
জেরুজালেমকে
ইসরাইলের রাজধানী হিসেবে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের স্বীকৃতির
প্রতিবাদে গর্জে উঠেছে মুসলিম বিশ্ব। শুক্রবার জুমার নামাজের পর বিভিন্ন
দেশে মার্কিনবিরোধী ব্যাপক বিক্ষোভ হয়েছে। ফিলিস্তিনিদের আগাম বিক্ষোভের
ঘোষণায় জেরুজালেমে অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন করেছিল ইসরাইল। কড়া নিরাপত্তা
উপেক্ষা করে জুমার নামাজের পর পূর্ব জেরুজালেমে বিক্ষোভ প্রদর্শন করেন কয়েক
হাজার ফিলিস্তিনি। এ সময় পুলিশের সঙ্গে দফায় দফায় সংঘর্ষ হয়েছে। বিক্ষুব্ধ
জনতা পুলিশকে লক্ষ্য করে ইট-পাথর নিক্ষেপ করেন। জবাবে ইসরাইলের আইনশৃঙ্খলা
বাহিনীর সদস্যরা বিক্ষোভকারীদের দিকে গুলি, টিয়ার শেল ও রাবার বুলেট ছুড়তে
থাকে। এতে অর্ধশতাধিক বিক্ষোভকারী আহত হয়েছেন। জেরুজালেমে বিক্ষোভে অংশ
নেয়া ওমর নামে এক তরুণ বলেন, ‘কি ঘটবে এটা কোনো বিষয় নয়- আমরা জানি,
জেরুজালেম ফিলিস্তিনের রাজধানী, ইসরাইলের নয়। ইসরাইল একটি দখলদার রাষ্ট্র।’
ট্রাম্পের এ ঘোষণার প্রতিবাদে শুক্রবার ফিলিস্তিন, মালয়েশিয়া,
ইন্দোনেশিয়া, পাকিস্তান, তুরস্ক, মিসর, ইয়েমেনসহ এশিয়া ও আফ্রিকার মুসলিম
দেশগুলোতে হাজার হাজার বিক্ষোভকারী রাস্তায় নেমে আসেন। ইন্তেফাদার ডাক
দিয়েছেন ইরানের জ্যেষ্ঠ ধর্মীয় নেতা আয়াতুল্লাহ আহমাদ খাতামি। খবর এএফপি,
সিএনএন ও আলজাজিরার। মুসলিম বিশ্ব ও ইউরোপীয় ইউনিয়নের হুশিয়ারি ও নিন্দা
উপেক্ষা করে বুধবার ট্রাম্প জেরুজালেমকে ইসরাইলের রাজধানী হিসেবে স্বীকৃতি
দেন। ট্রাম্পের এ স্বীকৃতির প্রতিবাদে ৩ দিনব্যাপী ‘ক্রোধের দিন’ ঘোষণা
করেছিলেন ফিলিস্তিনিরা। ফিলিস্তিনিদের আগাম এ বিক্ষোভের ঘোষণায় জেরুজালেম,
পশ্চিম তীর ও গাজা উপত্যকায় অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন করে ইসরাইল। জুমার
নামাজ শেষে ফিলিস্তিনের পশ্চিম তীর ও গাজা উপত্যকায় বিক্ষোভ করেছেন কয়েক
হাজার মানুষ। গাজায় বিক্ষোভে দুই ফিলিস্তিনি নিহত হয়েছেন। পশ্চিম তীরের
রামাল্লায় ইসরাইলি সেনাদের সঙ্গে ফিলিস্তিনি তরুণদের সংঘর্ষের ঘটনা ঘটেছে।
এতে আহত হয়েছেন অন্তত ৫০ জন। এদের মধ্যে ১৬ জনকে হাসপাতালে নেয়া হয়েছে।
এছাড়া হেবরন, নাবলুস, জেনিন, তুলকারেম, বেথেলহেম ও জেরিখো শহরেও বিক্ষোভ
হয়েছে। বিক্ষোভকারীরা পুলিশকে লক্ষ্য করে ইট-পাথর নিক্ষেপ করেছে।
ইসরাইলি
বাহিনী বিক্ষোভকারীদের দিকে গুলি, টিয়ার শেল ও রাবার বুলেট ছুড়েছে। গাজার
খান ইউনুস এলাকায় বিক্ষোভকারীদের লক্ষ্য করে ইসরাইলি পুলিশের ছোড়া গুলিতে
অন্তত চারজন আহত হয়েছেন। বেথেলহেমে অংশ নেয়া বিক্ষোভকারীরা বলেন,
জেরুজালেমের পবিত্র ভূমি রক্ষার জন্য আমরা জীবন দিতেও প্রস্তুত রয়েছি।
এখানের বিক্ষোভে পুলিশের গুলিতে এক শিশুসহ ১৭ জন আহত হয়েছেন। বিশ্বের
সর্ববৃহৎ মুসলিম দেশ ইন্দোনেশিয়ার রাজধানী জাকার্তায় মার্কিন দূতাবাসের
সামনে বিক্ষোভ করেছেন কয়েক হাজার বিক্ষোভকারী। এ সময় বিক্ষোভকারীরা
‘ট্রাম্পকে মানবতার শত্রু’ অ্যাখ্যা দিয়ে স্লোগান দেন। এ বিক্ষোভকে ঘিরে
মার্কিন দূতাবাসের নিরাপত্তা জোরদার করা হয়। তুরস্কের ইস্তাম্বুলে কয়েক
হাজার বিক্ষোভকারী জুমার নামাজের পর রাস্তায় নেমে প্রতিবাদ করেন।
ফিলিস্তিনিদের প্রতি সংহতি প্রকাশ করে বিক্ষোভকারীরা ‘জেরুজালেম আমাদের এবং
এটা বহাল থাকবে’, ‘আমেরিকা-ইসরাইলের পতন হোক’ স্লোগান দেন। রাজধানী
আঙ্কারাসহ তুরস্কের আরও কয়েকটি শহরে বিক্ষোভ হয়েছে। মালয়েশিয়ার রাজধানী
কুয়ালালামপুরে মার্কিন দূতাবাসের সামনে জড়ো হয়েছিলেন অন্তত পাঁচ হাজার
বিক্ষোভকারী। এ সময় তারা সেখানে ট্রাম্পের কুশপুত্তলিকায় অগ্নিসংযোগ করেন।
মালয়েশিয়ার সরকারি ও বিরোধী দলগুলো এ বিক্ষোভে অংশ নিয়েছে। এ সময়
বিক্ষোভকারীরা ‘ইসরাইলের পতন হোক, আমেরিকার পতন হোক’ স্লোগান দেন। শুক্রবার
দেশটির প্রধানমন্ত্রী নাজিব রাজাক টুইট বার্তায় লিখেছেন, ‘এ পবিত্র দিনে
আসুন আমরা জেরুজালেমের আমাদের ভাইদের জন্য প্রার্থনা করি। আল্লাহ আমাদের
হৃদয়কে ঐক্যবদ্ধ করুন এবং আমাদের শত্রুদের পরিকল্পনা ধ্বংস করুন।’
কুয়ালালামপুরে শুক্রবারের এ বিক্ষোভের আয়োজন করেন মালয়েশিয়ার ক্রীড়ামন্ত্রী
ও ক্ষমতাসীন ইউএসএনও দলের যুব শাখার প্রধান খায়রি জামালুদ্দিন। ট্রাম্পের
সমালোচনা করে তিনি বলেন, ‘আপনি আন্তর্জাতিক আইন লঙ্ঘন করে কী চান। আপনার এ
পদক্ষেপ মুসলিমরা কখনও মেনে নেবেন না।’ তিউনিশিয়ায়ও একই ধরনের বিক্ষোভ
হয়েছে। ট্রাম্পের ঘোষণার বিরুদ্ধে ইরানের রাজধানী তেহরানসহ বিভিন্ন শহরে
বিক্ষোভ-প্রতিবাদ হয়েছে। শুক্রবার জুমার নামাজের পর তেহরানে বিক্ষোভ মিছিলে
হাজার হাজার মানুষ ট্রাম্পের ঘোষণার নিন্দা ও প্রতিবাদ জানান। এ সময় তারা
আমেরিকা ও ইসরাইলের ধ্বংস কামনা করে নানা স্লোগান দেন। পাশাপাশি
বিক্ষোভকারীরা ফিলিস্তিনি জনগণের প্রতি নিজেদের সংহতি ও সমর্থন প্রকাশ
করেন। বিক্ষোভকারীরা ইসরাইল ও আমেরিকার পতাকা পোড়ান। ইরানের পবিত্র শহর কোম
ও মাশহাদেও ইসরাইল এবং আমেরিকার বিরুদ্ধে বিক্ষোভ সমাবেশ হয়েছে। রাজধানী
তেহরানে জুমার নামাজের অস্থায়ী খতিব আয়াতুল্লাহ আহমাদ খাতামি বলেন,
‘ট্রাম্পের ঘোষণা প্রমাণ করেছে ইন্তিফাদা ছাড়া ফিলিস্তিন সংকটের সমাধান
সম্ভব নয়। যে কেউ যে কোনো উপায়ে ইসরাইলের ক্ষতি করতে পারবে সেটা আল্লাহর
দরবারে সৎ কাজ হিসেবে গৃহীত হবে।’ এছাড়া আফগানিস্তানের রাজধানী কাবুলে
শুক্রবার বিক্ষোভ করেছেন এক হাজারের বেশি মুসলমান। বিক্ষোভকারীরা এ সময়
‘ডেথ টু ইসরাইল’, ‘ডেথ টু আমেরিকা’ লেখা ব্যানার প্রদর্শন করেন। পরে তারা
ট্রাম্পের কুশপুত্তলিকা, আমেরিকা ও ইসরাইলের পতাকায় আগুন লাগিয়ে দেন।
আফগানিস্তানের পশ্চিমাঞ্চলীয় হেরাত শহরে প্রায় আড়াই হাজার বিক্ষোভকারী
রাজপথে নেমে প্রতিবাদ জানান। দেশটির উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় কুন্দুজ শহরেও ৫
শতাধিক মানুষ বিক্ষোভ করেছেন। এছাড়া ইয়েমেনের রাজধানী সানায় কয়েকশ’ মানুষ
ট্রাম্পের জেরুজালেম নীতির প্রতিবাদ জানিয়েছেন। ইয়েমেনের
উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলীয় সা’দা প্রদেশে হুথি আনসারুল্লাহ সংগঠন ফিলিস্তিনের
সমর্থনে বিশাল সমাবেশের আয়োজন করে। পাকিস্তানের প্রধান ইসলামী দলগুলো
দেশটির গুরুত্বপূর্ণ শহরগুলোতে বিক্ষোভ সমাবেশ করেছে। এদিকে, শুক্রবার এ
বিষয়ে জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদের বৈঠক হয়েছে। এবার নিরাপত্তা পরিষদের
প্রেসিডেন্টের দায়িত্ব পালন করছে জাপান। বৃহস্পতিবার দেশটি জানায়- বলিভিয়া,
ব্রিটেন, মিসর, ফ্রান্স, ইতালি, সেনেগাল, সুইডেন ও উরুগুয়ে- এ আটটি সদস্য
দেশের অনুরোধে এ বৈঠক আহ্বান করা হয়। উদ্ভূত এ পরিস্থিতিতে ১৩ ডিসেম্বর
ইসলামী সহযোগিতা সংস্থার (ওআইসি) বিশেষ বৈঠক ডেকেছে তুরস্ক।
No comments:
Post a Comment