
ভারত, নেপাল ও ভুটানকে নিয়ে চতুর্দেশীয় মোটরযান চুক্তি বিবিআইএন অনুমোদনে থিম্পুকে রাজি করানোর চেষ্টা করবে বাংলাদেশ। আজ থেকে শুরু হওয়া প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ৩ দিনের থিম্পু সফরে ভুটানের শীর্ষ নেতৃত্বের সঙ্গে এ নিয়ে আলোচনা হবে। গতকাল সরকার প্রধানের সফর নিয়ে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে পররাষ্ট্রমন্ত্রী আবুল হাসান মাহমুদ আলী এমনটাই জানিয়েছেন। আন্তর্জাতিক সীমান্ত পাড়ি দিয়ে চার দেশের মধ্যে নিরাপদ, অর্থনৈতিকভাবে লাভজনক এবং পরিবেশের জন্য সহায়ক একটি উপ-আঞ্চলিক যোগাযোগ নেটওয়ার্ক (কানেকটিভিটি) প্রতিষ্ঠায় ২০১৫ সালে থিম্পুতে বিবিআইএন চুক্তিটি সই হয়। সেই চুক্তির আওতায় চার দেশের মধ্যে কার্গো, কন্টেইনার, মালবাহী ট্রাক ও যাত্রীবাহী পরিবহন চলাচলে একটি আন্তর্জাতিক কাঠামোর বিষয়ে ঐকমত্য হয়। বাংলাদেশসহ ৩ দেশ চুক্তিটি অনুমোদন করলেও ভুটান এখনো তা অনুমোদন (রেটিফাই) দেয়নি। এ নিয়ে দেশটির পার্লামেন্টের উচ্চ কক্ষ ন্যাশনাল কাউন্সিল বা এনসিতে তুমুল আলোচনা ও বিতর্ক হলেও চূড়ান্ত পর্যায়ে বিলটি প্রত্যাখ্যাত হয়েছে। প্রধানমন্ত্রীর থিম্পু সফরে দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক, সাব-রিজিওনাল কো-অপারেশন, যোগাযোগ বা কানেকটিভিটি, হাইড্রো পাওয়ার, কৃষি ও সাংস্কৃতিক ক্ষেত্রে সহযোগিতা এবং বাণিজ্য বাড়াতে সর্বোচ্চ গুরুত্ব থাকবে জানিয়ে পররাষ্ট্রমন্ত্রী এএইচ মাহমুদ আলী সংবাদ সম্মেলনে বলেন, ভুটানের সম্ভাবনাময় হাইড্রো পাওয়ার বা জলবিদ্যুৎ উৎপাদন শিল্পে এক বিলিয়ন পর্যন্ত বিনিয়োগের (আপাতত) পরিকল্পনা রয়েছে বাংলাদেশের। সেটি আরো বাড়তে পারে জানিয়ে তিনি বলেন, আমি ভুটান সফর করেছি। সেই সময়ে দু’টি প্রকল্প পরিদর্শনের সুযোগ আমার হয়েছিল। সেখানে বাংলাদেশ যৌথ বিনিয়োগ করবে। ভারত এবং তৃতীয় কোনো দেশ বা বিশ্বব্যাংকের মতো প্রতিষ্ঠানও সেখানে বিনিয়োগ করতে পারে। ওই প্রকল্প থেকে অন্তত ১০০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন হবে। যার পুরোটাই বাংলাদেশ কিনতে পারবে। সেখানে বাংলাদেশের বিনিয়োগের লভ্যাংশ ধরে বিদ্যুতের দামের একটি অংশ পরিশোধিত বলে গণ্য হবে, বাকিটা আন্তর্জাতিক নীতিমালা অনুযায়ী বাংলাদেশ পরিশোধ করবে। সেগুনবাগিচার ওই সংবাদ সম্মেলনে পররাষ্ট্র সচিব মো. শহীদুল হকসহ মন্ত্রণালয়ের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।
৬ চুক্তি ও সমঝোতা সইয়ের প্রস্তুতি: সংবাদ সম্মেলনে পররাষ্ট্রমন্ত্রী এ এইচ মাহমুদ আলী বলেন, প্রধানমন্ত্রীর ভুটান সফরের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অংশ ১৮ই এপ্রিল দু’দেশের প্রধানমন্ত্রী পর্যায়ে আনুষ্ঠানিক দ্বিপক্ষীয় বৈঠক অনুষ্ঠিত হবে। এ বৈঠকে দু’দেশের স্বার্থ সংশ্লিষ্ট বিষয়াবলী নিয়ে আলোচনা হবে। সেই বৈঠক শেষে দুই দেশের মধ্যে ৬টি চুক্তি-সমঝোতা স্মারক যথা, বাংলাদেশ ও ভুটানের মধ্যে দ্বৈত কর পরিহার, কৃষি ও কৃষিজাত পণ্যমান, সাংস্কৃতিক সহযোগিতা, ভুটান কর্তৃক বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ নৌ-রুট ব্যবহার, পণ্যের মাননিয়ন্ত্রণ সম্পর্কিত এবং ভুটান কর্তৃক বাংলাদেশ দূতাবাস স্থায়ীভাবে নির্মাণের জন্য জমি বরাদ্দ প্রদানের চুক্তি/সমঝোতা স্মারক সইয়ের সম্ভাবনা রয়েছে। ভুটান কর্তৃক বরাদ্দকৃত জমিতে প্রধানমন্ত্রী ভুটানের রাজার উপস্থিতিতে বাংলাদেশ দূতাবাসের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করবেন। সফরকালে প্রধানমন্ত্রী ভুটানের রাজকীয় প্রথা অনুযায়ী নির্ধারিত আনুষ্ঠানিকতায় অংশগ্রহণ করবেন। এছাড়া ভুটানের মহামহিম রাজা ও রাণীর সঙ্গে তিনি সৌজন্য সাক্ষাতে মিলিত হবেন। মন্ত্রী বলেন, বাংলাদেশের মহান মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে ১৯৭১ সালের ৬ই ডিসেম্বর ভুটান বাংলাদেশকে স্বাধীন ও সার্বভৌম দেশ হিসেবে স্বীকৃতি প্রদান করে। প্রধানমন্ত্রীর জানুয়ারি ২০০৯-এ ভুটান সফরের পর থেকে বাংলাদেশ ও ভুটানের মধ্যে বিদ্যমান সম্পর্ক দ্বিপক্ষীয়ভাবে ও উপ-আঞ্চলিক প্রেক্ষাপটে ব্যাপক অগ্রগতি লাভ করেছে। ২০১১ ও ২০১৩ সালে ভুটানের রাজা বাংলাদেশ সফর করেছিলেন। পরবর্তীতে ২০১৪ সালের ডিসেম্বরে ভুটানের প্রধানমন্ত্রীর বাংলাদেশ সফর এবং ভুটানের সংসদের উভয় কক্ষের স্পিকারসহ সংসদ সদস্য, ভুটানের রাণীমাতা সহ উচ্চপর্যায়ের প্রতিনিধিবৃন্দ বাংলাদেশ সফর করেছেন। এছাড়া ভুটানের পররাষ্ট্রমন্ত্রীর আমন্ত্রণে ২০১৬ সালের মে মাসে আমি ভুটানে দ্বিপক্ষীয় সফর করি। ভুটানের রাজার আমন্ত্রণে বাংলাদেশের প্রেসিডেন্ট ২০১৬ এর জুলাইয়ে ভুটানে রাষ্ট্রীয় সফর করেন। এসব উচ্চপর্যায়ের সফর দু’দেশের মধ্যে বিরাজমান সুসম্পর্কেরই নিদর্শন, যা প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার আসন্ন সফরের মধ্য দিয়ে আরো গভীর হবে বলে আশা করছি।
থিম্পুর উদ্দেশে প্রধানমন্ত্রী রওনা হবেন সকালে: পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানায়, রাষ্ট্রীয় সফরে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা আজ সকালে থিম্পুর উদ্দেশে রওনা করবেন। সেখানে তিনি অটিজমের ওপর একটি আন্তর্জাতিক সম্মেলনেও যোগ দেবেন। ভুটানের রাজধানী থিম্পুতে ‘অটিজম ও নিউরো ডেভেলপমেন্টাল ডিসঅর্ডার’ শীর্ষক তিন দিনের এ সম্মেলন আগামীকাল থেকে (১৯শে এপ্রিল) শুরু হচ্ছে। প্রধানমন্ত্রী তার ভুটান সফরের প্রথমে দ্বিপক্ষীয় কর্মসূচিতে অংশ নেবেন। সফরের প্রথম দিনে (আজ) ভুটানের রাজা জিগমে খেসার নামগেল ওয়াংচুক ও প্রধানমন্ত্রী তেসেরিং তোবগের সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় আলোচনা করবেন শেখ হাসিনা। এর আগে প্রধানমন্ত্রী ও তার সফরসঙ্গীরা দ্রুক এয়ারের একটি ভিভিআইপি ফ্লাইটে সকালে হজরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর ছেড়ে যাবেন। বেলা ১১টা ৩৫ মিনিটে উড়োজাহাজটির ভুটানের রাজধানীতে পাড়ো ইন্টারন্যাশনাল এয়ারপোর্টে পৌঁছাবে। ভুটানের প্রধানমন্ত্রী ও থিম্পুতে বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূত জিষ্ণু রায় চৌধুরী বিমানবন্দরে প্রধানমন্ত্রীকে অভ্যর্থনা জানাবেন। এ সময় তাকে আনুষ্ঠানিক খাদার (স্কার্ফ) পরিয়ে দেয়া হবে। পরে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীকে গার্ড অব অনার দেয়া হবে এবং তিনি গার্ড পরিদর্শন করবেন। বিকালে প্রধানমন্ত্রীকে রাজকীয় প্রাসাদে আনুষ্ঠানিকভাবে বরণ করে নেয়া হবে। প্রাসাদের মূল ফটকে একজন ক্যাবিনেট মন্ত্রী ও ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা প্রধানমন্ত্রীকে স্বাগত জানাবেন। পরে তাকে গার্ড অব অনার দেয়া হবে। প্রাসাদে ভুটানের রাজা ওয়াংচুক ও রাণী জেটসান পেমার সঙ্গে প্রধানমন্ত্রীর সাক্ষাৎ হবে। এরপর দুই দেশের প্রধানমন্ত্রীর মধ্যে বৈঠকের পর বাংলাদেশ ও ভুটানের বিভিন্ন বিষয়ে সমঝোতা স্মারক সই হবে। রাজকীয় আপ্যায়ন হলে প্রধানমন্ত্রী তার সম্মানে সে দেশের প্রধানমন্ত্রীর দেয়া নৈশভোজে যোগ দেবেন।
আগামীকালের কর্মসূচি: আগামীকাল বুধবার সকালে শেখ হাসিনা রাজকীয় আপ্যায়ন হলে গেস্ট অব অনার হিসেবে ‘অটিজম ও নিউরো ডেভেলপমেন্টাল ডিসঅর্ডার’ শীর্ষক সম্মেলনের উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে যোগ দেবেন। প্রধানমন্ত্রী সম্মেলনে অংশগ্রহণকারীদের সৌজন্যে দেয়া ভুটানের প্রধানমন্ত্রীর ওয়েলকাম লাঞ্চে অংশগ্রহণ করবেন। বিকালে শেখ হাসিনা টেকসই উন্নয়নের লক্ষ্যমাত্রার অংশ হিসেবে অটিজম ও অন্যান্য নিউরো ডেভেলপমেন্ট সমস্যার যথাযথ সমাধানে সক্ষমতা অর্জন শীর্ষক উচ্চপর্যায়ের এক আলোচনা সভায় সভাপতিত্ব করবেন। শেখ হাসিনা হেজোতে বাংলাদেশ দূতাবাসের ভিত্তিপ্রস্তর ফলক উন্মোচন করবেন। ভুটানের রাজাকে নিয়েই প্রধানমন্ত্রী সেই ফলক উন্মোচন করবেন। পরে প্রধানমন্ত্রী ভুটানের রাজা ও রাণীর দেয়া এক ব্যক্তিগত ভোজে যোগ দেবেন। প্রধানমন্ত্রী তার তিন দিনের সফর শেষে বৃহস্পতিবার সকালে দেশে ফিরবেন।
অটিজম সামিট ও বাংলাদেশ প্রসঙ্গ: বাংলাদেশ ও ভুটানের স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় যৌথভাবে অটিজম সম্মেলনের আয়োজন করছে। এতে কারিগরি সহায়তা দিচ্ছে সূচনা ফাউন্ডেশন (সাবেক গ্লোবাল অটিজম), অ্যাবিলিটি ভুটান সোসাইটি (এবিএস) ও বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার দ?ক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া কার্যালয়। সম্মেলনের প্রতিপাদ্য হচ্ছে ‘এএসডি ও অন্যান্য নিউরো ডেভেলপমেন্টাল সমস্যায় ব্যক্তি, পরিবার ও সমাজের জন্য কার্যকর ও টেকসই বহুমুখী কর্মসূচি’। গতকালের সংবাদ সম্মেলনে পররাষ্ট্রমন্ত্রী জানিয়েছেন, থিম্পুতে অনুষ্ঠিতব্য সম্মেলনে স্বাস্থ্য প্রতিমন্ত্রী জাহিদ মালিক, এমপিসহ বিশ্বের ৩১টি দেশ হতে উচ্চ পর্যায়ের নীতিনির্ধারকবৃন্দ, সরকারি কর্মকর্তা, বিশেষজ্ঞ, এনজিও ও সুশীল সমাজের প্রতিনিধি ও আন্তর্জাতিক সংস্থা-সংগঠনের প্রায় আড়াই শতাধিক প্রতিনিধি যোগদান করছেন। থিম্পু সফর এবং অটিজম সামিটসহ বিভিন্ন অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রীর সফরসঙ্গী হিসেবে পররাষ্ট্রমন্ত্রী (নিজে), আন্তর্জাতিক বিষয়ক উপদেষ্টা ড. গওহর রিজভী, সূচনা ফাউন্ডেশনের চেয়ারপারসন সায়মা ওয়াজেদ হোসেন এবং সরকারের উচ্চ পর্যায়ের কর্মকর্তারা অংশ নেবেন জানিয়ে মন্ত্রী মাহমুদ আলী বলেন, আপনারা জানেন সূচনা ফাউন্ডেশনের চেয়ারপারসন এবং প্রধানমন্ত্রীর কন্যা সায়মা ওয়াজেদ হোসেন বাংলাদেশ অটিজম বিষয়ক জাতীয় উপদেষ্টা কমিটির প্রধান। তার ঐকান্তিক প্রচেষ্টা ও উদ্যোগের ফলে বিগত কয়েক বছরে বাংলাদেশ সরকার বিভিন্ন পদক্ষেপ গ্রহণের মাধ্যমে অটিজম বিষয়ে সার্বিক অগ্রগতির দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে। তার উদ্যোগে জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদে ‘অটিজম আক্রান্ত শিশু ও তাদের পরিবারের জন্য স্বাস্থ্যসেবা এবং আর্থ-সামাজিক সহায়তা বৃদ্ধি’ শীর্ষক প্রস্তাব গৃহীত হয়। অটিজম বিষয়ে অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা তাকে ২০১৪ সালে ‘এক্সিলেন্স ইন পাবলিক হেলথ অ্যাওয়ার্ড’-এ ভূষিত এবং সমপ্রতি ডব্লিউএইচও’র চ্যাম্পিয়ন অ্যাওয়ার্ড অর্জন করেছেন। মন্ত্রী বলেন, বৃহত্তর আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে অটিজম ও স্নায়ুবিকাশজনিত সমস্যা মোকাবিলায় বাংলাদেশের নেতৃত্বকে সুদৃঢ় করার পাশাপাশি আসন্ন থিম্পু সম্মেলনটি হাজার হাজার অটিস্টিক শিশুর জীবনমান উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে বলে আশা করি।
No comments:
Post a Comment