
কওমি মাদরাসার দাওরায়ে হাদিসকে সাধারণ শিক্ষার মাস্টার্স সনদের সমমান স্বীকৃতি দেয়ার পর নিচের স্তরের কী হবে এমন প্রশ্ন এখন সবার মুখে মুখে। তাহলে কী দাওরায়ে হাদিস শেষ না করা পর্যন্ত নিচের স্তরের কোনো স্বীকৃতি মিলবে না। এমন প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গিয়ে জানা গেল, সরকার সব স্তরের স্বীকৃতি দিতে চাইলেও কওমি মাদরাসার আলেমরা তা নিতে চায়নি। একাধিক আলেমদের সঙ্গে কথা বলে এমন তথ্য জানা গেছে। আলেমরা জানান, সাধারণ শিক্ষার মতো কওমি মাদরাসাগুলোতে প্রাথমিক, নিম্নমাধ্যমিক, মাধ্যমিক, উচ্চ মাধ্যমিক ও স্নাতক পর্যায়ের মতো আনুষ্ঠানিক পরীক্ষা হয়। কিন্তু এগুলোর সরকারি স্বীকৃতি নিলে পূর্ণাঙ্গ আলেম তৈরি হবে না। তাই কওমি অর্ধেক আলেম তৈরি করতে চায় না। যারা সর্বোচ্চ পর্যায়ে অর্থাৎ দাওরায়ে হাদিস পর্যন্ত পড়বে কেবল তারাই সরকারের দেয়া স্বীকৃতি পাবে। নিচের স্তরের স্বীকৃতি না চাওয়ার কারণ ব্যাখ্যা দিয়ে একাধিক আলেম জানান, নিচের স্তরের স্বীকৃতি দেয়া শুরু করলে শেষ পর্যন্ত কওমিতে শিক্ষার্থী পাওয়া যাবে না। যেটা হচ্ছে আলিয়া মাদরাসায়। দাখিল শেষ করে কলেজ, আর আলিম শেষ করার পর সবাই স্নাতক করতে বিশ্ববিদ্যালয় কিংবা জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হয়। এতে ফাজিল বা কামিল পর্যায়ে শিক্ষার্থী পাওয়া যায় না। দাখিল পাস করে একজন শিক্ষার্থী কোরআন হাদীসের কিছুই শেখতে পারবে না। কওমিতে যদি নিচের দিকে এ ধরনের স্বীকৃতি দেয়ার পদ্ধতি চালু হয় তাহলে প্রাথমিক পর্যায়ে শিক্ষার্থীরা সাধারণ শিক্ষা বা আলিয়া মাদরাসায় চলে যাবে। একই অবস্থা হবে নিম্ন মাধ্যমিক, মাধ্যমিক থেকে উপরের প্রত্যেকটি স্তরে। এমনটি হলে কওমি মাদরাসার জন্য আত্মঘাতী হবে।
তাহলে মাস্টার্সের সার্টিফিকেট দিয়ে কী হবে এমন প্রশ্নে আলেমরা জানান, সরকার পশ্চিমা চাপে আমাদের ওপর স্বীকৃতি চাপিয়ে দিয়েছে। কওমি মাদরাসাগুলোর উন্নয়ন নয় জনগণ থেকে বিচ্ছিন্ন করার জন্য এই স্বীকৃতি। শীর্ষ স্থানীয় একজন আলেম বলেন, স্বীকৃতি পাওয়ার পর অনেকেই জানতে চেয়েছে আলিয়া মাদরাসার শিক্ষার্থী বিশ্ববিদ্যালয় ভর্তি হতে গেলে দুই চারটা বিষয় ছাড়া অন্যান্যা মৌলিক বিষয়ে ভর্তি হতে পারে। আর ফাজিল, কামিল পর্যায়ে শিক্ষার্থীরাও তো সরকারি চাকরিতে সব সময় উপেক্ষিত। এই অবস্থায় কওমি মাদরাসার স্বীকৃতি দেয়ার মানে কী হলো? তারা যদি সরকারি মূল ধারায় না আসতে পারে তাহলে কেন স্বীকৃতি নেয়া হলো এমন মৌলিক বিষয় প্রশ্ন করছেন তারা। কওমি সনদ বাস্তবায়ন কমিটির কেন্দ্রীয় একাধিক আলেম জানান, কওমি স্বীকৃতির পর অনেকই এটা নিয়ে প্রশ্ন তুলছেন। তারা জানতে চাচ্ছেন এই মাস্টার্সের সার্টিফিকেট দিয়ে আসলে কী হবে। নাকি শুধু শুধু সরকারের জালে বন্দি হওয়া। যাদের অনুদানে কওমি মাদরাসা চলে তাদের অনেকেই জানতে চাচ্ছে কেন সরকারের এই শর্তে তারা গেল? আবার নিচের স্তরের সার্টিফিকেটে সরকারের স্বীকৃতি না পেলে সরাসরি মার্স্টাসের সার্টিফিকেট দিয়ে কী সরকারি চাকরি পাবে? এমন প্রশ্ন করছেন নেতাদের কাছে। আলেমরা জানান, অধিকাংশ আলেম এই স্বীকৃতি নেয়ার পক্ষে ছিল না। এই মার্স্টাসের স্বীকৃতির পর একটা সময় এসে নিচের স্তরের স্বীকৃতির দাবি উঠবে। কেউ বলবে নিচের স্তরের স্বীকৃতি ছাড়া মাস্টার্সের স্বীকৃতি মূল্য নেই। কেউ বলবে দরকার নেই। এটার ফলে নিজেদের মধ্যে আরো দ্বন্দ্ব বাড়বে। আর নিচের স্তরের স্বীকৃতি নেয়ার মানেই কওমির মাদরাসার স্বকীয়তা হারানো। এখান থেকেই আলিয়া মাদরাসার মতো অর্ধেক আলেম হবে, যা ইসলামের জন্য ক্ষতিকর।
বিষয়টি ব্যাখ্যা দিয়ে কওমি সনদ বাস্তবায়ন কমিটি প্রভাবশীল সদস্য মুফতি মাওলানা রুহুল আমিন বলেন, বিষয়টি এমন নয়। আমরা চাই কওমি মাদরাসায় পড়াশোনা করে পরিপূর্ণ একজন আলেম হোক। মাঝখানে কেউ যদি অন্য কোনো আশায় এখান থেকে চলে যায়, তবে তার দ্বারা পরিপূর্ণ মাসয়ালা দেয়া সম্ভব না। এজন্য আমরা চাই, যারা এখানে পড়তে আসবে সবাই দাওরা-ই হাদিস পর্যন্ত পড়ে পরিপূর্ণ একজন আলেম হোক। তিনি বলেন, নিচের স্তরের প্রতি বছর একাধিক পরীক্ষা হয় এবং বছর শেষে পরীক্ষায় ফাইনাল পরীক্ষা পাস করার পর পরের ক্লাসে যাওয়ার সুযোগ পায়। অর্থাৎ তাকে মূল্যায়ন করার সব ব্যবস্থা আছে। শুধু সরকারি স্বীকৃতিটা নেই।
No comments:
Post a Comment