Sunday, January 7, 2018

শেওড়াপাড়ার দুঃখগাথা

ছয় দিন ধরে জ্বর রাবেয়া খাতুনের। বার্ধক্যজনিত রোগের কারণে তাঁর হাঁটাচলার সামর্থ্য নেই। আর এলাকার রাস্তা কাটা থাকায় তাঁকে গাড়িতে করে হাসপাতালে নেওয়ারও উপায় নেই। শেষ পর্যন্ত ছেলে কোলে করে তাঁকে কাটা রাস্তা পার করে হাসপাতালে নিয়ে যান। রাবেয়া খাতুনের বাসা পশ্চিম শেওড়াপাড়ার একটি গলিতে। ওই এলাকার কয়েকটি গলিতে চলছে পয়োনালা নির্মাণ ও সড়ক সংস্কারের কাজ। নির্দিষ্ট সময়ে কাজ শেষ না হওয়ায় সাধারণ মানুষকে ভোগান্তি পোহাতে হচ্ছে। পাশাপাশি লোকসান গুনতে হচ্ছে ব্যবসায়ীদের। গত বুধবার পশ্চিম শেওড়াপাড়ার মসজিদের গলি ও ইস্টওয়েস্ট গলি ঘুরে দেখা যায়, দুটি গলির পুরোটাই কিছু দূর পর পর কাটা। সেখানে কোথাও পয়োনালার স্ল্যাব বসানোর কাজ চলছে, কোথাও আবার রাস্তা খোঁড়াখুঁড়ি করা হচ্ছে। খোঁড়াখুঁড়ির পর ইট-ময়লা-আবর্জনা রাস্তাজুড়ে এবং বিভিন্ন বাড়ির সামনে স্তূপ করে রাখা। এতে বেশ কয়েকটি বাড়ির মূল ফটক বন্ধ। স্থানীয় লোকজনের অভিযোগ, খোলা পয়োনালায় পড়ে বেশ কয়েকটি শিশু আহত হয়েছে। গলির এক দোকানিকে দেখা যায় মুঠোফোনে গেমস খেলতে। এই প্রতিবেদককে তিনি বলেন, ‘ব্যবসা-বাণিজ্য নাই। পথে বইসা গেছি। গাড়ি না চলায় মালও আনতে পারি না। আবার কাস্টমারও আসে না।
মাল নেবে কীভাবে?’ এ সময় দেখা যায়, এক ব্যক্তি কাঁধে করে এক বস্তা চাল নিয়ে ঘরে ফিরছেন। দ্রুত হেঁটে যেতে যেতেই বলেন, ‘ভোগান্তির দেখছেন কী! বৃষ্টির মধ্যে আসলে দেখতেন আমরা কোন ডিজিটাল শহরে আছি।’ আবার, একটি ম্যাট্রেস ১০০ গজের মতো পথ বহন করাতে আসলাম উদ্দিনকে গুনতে হয়েছে ৩০০ টাকা। জানা গেছে, ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের (ডিএনসিসি) একটি প্রকল্পের আওতায় পশ্চিম শেওড়াপাড়ার গলিগুলোতে পয়োনালা বসানো এবং সড়ক সংস্কারের কাজ চলছে। ১৪ নম্বর ওয়ার্ডের অধীনে শেওড়াপাড়া, কাজীপাড়া ও সেনপাড়ায় এই কাজের জন্য ১৮ কোটি টাকা বরাদ্দ আছে। ২০১৬ সালের জানুয়ারিতে প্রকল্পের কাজ শুরু হয়ে জুনে শেষ হওয়ার কথা ছিল। কিন্তু নির্ধারিত সময়ে কাজ শেষ হয়নি। পরে চলতি বছরের জানুয়ারির ২০ তারিখ পর্যন্ত সময় বাড়ানো হয়। নির্ধারিত সময়ে কাজ শেষ না হওয়ায় বিপাকে আছে বাড়িওয়ালা-ভাড়াটে সবাই। মসজিদ গলির একটি বাড়ির তিনটি ফ্ল্যাট খালি। মালিক ‘টু-লেট’ লাগিয়েছেন বছরখানেক আগে। কিন্তু ভাড়াটে পাননি। তিনি ক্ষোভের সঙ্গে বলেন, ‘এর মধ্যে টাকা দিয়া কে ভাড়া থাকবে?’ এলাকার ভাড়াটে আবদুর রশীদ বলেন, ‘গাড়ি বের করা যায় না। রিকশাও চলে না। সকালে বাচ্চারা ঘুমে ঢুলু ঢুলু থাকে। স্কুলে নিতে অনেক কষ্ট করে হাঁটিয়ে মূল রাস্তা পর্যন্ত নিয়ে যেতে হয়।’ খোঁড়াখুঁড়ির কারণে শীতের শুষ্ক আবহাওয়ায় যোগ হয়েছে ধুলার অত্যাচার। একতলার ছাদ থেকে সীমা বেগম নামের এক নারী চিৎকার করে বলেন, ‘দুই বেলা ঘর মুছেও লাভ হয় না। ভাত-তরকারিতেও বালু কিচকিচ করে।’ ভোগান্তির পাশাপাশি আর্থিকভাবেও ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে এলাকাবাসী। এলাকার কয়েকজন ব্যক্তি বলেন, কাজ চলাকালীন তাঁদের অনেকের পানি, গ্যাস, টেলিফোনের লাইন কেটে গেছে। এসব নিজ খরচে তাঁদের মেরামত করতে হয়েছে।
কর্তৃপক্ষ কোনো ক্ষতিপূরণ দেয়নি। গত বুধবার রাস্তা খোঁড়ার সময় ঘটনাস্থলে ছিলেন টিঅ্যান্ডটির লাইনম্যান আবদুর রব। খোঁড়াখুঁড়ির সময় যাতে তাঁদের তার কাটা না পড়ে, সে বিষয়টি দেখছিলেন তিনি। তবুও কয়েকটি বাসার লাইন কেটে যায়। এ নিয়ে শ্রমিকদের সঙ্গে লাইনম্যানের তর্কাতর্কি হয়। এ সব অভিযোগের বিষয়ে ডিএনসিসির ১৪ নম্বর ওয়ার্ডের কাউন্সিলর মো. হুমায়ুন রশীদ বলেন, মেয়র আনিসুল হকের অসুস্থতা ও মৃত্যুর কারণে কাজ শেষ করতে দেরি হচ্ছে। পাশাপাশি গলিগুলো সরু হওয়ায় যন্ত্র ব্যবহার না করে হাতে কাজ করতে হয়েছে। তবে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের গাফিলতিও আছে। চলতি মাসের ২০ তারিখের মধ্যে শেষ হবে। মো. হুমায়ুন রশীদ আরও বলেন, গ্যাস, পানি বা অন্য কোনো লাইন কেটে যাওয়ায় যাঁরা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন, তাঁরা তাঁর সঙ্গে যোগাযোগ করলে তিনি প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেবেন। কাজ শেষ করতে দেরি প্রসঙ্গে জানতে চাইলে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান এমএম বিল্ডার্সের প্রকৌশলী আনোয়ারুল ইসলাম বলেন, প্রাথমিকভাবে যে কাজের কথা বলা হয়েছিল; তার পরিধি বেড়েছে। পাশাপাশি, গলি সরু হওয়ায় কাজ করতে দেরি হচ্ছে। আবার, কাজ করার সময় বিভিন্ন পরিষেবার লাইন বারবার কেটে যাওয়ায় সময় লাগছে বেশি।

No comments:

Post a Comment