Saturday, December 9, 2017

শিক্ষাব্রতী রোকেয়া এখনও প্রাসঙ্গিক

রোকেয়া অর্থ জ্যোতির্ময়ী। নামের অর্থের সঙ্গে যথার্থতা রয়েছে তার কর্মেও। বাঙালি নারীমুক্তি আন্দোলনের অগ্রদূত এ মহীয়সী নারী একজন খ্যাতিমান বাঙালি সাহিত্যিক ও সমাজ সংস্কারক। তাকে বাঙালি নারী জাগরণের অগ্রদূত হিসেবে গণ্য করা হয়। তৎকালীন পুরুষশাসিত সমাজের নির্মম নিষ্ঠুরতা, অবিচার ও কুসংস্কারে জর্জরিত অশিক্ষা এবং পর্দার নামে অবরুদ্ধ জীবনযাপনে বাধ্য অন্ধকারাচ্ছন্ন নারী সমাজকে তিনি দেখিয়েছেন আলোর পথ। তিনি জীবদ্দশায় সৃজনশীল ও বৈপ্লবিক লেখনীর মাধ্যমে নারীর সামাজিক ও আইনগত মর্যাদা উন্নয়নে যে আন্দোলনের সূচনা করেছিলেন, তা আজও প্রাসঙ্গিক। রোকেয়ার জীবনাবসান হয়েছে ১৯৩২ সালের ৯ ডিসেম্বর। একই দিনকে তার জন্মদিনও মনে করা হয়। তাই প্রতি বছর ৯ ডিসেম্বর ‘রোকেয়া দিবস’ হিসেবে উদযাপন করা হয়। বিশেষ করে তার জন্মভূমি রংপুরে এ দিবসটি খুবই জমজমাটভাবে উদযাপন করা হয়ে থাকে। জেলা প্রশাসনের উদ্যোগে তিন দিনব্যাপী আলোচনা সভা ও মেলার আয়োজন করা হয়। রোকেয়ার নামে তার জন্মস্থান রংপুরে প্রতিষ্ঠিত বিশ্ববিদ্যালয়, স্কুল ও কলেজসহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে নানা কর্মসূচি পালন করা হয়। তবে পরিতাপের বিষয়, তার নামে প্রতিষ্ঠিত বিশ্ববিদ্যালয়ে রোকেয়া চর্চায় বাধ্যতামূলক কোনো কোর্স এখনও চালু হয়নি। রোকেয়ার দর্শন চর্চার ক্ষেত্রে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোয় আরও পদক্ষেপ নেয়া প্রয়োজন। রোকেয়ার কবর কলকাতায়। সেখানে স্বামী সাখাওয়াত হোসেনের নামে তার প্রতিষ্ঠিত একটি গার্লস স্কুলও রয়েছে। এ বছর (২০১৭) সেই স্কুলে তার নিজের গড়া মহিলা সমিতি ‘আঞ্জুমানে খাওয়াতীনে ইসলামের’ শতবর্ষ উপলক্ষে ‘রোকেয়া মিনার’ নির্মাণ করা হয়েছে। কলকাতায় রোকেয়া সম্পর্কে গবেষণার জন্য ‘রোকেয়া ইন্সটিটিউট অব ভ্যালু এডুকেশন অ্যান্ড রিসার্চ’ (রিভার) নামে একটি প্রতিষ্ঠান প্রশংসনীয় কাজ করে চলেছে। রিভারের সাধারণ সম্পাদক প্রাণতোষ বন্দ্যোপাধ্যায় প্রসঙ্গক্রমে জানিয়েছেন, ১৯৯৫ সালে রোকেয়ার সমাধিফলক স্থাপন করে প্রথমবারের মতো তার জন্ম-মৃত্যু স্মরণে ভারতে ‘রোকেয়া দিবস’ পালন শুরু হয়। ১৮৮০ সালে রংপুর জেলার পায়রাবন্দ গ্রামে রোকেয়ার জন্ম। স্বশিক্ষিত রোকেয়ার জীবন, কর্ম ও চিন্তাচেতনার পরিচয় জেনে বিস্ময় লাগে। তার বাবা পায়রাবন্দের শিক্ষিত জমিদার জহিরুদ্দীন মোহাম্মদ আবু আলী হায়দার সাবের বিলাসিতা ও অপচয়ে শেষ জীবনে নিঃস্ব হন। তার (বাবা) চার স্ত্রীর প্রথমজন রাহাতুন্নেসার দুই ছেলে ও তিন মেয়ে। রোকেয়ার বড় দুই ভাই ইব্রাহিম সাবের ও খলিলুর সাবের কলকাতার সেন্ট জেভিয়ার্স কলেজ থেকে বিএ পাস করেন। কিন্তু তিন বোন করীমুন্নেসা, রোকেয়া ও হোমায়েরা শিক্ষালাভে বঞ্চিত ছিলেন। সাংসারিক কাজ ও ধর্ম-কর্মের জন্য প্রাথমিক কিছু তালিম তাদের জুটেছে। কারণ এ দেশে প্রায় সব সম্ভ্রান্ত পরিবারে তখন মেয়েরা ছিল অন্তপুরে বন্দি এবং আধুনিক শিক্ষালাভে বঞ্চিত। রোকেয়ার উপলব্ধি ছিল, আভিজাত্যবোধ সমাজ প্রগতির অন্তরায়। ‘সম্ভ্রান্ত’ কথাটিকে তিনি ‘অভিশপ্ত’ আখ্যা দিয়ে অভিমানে নিজের নাম থেকে ‘বেগম’ বিশেষণ বর্জন করেছিলেন।
অভিভাবকদের অগোচরে আকুল আগ্রহে বড় বোন করীমুন্নেসার সহযোগিতায় রোকেয়া শৈশব থেকে সংগোপনে লেখাপড়া করেছেন, বাংলা শিখেছেন। ১৮৯৬ সালে সৈয়দ সাখাওয়াত হোসেনের সঙ্গে ষোলো বছর বয়সে তার বিয়ে হয়। এ বিয়েই হঠাৎ রোকেয়াকে মুক্তি দেয় পৈতৃক নিবাসের সংকীর্ণ গণ্ডি থেকে, যেখানে তার সত্যিকার অর্থে কোনো স্বাধীনতা ছিল না। পাশ্চাত্য শিক্ষায় শিক্ষিত সাখাওয়াত ছিলেন উদার ও উচ্চশিক্ষিত। বিয়ের পরই রোকেয়ার গুণাবলি ও চিন্তাধারা সাখাওয়াত হোসেনকে প্রভাবিত করে। স্বামী-স্ত্রী উভয়ে মিলে মুসলমান মেয়েদের কুসংস্কার ও অজ্ঞতা সম্পর্কে আলোচনা করতেন। উদারচেতা সাখাওয়াত হোসেন রোকেয়ার সঙ্গে আলাপ-আলোচনায় উপলব্ধি করেন, মুসলিম নারী সমাজে শিক্ষা বিস্তার ছাড়া মুসলমান সমাজের উন্নতি কোনোভাবেই সম্ভব নয়। শিক্ষা সম্পর্কে রোকেয়ার মধ্যে যে উৎসাহ-উদ্দীপনা বিরাজ করছে, তা-ও তিনি অনুভব করেছিলেন। সাখাওয়াত হোসেন উর্দুভাষী ছিলেন, তার বাড়িতে বাংলা বলা হতো না। স্বামীর বাড়িতে রোকেয়া যে কখনও বাংলা বলার সুযোগ পাননি, নিজেই তা বলেছেন তার লেখা ‘মতিচুরে’। কিন্তু সাখাওয়াত হোসেন তাকে বাংলা লিখতে এবং তা পত্রিকায় প্রকাশ করতে উৎসাহিত করেন। ঊনবিংশ শতাব্দীর শেষের দিকে এবং বিংশ শতাব্দীর প্রথম দিকে সমাজের নারীদের যে শোচনীয় অবস্থা ছিল, রোকেয়া তার চমৎকার বর্ণনা দিয়েছেন। তিনি নারী সমাজকে উদ্দেশ করে লিখেছেন ‘ভগিনীরা! চক্ষু রগড়াইয়া জাগিয়া উঠুন, অগ্রসর হোন! মাথা ঠুকিয়া বল মা! আমরা পশু নই; বল ভাগিনী! আমরা আসবাব নই; বলো কন্যে! আমরা জড়োয়া অলঙ্কাররূপে লোহার সিন্ধুকে আবদ্ধ থাকিবার বস্তু নই; সকলে সমস্বরে বলো আমরা মানুষ!’ ওই সময়ে পুরুষদের ধারণা ছিল-‘নারীর জন্ম গৃহকোণে কাজ করার জন্য। তাদের লেখাপড়া শিখে কী হবে?’ এ ধারণাকে ভুল প্রমাণিত করার জন্য রোকেয়া তার লেখনীর মাধ্যমে নারী সমাজকে জাগিয়ে তুলে পুরুষদের বোঝাতে চেয়েছেন পুরুষের মতো নারীরও সবকিছুতেই সমান অধিকার আছে। তবে তিনি পুরুষ সমাজকে খাটো করে দেখেননি। তাই তিনি লিখেছেন, ‘আমরা সমাজের অর্ধাঙ্গ, আমরা পড়িয়া থাকিলে সমাজ উঠিবে কীরূপে? কোনো ব্যক্তি এক পা বাঁধিয়া রাখিলে খোঁড়াইয়া খোঁড়াইয়া কতদূর চলিবে? পুরুষের স্বার্থ এবং আমাদের স্বার্থ ভিন্ন নহে। তাহাদের জীবনের উদ্দেশ্য বা লক্ষ্য যাহা আমাদের লক্ষ্য তাহাই।’ আরেকটি অসাধারণ প্রতিভা ছিল রোকেয়ার। সেটি বিজ্ঞানের ক্ষেত্রে। হয়তো বিলাতে কৃষিবিদ্যায় প্রশিক্ষিত স্বামীর সাহচর্যেই বিজ্ঞানে রোকেয়ার হাতেখড়ি হয়েছিল। কিন্তু হাতেখড়িতেই তা সমাপ্ত হয়নি। বিজ্ঞানবিষয়ক গভীর আগ্রহ এবং সাধারণজ্ঞান তার চিন্তাকে সমুজ্জ্বল করেছিল। বিজ্ঞানের সুস্পষ্ট ছাপ দেখা যায় তার রচিত গ্রন্থ ‘সুলতানার স্বপ্নে’। বিগত যুগের যেসব ধারণা নারীকে পুরুষের কৃপার পাত্রী করে রেখেছিল, সেগুলোয় আজ অনেকটাই পরিবর্তন এসেছে। নৈতিকতার প্রশ্নে পুরুষদের বিশেষ অধিকার অনেকটাই সমানাধিকারে রূপ নিয়েছে। কোনো কোনো ক্ষেত্রে নারীরা এখন অগ্রাধিকারও পাচ্ছে। সর্বোপরি রোকেয়ার জন্মভূমি বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী নারী, বিরোধীদলীয় নেত্রী নারী, সংসদের স্পিকার নারী, এমপি-মন্ত্রীসহ রাষ্ট্রের প্রায় সব স্তরের কোনো না কোনো পদে সফলভাবে নিয়োজিত আছেন নারী। আজকের নারীমুক্তি, নারীর ক্ষমতায়ন ও নারীর উন্নয়ন- এসব সফলতায় রোকেয়ার চেতনা ও দর্শনের অবদান অনস্বীকার্য।
মোহাম্মদ আলী : সহ-রেজিস্ট্রার, বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়, রংপুর

No comments:

Post a Comment