
রংপুর
সিটি কর্পোরেশন (রসিক) নির্বাচনে লাঙ্গলের বড় জয়ে আওয়ামী লীগ এবং বিএনপি
শিবিরে হতাশা নেমে এলেও জাতীয় পার্টি উজ্জীবিত। রংপুরে জাতীয় পার্টির এ
বিপুল জয়ের নেপথ্য কারণ ভোটারদের বক্তব্যের মধ্য দিয়েই ফুটে উঠল। শফিক
রহমান নামের এক ভোটার যুগান্তরকে বলেছেন, রংপুরবাসী মনে করে ‘আগামীতে জাতীয়
পার্টির চেয়ারম্যান হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ আরও ক্ষমতায়িত হবেন। আগামীর
জাতীয় রাজনীতির নিয়ামক শক্তিতে পরিণত হবেন সাবেক এ রাষ্ট্রপতি। রংপুরবাসী
সেই চিন্তা মাথায় রেখেই রংপুর সিটিতে লাঙ্গলে ভোট দিয়েছেন।’ রংপুরের লোকজন
মনে করেন, এরশাদ ক্ষমতায়িত হলে রংপুরের উন্নয়ন হবে। রংপুর সিটির এ বিজয়
শুধু রংপুরেই থেমে থাকবে না, এটা ছড়িয়ে পড়বে সারা দেশে। আগামী এক বছর পরই
জাতীয় নির্বাচন। সেই নির্বাচনের মধ্য দিয়ে সরকার পরিবর্তন ঘটবে। রংপুরের
জাতীয় পার্টির নেতারা মনে করেন, পরবর্তী সরকার গঠনের মধ্য দিয়ে রাজনীতিতে
এরশাদের অবস্থান আরও সুসংহত হবে। এরশাদই হবেন রাজনীতির প্রভাবশালী নিয়ামক।
শক্তিশালী হবে জাতীয় পার্টিও। এছাড়া বিপুল ভোটে মোস্তাফিজার রহমান মোস্তফার
এ জয় প্রমাণ করে এরশাদ বৃহত্তর রংপুরে কতটা জনপ্রিয়। এ জয় জাতীয়
রাজনীতিতেও ব্যাপকভাবে প্রভাব ফেলবে। এদিকে সরফুদ্দীন আহম্মেদ ঝন্টুর
শোচনীয় পরাজয় নিয়ে চলছে নানামুখী বিশ্লেষণ। বলাবলি হচ্ছে- ঝন্টুর বিরুদ্ধে
দুর্নীতির অভিযোগ ছাড়াও দলের নেতাকর্মীদের অসহযোগিতাও এ পরাজয়ের পেছনে কাজ
করেছে। এছাড়া দলের নেতাকর্মীরা একজোট হয়ে তার বিরুদ্ধে কাজ করার পাশাপাশি
তৃণমূলের সঙ্গে ঝন্টুর একটা দূরত্ব তৈরি হয়ে গিয়েছিল। এর ফলও দেখতে পেয়েছেন
দেশবাসী। রংপুরের এ ফলাফল জাতীয় নির্বাচনে প্রভাব পড়বে না- শাসক দল আওয়ামী
লীগ নেতারা এমনটা বলতে চাইলেও জাতীয় পার্টির চেয়ারম্যান ও সাবেক
রাষ্ট্রপতি হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ রংপুরে বলেছেন, লাঙ্গলের এ জোয়ার সারা
দেশে ছড়িয়ে পড়বে। সারা দেশে জাতীয় পার্টির জোয়ার বইবে। সাবেক এ রাষ্ট্রপতি
বলেছেন, রংপুর সিটি নির্বাচনে জাতীয় পার্টি নিজেদের সক্ষমতার প্রমাণ
দিয়েছে। লাঙ্গলের দুর্গে কেউ হানা দিতে পারবে না, তার প্রমাণও এ জয়ে হয়েছে।
রংপুর মহানগর জাতীয় পার্টির সাধারণ সম্পাদক এসএম ইয়াহিয়া বলেছেন, রসিক
নির্বাচন শুধু বৃহত্তর রংপুরেই নয় এটা সারা দেশে সব নির্বাচনে প্রভাব
ফেলবে। তিনি বলেছেন, যারা এতদিন মনে করতেন জাতীয় পার্টি ক্রমাগত ক্ষয়িষ্ণু
হচ্ছে, এ নির্বাচনের ফল তাদের চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিয়েছে। এ নির্বাচনের
মধ্য দিয়ে জাতীয় পার্টি সারা দেশে শক্তিশালী হয়ে উঠবে, দলের নেতাকর্মীরা
উজ্জীবিত হবেন। তিনি বলেন, জাতীয় পার্টির চেয়ারম্যান এরশাদের ব্যক্তি ইমেজ
নেতাকর্মীদের আরও সাহসী করে তুলবে। রংপুরের নতুন নগরপিতা মোস্তফা বলেছেন,
রসিক নির্বাচন হবে রাজনীতির টার্নিং পয়েন্ট। রংপুর সিটি নির্বাচনে বিএনপি
প্রার্র্থীর ভোট প্রায় ১৪ হাজার বাড়লেও আওয়ামী লীগ প্রার্থীর ভোট কমেছে ২৭
হাজার। তবে আওয়ামী লীগের এ ভরাডুবিতে খুশি বিএনপি। তারা বলছেন, সরকারের
নানা নেতিবাচক কর্মকাণ্ডের ফলে শাসক দলের ভোট কমেছে। বিএনপি নেতাদের
প্রশ্ন, জামায়াতের ভোট গেল কোথায়। তবে রংপুরের সাধারণ মানুষ বলছেন, সুষ্ঠু
ভোটের মাধ্যমে তাদের প্রত্যাশার প্রতিফলন ঘটেছে। ভোটের ফলাফল বিশ্লেষণে
দেখা গেছে- ১৯৩টি ভোট কেন্দ্রের মধ্যে ১৮১টিতেই জাতীয় পার্টির প্রার্থী
বেশি ভোট পেয়েছেন। আ’লীগ প্রার্থী সরফুদ্দীন ঝন্টু ৮টি এবং বিএনপির
প্রার্থী কাওছার জামান ৪টি কেন্দ্রে বেশি ভোট পেয়েছেন। স্থানীয় আওয়ামী লীগ ও
বিএনপি নেতারা বলছেন, আ’লীগ ও বিএনপি নেতাদের প্রভাবাধীন কেন্দ্রগুলোতেও
তারা হেরে গেছেন। এটা আওয়ামী লীগের জন্য বড় বার্তা। স্থানীয় আওয়ামী লীগের
কয়েকজন নেতার সঙ্গে আলাপে জানা গেছে, অন্তত পাঁচ কারণে সরফুদ্দীন ঝন্টুর এ
ভরাডুবি। এগুলো হচ্ছে- প্রার্থী বাছাইয়ে ভুল সিদ্ধান্ত। প্রার্থীর বিরুদ্ধে
অনিয়ম-দুর্নীতি ও সাধারণ মানুষের সঙ্গে খারাপ আচরণ, দলের নেতাকর্মীদের
সঙ্গে ঝন্টুর দূরত্ব তৈরি, দলীয় কোন্দল এবং দীর্ঘমেয়াদে সরকার ক্ষমতায়
থাকার কারণে নেতিবাচক জাতীয় ইস্যু। অনেকে বলেছেন, নির্বাচনে ঝন্টু যে
পরাজিত হবেন এটা আগেই বোঝা গিয়েছিল কিন্তু এত কম ভোট পাবেন তা অনুমান করা
যায়নি। তাদের ধারণা ছিল, ঝন্টু হারলেও এক লাখের বেশি ভোট পাবেন। কিন্তু
নৌকা হারল ৯৮ হাজার ভোটের ব্যবধানে। তাদের প্রশ্ন, এ নির্বাচন কী বার্তা
দিল? কথা হয় রংপুর মহানগর আওয়ামী লীগ সাধারণ সম্পাদক ও মেয়র প্রার্থীর
নির্বাচনী এজেন্ট তুষার কান্তির সঙ্গে। তিনি যুগান্তরকে বলেন, আমরা সাধারণ
মানুষের ভোট পাইনি। শুধু পদধারী নেতা ও ডেডিকেটেড কর্মীদের ভোট পেয়েছি।
একজন নেতা বলেন, রংপুর সিটি কর্পোরেশন এলাকায় ৬০-৭০ হাজার সংখ্যালঘু,
২০-২৫ হাজার বিহারি এবং ৩৬ হাজার নতুন ভোটার রয়েছেন। ঝন্টু মাত্র ৬২ হাজার
৪০০ ভোট পেয়েছেন। এসব ভোটারের সিংহভাগই আওয়ামী লীগের ধরা হয়। ওই হিসাব ভুল
প্রমাণিত হয়েছে। আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগে এ ফলাফল দলের জন্য বড়
শিক্ষা উল্লেখ করে তিনি বলেন, সরকারে থাকার পরও মাত্র ৮টি কেন্দ্রে আ’লীগের
জয়, আমাদের জন্য লজ্জাজনক। রংপুর জেলা আওয়ামী লীগ সাধারণ সম্পাদক
অ্যাডভোকেট রেজাউল করিম রাজু যুগান্তরকে বলেন, এ নির্বাচন সুন্দর, উৎসবমুখর
ও অংশগ্রহণমূলক হয়েছে। আমরা যে ভোট পেয়েছি তা আওয়ামী লীগ কর্মীদের ভোট।
অন্যদের ভোট টানতে পারিনি। অভ্যন্তরীণ কোন্দল নির্বাচনে প্রভাব ফেলেছে কিনা
এমন প্রশ্নের উত্তর এড়িয়ে তিনি বলেন, দলের চাপের মুখে নেতাকর্মীরা
প্রার্থীর পক্ষে কাজ করেছেন। তাদের মধ্যে স্বতঃস্ফূর্ততা ছিল না। প্রতীকের
ইমেজের সঙ্গে প্রার্থীর বড় গ্যাপ ছিল। স্থানীয় বিএনপি নেতারা মনে করছেন,
বিএনপি প্রার্থীর ভোট ১৪ হাজার বাড়লেও প্রতিযোগিতায় আসতে পারেনি এবং এটাই
বড় লজ্জার। বিএনপি নেতারা বলছেন, আমাদের প্রধান প্রতিযোগী ছিল আওয়ামী লীগ।
আমরা সরকারের ব্যর্থতার জবাব ব্যালটে দিতে ভোটারদের আহ্বান জানিয়েছিলাম।
ভোটাররা তাতে সাড়া দিয়েছেন। ভোট নষ্ট হবে এমন শঙ্কায় অনেকেই লাঙ্গল প্রতীকে
ভোট দিয়েছেন। বিএনপির একজন নেতা বলেছেন, রংপুর সিটি কর্পোরেশন এলাকায়
জামায়াতের ৩০-৪০ হাজার ভোট রয়েছে। ওই ভোটের বড় অংশ বিএনপি পায়নি। এ বিষয়ে
রংপুর মহানগর বিএনপির সভাপতি মুক্তিযোদ্ধা মোজাফফর হোসেন বলেন, বিএনপির ভোট
এত কম নয়। এখানে বিস্ময়কর কারসাজি হয়েছে। জোটের শরিকদের বিএনপিতে ভোট
দেয়ার প্রসঙ্গে তিনি বলেন, শরিকরা ভোট দিয়েছে এটাই আমরা বিশ্বাস করি।
No comments:
Post a Comment