
দেশের তৈরি পোশাক কারখানার এক-তৃতীয়াংশ এখন ‘সি’ গ্রেডের রয়েছে। এসব কারখানা কোনো কমপ্লায়েন্স মেনে চলে না। সংস্কারকাজে যথেষ্ট অগ্রগতি না হওয়ায় এসব কারখানায় নিরাপত্তা ঝুঁকি রয়ে গেছে, যা অনাকাঙ্ক্ষিত দুর্ঘটনা ঘটাতে পারে। গত বছর ত্রৈমাসিক ভিত্তিতে পোশাক শিল্পের ২ হাজার ২৬৭টি কারখানা পরিদর্শন করে কল-কারখানা ও প্রতিষ্ঠান পরিদর্শন অধিদপ্তর (ডিআইএফই)। পরিদর্শনে উঠে এসেছে এসব তথ্য। এদিকে বিজিএমইএ’র ৩ হাজার ৩৫৭টি কারখানা পরিদর্শনের এক প্রতিবেদনে দেখা গেছে, বর্তমানে বিজিএমইএ’র নিবন্ধিত সদস্য কারখানার সংখ্যা ৫ হাজার ৩০০ (সব কারখানা সক্রিয় নেই)। এর মধ্যে বিজিএমইএ সদস্যভুক্ত ‘এ’ গ্রেডের কারখানার পরিমাণ ১৭৮৮টি। অর্থাৎ এ প্রতিষ্ঠানগুলো কর্মপরিবেশের সব নিয়ম মেনে চলে। ‘বি’ গ্রেডের ৯৮৯টি। এছাড়া ৫৮০টি কারখানা ‘সি’ গ্রেডের।
বিজিএমইএ সূত্রে জানা গেছে, কর্মচারীদের নিয়োগপত্র ও পরিচয়পত্র প্রদান, মজুরি কাঠামো অনুসরণ করা হয় কিনা, পরিশোধ পরিস্থিতি কেমন, কমপ্লায়েন্স-সংক্রান্ত এমন ২৬টি বিষয়ের সমন্বিত ফরম্যাট বিবেচনায় কারখানাগুলোকে নম্বর দেয়া হয়। প্রাপ্ত নম্বরের ফলাফলের ভিত্তিতে কারখানাগুলোকে এ, বি, সি- এই তিন গ্রেডভুক্ত করেছে সংগঠনটি। ৮৫ থেকে ১০০ নম্বর পাওয়া কারখানাকে ‘এ’, ৭০ থেকে ৮৪ নম্বর পাওয়া কারখানাগুলোকে ‘বি’ এবং ৭০-এর নিচে নম্বর পাওয়া কারখানাগুলোকে ‘সি’ গ্রেডভুক্ত করেছে। প্রতিবেদনে ইস্যুভিত্তিক নির্ধারিত নম্বরের ভিত্তিতে ৫৩.২৬ শতাংশ কারখানাকে এ গ্রেডের কারখানা হিসেবে মূল্যায়ন করা হয়েছে। ৮৫ থেকে ১০০ পর্যন্ত নম্বর পেয়েছে এসব কারখানা। ৭০ থেকে ৮৪ নম্বরপ্রাপ্ত বি-গ্রেডের কারখানার সংখ্যা ২৯.৪৬ শতাংশ ও ৭০-এর কম নম্বর পাওয়া সি গ্রেডের কারখানার সংখ্যা ১৭.২৮ শতাংশ। সে হিসাবে দেশের এক-তৃতীয়াংশ পোশাক কারখানা এখন ‘সি’ গ্রেডের রয়েছে। এর মধ্যে তৈরি পোশাক খাতের সংগঠন বিজিএমইএ ও বিকেএমইএ’র কারখানা যেমন আছে, তেমনি দুই সংগঠনের সদস্য নয়, এমন কারখানাও রয়েছে।
সূত্র মতে, আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থার (আইএলও) সহায়তায় এসব পোশাক কারখানা প্রাথমিক পরিদর্শন করেছিল ডিআইএফই। অবশ্য কারখানাগুলো কত শতাংশ ত্রুটি সংস্কার বা সংশোধন করছে, সে বিষয়ে অধিদপ্তরের কাছে সুনির্দিষ্ট তথ্য নেই।
পরিদশর্ন প্রতিবেদন অনুযায়ী, বিজিএমইএ’র সদস্য কারখানা পরিদর্শন করা হয়েছে মোট ১ হাজার ৩৮৭টি। এর মধ্যে ‘এ’ গ্রেডের কারখানা ৬১১টি এবং ‘বি’ গ্রেডের ৮৮২টি। এছাড়া ৩৩৪টি বা ২৪.০৮ শতাংশ কারখানা ‘সি’ গ্রেডের। অন্যদিকে বিকেএমইএ’র সদস্যভুক্ত মোট ৩০০টি কারখানা পরিদর্শন করেছে অধিদপ্তর; যার মধ্যে ১২৪টি ‘এ’ ও ৮৮টি কারখানা ‘বি’ গ্রেডের। বাকি ৮৮টি বা ২৯.৩৩ শতাংশ কারখানা ‘সি’ গ্রেডের। বিজিএমইএ ও বিকেএমইএ’র সদস্য নয়, এমন ৫৮০টি কারখানা পরিদর্শন করেছে অধিদপ্তর। এর মধ্যে ‘এ’ গ্রেডের কারখানা ১০৭টি এবং ‘বি’ গ্রেডের ১০৫টি। বাকি ৩৬৮টি বা ৬৩.৪৪ শতাংশ কারখানা ‘সি’ গ্রেডের।
কমপ্লায়েন্স প্রতিপালন-সংক্রান্ত বিজিএমইএ’র ওই জরিপ প্রতিবেদন অনুযায়ী, মাতৃত্বকালীন ছুটি দেয়া হয় না ১৭ শতাংশ কারখানায়। এ সময় ভাতা দেয়ার বিষয়টিও আমলে নেয় না এসব কারখানা। চাকরি-সংক্রান্ত কোনো রেকর্ড নেই ১৫ শতাংশ কারখানায়। কোনো রকম নিয়োগপত্র ছাড়াই শ্রমিকদের দিয়ে কাজ করাচ্ছে ৫ শতাংশ কারখানা। ৫৮ শতাংশ কারখানায়ই অংশীদারি কমিটি নেই। এমনকি নিয়মিত বেতন দেয়া হয় না ১.৫ শতাংশ কারখানায়। ঢাকা ও চট্টগ্রামে সদস্য কারখানা সরজমিন পরিদর্শনের মাধ্যমে এ প্রতিবেদন তৈরি করেছে বিজিএমইএ।
সংশ্লিষ্টরা জানান, তাজরীন ফ্যাশনসের পর রানাপ্লাজা তৈরি পোশাকশিল্পে সবচেয়ে ভয়াবহ দুটি দুর্ঘটনা। এ ঘটনাগুলোর কারণে বিশ্বে আলোচিত-সমালোচিত এ দেশের পোশাক খাত। এতে বিদেশি ক্রেতারা দেশের পোশাক কারখানাগুলোয় কমপ্লায়েন্স বা উন্নত কর্মপরিবেশ নিশ্চিতে চাপ প্রয়োগ করেন। এমন পরিস্থিতিতে গত ৪ বছরে কারখানাগুলোর মানোন্নয়নে সর্বাত্মকভাবে কাজ করা হলেও মালিকদের অবহেলায় এখনো কারখানার শ্রমিকদের নিরাপত্তা ইস্যুটি অবহেলিতই থেকে গেছে।
এদিকে ইউরোপীয় ক্রেতাদের জোট অ্যাকর্ড ও উত্তর আমেরিকার ক্রেতাদের জোট অ্যালায়েন্সের সদস্য কারখানাগুলোর সংস্কারকাজ শেষ হয়েছে যথাক্রমে ৭৭ ও ৭৫ শতাংশ। দুই জোটের ১৩৫ কারখানা অগ্নি, বৈদ্যুতিক ও ভবনের কাঠামোগত প্রাথমিক ত্রুটি সংশোধনের কাজ শেষ করেছে। অ্যাকর্ড ও অ্যালায়েন্সের মোট সদস্য কারখানার সংখ্যা বর্তমানে ২ হাজার ২০৬। ত্রুটি সংস্কারকাজে সন্তোষজনক অগ্রগতি না থাকলে ব্যবসা স্থগিতের মতো কঠিন সিদ্ধান্ত নিয়ে থাকে উভয় জোটের কর্তৃপক্ষ। ফলে জোটভুক্ত কারখানার সংস্কারকাজ চার ভাগের তিন ভাগ সম্পন্ন হয়েছে। এখন পর্যন্ত ২০২ কারখানার সঙ্গে ব্যবসায়িক সম্পর্ক ছিন্ন করেছে তারা।
কল-কারখানা ও পরিদর্শন অধিদপ্তরের মতে, কমপ্লায়েন্স ইস্যু বাস্তবায়নে ঘাটতি থাকলে প্রথমে সতর্কতা জারি করা হয়। এরপরও পরিস্থিতির উন্নয়ন না ঘটলে আইনি পদক্ষেপ নেয়া হয়। প্রতিষ্ঠানটি পর্যবেক্ষণে দেখেছে, সংগঠনের সদস্য নয়, এমন কারখানাগুলোরই কমপ্লায়েন্স বাস্তবায়নে ঘাটতি রয়েছে। আর কোনো পর্যবেক্ষণের আওতায় না থাকায় কারখানাগুলো কমপ্লায়েন্স বাস্তবায়নেও পিছিয়ে রয়েছে।
বিজিএমইএ সহ-সভাপতি মাহমুদ হাসান খান বাবু বলেন, প্রতিবেদনে উঠে আসা দুর্বলতা ইউরোপের ক্রেতাজোট অ্যাকর্ড এবং মার্কিন ক্রেতাজোট অ্যালায়েন্সভুক্ত কারখানায় নেই। এই দুই জোটের বাইরে থাকা কিছু কারখানা সংস্কারের বিশাল ব্যয় সামাল দিতে হিমশিম খাচ্ছে। ওই সব কারখানায় এ ধরনের কিছু ত্রুটি থেকে যাওয়া অস্বাভাবিক নয়। তবে সদস্য কারখানার কমপ্লায়েন্স মান উন্নয়নে বিজিএমইএ অনমনীয়। এ কারণে ছোট-মাঝারি অনেক কারখানা বন্ধ হচ্ছে।
No comments:
Post a Comment