
রাজধানীর
আগারগাঁওয়ে মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘরের
৪ নম্বর গ্যালারির বিষয়বস্তু শত্রুবাহিনীর আত্মসমর্পণ। এখানে নানান
ভুক্তির মধ্যে একটি জায়গায় এসে অনেকের চোখ আটকে যায়। কাচের ঘেরের ভেতরে
পুড়ে যাওয়া লম্বা চারটি কাঠের তক্তা। যুদ্ধের সময় হানাদার বাহিনীর নৃশংসতার
একটি বিশেষ প্রবণতা ছিল অগ্নিসংযোগ। যুদ্ধের নয় মাসজুড়ে পাকিস্তানি বাহিনী
গ্রামের পর গ্রাম নির্বিচারে বাড়িঘর পুড়িয়েছে। এই পোড়া তক্তা তারই সাক্ষ্য
বহন করছে। তক্তাগুলো এসেছে ঢাকার অদূরে কেরানীগঞ্জের ভাওয়াল খানবাড়ি এলাকা
থেকে। একাত্তরের ২৫ নভেম্বর ওই এলাকার অনেক বাড়িঘর পুড়িয়ে দেয় পাকিস্তানি
বাহিনী। তার মধ্যে মুক্তিযোদ্ধাদের বাড়ি হিসেবে চিহ্নিত একটি বাড়ির তিনটি
ঘরও পুড়ে যায়। ওই পরিবারের সদস্যরা একটি দগ্ধ ঘর সংস্কার না করে আগের
অবস্থায় রেখে দিয়েছেন। আর পুড়ে যাওয়া খাট, কাঠের বিম, কয়েকটি পাটাতন, একটি
মইসহ কিছু অংশ দান করেছেন মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘরকে। মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘর
কর্তৃপক্ষ বলছে, একাত্তরে যুদ্ধের শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত পাকিস্তানি বাহিনী
জ্বালিয়ে-পুড়িয়ে ছাই করে দেয় লাখ লাখ বাড়িঘর। যে জনপদে তারা ঢুকেছে,
সেখানে পুড়িয়েছে বাজার-হাট, হিন্দু বসতি কিংবা ‘জয় বাংলা সমর্থকদের’ বাড়ি।
অগ্নিসংযোগের সঠিক কোনো হিসাব নেই। তবে পুড়ে যাওয়া কাঠের এই টুকরোগুলো সেই
দিকটিকে মূর্ত করে তুলছে। গ্যালারির আত্মসমর্পণ অংশে এগুলো প্রদর্শনের কারণ
সম্পর্কে জাদুঘরের অন্যতম ট্রাস্টি মফিদুল হক প্রথম আলোকে বলেন,
‘মুক্তিযুদ্ধে বিজয়ের আনন্দের সঙ্গে হারানোর বেদনাও কম ছিল না। পোড়া কাঠের
এই টুকরোগুলো দিয়ে আমরা সেই বিষয়টিকে বোঝানোর চেষ্টা করেছি।’
মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘরের গণহত্যা গবেষণা কার্যক্রম সেন্টার ফর দ্য স্টাডি অব
জেনোসাইড অ্যান্ড জাস্টিসের সঙ্গে উইন্টার স্কুল কার্যক্রমের সমন্বয়ে একদল
স্কুলশিক্ষার্থী গত বছরের ডিসেম্বর মাসে কেরানীগঞ্জে মুক্তিযুদ্ধের গণকবর ও
স্মৃতিস্তম্ভ পরিদর্শন করে। এ সময় তারা স্থানীয় লোকজনের কাছ থেকে ভাওয়াল
খানবাড়ি এলাকায় পুড়ে যাওয়া এই ঘরের সন্ধান পায়। মোহাম্মদপুরের বছিলা সেতু ও
ঘাটারচর চৌরাস্তা পার হয়ে প্রায় এক কিলোমিটার এগোলে খানবাড়ি এলাকা। মূল
সড়ক থেকে ডান দিকে নেমে যাওয়া রাস্তা ধরে এগোলে খানবাড়ি মসজিদ। এর পেছনেই
পোড়া ঘরটির অবস্থান।
২৯ নভেম্বর সকালে সেখানে গিয়ে দেখা গেল, আশপাশের বেশ
কয়েকটি বাড়িঘর নতুন করে বানানো হলেও ইটের দেয়াল ও টিনের ছাউনি দেওয়া ঘরটি
আগের অবস্থাতেই আছে। ঘরটির দেয়ালে এখনো কালো কালো ছোপ। লক্ষ করে দেখলে
ভেতরের জানালা ও দরজার চৌকাঠেও চোখে পড়ে এমন চিহ্ন। সেখানে কথা হয় ওই
পরিবারের সদস্য মুক্তিযোদ্ধা আজিজ খানের সঙ্গে। মুক্তিযুদ্ধকালে তিনি এই
এলাকার সেকশন কমান্ডারের দায়িত্ব পালন করেন। এ ছাড়া তাঁর পরিবারের আরও চার
সদস্য মুক্তিযুদ্ধে সরাসরি অংশ নেন। এর মধ্যে মনসুর আলী নামের একজন
রাজারবাগ এলাকায় সম্মুখযুদ্ধে শহীদ হন। আজিজ খান বলেন, ‘একাত্তরে তারানগর
ইউনিয়নের মধ্যে আমাদের বাড়িটি বিশেষভাবে চিহ্নিত ছিল মুক্তিযোদ্ধাদের বাড়ি
হিসেবে। আমার চাচা মহিউদ্দীন খান ছিলেন ইউনিয়নের তৎকালীন চেয়ারম্যান। ২৬
মার্চ রাতে ঢাকায় গণহত্যা শুরু হলে পরদিন এই পথে পালিয়ে আসা কয়েকজন ইপিআর
সদস্যকে চাচা আমাদের বাড়িতে আশ্রয় দিয়েছিলেন। কয়েক দিন এখানে অবস্থানের পর
অস্ত্রগুলো রেখে ওই ইপিআর সদস্যরা যাঁর যাঁর বাড়িতে ফিরে যান। সময়
পরিক্রমায় পাকিস্তানি সেনাদের অত্যাচার-নির্যাতনের মাত্রা বাড়তে থাকায়
এখানকার অনেক লোক ভারতে যেতে শুরু করে। এরপর এখানে মুক্তিবাহিনীর আবির্ভাব
ঘটে।’ ২৫ নভেম্বর এই এলাকা আক্রান্ত হওয়ার কারণ হিসেবে দুটি বিষয়কে চিহ্নিত
করেন আজিজ খান। তিনি বলেন, ওই সময়ে মোট ২১ জন মুক্তিযোদ্ধা ঘাটারচর ও
তারানগর এলাকার বিভিন্ন জায়গায় কয়েকটি ভাগে অবস্থান নেন। এখান থেকেই তাঁরা
মাঝেমধ্যে ঢাকায় গিয়ে ছোটখাটো অপারেশন করে আসতেন। এর মধ্যে প্লাটুন
কমান্ডার এখনকার বিখ্যাত চিত্রশিল্পী শাহাবুদ্দিন আহমেদও ছিলেন। তিনি
অবস্থান নেন নিমতলী গ্রামের ডা. ফজলুল করিমের বাড়িতে। আক্রমণের পাঁচ দিন
আগে মুক্তিযোদ্ধা কুতুবুদ্দীনের নেতৃত্বে এলাকার শান্তি কমিটির চেয়ারম্যান
জয়নাল আবেদীনকে হত্যার জন্য শাক্তা ইউনিয়নের ভাঙাবাড়ি এলাকায় লুকিয়ে থেকে
অতর্কিতে হামলা (অ্যামবুশ) চালানো হয়। কিন্তু গুলি লাগলেও নৌকার ওপর থাকা
জয়নাল আবেদীন সেদিন বেঁচে যান। এর দুই দিন পর ২২ নভেম্বর রাতে শিল্পী
শাহাবুদ্দিনের নেতৃত্বে ঘাটারচর এলাকার আবদুর রহমানের বাড়িতে একটি সভা হয়।
ওই সভায় মুক্তিযুদ্ধে যোগ দিতে ইচ্ছুক এমন অনেকের নাম তালিকাভুক্ত করা হয়।
এই সভার খবর পৌঁছে যায় পাকিস্তান সেনাবাহিনীর কানে। এরই প্রতিক্রিয়ায়
ভোররাতে ঘাটারচর থেকে শুরু হয় পাকিস্তানি বাহিনীর আক্রমণ। এর বর্ণনা দিতে
গিয়ে নিমতলী গ্রামের বাসিন্দা আরেক মুক্তিযোদ্ধা খলিলুর রহমান বলেন,
আক্রমণের শুরুতেই ঘাটারচরের হিন্দু গ্রামগুলোর বেশির ভাগ পুড়িয়ে দেয়
পাকিস্তানি সেনারা। অন্য অনেক গ্রামবাসীর সঙ্গে আবদুর রহমানকেও হত্যা করা
হয়। এরপর সকাল সাতটা থেকে রাত পর্যন্ত খানবাড়ি এলাকার বড়মন হরিয়া, ছোটমন
হরিয়া, বড় ভাওয়াল, কাঁঠালতলীতে নির্বিচারে হত্যাযজ্ঞ চলে। চারদিকেই আগুন,
কান্নার রোল, বিভীষিকাময় পরিবেশ। এমনকি জঙ্গল কিংবা পানির ভেতর লুকিয়ে থাকা
মানুষকেও খুঁজে খুঁজে গুলি করা হয়েছে। ওইদিন ঘাটারচর ও খানবাড়ি এলাকায়
৫০-৬০ জন রাজাকার নিয়ে শতাধিক নিরস্ত্র গ্রামবাসী ও দুজন নিরস্ত্র
মুক্তিযোদ্ধাকে হত্যার অভিযোগ উঠেছিল যুদ্ধাপরাধের দায়ে ফাঁসি হওয়া
জামায়াতে ইসলামীর সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল আবদুল কাদের মোল্লার বিরুদ্ধে।
এ সময় ১৭ বছরের মুক্তিযোদ্ধা আজিজ খান অবস্থান করছিলেন সাভারের শিমুলিয়া
প্রশিক্ষণ ক্যাম্পে। হানাদার বাহিনীর আক্রমণ পর্ব শেষ হওয়ার পর তিনি এলাকায়
ফিরে জানতে পারেন, আক্রমণের দিন তাঁর বাবা হাশেম খানসহ দুই ভাইকে আটকের পর
নির্যাতন করে ছেড়ে দেয় পাকিস্তানি বাহিনী। পরে রাজাকারদের ইন্ধনে তাঁদের
বাড়ির তিনটি ঘর পুড়িয়ে দেওয়া হয়। যার একটিতে লুকানো ছিল ইপিআর সদস্যদের
রেখে যাওয়া অস্ত্রগুলো। গুলিতে তাঁর পরিবারের দুই সদস্যও মারা পড়েন।
গুলিবিদ্ধ অবস্থায় পাশের একটি ডোবায় আশ্রয় নেন প্রতিবেশী হাবিবুর রহমান।
যুদ্ধের এত বছর পরও পুড়ে যাওয়া একটি ঘর সে অবস্থাতেই রেখে দেওয়ার কারণ
সম্পর্কে আজিজ খান বলেন, ‘আমরা আসলে মুক্তিযুদ্ধের ওই দুঃসহ স্মৃতিটুকু
মুছে ফেলতে চাইনি। এ জন্য পুড়ে যাওয়া আর দুটি ঘর নতুন করে তৈরি করা হলেও এই
ঘরটি একই অবস্থায় রেখে দিয়েছি। মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘরে এর কিছু কিছু অংশ
দেওয়া হয়েছে। নতুন প্রজন্ম জানুক, অনুভব করুক, বিজয়ের জন্য কী দুঃসহ
যন্ত্রণা আমাদের পেরিয়ে আসতে হয়েছে।’
No comments:
Post a Comment