
চলতি
বছরের অক্টোবর মাসে অনুষ্ঠিত চীনের কমিউনিস্ট পার্টির ১৯তম কংগ্রেস চীনের
জাতীয় ও আন্তর্জাতিক রাজনীতির এক নতুন দিকনির্দেশক হিসেবে বিবেচিত হবে
ভবিষ্যতে। এ কংগ্রেসের ফলাফলকে কমিউনিস্ট পার্টির ক্ষমতা প্রয়োগের ক্ষেত্রে
নতুন বাঁক হিসেবে অভিহিত করা যেতে পারে। ১৯২১ সালে প্রতিষ্ঠার পর থেকে এ
পর্যন্ত চীনের কমিউনিস্ট পার্টির রাজনীতি বহুবার গতি পরিবর্তন করেছে;
কিন্তু শেষ পর্যন্ত কাক্সিক্ষত লক্ষ্য, চীনা বৈশিষ্ট্যের সমাজতন্ত্র
প্রতিষ্ঠায় ব্যর্থ হয়নি। অথচ একই সময়ে প্রতিষ্ঠিত ভারতীয় কমিউনিস্ট পার্টি
এখন পর্যন্ত রাষ্ট্রক্ষমতায় আসতে পারেনি- শুধু তিনটি রাজ্যে নির্বাচনী জয়
ছাড়া। সেই কমিউনিস্ট পার্টি এখন বহু ধারায় বিভক্ত। এদের মধ্যে একমাত্র
মাওবাদীরা চালিয়ে যাচ্ছেন সাম্য প্রতিষ্ঠার লড়াই। অক্টোবরে অনুষ্ঠিত
কংগ্রেসের ফলস্বরূপ গত ১ থেকে ৩ ডিসেম্বর পর্যন্ত চীনের রাজধানী বেইজিংয়ে
অনুষ্ঠিত হল পৃথিবীর বিভিন্ন দেশের রাজনৈতিক দল ও সংগঠনের সঙ্গে কমিউনিস্ট
পার্টির উচ্চপর্যায়ের সংলাপ। এ ধরনের সংলাপ অতীতে আর কোথাও কখনও অনুষ্ঠিত
হয়নি। বাংলাদেশসহ পৃথিবীর ১২০টি দেশের ২০০-এর বেশি রাজনৈতিক দল ও সংগঠনের
প্রতিনিধিরা শামিল হয়েছিলেন এ সংলাপে। কে যাননি এ সংলাপে- উন্নত, উন্নয়নশীল
ও পিছিয়ে পড়া রাষ্ট্রের সরকারপ্রধান, বিরোধী দলের প্রধান, রাজনৈতিক দলের
প্রধান, উপপ্রধান, কমিউনিস্ট, অকমিউনিস্ট সবাই গিয়েছিলেন। চীনের কমিউনিস্ট
পার্টি যে একসঙ্গে এত বিদেশি নেতাকে আমন্ত্রণ জানিয়ে জড়ো করতে পারে, এ
সংলাপ তার এক কর্মোদ্যমী উদাহরণ। আটশ’র বেশি বিদেশিকে হোটেলে রাখা, হোটেল
থেকে সম্মেলনস্থলে নিয়ে যাওয়া, ফিরিয়ে আনা, আহার-বাসস্থানের ব্যবস্থা করা
এক বিরাট কর্মযজ্ঞ- যেখানে শৃঙ্খলার ঘাটতি ছিল না। তবে সেখানেও একই ঘটনার
পুনরাবৃত্তি ঘটেছে- রাস্তা বন্ধ করে অতিথিদের আনা-নেয়া করা। সম্ভবত, চীন
সরকার কোনো ঝুঁকি নিতে চায়নি বলেই এ নিরাপত্তা ব্যবস্থা। সংলাপের মূল বিষয়
ছিল মানবজাতির জন্য অংশীদারিত্বের ভিত্তিতে এক সুন্দর পৃথিবী গড়ে তোলার
ক্ষেত্রে রাজনৈতিক দলগুলোর ভূমিকা। এ মূল শিরোনামকে আবার ভাগ করা হয়েছিল
কয়েকটি ভাগে : নতুন যুগে চীনা বৈশিষ্ট্যের সমাজতন্ত্র সম্পর্কে শি জিন
পিংয়ের চিন্তাধারা, নতুন যুগে নতুন স্বপ্ন নিয়ে চীনের উন্নয়ন, শক্তিশালী
রাজনৈতিক দল গঠনের পথে চ্যালেঞ্জ ও সম্ভাবনা, দেশের উন্নয়ন আকাক্সক্ষায়
জাতীয় অনুশীলন এবং রাজনৈতিক দলগুলোর অভিজ্ঞতা, ওয়ান বেল্ট ওয়ান রোড
কর্মসূচির এগিয়ে যাওয়া, মানবজাতির জন্য অভিন্ন অংশীদারিত্বের ভিত্তিতে
পৃথিবী গঠনে রাজনৈতিক দলগুলোর ভূমিকা ও দায়িত্ব। চর্চা ও প্রয়োগের ক্ষেত্রে
চীন এর আগেও দুটি চিন্তাধারার সঙ্গে পরিচিত হয়েছে। এর একটি হচ্ছে, মাও
সেতুংয়ের চিন্তাধারা। একসময় পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে স্লোগান উচ্চারিত হতো :
মাও সেতুংয়ের চিন্তাধারা, বিশ্বকে আজ দিচ্ছে নাড়া। মাও সেতুং নতুন চীনের
প্রতিষ্ঠাতা আর দেং শিয়াও পিং আধুনিক চীনের প্রতিষ্ঠাতা হিসেবে স্বীকৃত।
অনুমান করা যায়, শি জিন পিং স্বীকৃত হবেন শক্তিশালী নেতা হিসেবে, যিনি
বিশ্বে চীনের নেতৃত্বকে পুনঃপ্রতিষ্ঠিত করেছেন। সংলাপের শেষদিনে গৃহীত
বেইজিং উদ্যোগ বা যাকে ঘোষণাও বলা যেতে পারে, তাতে ভবিষ্যৎ পৃথিবীর বহু
স্বপ্নের, আকাক্সক্ষার কথা বলা হয়েছে। বর্তমান পৃথিবীর সব সমস্যা এবং
ভবিষ্যতে যেসব সমস্যার উদ্ভব ঘটতে পারে তার সবকিছুই এতে অন্তর্ভুক্ত হয়েছে-
যার বাস্তবায়ন রাজনৈতিক দলগুলোর ভূমিকা ও উদ্যোগ ছাড়া সম্ভব নয়। একইভাবে
সম্ভব নয় একটি আন্তর্জাতিক অনুমোদন ব্যতীত। এত বিশাল কর্মযজ্ঞ সম্পর্কে
পত্রিকার স্বল্প পরিসরে লেখা সম্ভব নয়। কিন্তু যেটা বোঝা প্রয়োজন তা হচ্ছে-
কেন এ কর্মযজ্ঞ?
মাও সেতুংয়ের নেতৃত্বে কমিউনিস্ট পার্টির ক্ষমতা গ্রহণের
পর চীন সম্পর্কে সারা বিশ্বে বিপুল আগ্রহের সৃষ্টি হয়। শুরু হয় প্রশংসামূলক
ও ব্যাখ্যামূলক লেখালেখি। পৃথিবীর বিভিন্ন দেশ থেকে স্বেচ্ছাসেবকরা চীনে
যান কাজ করার জন্য। চিরায়ত আতিথিয়েতা দিয়ে চীন তাদের বরণ করে নেয়। এ
স্বেচ্ছাসেবকরা অপূর্ব সুন্দর ইংরেজিতে অনুবাদ করেন মাও সেতুংয়ের রচনাবলি।
পৃথিবীর পূর্ব দিগন্তে চীন নামক লাল সূর্যের উদয় কোটি কোটি মানুষকে
উদ্দীপ্ত করে। মুক্তির জন্য চীনের কমিউনিস্ট পার্টির নেতৃত্বে যে
দীর্ঘমেয়াদি লংমার্চ হয়েছিল, তা অনেক বিশেষত্ব দিয়েছিল মুক্তি আন্দোলনে।
ক্ষমতা গ্রহণের পর অভ্যন্তরীণ ক্ষেত্রে মাও সেতুং দেশ ও অর্থনীতি পরিচালনার
নীতিমালা নিয়ে প্রচুর পরীক্ষা-নিরীক্ষা চালিয়েছেন। সব পরীক্ষাই যে সফল
হয়েছে এমনটি নয়। সেখানে ব্যর্থতার গ্লানিও আছে, আছে সাফল্যের কাহিনী।
কিন্তু বাস্তবতা হচ্ছে, ১৯৪৯ সাল থেকেই চীন আছে বিশ্ব মনোযোগের কেন্দ্রে।
মাও সেতুংয়ের মূল্যায়ন করতে গিয়ে চীনের কমিউনিস্ট পার্টি মনে করে তাদের
চেয়ারম্যানের কর্মকাণ্ড সত্তর ভাগ সঠিক, ত্রিশ ভাগ ভুলে ভরা। অবশ্য এ
মূল্যায়ন জীবদ্দশায় নয়, হয়েছে মাও সেতুংয়ের মৃত্যুর পর। অভ্যন্তরীণ
ক্ষেত্রে যাই হোক না কেন, বৈদেশিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে শুরু থেকেই চীন
সচেতনভাবে কয়েকটি নীতি অনুসরণ করেছে। এর একটি হচ্ছে তার জাতীয় স্বার্থ
সংরক্ষণ। জাতীয় স্বার্থের বাস্তবায়নে চীন জোটনিরপেক্ষ শীর্ষ সম্মেলনের
সঙ্গে যুক্ত হয়েছে, জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদের সদস্যপদ ফিরে পাওয়ার জন্য
কূটনৈতিক লড়াই অব্যাহত রেখেছে এবং বহিঃশত্রুর আক্রমণ থেকে নিজেকে রক্ষা
করার জন্য গড়ে তুলেছে পারমাণবিক ক্ষমতাসম্পন্ন শক্তিশালী প্রতিরক্ষা
ব্যবস্থা। একইসঙ্গে চীন সক্রিয়ভাবে যুক্ত হয়েছে বিংশ শতাব্দীর ষাটের ও
সত্তরের দশকে পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে ছড়িয়ে পড়া মুক্তি আন্দোলনের সঙ্গে। এসব
আন্দোলনকে সব ধরনের সাহায্য-সহযোগিতা দিয়েছে চীন। অস্ত্র, প্রশিক্ষণ থেকে
শুরু করে কোনো কিছুর কমতি সেখানে ছিল না। বিভিন্ন দেশের মুক্তি সংগ্রামের
প্রয়োজনে চীন পাকিস্তানকে ব্যবহার করছে নিরাপদ পথ হিসেবে। হয়তো সে কারণেই
পাকিস্তানের সঙ্গে চীনের বন্ধুত্ব এত গভীর। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে
সম্পর্কোন্নয়নেও পাকিস্তান মুখ্য ভূমিকা পালন করেছে। সেই দিনগুলোতে এশিয়া,
আফ্রিকা, ল্যাটিন আমেরিকার মুক্তিকামী মানুষের কাছে চীন হয়ে উঠেছিল
মুক্তির মিত্র। এর আরেকটি কারণ ছিল, ততদিনে বিপ্লবের পথ থেকে তৎকালীন
সোভিয়েত ইউনিয়নের পশ্চাদপসারণ। মুক্তি সংগ্রামের প্রতি সমর্থনের কারণে চীন
হয়ে উঠেছিল বিশ্বের রাজনৈতিক মঞ্চের অন্যতম নায়ক। মাও সেতুংয়ের মৃত্যুর পর
দেং শিয়াও পিংয়ের নেতৃত্বে চীন শুরু করে নিজের অর্থনৈতিক মুক্তির নতুন
পথচলা। গৃহীত নীতির কারণেই গত শতাব্দীর শেষে চীন পরিণত হয় অর্থনৈতিক
দৈত্যে। এ পথচলা বর্তমান শতাব্দীতেও অব্যাহত আছে। অর্থনীতিবিদরা মনে করেন,
বর্তমান শতাব্দীর মাঝামাঝি চীন অর্থনৈতিকভাবে সব দেশকে অতিক্রম করে যাবে। এ
অর্থনৈতিক সাফল্য বৈদেশিক সম্পর্কের ক্ষেত্রেও চীনকে জুগিয়েছে নতুন শক্তি।
কিন্তু অর্থনীতিবিদরা চীনের অর্থনৈতিক সাফল্যকে স্পষ্টভাবে ব্যাখ্যা করতে
পারেন না। অবশ্য এ সাফল্য যে চীনের সমাজ থেকে বৈষম্য পুরোপুরি দূর করেছে
এমন নয়; কিন্তু চোখ ঝলসানো উন্নতি ঘটেছে ব্যাপক। সোভিয়েত ইউনিয়নের পতনের পর
পৃথিবীতে যে একক কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল তাতে পরিবর্তন আসছে। ভেঙে
পড়ছে এককেন্দ্রিক বিশ্বব্যবস্থা। অতীতের মতো বহুকেন্দ্রিক বিশ্ব আবার নতুন
করে গড়ে উঠবে না। চীনের নেতৃত্ব এ বিষয়টি উপলব্ধি করেছেন। তারা বুঝতে
পেরেছেন অতীতের প্রভাব, নেতৃত্ব ফিরিয়ে আনার, পুনঃপ্রতিষ্ঠার এখনই সময়। সেই
নেতৃত্ব ফিরিয়ে আনতে হলে বৈচিত্র্যের মাঝেই ঐক্য তৈরি করতে হবে। পৃথিবীর
কোটি কোটি মানুষের অংশীদারিত্বের ভিত্তিতে গড়ে তুলতে হবে নতুন পৃথিবী। নতুন
পৃথিবী গড়ায় রাজনৈতিক দলগুলোই মুখ্য ভূমিকা পালন করবে। আর এ কারণেই এবারের
এ সংলাপ।
মাহফুজ উল্লাহ : শিক্ষক ও সাংবাদিক
মাহফুজ উল্লাহ : শিক্ষক ও সাংবাদিক
No comments:
Post a Comment