
ভারতের
সেনাবাহিনীর প্রধান বিপিন রাওয়াতের মন্তব্যে দেশটির সংবাদ মাধ্যমে
সমালোচনায় ঝড় উঠেছে। তার বিতর্কিত মন্তব্যকে রাজনৈতিক আখ্যা দেয়া হয়েছে।
প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির ভারত ‘পাকিস্তানি মডেলকে’ আদর্শ হিসেবে মেনে
চলছে বলেও আশঙ্কা প্রকাশ করেছে কিছু সংবাদ মাধ্যম। বুধবার নয়াদিল্লিতে এক
সেমিনারে জেনারেল রাওয়াত অভিযোগ করেন, দেশটির উত্তর-পূর্বাঞ্চলে
পরিকল্পিতভাবে বাংলাদেশ থেকে লোক প্রবেশ করানো হচ্ছে। পাকিস্তান ও চীনের
মদদে একটি ছায়াযুদ্ধ’র অংশ হিসেবে ভারতের ওই এলাকাকে অস্থিতিশীল করে তুলতেই
এ কাজ করা হচ্ছে। সেখানে আসামের রাজনৈতিক দল অল ইন্ডিয়া ইউনাইটেড
ডেমোক্রেটিক ফ্রন্ট (এআইইউডিএফ) সম্পর্কে বিপিন বলেন, এটি ভারতীয় জনতা
পার্টির (বিজেপি) চেয়েও দ্রুতগতিতে ছড়িয়ে পড়ছে। দলটির কারণে আসামের নয়টি
জেলায় মুসলমানদের সংখ্যাগরিষ্ঠতা বেড়েছে। মোদি নেতৃত্বাধীন ভারত
‘পাকিস্তানি মডেলের’ দিকে এগোচ্ছে কিনা সেই প্রশ্ন তোলা হয়েছে আনন্দবাজার
পত্রিকার সম্পাদকীয়তে। বলা হয়, ‘জওহরলাল নেহরু ভারত সেনাবাহিনীকে রাজনৈতিক
ক্ষমতা ও উচ্চাশা হইতে দূরে রাখতে পেরেছিলেন। মোদির ভারত কি নেহরু যুগের
সেই অভিজ্ঞানটিকেও মুছিয়া দিতে তৎপর?’ সেনাবাহিনীকে কেন নির্বাচিত সরকারের
অধীনেই থাকতে হবে, কেন সেনার রাজনৈতিক উচ্চাশা থাকতে পারে না- সে বিষয়ে
ভারতে এত দিন নেহরুর মতবাদই গ্রাহ্য ছিল। সরকারের সামান্য সমালোচনা করে
জেনারেল কারিয়াপ্পা নেহরুর নিকট তিরস্কৃত হয়েছিলেন এবং সেই তিরস্কারই
সম্পর্কের সুর বেঁধে দিয়েছিল। সেনাবাহিনী কখনও সীমারেখা অতিক্রম করেনি।
রাওয়াত আসামে গিয়ে যে মন্তব্যগুলো করলেন, তাতে এ রেখা ভাঙার চেষ্টা
সুস্পষ্ট। এ প্রথম কোনো সেনাপ্রধানের বক্তব্যে ধর্মীয় বিভাজন এতখানি প্রকট,
রাজনৈতিক আনুগত্যের সংকেত এত তীব্র।’ রাওয়াতের এমন মন্তব্যে মোদির নিশ্চুপ
থাকা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে আনন্দবাজার পত্রিকার সম্পাদকীয়তে। এতে বলা হয়,
‘সেনাপ্রধানের অনধিকার চর্চায় প্রধানমন্ত্রী প্রতিক্রিয়া জানাননি। জানাবেন,
সেই ভরসাও ক্ষীণ। তার আমলে ভারতে সেনাবাহিনীর বা সীমান্ত রক্ষায় অতন্দ্র
জওয়ানের’ রাজনৈতিক ব্যবহার নজিরবিহীনভাবে বেড়েছে। মানুষের মনে সেনাবাহিনীর
প্রতি যে শ্রদ্ধা আছে, তাকে নিজেদের দিকে টেনে নেয়ার জন্য বিজেপির নেতারা
সুকৌশলে সেনা ও সরকারের পরিচিতিকে ‘অদ্বৈত’ হিসেবে প্রতিষ্ঠা করতে চেষ্টা
করছেন। মোদি ভুলে গেছেন, সংকীর্ণ রাজনৈতিক স্বার্থে সরকার ও সেনার
মধ্যবর্তী পাচিলটি ভাঙিলে তার পরিণতি শেষ অবধি সুখকর হয় না। পাকিস্তান
ঠেকিয়া শিখছে। পাকিস্তানই কি মোদির জীবনের ধ্র“বতারা?’ দ্য হিন্দুর
সম্পাদকীয়তে বলা হয়, বিংশ শতাব্দীর মাঝামাঝি যেসব দেশ ঔপনিবেশিক শাসন থেকে
স্বাধীন হয়েছে, সেগুলোর মধ্যে ভারত তার সেনাবাহিনীকে রাজনীতি থেকে দূরে
রাখতে সফল হয়েছে। জনমিতির বিপর্যয় ও বাংলাদেশ থেকে উত্তর-পূর্বাঞ্চলে
‘পরিকল্পিত অভিবাসনের’ বিষয়ে সেনাপ্রধান রাওয়াত যে মন্তব্য করেছেন, তা যে
কোনো বিচারেই অস্বাভাবিক। ভারতীয় সেনাপ্রধানদের ক্ষেত্রে অনেক দিনের একটি
ঐতিহ্য ছিল যে, তারা জনসমক্ষে মন্তব্যের সময় রাজনৈতিক বিষয় থেকে দূরে
থাকতেন। রাওয়াত বাংলাদেশ, পাকিস্তান ও চীনের প্রতি স্পষ্ট ইঙ্গিত দিয়েছেন।
ঐতিহ্যবাহী অবস্থান থেকে সেনাপ্রধানের এমন সরে আসা নজিরবিহীন। ঐতিহ্য
অনুযায়ী এ আত্মসংযম ভারতীয় গণতন্ত্র ও সেনাবাহিনী উভয়পক্ষের জন্যই ইতিবাচক।
সেনাপ্রধান রাওয়াতের মন্তব্যকে কেন্দ্র করে রাজনৈতিক বিতর্ক শুরু হয়েছে।
টাইমস অব ইন্ডিয়ার সম্পাদকীয়তে বলা হয়, ‘এটি ছিল পুরোপুরি অপ্রয়োজনীয়। একজন
দায়িত্বরত সেনাপ্রধান হিসেবে জনসমক্ষে যে কোনো ধরনের রাজনৈতিক মন্তব্য করা
থেকে দূরে থাকা রাওয়াতের কর্তব্য। রাওয়াতের শব্দচয়ন এমন একটি দৃষ্টিভঙ্গি
তৈরি করেছে যেন এআইইউডিএফ চীন-পাকিস্তানের প্রক্সি হিসেবে কাজ করছে। আবার
অভিবাসনের প্রাথমিক কারণ হয় অর্থনৈতিক। কিন্তু সেনাপ্রধানের বক্তব্যে মনে
হচ্ছে, বাংলাদেশ থেকে অভিবাসনের পেছনে কোনো না কোনোভাবে চীন বা পাকিস্তান
জড়িত।’
‘টাইমস অব ইন্ডিয়া’র সম্পাদকীয়তে আরও বলা হয়, এর আগে দুই সীমান্তে
যুদ্ধ করার সম্ভাবনা নিয়ে মন্তব্য করে সেনাপ্রধান সমালোচনার সম্মুখীন
হয়েছিলেন। ওই ঘটনার সূত্র ধরে সংবাদমাধ্যমটি লিখেছে, আগে সামরিক বিষয় নিয়ে
মন্তব্য করেছিলেন রাওয়াত। তা নিয়ে সমালোচনা ন্যায়সঙ্গত ছিল না। কিন্তু
রাজনীতিতে নাক গলানো কোনোভাবেই তার কাজ নয়। যে কোনো মূল্যে বিষয়টি অবশ্যই
এড়িয়ে যেতে হবে। রাওয়াতকে অবশ্যই রাজনৈতিক নিরপেক্ষতা বজায় রাখতে হবে। তা
না হলে ভারতও পাকিস্তানের মতো দেশে পরিণত হবে। ‘লাইন অব কন্ট্রোল’ শিরোনামে
ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেসের সম্পাদকীয়তে বলা হয়, সেনাপ্রধানের মন্তব্য
গুরুত্বপূর্ণ এবং বিরক্তিকর। স্বাধীন ভারতে অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক অঙ্গন ও
কর্তব্যরত সামরিক কর্মকর্তাদের মধ্যে একটি সীমারেখা আছে এবং একে শ্রদ্ধা
করা হয়। পৃথককরণের এ ঐতিহ্য ভারতের জন্য অত্যন্ত ইতিবাচক হয়ে আছে। বন্ধ
দরজার ওপাশে সরকারি কর্মকর্তাদের কাছে এসব মতামত জানাতে পারেন সেনাপ্রধান।
কিন্তু জনসমক্ষে এ বিষয়ে অবশ্যই ঘোষণা দেয়া উচিত নয়। সেনাবাহিনী ও এর
প্রধানের রাজনৈতিক নিরপেক্ষতা ভারতীয় গণতন্ত্রের প্রকৃতি নির্ধারণের
ক্ষেত্রে জরুরি। জেনারেল রাওয়াতের সাম্প্রতিক বক্তব্য প্রতিবেশী দেশগুলোর
সঙ্গে ভারতের সম্পর্কের সাম্যাবস্থা নষ্ট করতে পারে বলেও আশঙ্কা করা হয়েছে
‘ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস’র সম্পাদকীয়তে।
No comments:
Post a Comment