
সরকার
নিয়োগের ক্ষেত্রে যেন ধীরে চলো নীতি গ্রহণ করেছে। বিশেষ করে ৩৫ ও ৩৬তম
বিসিএসে যাঁরা নন-ক্যাডার তালিকাভুক্ত হয়েছেন, তাঁদের আহাজারিতে যেন
আকাশ-বাতাস ভারী হয়ে উঠছে। তাঁরা একধরনের অনিশ্চয়তার মধ্যে পড়ে গেছেন। অথচ
সরকারের বিভিন্ন মন্ত্রণালয়, বিভাগ, দপ্তর, অধিদপ্তর ও পরিদপ্তরগুলোতে নবম ও
দশম গ্রেডের প্রায় ৭০ হাজার পদ শূন্য। সম্প্রতি সংসদে এক প্রশ্নের জবাবে
জনপ্রশাসনমন্ত্রী বলেন, সরকারের বিভিন্ন পর্যায়ে শূন্য পদের সংখ্যা সাড়ে
তিন লাখেরও বেশি। কিন্তু মন্ত্রণালয় থেকে পিএসসিতে চাহিদা পাঠানো হচ্ছে না,
আর তাই এই বেকার তরুণদের অপেক্ষার পালাও যেন ফুরোচ্ছে না। সম্প্রতি এই
তরুণদের অনেকেই ব্যক্তিগতভাবে লেখকের কাছে মেইল করেছেন, এর মাধ্যমে জানা
গেল, তাঁদের মনের অবস্থাটা কী। এর আগেও প্রথম আলোর চিঠিপত্র বিভাগে এ নিয়ে
বেশ কটি চিঠি ছাপা হয়েছে। যা হোক, এই শূন্য পদের মধ্যে সরকারি প্রাথমিক
বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষকের পদ খালি আছে ২০ হাজার। সরকার নন-ক্যাডারদের
মধ্য থেকে এই নিয়োগ দিতে চাইলে অনেকেই তাতে রাজি হননি। তাঁদের দাবি, সরকারি
কর্মকমিশন (পিএসসি) নন-ক্যাডারে নবম ও দশম গ্রেড ছাড়া নিয়োগ দিতে পারে না।
কিন্তু প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষকের পদ এখনো ১২তম গ্রেডভুক্ত। অথচ
নন-ক্যাডার মর্যাদায় যাঁরা অন্যান্য মন্ত্রণালয়ের অধীনে বিভিন্ন পদে নিয়োগ
পেয়েছেন বা পেতে যাচ্ছেন, তাঁরা সবাই দশম গ্রেডে যোগ দিয়েছেন বা দিচ্ছেন।
স্বাভাবিকভাবেই এঁরা আপত্তি করেছেন। তবে ২০১৪ সালে প্রধান শিক্ষকদের পদটি
দ্বিতীয় শ্রেণিতে উন্নীত করেছিল প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়। কিন্তু
তখন মন্ত্রণালয় কৌশলে প্রধান শিক্ষকদের বেতন নির্ধারণ করে ১১তম
(প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত) ও ১২তম গ্রেডে (প্রশিক্ষণবিহীন)। একদিকে বিপুল পদ খালি,
অন্যদিকে আমরা দেখছি, প্রশাসন ক্যাডার অতিরিক্ত জনবলের চাপে পড়েছে। আমরা
একদিকে নিম্ন-মধ্যম আয়ের দেশে উত্তীর্ণ হয়েছি, অন্যদিকে আমাদের তরুণদের
মধ্যে সরকারি চাকরির আকাঙ্ক্ষা বাড়ছে। বিআইডিএসের গবেষক শহিদুল ইসলামের
লেখায় জানা যায়, গত ১০ বছরে বিসিএসে আবেদনের গড় বার্ষিক প্রবৃদ্ধি ২০
শতাংশের কাছাকাছি। আর ৩৮তম বিসিএসে আগের বিসিএসের তুলনায় প্রায় এক লাখ,
অর্থাৎ শতকরা ৪২ ভাগ বেশি আবেদন পড়েছে। অথচ ব্যাপারটা উল্টো হওয়ার কথা।
অর্থনৈতিক কার্যক্রম যত বাড়বে, ততই একটি দেশে সরকারি চাকরির প্রতি তরুণদের
আকর্ষণ কমবে—এটাই রীতি। তখন তো বিশেষায়িত কাজের চাহিদা বাড়বে। দরকার পড়বে
উচ্চতর দক্ষতা ও প্রযুক্তির, তার জন্য তরুণেরা নিজেদের প্রস্তুত করবেন। ফলে
বোঝা যায়, উন্নয়ন নিয়ে আমাদের দাপ্তরিক তথ্য-উপাত্তে ঝামেলা আছে। সরকারি
চাকরির জন্য প্রস্তুতি নিতে গিয়ে এই তরুণেরা জীবনের স্বর্ণসময়ের একটা বড়
অংশ ব্যয় করে ফেলেছেন। অথচ তাঁরা এই সময়টা অন্য কোনো উৎপাদনশীল কাজে ব্যয়
করতে পারতেন। বড় বেসরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোও তাদের খণ্ডকালীন কাজে লাগাতে
পারত। অথবা সরকারেরও এমন প্রকল্প থাকতে পারত, যার মাধ্যমে এদের এই সময়টা
কাজে লাগানো সম্ভব হতো। কিন্তু এই দেশে বেকারদের জন্য ভাবার মানুষ যেন নেই।
আবার এটাও সত্য, বেসরকারি নিয়োগদাতারা অভিযোগ করছেন, তাঁরা দক্ষ কর্মী
পাচ্ছেন না। তাহলে আমাদের শিক্ষাব্যবস্থা কী উৎপাদন করছে, সেটা নিয়ে
গভীরভাবে চিন্তিত হওয়ার সময় কি কারও হবে? এ ছাড়া সরকারি চাকরি করতেই হবে—এই
মানসিকতার মধ্যেও সমস্যা আছে। তবে এককভাবে এই অপেক্ষমাণ নন-ক্যাডারদের
দোষারোপ করার কিছু নেই, সমাজ বাস্তবতাই হয়তো তাঁদের এ দিকে ঠেলে দিয়েছে।
আর বাস্তবতা এমন দাঁড়িয়েছে যে তাঁদের অনেকের সরকারি চাকরির বয়স প্রায় শেষ
হয়ে এসেছে। এখন যদি তাঁদের নিয়োগ দেওয়া না হয়, তাহলে তাঁরা অকূলপাথারে পড়ে
যাবেন, সেটা নিশ্চয়ই আমাদের কাম্য নয়। নতুন শতকে কাজের ধরন পাল্টে যাচ্ছে।
আগামী দিনে বিশ্বায়নের সঙ্গে তাল মেলাতে গেলে আমাদের দক্ষতা বৃদ্ধিতে জোর
দেওয়া ছাড়া উপায় নেই। সব কাজই যেভাবে প্রযুক্তিনির্ভর হয়ে পড়ছে, তাতে দক্ষ
মানবসম্পদ নির্মাণে আমাদের শিক্ষায় ব্যাপক বিনিয়োগ করতে হবে। রোবট সোফিয়ার
আগমন কিন্তু আমাদের সেই বার্তাই দিয়ে যাচ্ছে। একই সঙ্গে আমাদেরও মানসিকতায়
পরিবর্তন আনা দরকার। কারণ, শুধু বড় প্রতিষ্ঠান সবার কর্মসংস্থান নিশ্চিত
করতে পারবে না। তৃণমূল পর্যায়ে কর্মসংস্থান করতে পারে ক্ষুদ্র ও মাঝারি
উদ্যোগ। আর তার জন্য আমাদের উদ্যোক্তার মানসিকতা তৈরি করতে হবে।
প্রতীক বর্ধন: সাংবাদিক ও অনুবাদক।
bardhanprotik@gmail.com
প্রতীক বর্ধন: সাংবাদিক ও অনুবাদক।
bardhanprotik@gmail.com
No comments:
Post a Comment