে। জেএমরি এ ধরনের সাংগঠনিক নির্দেশনার প্রেক্ষিকেই জেএমবি কিলিংমিশনের
সদস্যরা এই জাপানি নাগরিক হোসিও কোনিকে হত্যার পরিকল্পনা করে। পিপি আরও
জানান, আব্দুল কাদের জিলানী আদালতকে জানিয়েছেন, হত্যাকান্ডের ৮-১০ দিন আগে
থেকে রংপুর মহানগরীর নুরপুরে আব্দুল আজিজ নামের এক ব্যাক্তির বাড়িভাড়া নিয়ে
জাপানি নাগরিক হত্যার পরিকল্পনা করে জেএমবি জঙ্গিরা। হত্যাকান্ডের দিন
কাউনিয়ার নব্দিগঞ্জ রেলগেট থেকে একটি টিভিএস কালো রংয়ের মোটরসাইলে করে
জেএমবি জঙ্গি হাসান, মাসদু রানা ও বিজয় ঘটনাস্থলে আসে। তাদের প্রত্যেকের
কাছে একটি করে পিস্তল ছিল। পিস্তল ছাড়াও ২ টি করে ম্যাগাজি এবং প্রতিটি
ম্যাগাজিনে ৪ টি করে গুলি ছিল। এরমধ্যে হাসান মোটর বাইক চালায়। হাসান
মোটরবাইক স্ট্যার্ট অবস্থায় পাকা রাস্তায় দাড়িয়ে থাকে। আর মাসুদ ও বিজয়
মোটরসাইকেল থেকে নেমে মুরাদের বাড়ির সামনে অবস্থান নেয়। হোসিও কোনি
মোন্নাফের রিকশাযোগে ঘাসের খামারে যাওয়ার আগে মুরাদের বাড়ির সামনে আসা
মাত্রই বিজয় আদাব দিয়ে রিকশা থামায়। সাথে সাথেই মাসুদ রানা হোসিও কোনির
বুকের বামপাশে গুলি করে। মৃত্যু নিশ্চিত করার জন্য মাসুদ রানা কোনির মাথা
লক্ষ করে গুলি ছোড়ে। কিন্তু সেটি লক্ষ ভ্রস্ট হয়। তৎক্ষনাত বিজয় কোনির
শরীরে পরপর দুরাউন্ড গুলি করে মৃত্যু নিশ্চিত করে দৌড়ে স্টার্ট দেয়া
মোটরাসাইকেলে চরে হারাগাছের দিকে রওয়ানা দিয়ে সামনের বাজার থেকে ডান পাশের
কাচা রাস্তার ফাঁকা রাস্তায় গিয়ে নম্বর প্লেট পরিবর্তন করে তিনজনই পীরগাছায়
মাসুদের বাড়িতে যায়।
দুই তিনদিন পর সাদ্দাম ওই বাড়িতে গিয়ে মোটরসাইকেলটি
নিয়ে যায়। এর আগে ঘটনার দিন জেএমবি সদস্য এসহাক আলী কোনিওর রংপুর মহানগরীর
মুন্সিপাড়াস্থ ভাড়াবাড়ির সামনে অবস্থান নেয়। তিনি বাড়ি থেকে বের হওয়া
মাত্রই হাসান মাসুদ রানা ও বিজয়কে খবর দেন। এছাড়াও আরকানুল্লাহ আনছারী
ঘটনাস্থলের পাশের রাস্তায় খূনের ঘটনা ঘটিয়ে নির্বিঘেœ পালিয়ে যাওয়ার জন্য
অন্য সহযোগিতা করেন। সাখাওয়াত ও লিটন এই হত্যাকান্ডের পরিকল্পনা ও
সহযোগিতার সাথে সরাসরি জড়িত। এদিকে আসামীপক্ষের স্টেট ডিফেন্স আইনজিবী আবুল
হোসেন ও আসামীর নিযুক্ত আইনজীবি আফতাব হোসেন জেরায় চার্জশিট প্রদানকারী
পুলিশ কর্মকর্তার আব্দুল কাদের জিলানীকে বলেন, কোনিও হোসির ব্যবসায়িক বন্ধু
হুমায়ুন কবির হিরা তার দেয়ার ১৬৪ ধারায় জবানবন্দিতে বলেছেন, তার বড় ভাই
কামাল হায়দার তাকে বলেছিলেন হোসিও কোনিকে শিবির কর্মীরা হত্যা করতে পারে।
কিন্তু হিরা ও ভাই কামালকে এই মামলায় সাক্ষি, আসামী কিংবা রাজ সাক্ষি করা
হয় নি। প্রতিত্তুরে পুলিশ কর্মকর্তা আব্দুল কাদির জিলানী বলেন, এ ঘটনার
সাথে শিবিরের সংশ্লিষ্টতার কোন প্রমান পাওয়া যায় নি, তাছাড়া আসামীরা ১৬৪
ধারার জবানবন্দিতে নিজেরাই খুনের কথা স্বীকার করে নিয়েছে। জেরায় আসামীদের
আইনর্জীবিরা এ ঘটনার সাথে আর্ধিকভাবে লাভবান হওয়ার জন্য হুমায়ুন কবির হীরা ও
তার ভাই কামাল হায়দার পরস্পর যোগসাজসে করে থাকতে পারে এবং আসামীদের
নির্দোষ দাবি করে বক্তব্য রাখেন। সাক্ষ্য গ্রহনের আগে সকাল ১১ টায় কঠোর
মামলার চার্জশিটভুক্ত গ্রেফতারকৃত আসামী উগ্রবাদি জঙ্গি জেএমবির
উত্তরাঞ্চলের স্কোয়াড লিডার মাসুদ রানা, এছাহাক আলী, লিটন মিয়া, আবু সাঈদ,
সাখাওয়াত হোসেনকে আদালতে আনা হয়। চার্জশিটভুক্ত ৮ জনের মধ্যে রাজশাহীতে
নজরুল ইসলাম ওরফে বাইক হাসান পুলিশের সাথে বন্দুক যুদ্ধে এবং সাদ্দাম হোসেন
ঢাকায় পুলিশের সাথে বন্দুক যুদ্ধে নিহত হন। আর অপর চার্জশিটভূক্ত রোকেয়া
বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষাথী আহসান উল্লাহ আনছারী এখনও পলাতক আছে। এছাড়াও
বিজয়ের কোন নাম ঠিকানা ও ট্রেস না পাওয়ায় তাকে চার্জশিট থেকে বাদ দেয়া হয়।
প্রসঙ্গতঃ ২০১৫ সালের ৩ অক্টোবর সকাল সাড়ে ১০ টায় রংপুর মহানগরীর উপকণ্ঠ
কাউনিয়া উপজেলার কাচু আলুটারী এলাকায় দুর্বৃত্তদের গুলিতে খুন হন হোসিও
কোনি।

No comments:
Post a Comment