Tuesday, June 6, 2017

ঐশীর সাজা কমে যাবজ্জীবন

বাবা-মাকে হত্যার অভিযোগে বিচারিক আদালতে মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত ঐশী রহমানের সাজা কমিয়ে তাকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দিয়েছেন হাইকোর্ট। বিচারপতি জাহাঙ্গীর হোসেন ও বিচারপতি মো. জাহাঙ্গীর হোসেনের সমন্বয়ে গঠিত হাইকোর্ট বেঞ্চ গতকাল ঐশীর ডেথ রেফারেন্স (মৃত্যুদণ্ড অনুমোদন) আপিল ও জেল আপিলের রায় ঘোষণা করেন। রায়ে ঐশীকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ডের পাশাপাশি ৫ হাজার টাকা জরিমানাও করা হয়। একই সঙ্গে এ মামলায় বিচারিক আদালতে দুবছরের কারাদণ্ডপ্রাপ্ত ঐশীর বন্ধু মিজানুর রহমানের সাজা বহাল রাখা হয়েছে। গতকাল ঘোষিত রায়ের পর্যবেক্ষণে আদালত বলেছেন, ঐশীর অপরাধ মৃত্যুদণ্ডযোগ্য হলেও তার বয়স, মানসিক অবস্থা বিবেচনা করে তাকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেয়া হয়েছে। এ মামলায় নিম্ন আদালত আবেগতাড়িত হয়ে রায় দিয়েছেন উল্লেখ করে মৃত্যুদণ্ডই একমাত্র দৃষ্টান্তমূলক সাজা নয় বলে মন্তব্য করেছেন হাইকোর্ট। এর আগে গত ৭ই মে ঐশীর ডেথ রেফারেন্স ও আপিলের শুনানি শেষে আলোচিত এ হত্যা মামলার রায় যে কোনো দিন ঘোষণা করা হবে মর্মে তা অপেক্ষমাণ (সিএভি) রেখেছিলেন আদালত। গত ১২ই মার্চ এ মামলার ডেথ রেফারেন্স ও আপিলের শুনানি শুরু হয়। রাষ্ট্রপক্ষে শুনানিতে অংশ নেন ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল জহিরুল হক জহির ও সহকারী অ্যাটর্নি জেনারেল আতিকুল হক সেলিম। ঐশীর পক্ষে ছিলেন আইনজীবী সুজিত চ্যাটার্জি বাপ্পী ও মাহবুব হোসেন রানা। মোট ১৩ কার্যদিবসে ডেথ রেফারেন্স ও আপিলের শুনানি শেষে গতকাল রায় ঘোষণা করলেন আদালত।
রায়ের পর্যবেক্ষণে বলা হয়, মানসিকভাবে বিচ্যুতির কারণেই সুস্পষ্ট উদ্দেশ্য ছাড়া আসামি (ঐশী) এই জোড়া খুনের ঘটনা ঘটিয়েছে। তার পরিবারে মানসিক ভারসাম্যহীনতার ইতিহাস রয়েছে। চিকিৎসকরা ঐশীর মধ্যেও মানসিক সমস্যা পেয়েছেন। ঘটনার সময় তার বয়স ছিল ১৯ বছর। তার বিরুদ্ধে অতীতে ফৌজদারি কোনো অপরাধের নজিরও নেই। এ ছাড়া সে ঘটনার দুদিন পরই স্বেচ্ছায় থানায় আত্মসমর্পণ করে। রায়ে আদালত বলেন, তার (ঐশী) পিতা পুলিশে ও মা বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে কর্মরত ছিলেন। তারা তাকে পর্যাপ্ত সময় দিতে পারেননি। তারা যখন উপলব্ধি করছিলেন ঠিক সে সময় তার জীবনে মাদক আসক্তি ও উচ্ছন্নে চলে গেছে। রায়ে উল্লেখ করা হয়, সন্তানদের জন্য বাবা-মা ও অভিভাবকই হলেন প্রাথমিক শিক্ষক। সে হিসেবে সন্তানদের জন্য ভালো পরিবেশ এবং বাবা মায়েদের সময় দেয়া প্রয়োজন। রায়ে আরো বলা হয়, পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে মৃত্যুদণ্ডকে নিরুৎসাহিত করা হয়েছে। আমাদের দেশে তা বিলপ্ত করার পরিবেশ আসেনি। জনসংখ্যা বেড়েছে। ফলে অপরাধপ্রবণতা যেমন বেড়েছে, তেমনি অপরাধের ধরনও পাল্টেছে। এ অবস্থায় মৃত্যুদণ্ড রহিত করা যুক্তি সঙ্গত নয়। আবার মৃত্যুদণ্ডই একমাত্র দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নয়। এটা কার্যকর করলেই যে সমাজ থেকে অপরাধ দূর হয়ে যাবে, বিষয়টি তা নয়। কম সাজাও অনেক সময় সমাজ থেকে অপরাধ কমাতে সুস্পষ্ট ও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। রায়ে উল্লেখ করা হয়, মৃত্যুদণ্ড কমাতে সমাজের প্রতিটি স্তরে সুশাসন ও মানুষের মধ্যে অপরাধপ্রবণতা রোধে সচেতনতা বৃদ্ধি করতে হবে। নিম্ন আদালতে ঐশীর মৃত্যুদণ্ডের রায়ের বিষয়ে গতকাল হাইকোর্ট পর্যবেক্ষণে বলেন, নিম্ন আদালত সামাজিক অবক্ষয় বিবেচনায় নিয়ে কিছুটা আবেগতাড়িত হয়ে এ রায় দিয়েছেন। কিন্তু সাজা নির্ধারণ ও বিচারের ক্ষেত্রে এ ধরনের আবেগ প্রদর্শনের সুযোগ নেই। আদালত আইনগত তথ্যাদি ও প্রমাণাদি বিবেচনায় নেবে। যেখানে একজন নারী হিসেবে ১৯ বছর বয়সে এ ধরনের অপরাধ করেছে।
রায়ের প্রতিক্রিয়ায় ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল জহিরুল হক জহির সাংবাদিকদের বলেন, আমরা বিচারিক আদালতের রায় বহাল রাখার আবেদন করেছিলাম। কিন্তু ঐশীর সার্বিক অবস্থা বিবেচনা করে আদালত তার সাজা কমিয়ে তাকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দিয়েছেন। পূর্ণাঙ্গ রায় পেলে এ বিষয়ে আপিলের সিদ্ধান্ত নেয়া হবে। তিনি বলেন, ঐশীর বয়স, মানসিক অবস্থা, ঘটনার দুদিনের মধ্যে আত্মসমর্পণসহ ৫টি কারণ উল্লেখ করে আদালত তাকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দিয়েছেন। ঐশীর আইনজীবী সুজিত চ্যাটার্জি বাপ্পী বলেন, ঐশীর মানসিক অবস্থা বিবেচনায় নিয়ে সাজা কমানোর আর্জি জানিয়েছিলাম। আমরা হাইকোর্টের এ রায়ের বিরুদ্ধে আপিল করবো। এর আগে নিম্ন আদালতে রায়ের পর ঐশীর ডেথ রেফারেন্স ২০১৫ সালের ১৯শে নভেম্বর হাইকোর্টে আসে। ওই বছরের ৬ই ডিসেম্বর খালাস চেয়ে হাইকোর্টে আপিল করে ঐশী। শুনানিকালে ঐশীর মানসিক অবস্থা পর্যবেক্ষণের জন্য তাকে আদালতে হাজির করার নির্দেশ দেন হাইকোর্টের সংশ্লিষ্ট বেঞ্চ। পরে গত ১০ই এপ্রিল ঐশী আদালতে হাজির হলে বেঞ্চের দুই বিচারক বিচারপতি জাহাঙ্গীর হোসেন ও বিচারপতি মো. জাহাঙ্গীর হোসেন দুই পক্ষের আইনজীবীদের উপস্থিতিতে বিচারকদের খাস কামরায় ঐশীর সঙ্গে প্রায় ১৫ মিনিট কথা বলে তার মানসিক অবস্থা পর্যবেক্ষণ করেন।
২০১৩ সালের ১৬ই আগস্ট রাজধানীর চামেলীবাগে নিজেদের বাসা থেকে পুলিশের বিশেষ শাখার (এসবি) কর্মকর্তা মাহফুজুর রহমান ও তার স্ত্রী স্বপ্না রহমানের ক্ষতবিক্ষত লাশ উদ্ধার করে পুলিশ। তবে, এর আগেই ছোট ভাইকে নিয়ে বাসা থেকে বেরিয়ে যায় ঐশী। এ ঘটনার পরদিনই ঐশীর চাচা মশিউর রহমান পল্টন থানায় হত্যা মামলা করেন। ওই দিনই ঐশী পল্টন থানায় আত্মসমর্পণ করেন। ২০১৪ সালের ৯ই মার্চ গোয়েন্দা পুলিশের পরিদর্শক মো. আবুল খায়ের মাতুব্বর এ মামলার অভিযোগপত্র (চার্জশিট) আদালতে জমা দেন। সাক্ষ্য গ্রহণ ও যুক্তিতর্ক উপস্থাপন শেষে ২০১৫ সালের ১২ই নভেম্বর রায় ঘোষণা করেন ঢাকার দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনাল-৩ এর বিচারক সাঈদ আহমেদ। রায়ে ঐশী রহমানকে মৃত্যুদণ্ডাদেশ দেয়া হয়। এ ছাড়া হত্যাকাণ্ডে সহায়তা দেয়ার অভিযোগ প্রমাণিত হওয়ায় ঐশীর বন্ধু মিজানুর রহমানকে দুই বছরের কারাদণ্ড দেন আদালত। আর অভিযোগ প্রমাণিত না হওয়ায় ঐশীর আরেক বন্ধু আসাদুজ্জামান জনিকে খালাস দেন আদালত। হত্যায় সহযোগিতা করার অভিযোগে এ মামলায় ঐশীদের বাসা অপ্রাপ্তবয়স্ক গৃহকর্মী সুমিকেও আসামি করা হয়। তার বিচার কিশোর আদালতে চলছে।

No comments:

Post a Comment