
হঠাৎ করেই মার্কিন ডলারের বাজার অস্থির। যার বিরূপ প্রভাব পড়ছে আমদানি
পণ্যে। বিশেষ করে আমদানিনির্ভর নিত্যপণ্যের দাম কয়েক দিন ধরেই বাড়তে শুরু
করেছে। সবচেয়ে খারাপ প্রভাব পড়েছে চালের বাজারে। ডলারের মূল্যবৃদ্ধির
অজুহাতে আবারও বাড়তে শুরু করেছে চালের দাম। রাজধানীর পাইকারি ও খুচরা
বাজারে মোটা চালসহ সব ধরনের চালে কেজিপ্রতি দাম বেড়েছে ২ থেকে ৪ টাকা। তবে
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, ডলারের মূল্যবৃদ্ধি হলেও এখনই চালের দাম বাড়ার কারণ
নেই। বর্তমানে বাজারে যে চাল রয়েছে, তা কমপক্ষে ১৫ থেকে এক মাস আগের আমদানি
করা। আর ডলারের দাম বৃদ্ধির পর নতুন করে চাল বাজারে আসতে ১৫ থেকে ২০ দিন
সময় লাগবে। কিন্তু ডলারের মূল্যবৃদ্ধি অজুহাত দেখিয়ে অসাধু ব্যবসায়ীরা এখনই
দাম বাড়িয়ে দিয়েছে। ব্যাংকাররা জানান, মূলত পাঁচ কারণে বেড়েছে
ডলারের দাম। গত জুন শেষে আমদানি, রফতানি, রেমিটেন্স ও ঋণ প্রবৃদ্ধি বেড়েছে।
একই সঙ্গে অফশোর ব্যাংকিংয়ের (বিদেশ থেকে নেয়া ঋণ) পরিশোধও বেড়েছে। এসব
কর্মকাণ্ড পুরোটাই ডলারের মাধ্যমে হয়ে থাকে। এ সময় ডলার নিয়ে সংকট সৃষ্টি
হয়। সে সংকটকে কয়েকটি ব্যাংক অধিক মুনাফার হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করে। ফলে
ডলারের বাজারে অস্থিরতা সৃষ্টি হয়। জানতে চাইলে ব্যাংক নির্বাহীদের
সংগঠন অ্যাসোসিয়েশন অব ব্যাংকার্স বাংলাদেশের (এবিবি) চেয়ারম্যান ও
মিউচুয়াল ট্রাস্ট ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) আনিস এ খান
যুগান্তরকে বলেন, ডলারের বাজারের বিদ্যমান পরিস্থিতি সহনশীলতার বাইরে চলে
গেছে। কোনোভাবেই ডলারের দাম নিয়ন্ত্রণ করতে পারছি না। অসম
প্রতিযোগিতার কারণে গ্রাহক হারাতে হচ্ছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্দেশনা-
বাজারের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ হতে হবে। বাংলাদেশ ব্যাংক বলছে, ডলারের দাম
৮৩ টাকার বেশি হতে পারবে না। কিন্তু বাজারের বাস্তবতা সম্পূর্ণ ভিন্ন। বাংলাদেশ
ব্যাংকের নির্বাহী পরিচালক ও মুখপাত্র শুভঙ্কর সাহা বলেন, বাজারের চাহিদার
ওপর ডলারের দাম ওঠানামা করে। সে বিবেচনায় দাম বাড়লে সেটি স্বাভাবিক ধরা
হয়। তবে কৃত্রিম সংকট তৈরি করা বা অন্য কোনো কারণে দাম বাড়ছে কিনা, সেটি
বাংলাদেশ ব্যাংক পর্যবেক্ষণ করছে। এবিবির সাবেক চেয়ারম্যান ও মেঘনা
ব্যাংকের এমডি মোহাম্মদ নুরুল আমিন যুগান্তরকে বলেন, কয়েক দিনের মধ্যে
ডলারের দাম নিয়ন্ত্রণে চলে আসবে। এ নিয়ে বৈঠক করা হয়েছে বলে জানান তিনি। জানা
গেছে, ডলারের এ মূল্যবৃদ্ধির খেসারত দিচ্ছেন ভোক্তারা। দেশের অধিকাংশ
নিত্যপণ্য আমদানিনির্ভর। ফলে এসব পণ্যমূল্য শতকরা ৫ থেকে ১০ শতাংশ বেড়ে
গেছে। কোনো কোনো পণ্যে এর চেয়েও বেশি লাভ করা হচ্ছে। তবে এ সময়ে এর খারাপ
প্রভাব পড়েছে চালের মূল্যে। ভারত থেকে সবচেয়ে বেশি চাল আমদানি হয়
দিনাজপুরের হিলি স্থলবন্দর থেকে। দু’দিনের ব্যবধানে বন্দরটিতে আমদানি করা
চালের দাম বেড়েছে কেজিতে ১ টাকা। দু’দিন আগেও মোটা চালের মধ্যে
প্রতি কেজি স্বর্ণা চাল বিক্রি হয়েছিল ৩৬ টাকায়। একই চাল রোববার বিক্রি হয়
৩৭ টাকা কেজি দরে। এছাড়া ৩৯ টাকার রতœা জাতের চাল এদিন বিক্রি হচ্ছে ৪০
টাকায়। বন্দরে দাম বাড়ার কারণে আগেভাগে সুযোগ নিচ্ছেন মিল মালিকরাও। একই
হারে তারাও দাম বাড়িয়েছেন। আর এ দাম বাড়ার প্রভাব পড়েছে পাইকারি ও ভোক্তা
পর্যায়ে। চাল আমদানিকারকদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, ডলারের মূল্য
বেড়ে যাওয়ার কারণে তারা দেশে আমদানি করা চালের দাম বাড়িয়েছেন। এছাড়া প্রতি
ডলার আগে ৮১ টাকায় ক্রয় করলেও একই ডলার বর্তমানে ব্যাংকভেদে ৮৪ টাকা থেকে
৮৪ টাকা ৩০ পয়সায় কিনতে হচ্ছে। এতে করে চাল আমদানিতে আগের চেয়ে বাড়তি খরচ
হচ্ছে বলে দাবি করেন তারা। তাই আমদানি করা চালে কিছুটা বেশি দাম বাড়িয়ে
বিক্রি করতে হচ্ছে। এদিকে আমদানি করা চালের মূল্যবৃদ্ধির সঙ্গে
তালমিলিয়ে মিলাররাও স্থানীয় মিলে উৎপাদিত চালের দাম বাড়িয়েছেন। খোঁজ নিয়ে
জানা গেছে, রোববার মিল পর্যায়ে প্রতি কেজি মিনিকেট চাল মানভেদে ৫৪-৫৭ টাকায়
বিক্রি করেছেন তারা। দু’দিন আগেও একই চাল মিলাররা বিক্রি করেছিলেন ৫৩-৫৫
টাকায়। এছাড়া বিআর-২৮ চাল মিল গেটে দু’দিন আগেও প্রতি কেজি ৪৩-৪৪
টাকায় বিক্রি হয়েছিল। একই চাল রোববার তারা বিক্রি করেন প্রতি কেজি ৪৪-৪৫
টাকায়।
ব্যাংক সংশ্লিষ্টরা বলছেন, প্রতি ডলার আগে ৮১ টাকায় ক্রয়
করলেও একই ডলার বর্তমানে ব্যাংকভেদে ৮৪ টাকা থেকে ৮৪ টাকা ৩০ পয়সায় কিনতে
হচ্ছে। এতে করে আমদানিতে আগের চেয়ে বাড়তি খরচ হচ্ছে। যার প্রভাব পড়ছে
পণ্যমূল্যে। এদিকে আমদানি পর্যায়ে বিল পরিশোধেও ডলার সংকট বড় হচ্ছে। ফলে
নিত্যদিনের চাহিদা মেটাতে ডলার কিনতে বাংলাদেশ ব্যাংকে ধরনা দিচ্ছে
ব্যাংকগুলো। বাংলাদেশ ব্যাংক তা বিক্রিও করছে। কিন্তু তাতে চাহিদা মিটছে
না। এ সুযোগে কয়েকটি ব্যাংক ডলার বিক্রিতে অতিরিক্ত মুনাফা নিতে শুরু করে।
নির্ধারিত দামের চেয়ে ৩ থেকে ৪ টাকা বেশি দরে অন্য ব্যাংকগুলোর কাছে ডলার
বিক্রি করছে। এ অভিযোগে অন্তত ১১টি ব্যাংকে নোটিশ দিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক।
এদিকে বাজারের ডলার চাহিদা পূরণে রফতানি উন্নয়ন তহবিলের (ইডিএফ) আকার ২৫০
কোটি থেকে বাড়িয়ে ৩০০ কোটি ডলার করা হয়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংক সূত্র
জানায়, বাজার স্থিতিশীল রাখতে চলতি অর্থবছরের প্রথম মাস থেকে রোববার
পর্যন্ত বাংলাদেশ ব্যাংক ৭৫ কোটি ৬০ লাখ ডলার বিক্রি করেছে। একই সময়ে বাজার
থেকে কোনো ডলার কেনার প্রয়োজন হয়নি বাংলাদেশ ব্যাংকের। অথচ গত অর্থবছর
বাজারে ১৭ কোটি ৫০ লাখ ডলার বিক্রির বিপরীতে বিভিন্ন ব্যাংক থেকে ১৯৩ কোটি
১০ লাখ ডলার ক্রয় করেছিল বাংলাদেশ ব্যাংক। এর আগে ২০১৫-১৬ অর্থবছরে
বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে বাজারে ডলার বিক্রির দরকার হয়নি। যদিও ওই অর্থবছর
বাজার থেকে ৪১৩ কোটি ১০ লাখ ডলার কিনেছিল বাংলাদেশ ব্যাংক। এর আগের কয়েক
অর্থবছরেও দাম পড়ে যাওয়া ঠেকাতে বাজার থেকে অতিরিক্ত ডলার কিনে নিয়েছিল
বাংলাদেশ ব্যাংক। বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্যমতে, চলতি অর্থবছরের প্রথম
চার মাসে (জুলাই-অক্টোবর) ১ হাজার ৯২০ কোটি ডলারের ঋণপত্র (এলসি) খোলা
হয়েছে। আগের অর্থবছরের একই সময়ের তুলনায় যা ২৭ শতাংশ বেশি। একই সময়ে এলসি
নিষ্পত্তির হার বেড়েছে ২৪ শতাংশ। অথচ এ সময়ে রফতানি বেড়েছে মাত্র ৭ দশমিক
শূন্য ৩ শতাংশ। এদিকে এলসি খোলায় ব্যয় বৃদ্ধি পাওয়ায় প্রতিনিয়ত
বাংলাদেশ ব্যাংকের কাছে ডলার চেয়ে আবেদন করছে ব্যাংকগুলো। গেল মঙ্গলবার
১৮টি ব্যাংক ডলার চায়। ব্যাংকগুলোকে ৬ কোটি ডলার দিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক।
বুধ ও বৃহস্পতিবার কয়েকটি ব্যাংককে দিয়েছে ৫ কোটি ৮০ লাখ ডলার। এরপরও
ডলারের মূল্য নিয়ন্ত্রণে আসেনি। সূত্র জানায়, এ সুযোগে বাজারে
কারসাজি শুরু করেছে বড় কয়েকটি ব্যাংক। আমদানি পর্যায়ে ডলারের মূল্য ৮৩
টাকার মধ্যে রাখার বাধ্যবাধকতা রয়েছে। আন্তঃব্যাংক লেনদেনে মূল্য ৮২ টাকা।
খাতাকলমে এ রেট ঘোষণা করা হলেও বাস্তবে আমদানিকারক ও অন্য ব্যাংকের কাছ
থেকে ৮৪ থেকে ৮৫ টাকা পর্যন্ত আদায় করছে কয়েকটি ব্যাংক।
No comments:
Post a Comment