
পুরান
ঢাকার ১নং শিরীষ দাস রোডের বিউটি বোর্ডিং ছিল গুণী মানুষদের মিলন কেন্দ্র।
বোর্ডিংয়ের জন্মলগ্ন থেকেই সেখানে আড্ডা দিতেন প্রথিতযশা কবি, সাহিত্যিক,
বুদ্ধিজীবী, শিল্পী, সাংবাদিক, চিত্রপরিচালক, নৃত্যশিল্পী, গায়ক, অভিনেতাসহ
বিভিন্ন শ্রেণী-পেশার মানুষ। এ কারণে বোর্ডিংটি পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর
টার্গেটে পরিণত হয়েছিল। একাত্তরের ২৭ মার্চ বেলা ১১টায় হানাদাররা ওই
বোর্ডিংয়ে অতর্কিত আক্রমণ চালায়। সেখান থেকে ধরে নিয়ে বোর্ডিংয়ের মালিকসহ
১৭ জনকে হত্যা করে। ওইদিনের ঘটনা সম্পর্কে বিউটি বোর্ডিংয়ের মালিক প্রহ্লাদ
চন্দ্র সাহার ছেলে তারক সাহা বলেন, আমার বাবা (প্রহ্লাদ চন্দ্র সাহা) সকাল
৯টার দিকে বোর্ডিংয়ের উদ্দেশে বাসা থেকে বের হন কর্মচারীদের কাছ থেকে
বিদায় নেয়ার উদ্দেশে। কারণ দেশের উদ্ভূত পরিস্থিতিতে তিনি সপরিবারে ঢাকার
বাইরে চলে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন। বিউটি বোর্ডিংয়ে যাওয়ার পথে দু-একজন
বন্ধুর সঙ্গে তার দেখা হয়। তাদেরসহ তিনি বিউটি বোর্ডিংয়ে গিয়ে চা পান
করেন। শিরীষ দাস লেন অর্থাৎ বিউটি বোর্ডিংয়ের আশপাশে কয়েকটি বিহারি
পরিবারের বাস ছিল। তাদের মধ্য থেকে কেউ পাকিস্তানি সেনাদের খবর দেয় যে,
বাবা এখন তার বোর্ডিংয়ে অবস্থান করছেন। এ সংবাদের ভিত্তিতে পাক সেনারা বেলা
১১টার দিকে দুটো জিপে করে বিউটি বোর্ডিংয়ের ফটকের সামনে এসে নামে।
বোর্ডিংয়ে সে সময় ছিলেন বোর্ডার নির্মল রায়, সমাজসেবক খোকাবাবু,
চিত্রশিল্পী হারাধন বর্মন, ব্যবসায়ী প্রেমলাল সাহা, ব্যবসায়ী কেশব দেও
আগরওয়াল, চলচ্চিত্র শিল্পী শামস ইরানী, অভিনেতা যোশেফ কোরায়া, বরিশালের
ভোলার ক্ষিতীশ চন্দ্র দে (কর্মচারী সুখরঞ্জন দে’র ভাই) আর আমার বাবা
প্রহ্লাদ চন্দ্র সাহা (৩৫)। এ ছাড়া বাবার সঙ্গে গল্প করতে এসেছিলেন পুস্তক
ব্যবসায়ী সন্তোষ কুমার দাস, প্রকাশক হেমন্ত কুমার সাহা, ক্রীড়া ব্যক্তিত্ব
অহিন্দ্র চৌধুরী শংকর, প্যারিদাস রোডের প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষক প্রভাত
চন্দ্র সাহা এবং এলাকাবাসী নূর মোহাম্মদ মোল্লা। এ ছাড়া সেখানে কর্মচারীদের
মধ্যে ছিলেন ম্যানেজার নরসিংদীর শীতল কুমার দাস, সহকারী ম্যানেজার ঢাকার
সাধন চন্দ্র রায় (৫২), পাচক অখিল চক্রবর্তী (৪৫), কর্মচারী ভোলার সুখরঞ্জন
দে (৩৫) ও নেপাল। এই আঠারো জনকে পাক সেনারা ধরে জিপে করে নিয়ে যায়। কিছুদূর
যাওয়ার পর নেপাল নামে একজন জিপ থেকে লাফ দিয়ে পালিয়ে যান। সে সময়
ফরাশগঞ্জের ফটোগ্রাফার বিজন সরকার বিউটি বোর্ডিংয়ের কাছেই ছিলেন। কিন্তু
সেনাদের জিপ দেখে আর এগিয়ে যাননি। বাবাকে ধরে নিয়ে যাওয়ার সংবাদ পাই দুপুর
আড়াইটার দিকে। কারফিউ বিকেল ৫টার দিকে শিথিল হয়। কারফিউ শিথিল হলে মায়ের
(প্রতিভা রানী সাহা) সঙ্গে আমিও বিউটি বোর্ডিংয়ে আসি বাবার খোঁজে।
বিউটি
বোর্ডিংয়ের পাশে জমিদার বাড়িতে গিয়ে জমিদার পত্নী ত্রিনয়নী দাসের সঙ্গে মা
দেখা করেন। তিনি আমার বাবাকে ধরে নিয়ে যাওয়া সম্পর্কে কোনো খোঁজ দিতে
পারেননি। পরের দিন বাবার খোঁজে মা জগন্নাথ কলেজে যান। জগন্নাথ কলেজ ছিল
পাক সেনাদের ক্যাম্প। বাবাকে ছেড়ে দেয়ার জন্য মা সেনাদের সঙ্গে কথা বলেন।
সেনারা মাকে জানায়, তাদের ওখানে বাবাকে নিয়ে যাওয়া হয়নি। ওখানে বাবার খোঁজ
না পেয়ে মা লক্ষ্মীবাজারে কায়েদে আযম কলেজে (বর্তমান সোহরাওয়ার্দী কলেজ)
পাক সেনাদের আরেক ক্যাম্পে খোঁজ নেন। তারাও কোনো খবর দিতে পারেনি। বিউটি
বোর্ডিংয়ে এ ঘটনার প্রত্যক্ষদর্শী ৩২ শিরীষ দাস লেনের বাসিন্দা ও শহীদ নূর
মোহাম্মদ মোল্লার ছেলে আবদুল মজিদ জানান, মুক্তিযুদ্ধের সময় তার বয়স ছিল ১৫
বছরের বেশি। তার বাবা নূর মোহাম্মদ মোল্লা বিউটি বোর্ডিংয়ে মালীর চাকরি
করতেন। ২৭ মার্চ সকাল সাড়ে ৮টা-৯টার দিকে নূর মোহাম্মদ মোল্লা বোর্ডিংয়ে
যান। পাক সেনারা যখন বোর্ডিং ঘেরাও করে তখন মালিক প্রহ্লাদ চন্দ্র সাহা
বন্ধু-বান্ধব, বোর্ডার ও কর্মচারীসহ সেখানে অবস্থান করছিলেন। সেনারা প্রথমে
তাদের জিপে করে ফরাশগঞ্জ লালকুঠিতে পাকিস্তানি সেনা ক্যাম্পে নিয়ে যায়।
পরে সেখান থেকে ট্রাকে করে অন্য জায়গায় নিয়ে তাদের হত্যা করে। তিনি বলেন,
‘বোডিংয়ের সতেরো জনকে সেদিন হত্যা করা হয়।’
No comments:
Post a Comment