
কিন্তু পরিসঞ্চালন হতে হবে শতভাগ নিরাপদ। রক্তের গ্রুপ নির্ণয় থেকে শুরু করে ‘পরিসঞ্চালন সেট’ সবকিছুই হতে হবে নিরাপদ। বিশেষ করে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার নির্দেশনা অনুসারে রক্তদাতাদের এইডস, হেপাটাইসিস বি ও সি, সিফিলিস এবং ম্যালেরিয়ার পরীক্ষা করা বাধ্যতামূলক। এসব পরীক্ষা ছাড়া রক্ত পরিসঞ্চালন করলে রোগীর জীবন বাঁচানোর পরিবর্তে তাকে মৃত্যুর দিকে ঠেলে দেয়া হবে। নিরাপদ রক্ত পরিসঞ্চালন আইন ২০০২-এর আলোকে ২০০৮-এ প্রণীত বিধিমালায় বলা হয়েছে, ‘রক্তবাহিত রোগ নির্ণয়, রক্তের অন্যান্য পরীক্ষা-নিরীক্ষা ও রক্ত সংরক্ষণ ইত্যাদি কাজের জন্য প্রয়োজনীয় পর্যাপ্ত রিএজেন্ট, কিটস, রক্তের ব্যাগ ইত্যাদি সরবরাহ সরকার বা যথাযথ কর্তৃপক্ষ নিশ্চিত করবে। সে অনুযায়ী প্রতি বছর স্বাস্থ্য অধিদফতর থেকে রক্ত ব্ল্যাড ট্রান্সফিউশন মেডিসিন বিভাগসহ বিভিন্ন হাসপাতালে রক্ত পরীক্ষার জন্য পরিসঞ্চালন সেটসহ বিভিন্ন প্রকারের যন্ত্রপাতি, কিট এবং রিএজেন্ট সরবরাহ করা হয়। এজন্য সরকারের আলাদা বরাদ্দ আছে। কিন্তু এক বছরের বেশি সময় ধরে তা সরবরাহে অচলাবস্থা বিরাজ করছে। এজন্য ১০০ কোটি টাকার বেশি বরাদ্দ থাকলেও এখন তা রহস্যজনক কারণে বন্ধ হয়ে আছে। এ প্রসঙ্গে জানতে চাইলে স্বাস্থ্য অধিদফতরের পরিচালক (হাসপাতাল ও ক্লিনিকসমূহ) অধ্যাপক ডা. কাজী জাহাঙ্গীর হোসেন যুগান্তরকে বলেন, কোথাও কোথাও সংকট থাকতে পারে। নিরাপদ রক্ত পরিসঞ্চালনে সরকারি বরাদ্দ আছে, তবে মন্ত্রণালয় থেকে বরাদ্দ এখনও ছাড় হয়নি। বরাদ্দ ছাড় হলে সেন্ট্রাল মেডিকেল স্টোরেজ ডিপার্টমেন্টের (সিএমএসডি) মাধ্যমে টেন্ডার আহবান করা হবে। টেন্ডার প্রক্রিয়ার মাধ্যমে মালামাল সরবরাহ করা হবে। তারপর হাসপাতালে পৌঁছে দেয়া হবে।
তিনি বলেন, সব প্রক্রিয়া সম্পন্ন করে হাসপাতালে এসব উপকরণ সরবরাহ করতে জুন মাস পর্যন্ত গড়াবে। তবে স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের সচিব (স্বাস্থ্য সেবা বিভাগ) সিরাজুল হক খান যুগান্তরকে বলেন, বরাদ্দের টাকা আরও আগেই ছাড় হয়ে যাওয়ার কথা। ছাড় হয়নি এমন তথ্য কেউ দিয়ে থাকলে, সেটি সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি নিজ দায়িত্বে বলেছেন। এখানে অন্য কোনো বিষয় জড়িত থাকতে পারে বলেও মন্তব্য করেন তিনি। স্বাস্থ্য অধিদফতরের সংশ্লিষ্ট একাধিক কর্মকর্তা বরাদ্দ বন্ধের বিষয়টি স্বীকার করেন। তারা বলেন, বেশ কয়েকটি জেলায় পরিসঞ্চালন বন্ধ আছে। অনেক জায়গায় ব্যাগ কিনে দিলে রক্ত পরীক্ষা ছাড়াই পরিসঞ্চালন চলছে। রোগীদের স্বাস্থ্যঝুঁকির বিষয়ে জানতে চাইলে এক কর্মকর্তা বলেন, আল্লাহর ওপর ভরসা করেই পরিসঞ্চালন চলছে। উপকরণ রবাদ্দ না হওয়া পর্যন্ত কিছু করার নেই। দেশে বর্তমানে বছরে প্রায় ৯ লাখ ব্যাগ রক্ত পরিসঞ্চালন হয়ে থাকে। এর মধ্যে প্রায় শতকরা ৬৯ ভাগ রক্ত আত্মীয়স্বজন থেকে এবং ৩১ ভাগ স্বেচ্ছায় রক্তদাতার কাছ থেকে সংগ্রহ করা হয়। স্বেচ্ছায় রক্তদাতার সংখ্যা গত দশ বছরে শতকরা ১০ ভাগ থেকে বৃদ্ধি পেয়ে শতকরা ৩১ ভাগে দাঁড়িয়েছে। ২০২০ সালের মধ্যে ১০০ ভাগ স্বেচ্ছায় রক্তদান নিশ্চিত করার কাজ করছে সংশ্লিষ্টরা। জাতীয় নিরাপদ রক্ত পরিসঞ্চালন কমিটি সূত্রে জানা গেছে, ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ব্ল্যাড ট্রান্সফিউশন মেডিসিন বিভাগে প্রতি মাসে কমপক্ষে ৪ হাজার রক্ত পরিসঞ্চালন ব্যাগ প্রয়োজন হয়। একই সঙ্গে রক্ত সংগ্রহে সিরিঞ্জসহ যন্ত্রপাতিও লাগে। এক বছর ধরে এসবের সংকট চলছে।
একই অবস্থা বিরাজ করছে চট্টগ্রাম, রাজশাহী ও ময়মনসিংহসহ সব মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল এবং বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের ব্লাড ট্রান্সফিউশন বিভাগে। অথচ এসব হাসপাতালে প্রতি মাসে কয়েক লাখ রোগী রক্তবাহিত রোগের চিকিৎসা নিতে যান। কিন্তু ব্লাডব্যাগসহ অন্য রিএজেন্ট সামগ্রীর সংকটের কারণে রোগীদের দুর্ভোগ চরমে পৌঁছেছে। এ প্রসঙ্গে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের ট্রান্সফিউশন মেডিসিন বিভাগের চেয়ারম্যান অধ্যাপক মো. আসাদুল ইসলাম দেশব্যাপী ব্লাড ব্যাগ, কিটস এবং রিএজেন্টের সংকটের বিষয়টি স্বীকার করেন। তিনি বলেন, দেশে এখনও স্বেচ্ছায় রক্তদাতার সংখ্যা এমনিতেই কম। এমতাবস্থায় মুমূর্ষু রোগীর জন্য স্বজনরা অনেক খোঁজাখুঁঁজির পর ডোনার নিয়ে হাসপাতালে হাজির হন। অধিকাংশ সময় তারা জানতে পারেন ব্লাডব্যাগের সরবরাহ শেষ। তখন কর্তব্যরত চিকিৎসকরা বাইরে দোকান থেকে দ্রুত রক্তের ব্যাগ কিনে নিয়ে আনতে বলেন। রক্তের ব্যাগ কিনে আনা, রক্তের ক্রসম্যাচিং ইত্যাদি পরীক্ষা-নিরীক্ষা করতে গিয়ে দেরি হওয়ায় রোগীর চিকিৎসা শুরু হতেও অনেক সময় বিলম্ব হয়। তাছাড়া এক্ষেত্রে রোগীকে প্রায় হাজারখানিক টাকা খরচ করতে হয়। তিনি বলেন, বিশ্ববিদ্যালয়ে বিশেষ বরাদ্দ থাকায় বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার নীতিমালা অনুযায়ী পরীক্ষা করেই পরিস্থিতি সামাল দেয়া হচ্ছে।
কিন্তু সারা দেশের সরকারি হাসপাতালগুলোতে কিটস ও রিএজেন্ট সরবরাহ না থাকায় পরীক্ষা ছাড়াই চলছে পরিসঞ্চালন। ফলে লাখ লাখ রোগী মারাত্মক রক্তবাহিত রোগে আক্রান্ত হয়ে পড়ার ঝুঁকিতে রয়েছে। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক রাজধানীর কয়েকটি সরকারি হাসপাতালের একাধিক ট্রান্সফিউশন মেডিসিন বিশেষজ্ঞ বলেন, আমাদের দেশে প্রতিদিনই সড়ক দুর্ঘটনায় অনেকেই মারা যান, বেশির ভাগ মৃত্যুই অতিরিক্ত রক্তক্ষরণজনিত কারণে। রক্ত সঠিক সময়ে সংগ্রহ করে নিরাপদে পরিসঞ্চালন করা গেলে অনেক জীবনই বাঁচানো সম্ভব। তাছাড়া সারা দেশে প্রতিদিন অসংখ্য প্রসূতি মা ‘সিজারের’ মাধ্যমে সন্তান জন্ম দেন। এসব মায়ের একটি বড় অংশের রক্তের প্রয়োজন পড়ে। এ সময় যদি অনিরাপদ রক্ত পরিসঞ্চালনের মাধ্যমে কোনো মায়ের শরীরে হেপাটাইটিস-বি, সি বা এইচআইভি সংক্রমিত রক্ত প্রবেশ করে, তাহলে মা ও শিশু দু’জনই ঝুঁকিতে পড়বে। বেশির ভাগ রক্ত পরিসঞ্চালন হয় প্রসূতি মা, অস্ত্রোপচারের রোগী, থ্যালাসেমিয়া, হিমোফেলিয়া ও দুর্ঘটনাজনিত কারণে আহত রোগীদের জন্য।
No comments:
Post a Comment