Monday, April 10, 2017

প্রণব-সোনিয়ার সঙ্গে প্রধানমন্ত্রীর বৈঠক



দিল্লি সফরের তৃতীয় দিনে প্রেসিডেন্ট প্রণব মুখার্জি ও কংগ্রেস সভাপতি সোনিয়া গান্ধীর সঙ্গে বৈঠক করেছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। বিকালে ভারতের রাষ্ট্রপতি ভবনে গিয়ে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সঙ্গে বৈঠক করেন কংগ্রেস সভানেত্রী সোনিয়া গান্ধী। আর সন্ধ্যায় রাষ্ট্রপতি ভবনেই প্রণব মুখার্জির সঙ্গে সাক্ষাৎ হয় শেখ হাসিনার। পরে তিনি রাষ্ট্রপতি ভবনের অশোকা হলে সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানও উপভোগ করেন তিনি।  সেখানে তাঁর সম্মানে রাষ্ট্রপতি এক স্টেট ব্যাঙ্কুয়েট বা ভোজসভারও আয়োজন করেন। বাংলাদেশের সরকার প্রধান এবং তার সফরের গুরুত্বপূর্ণ সফরসঙ্গীরা এ ভোজে অংশ নেন। ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির আমন্ত্রণে চারদিনের সরকারি সফরে শুক্রবার থেকে নয়াদিল্লিতে রয়েছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। গতকাল দিনের শুরুতে তিনি আজমীর শরীফে খাজা মঈনুদ্দিন চিশতি (রহ.)-এর মাজার জিয়ারত করেছেন। সকালে প্রধানমন্ত্রী নয়াদিল্লি থেকে খাজা মঈনুদ্দিন চিশতি (রহ.)-এর দরগায় পৌঁছান। প্রধানমন্ত্রী দেশের অব্যাহত শান্তি, অগ্রগতি ও সমৃদ্ধি কামনা করে বিশেষ মোনাজাত করেন। আজ দিনের শুরুতে একটি সংবর্ধনা এবং বিজনেস সামিটে অংশ নিয়ে বিকেলে প্রধানমন্ত্রী দেশে ফিরবেন।
বাংলাদেশ-ভারত ৬২ দফার বিবৃতির গুরুত্বপূর্ণ দিক: এদিকে সফরের দ্বিতীয় দিনে (শনিবার) নয়াদিল্লিতে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এবং ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির নেতৃত্বাধীন শীর্ষ বৈঠকের পর ৬২ দফা যুক্ত বিবৃতি প্রকাশ করা হয়েছে। দুই প্রধানমন্ত্রীর অনুমোদনসাপেক্ষে প্রকাশিত ওই যুক্ত বিবৃতিতে দুই দেশের একসঙ্গে আগামীর পথচলার গুরুত্বপূর্ণ নির্দেশনাগুলোর অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। শনিবার রাতেই ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের ওয়েবসাইটে বিবৃতিটি প্রকাশ করা হয়। তাতে ভ্রাতৃত্বের বন্ধন, সমতা, আস্থা এবং বোঝাপড়ার ওপর প্রতিষ্ঠিত বাংলাদেশ ও ভারতের সম্পর্ককে কৌশলগত অংশীদারত্বের চেয়েও অনেক বেশি বলে অভিহিত করেন দুই দেশের প্রধানমন্ত্রী। বিবৃতিতে বলা হয়, আন্তরিক ও উষ্ণ পরিবেশে দুই প্রধানমন্ত্রীর একান্ত বৈঠক হয়েছে। ২০১৫ সালের জুন মাসে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির বাংলাদেশ সফরকালে গৃহীত সিদ্ধান্ত যথাযথ বাস্তবায়ন হওয়ায় সন্তোষ প্রকাশ করেন দুই নেতা। বিবৃতিতে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি বাংলাদেশের নজরকাড়া আর্থসামাজিক উন্নয়নের প্রশংসা করেন। এ ছাড়া বাংলাদেশে গণতন্ত্র শক্তিশালীকরণ এবং এ অঞ্চলের ভেতর ও বাইরে শান্তি, নিরাপত্তা ও স্থিতিশীলতা বৃদ্ধিতে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নেয়া পদক্ষেপের প্রশংসা করেন। দুই প্রধানমন্ত্রী মনে করেন, সমন্বিত সীমান্ত ব্যবস্থাপনা পরিকল্পনা কার্যকরভাবে বাস্তবায়িত হলে এর মাধ্যমে সীমান্তের দুর্বল এলাকাগুলোর যৌথ ব্যবস্থাপনায় উন্নতি হবে। এতে করে সীমান্তে অনিয়মিত চলাচল, সহিংসতার ঘটনা, মানুষের জীবনহানিসহ অপরাধমূলক কার্যক্রম শূন্যের কোঠায় নেমে আসবে। বিদ্যুৎ, পানিসম্পদ, বাণিজ্য, ট্রানজিট ও যোগাযোগের ক্ষেত্রে আঞ্চলিক সহযোগিতা বৃদ্ধির মাধ্যমে পারস্পরিক সুফল অর্জনের ওপর গুরুত্বারোপ করেন দুই দেশের প্রধানমন্ত্রী। তারা জলবিদ্যুৎ উৎপাদনে বাংলাদেশ, ভারত ও ভুটানের মধ্যকার ত্রিপক্ষীয় সমঝোতা স্মারকের উদ্যোগের প্রশংসা করে বলেন, তিন দেশের নেতারা যখন একসঙ্গে হবেন, তখন এ স্মারক স্বাক্ষরিত হবে। বাংলাদেশে পদ্মা নদীতে গঙ্গা ব্যারাজের যৌথ উন্নয়নের ব্যাপারে বাংলাদেশের প্রস্তাবে ইতিবাচক পদক্ষেপ নেয়ার বিষয়টিকে সাধুবাদ জানান দুই প্রধানমন্ত্রী। ‘জয়েন্ট টেকনিক্যাল সাব গ্রুপ অন গঙ্গাস ব্যারাজ প্রজেক্ট’ প্রতিষ্ঠায় এবং প্রকল্পের উজানে নদীতীরে সীমান্তে সমীক্ষার জন্য ভারতীয় কারিগরি দলের বাংলাদেশ সফরকে তাঁরা স্বাগত জানান। কলকাতা-খুলনা-ঢাকার মধ্যে নতুন বাসসেবা চালুর প্রশংসা করে দুই প্রধানমন্ত্রী বলেন, এতে করে দুই দেশের জনগণের মধ্যে যোগাযোগ বাড়বে। ২০১৬ সালের অক্টোবর মাসে ঢাকা ও দিল্লির মধ্যে পরীক্ষামূলক কার্গো পরিবহনকেও স্বাগত জানান তাঁরা। প্রতিরক্ষা সহযোগিতা জোরদার করার বিষয়ে যৌথ বিবৃতিতে বলা হয়, বাংলাদেশের মহান স্বাধীনতাযুদ্ধের সময় ১৯৭১ সালের ডিসেম্বর মাসে উভয় বাহিনীর যৌথ অভিযানের ইতিহাসের কথা স্মরণ করে পারস্পরিক লাভজনক এবং আরও গভীর প্রতিরক্ষা সহযোগিতার ব্যাপারে দুই নেতা একমত হন। দুই দেশের মধ্যে বর্তমান বন্ধুত্বপূর্ণ দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের ভিত্তিতে ২০১৬ সালের নভেম্বর মাসে ভারতের প্রতিরক্ষামন্ত্রীর প্রথম বাংলাদেশ সফরে প্রতিরক্ষা সহযোগিতার নতুন মাত্রার পথে উল্লেখযোগ্য পদক্ষেপ বলে দুই প্রধানমন্ত্রী উল্লেখ করেন। দুই দেশের জনগণের মধ্যে ক্রমবর্ধমান যোগাযোগকে স্বাগত জানিয়ে বিবৃতিতে বলা হয়, এ যোগাযোগ আরও উন্নয়নে একমত হয়েছেন দুই প্রধানমন্ত্রী। এ লক্ষ্যে ২০১৮ সালকে বাংলাদেশে ‘ভারত বর্ষ’ এবং ২০১৯ সালকে ভারতে ‘বাংলাদেশ বর্ষ’ উদ্যাপনের সিদ্ধান্ত নেন দুই প্রধানমন্ত্রী। ২০২১ সালে বাংলাদেশের স্বাধীনতাযুদ্ধের ৫০তম বার্ষিকী ও ২০২২ সালে ব্রিটিশ শাসন থেকে ভারতের স্বাধীনতা অর্জনের ৭৫তম বার্ষিকী উদ্যাপনের সিদ্ধান্তও নেন তাঁরা। তিস্তা চুক্তির বিষয়ে নরেন্দ্র মোদি বলেন, এ ব্যাপারে দ্রুত চুক্তি সম্পাদনে তাঁর সরকার ভারতে সংশ্লিষ্ট সকলের সঙ্গে কাজ করছে। এছাড়া দুই প্রধানমন্ত্রী ফেনী, মনু, মুহুরী, খোয়াই, গোমতী, ধরলা ও দুধকুমার নদীর মতো অভিন্ন নদীর পানিবণ্টন সংক্রান্ত বিভিন্ন দিক নিয়ে আলোচনা করার জন্য সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের নির্দেশ দিয়েছেন বলেও বিবৃতিতে উল্লেখ করা হয়। বিবৃতিতে বলা হয়- দুই প্রধানমন্ত্রী সম্প্রতি ভারত ও বাংলাদেশে বর্বরোচিত সন্ত্রাসী হামলার তীব্র নিন্দা করেন। তার উভয়ে সন্ত্রাস দমনে এবং এতদাঞ্চলে সন্ত্রাস ও জঙ্গিবাদের বিস্তার রোধে জরুরি পদক্ষেপ নেয়ার প্রয়োজনীয়তার ওপর গুরুত্বারোপ করেন। পাশাপাশি সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে কঠোর পদক্ষেপ নিতে উভয় দেশের আইন প্রয়োগকারী, গোয়েন্দা এবং নিরাপত্তা সংস্থাগুলোর মধ্যে সহযোগিতা আরো বৃদ্ধির দৃঢ় সংকল্পও প্রকাশ করেন তারা। তারা চোরাচালান, জাল মুদ্রা নোট প্রচার এবং মাদক পাচার রোধে উভয় দেশের মধ্যকার সহযোগিতার উচ্ছ্বসিত প্রশংসা করেন। এ প্রসঙ্গে তারা দু’দেশের কোস্ট গার্ডের মধ্যে স্বাক্ষরিত এমওইউ’র প্রশংসা করেন। উভয় নেতা বিজিবি’কে সীমান্ত চৌকি নির্মাণ ও রক্ষণাবেক্ষণে ভারতের সীমান্ত সড়ক ব্যবহারে বিএসএফ ও বিজিবি’র মধ্যে স্বাক্ষরিত এসওপি চুক্তির প্রশংসা করেন। এ চুক্তির ফলে বিজিবি প্রত্যন্ত এলাকাগুলোতে চিকিৎসা সুযোগ-সুবিধাও পাবে। দুই নেতা প্রতিরক্ষা সহযোগিতা, ডিফেন্স লাইন অব ক্রেডিট এবং বিভিন্ন প্রতিরক্ষা প্রশিক্ষণ ইনস্টিটিউটের মধ্যে এমওইউ সম্পন্নকে স্বাগত জানান।

No comments:

Post a Comment