
নিষিদ্ধ জঙ্গি সংগঠন নব্য জেএমবির ‘সারোয়ার-তামীম’ গ্রুপের আরও দুই উচ্চশিক্ষিত প্রকৌশলীসহ ৫ জনকে গ্রেপ্তার করেছে র্যাব-১০। গত সোমবার দিবাগত রাতে রাজধানীর বাড্ডা ও যাত্রাবাড়ী এলাকায় অভিযান চালিয়ে তাদের গ্রেপ্তার করা হয়। গ্রেপ্তারকৃতরা হলো- অলিউজ্জামান ওরফে অলি (২৭), আনোয়ারুল আলম (২৯), সালেহ আহাম্মেদ শীষ (২২), আবুল কাশেম (২৭) ও মো. মোহন ওরফে মহসিন (২০)। এ সময় তাদের কাছ থেকে বিস্ফোরক ও উগ্রবাদী বই জব্দ করা হয়েছে। জঙ্গি তৎপরতার পাশাপাশি ধর্মীয় উগ্রতা সৃষ্টির জন্য তারা ফেসবুকে ধর্মীয় বিষয় ভাইরাল করে ছেড়ে দিত বলেও গতকাল সংবাদ সম্মেলনে জানিয়েছেন র্যাব কর্মকর্তারা।
র্যাব জানায়, জঙ্গি মামলা তদন্ত ও গোয়েন্দা অনুসন্ধানে সম্প্রতি তাদের আবার সংগঠিত হওয়ার বিষয়টি জানা যায়। এ জন্য তারা বাড়ি ছেড়ে ঢাকার আশপাশে বিভিন্ন বাসা-বাড়ি ভাড়া নিয়ে আশ্রয় নিয়েছিল। এর মধ্যে গত সোমবার রাতে বাড্ডায় অভিযান চালিয়ে অলি ও আনোয়ারকে গ্রেপ্তার করা হয়। তাদের দেয়া তথ্য অনুযায়ী রাত ৩টার দিকে সায়েদাবাদ বাসস্ট্যান্ড হতে গ্রেপ্তার হন সালেহ আহাম্মেদ শীষ, আবুল কাশেম ও মহসিন। এ সময় তাদের কাছ থেকে বিস্ফোরক, বোমা তৈরির সরঞ্জামাদি, জঙ্গিবাদী বই, ডামি পিস্তল ও বন্দুক, নগদ ৩ লক্ষাধিক টাকা ও অন্যান্য সরঞ্জামাদি উদ্ধার করা হয়।
র্যাব আরও জানায়, গ্রেপ্তার হওয়া অলি বর্তমানে একটি বহুজাতিক কোম্পানিতে প্রকৌশলী হিসেবে কর্মরত। বুয়েট থেকে ২০১২ সালে ইলেক্ট্রিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং পাস করেন। বুয়েটে পড়ার সময় তার ধর্মীয় বিষয়ের ওপর আগ্রহের সৃষ্টি হয়। বিভিন্ন ধর্মীয় বই-পুস্তক, লিফলেট ও অনলাইনে বিভিন্ন সাইটের মাধ্যমে ধর্মীয় উগ্রবাদী বিষয়ে আকৃষ্ট হয়। পরে ২০১৫ সালের শেষের দিকে নব্য জেএমবি’র ‘সারোয়ার-তামীম’ গ্রুপে যোগ দেয়। তাকে কাফরুল এলাকার একটি জঙ্গি সেল পরিচালনার দায়িত্ব দেয়া হয়। সে বিগত সোয়া এক বছর ধরে মিরপুর কাফরুল এলাকার একটি জঙ্গি সেল পরিচালনা করছে। দলের সব সদস্যকে ইন্টারনেট পরিচালনা ও টেলিগ্রাম আইডি ব্যবহারের ওপর দীক্ষা দেয়া এবং তার নেতৃত্বে দলের সদস্যরা ফেসবুকে ইসলাম অবমাননাকারী বিবিধ স্ট্যাটাস ভাইরাল আকারে পোস্ট করে সহানুভূতি ও সমর্থন আদায়ের উদ্দেশ্যে প্রচারণা চালায়। একই সময় গ্রেপ্তার হওয়া আনোয়ার তার সহপাঠী। বুয়েটে ক্যামিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং শেষ করা আনোয়ার বর্তমানে একটি কোচিং সেন্টারে শিক্ষকতা করছে। বোমা তৈরিতে পারদর্শী আনোয়ার অলির মাধ্যমেই সে গ্রুপে যোগ দেয় বলে র্যাব জানিয়েছে।
এছাড়া আবুল কাশেম ২০০৪ সালে মিরপুর ১৩ এর দারুল উলুম মাদ্রাসায় অধ্যয়ন শুরু করে ও পরে কামরাঙ্গীর চরের ফরিদাবাদ জামিয়া আরাবিয়া ইমদাদুল উলুম মাদরাসা থেকে ২০১৪ সালে দাওরা হাদিস পাস করে। এরপর টিউশনি করে জীবিকা নির্বাহের জন্য কাফরুলে অবস্থান করে। গত বছরের শুরুর দিকে তার সঙ্গে অলির পরিচয় হয়। অলিই তাকে উদ্বুদ্ধ করে জঙ্গি তৎপরতায় জড়াতে। ধর্মীয় বিষয়ে জ্ঞান থাকায় দলের অন্যান্য সদস্যদের নিয়ে আকিদাগত বিষয় নিয়ে আলোচনায় সে মূল ভূমিকা পালন করত। ইন্টারনেটের মাধ্যমে সংগৃহীত আরবিতে লেখা বিভিন্ন উগ্রবাদী মতাদর্শ বাংলায় ভাষান্তর করে ফেসবুকে ভাইরাল আকারে ইন্টারনেটে ছড়িয়ে দিতো। সদস্যদের কাছ থেকে মাসিক ইয়ানত সংগ্রহ করে বিভিন্ন স্থানে দিয়েও আসতো। আর সালেহ আহাম্মেদ শীষ মিরপুর সেনপাড়া বায়তুল মামুর মাদরাসা থেকে ২০১২ সালে দাখিল পাস করে মিরপুর বাঙলা কলেজে ডিগ্রিতে অধ্যয়ন করছিল। মিরপুরে থাকাকালে অলির সঙ্গে পরিচয়ের সূত্রধরে উগ্র ধর্মীয় ভাবাদর্শে উদ্বুদ্ধ হয়। সংগঠনে নিয়মিত ইয়ানত প্রদান করত এবং চট্টগ্রামে এক বছর আগে অস্ত্র চালনার ওপর প্রশিক্ষণ নেয়। সম্প্রতি মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত অন্যতম শীর্ষ জঙ্গি আসামি মুফতি হান্নানের সঙ্গেও তার আত্মীয়তার সম্পর্ক রয়েছে বলে দাবি করার বিষয়টি জানিয়েছে র্যাব। আর মিরপুর এলাকায় থেকে তৃতীয় শ্রেণি পর্যন্ত লেখাপড়া করা মহসিন ২০১৪ সাল পর্যন্ত পরিবহনের হেলপারের কাজ করতো। ছোটবেলা থেকে থাকতো কাফরুলে। আবুল কাশেমই তাকে ধর্মীয় উগ্রতায় উদ্ধুদ্ধ করে। চলতি মার্চের প্রথম সপ্তাহ থেকে সে পরিবার ছেড়ে ‘হিজরতে’র উদ্দেশ্যে বাসা থেকে বের হয়। এর আগে গত বছরের মাঝামাঝিতে সে চট্টগ্রামে অস্ত্র প্রশিক্ষণ গ্রহণ করে।
তাছাড়া তাদের গ্রুপে ১০ থেকে ১২ সদস্য রয়েছে। এক বছরের বেশি সময় আগে তারা একত্রিত হয়। দলের অধিকাংশই থাকে কাফরুল ও মিরপুরে। সরকারি স্থাপনায় হামলা চালানোর পরিকল্পনা ছিল অলির নিয়ন্ত্রণাধীন এই সেলের। আর এই নাশতার দায়িত্ব অপর সহযোগী মনির এবং সালমান ওরফে আব্দুল্লাহকে দেয়া হয়েছে বলে জানা গেছে।
No comments:
Post a Comment