
রোহিঙ্গা
শিবিরগুলোর অন্যতম প্রধান সমস্যা এখন ডিফথেরিয়ার সংক্রমণ। এ পর্যন্ত সাড়ে
তিন হাজার মানুষ এই রোগে আক্রান্ত হয়েছে। মারা গেছে ৩০ জন। দিনে গড়ে ৭০ জন
এই রোগে আক্রান্ত হচ্ছে। পরিস্থিতি সামাল দিতে ইতিমধ্যে যুক্তরাজ্য থেকে ৪০
জনের একটি চিকিৎসক দল বাংলাদেশে এসেছে। তারা আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত
ডিফথেরিয়া বিশেষজ্ঞ দল। পৃথিবীর যেকোনো প্রান্তে ডিফথেরিয়ার প্রকোপ বা
প্রাদুর্ভাব দেখা দিলে এই বিশেষজ্ঞ দলকে সেখানে যাওয়ার জন্য অনুরোধ করা হয়।
তারা বর্তমানে বিভিন্ন রোহিঙ্গা শিবিরে আন্তর্জাতিক অভিবাসী সংস্থার
(আইওএম) চিকিৎসকদের সঙ্গে কাজ করছে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার জেনেভা সদর
দপ্তর ও দিল্লি আঞ্চলিক কার্যালয়ের ডিফথেরিয়া-সংশ্লিষ্ট সব কর্মকর্তাও এখন
বাংলাদেশে। এর পাশাপাশি সরকারের স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের কর্মীরাও কাজ
করছেন। কুতুপালং শিবিরের আইওএমের স্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্র কাজ করছে। রোহিঙ্গা
শিবিরগুলোর মধ্যে কুতুপালং সবচেয়ে বড়। সরকারি হিসাব বলছে, পুরোনো ও নতুন
আসা রোহিঙ্গাদের চার লাখের বেশি এই শিবিরে আছে। কুতুপালং শিবির চেনে না এমন
মানুষ এলাকায় কমই রয়েছে। গত শনিবার এই শিবিরের মধ্য দিয়ে যাওয়ার পথে দেখা
যায়, মাছ, সবজি, কাঠসহ দৈনন্দিন জীবনে প্রয়োজনীয় প্রায় সব জিনিসই বিক্রি
হচ্ছে। রাস্তায় ভিড়, দুই পাশে রোহিঙ্গাদের ঘন বসতি। গাড়ি চালানোর উপায়
প্রায় নেই বললেই চলে। কারণ, রাস্তাজুড়ে কেবল মানুষ আর মানুষ। তাদের মধ্যে
শিশুর সংখ্যাই বেশি। আইওএমের স্বাস্থ্যকেন্দ্রটি কোথায়, জিজ্ঞেস করলে সবাই
সামনের দিকে যেতে পরামর্শ দেয়। চারদিকে বেড়া দিয়ে ঘেরা মূল
স্বাস্থ্যকেন্দ্রটি। প্রবেশমুখে নিরাপত্তাকর্মী দাঁড়িয়ে। সেখানে ঢুকে একজন
চিকিৎসককে নিজের পরিচয় দিয়ে ডিফথেরিয়া চিকিৎসাকেন্দ্রটির অবস্থান জানতে
চাইলে তিনি বাঁ দিকে যাওয়ার পরামর্শ দেন। আইওএমের মূল স্বাস্থ্যকেন্দ্র
থেকে একেবারে আলাদা করা এই কেন্দ্র। দরজায় দাঁড়িয়ে দেখা গেল, ভেতরে চারজন
বিদেশি এবং দুজন দেশি চিকিৎসক একজন রোগীকে নিয়ে ব্যস্ত। প্রত্যেকের পরনে
নীলাভ গাউন, মুখে বিশেষ ধরনের মাস্ক। একজনকে ডেকে নিজের পরিচয় দিয়ে
ডিফথেরিয়া রোগের পরিস্থিতি সম্পর্কে জানতে চাইলে তিনি কোনো কথা বলতে
অস্বীকৃতি জানান। যতগুলো কেন্দ্রে ডিফথেরিয়ার চিকিৎসা হচ্ছে, সবগুলোর
সতর্কতা ব্যবস্থাই এমন। দিল্লি থেকে এসেছেন বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার জরুরি
স্বাস্থ্য কর্মসূচির কারিগরি কর্মকর্তা চিকিৎসক নীলেশ বুদ্ধ। গতকাল রোববার
তিনি প্রথম আলোকে বলেন, ‘একটি বড় উদ্বেগের কারণ হচ্ছে ডিফথেরিয়া এখন
স্থানীয় মানুষের মধ্যে ছড়িয়ে পড়ছে।’ তাঁর তথ্যমতে, স্থানীয় লোকজনের মধ্যে
গতকাল পর্যন্ত ১৬ জন সন্দেহভাজন ডিফথেরিয়া রোগী পাওয়া গেছে। ডিফথেরিয়া
মোকাবিলার ‘কাজটি খুবই কঠিন’ এমনই মন্তব্য চিকিৎসক নীলেশ বুদ্ধের। তিনি
বলেন, ‘কুতুপালংয়ের মতো বড় শিবির আমি জীবনে দেখিনি। কয়েক লাখ মানুষ সেখানে
থাকছে। অত্যন্ত ঘনবসতি। ডিফথেরিয়াও অত্যন্ত ছোঁয়াচে। এ ছাড়া রোহিঙ্গারা
কোনো দিন কোনো রোগের টিকা পায়নি। তাদের পুষ্টি পরিস্থিতিও খারাপ।’ বেশ কিছু
রোহিঙ্গা শিবিরের খুব কাছেই স্থানীয় মানুষের বসবাস। মেলামেশার সুযোগ অনেক,
সংক্রমণের ঝুঁকিও রয়েছে। অবশ্য ডিফথেরিয়া রোগের ভয়াবহতা সম্পর্কে রোহিঙ্গা
ও স্থানীয় মানুষকে সচেতন করার জন্য সরকার ও বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার পক্ষ
থেকে একটি পোস্টার ছাপানো হয়েছে। তাতে বলা হয়েছে, ‘ডিফথেরিয়া একটি ভয়াবহ
ছোঁয়াচে রোগ, যার কারণে মৃত্যুও হতে পারে।’ খুব শিগগিরই এই পোস্টার বিলি
করা হবে। ৮ নভেম্বর কক্সবাজার জেলার উখিয়া উপজেলার বালুখালী রোহিঙ্গা
শিবিরে সীমান্তবিহীন চিকিৎসক দলের (এমএসএফ) ক্লিনিকে প্রথম একজন ডিফথেরিয়ায়
আক্রান্ত রোগী পাওয়া যায়। এরপর থেকে একের পর এক রোগী পাওয়া যেতে থাকে।
শিবিরগুলো অত্যন্ত ঘনবসতিপূর্ণ হওয়ার কারণে দ্রুত এই রোগ ছড়াতে থাকে।
ডিসেম্বরের মাঝামাঝি প্রতিদিন ২০০ থেকে ২৫০ রোহিঙ্গা এতে আক্রান্ত হতে
থাকে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা বলছে, নানা প্রতিরোধমূলক উদ্যোগ নেওয়ার কারণে
সংক্রমণ কমে এসেছে। তবে এখনো দৈনিক গড়ে ৭০ জন এই রোগে আক্রান্ত হচ্ছে।
ডিফথেরিয়া হলে গায়ে জ্বর আসে, গলায় ব্যথা হয়, খাবার গিলতে কষ্ট হয় এবং ঘাড়
ফুলে যায়। এর সঙ্গে গলা ও নাকের মধ্যে সাদা দাগ বা আস্তরণ দেখা দিলে, টনসিল
ফুলে গেলে ও শ্বাস-প্রশ্বাসে কষ্ট হলে রোগীকে ডিফথেরিয়া চিকিৎসাকেন্দ্রে
নেওয়ার পরামর্শ দিয়েছে জাতিসংঘের এই বিশেষায়িত প্রতিষ্ঠানটি। কক্সবাজার
জেলা সিভিল সার্জন কার্যালয় সূত্র জানিয়েছে, এ পর্যন্ত সাড়ে তিন হাজার
মানুষ এই রোগে আক্রান্ত হয়েছে। মারা গেছে ৩০ জন। এ পর্যন্ত ৪০০ রোগীর লালার
নমুনা ঢাকায় এনে পরীক্ষা করা হয়েছে।
এর মধ্যে এক-তৃতীয়াংশ ডিফথেরিয়া বলে
শনাক্ত হয়েছে। গত বছর ২৫ আগস্টের পর থেকে মিয়ানমারের রাখাইন প্রদেশের
রোহিঙ্গারা বাংলাদেশে ঢোকা শুরু করে। হাজার হাজার রোহিঙ্গা আসতে থাকে। নতুন
ও পুরোনো মিলে এখন ১০ লাখের বেশি রোহিঙ্গা বিভিন্ন শিবিরে বাস করছে।
রোহিঙ্গাবিষয়ক জাতীয় টাস্কফোর্স ও জেলা টাস্কফোর্সের সদস্য হিসেবে কাজ
করছেন জেলা সিভিল সার্জন চিকিৎসক মো. আবদুস সালাম। তিনি বলেন, রোহিঙ্গা
শিবিরগুলোতে স্বাস্থ্যের প্রধান সমস্যা এই ডিফথেরিয়া। গত শতাব্দীর সত্তরের
দশক থেকে বাংলাদেশে শুরু হওয়া টিকা কার্যক্রমের ফলে দেশ থেকে ডিফথেরিয়া
প্রায় নির্মূলের পথে। বহুদিন এই রোগে আক্রান্ত রোগী না পাওয়ার কারণে সঠিক
ওষুধও মজুত ছিল না। প্রস্তুতিও কম ছিল। এ পরিস্থিতিতে কী কী পদক্ষেপ
নিয়েছেন জানতে চাইলে সিভিল সার্জন বলেন, ইতিমধ্যে ১৫ বছরের কম বয়সী প্রায়
সাড়ে তিন লাখ শিশুকে ডিফথেরিয়ার টিকা দেওয়া হয়েছে, এর মধ্যে ৩০ হাজার
স্থানীয় শিশু। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার সহায়তায় ডিফথেরিয়া চিকিৎসার মূল
ওষুধ (অ্যান্টি-টক্সিন) আনা হয়েছে এবং তা যথেষ্ট পরিমাণে মজুত আছে।
আক্রান্ত ব্যক্তিদের চিকিৎসার জন্য বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংস্থা ও দেশি
এনজিওর ক্লিনিকে সম্পূর্ণ পৃথক কেন্দ্র খোলা হয়েছে। সংক্রমণের আশঙ্কায় কোনো
সরকারি হাসপাতালে ডিফথেরিয়া রোগীর চিকিৎসা হচ্ছে না। এ মাসে দ্বিতীয় দফা
ডিফথেরিয়ার টিকা দেওয়ার প্রস্তুতিও চলছে। বাংলাদেশসহ ছয়টি দেশে বর্তমানে
ডিফথেরিয়ার প্রাদুর্ভাব চলছে বলে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা বলেছে।
বৈশ্বিকভাবে ডিফথেরিয়ার ওষুধ অ্যান্টি-টক্সিন উৎপাদন কম। তবে বাংলাদেশের
জন্য পর্যাপ্ত ওষুধ আছে।
No comments:
Post a Comment