
দেশে
নারী সুরক্ষায় কঠোর আইন আছে। নারীর অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি ও ক্ষমতায়নও বেড়েছে।
প্রধানমন্ত্রী, বিরোধী দলের নেতা, জাতীয় সংসদের স্পিকার থেকে শুরু করে
সরকারি-বেসরকারি পর্যায়ে উচ্চ পদে আসীন বহু নারী। আছেন নারী বিচারক, সচিব ও
পাইলট। ব্যবসা ক্ষেত্রেও নারী সাফল্যের শীর্ষে আছেন। এত কিছুর পরও দেশে
নারী নির্যাতন কমছে না। ৮২ শতাংশ নারী বিবাহিত জীবনে নির্যাতনের শিকার
হচ্ছেন। পরিবারের সদস্য, বিশেষ করে স্বামীর মাধ্যমে জীবনের কোনো না কোনো
সময়ে তারা যৌন, শারীরিক, অর্থনৈতিক, মানসিক নির্যাতনের শিকার হচ্ছেন।
তবে
সামাজিক মর্যাদা ও পুনরায় নির্যাতনের ভয়ে মুখ খোলেন না নির্যাতিত এসব নারী।
নির্যাতনের ঘটনাকে এখনও পরিবারের বিষয় হিসেবে মনে করেন তারা। বিশ্বের
বৃহত্তম বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থা ব্র্যাকের ২০১৭ সালের নারী নির্যাতন
সংক্রান্ত এক প্রতিবেদনে এসব তথ্য বলা হয়েছে। দেশের ৫৬টি জেলার ১২ হাজারেরও
বেশি কমিউনিটি ভিত্তিক নারী সংগঠন 'পল্লী সমাজ' এবং ব্র্যাকের অন্যান্য
কর্মসূচির প্রতিনিধিদের থেকে এসব তথ্য সংগ্রহ করা হয়েছে। ৮ মার্চ বিশ্ব
নারী দিবসের আগে ব্র্যাক আনুষ্ঠানিকভাবে প্রতিবেদনটি প্রকাশ করবে।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, নির্যাতনের শিকার নারীদের মধ্যে ৮২ শতাংশ বিবাহিত,
১৭ শতাংশ অবিবাহিত, অন্যান্য ১ শতাংশ। বিবাহিত নারীরা সবচেয়ে বেশি শারীরিক
নির্যাতনের শিকার হয়েছেন এবং এই নির্যাতনগুলো পরিবারের সদস্য বিশেষ করে
স্বামীর দ্বারা বেশি ঘটেছে। এক থেকে ৩৫ বছর বয়সী নারীরা বেশি নির্যাতনের
শিকার হয়েছেন। বয়সভিত্তিক নির্যাতনের ধরন বিশ্নেষণে দেখা যায়, ১৮ বছরের
নিচে মেয়ে শিশুরা যে নির্যাতনের শিকার বেশি হয় তাহলো ধর্ষণ (ধর্ষণের ঘটনা
৬৯ শতাংশ)। নথিভুক্ত ঘটনাগুলোর বয়সভিত্তিক বিশ্নেষণে আরও দেখা যায়, এক
বছরের কম বয়সী থেকে ৫ বছর বয়সী ৪৭ জন, ৬ থেকে ১০ বছর ১৩১ জন, ১১ থেকে ১৭
বছর ৩৮২ জন ধর্ষণের শিকার হয়েছেন।
অর্থাৎ ধর্ষণের ঘটনায় প্রাপ্তবয়স্কদের
চেয়ে শিশুর সংখ্যা দ্বিগুণেরও বেশি। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ১৮ বছরের নিচে
প্রতি দুই দিনে ৩টি শিশু ধর্ষণের শিকার হয়েছে যা খুবই আশঙ্কাজনক।
নির্যাতনের ঘটনাগুলোর বিশ্নেষণে দেখা যায়, যৌতুকের দাবিতেই মূলত বিরাট
সংখ্যক নারী নির্যাতনের ঘটনা ঘটছে। ২০১৭ সালে সংঘটিত নির্যাতনের ঘটনার
মধ্যে দেখা যায়, ৩২% ঘটনাই ঘটেছে যৌতুকজনিত কারণে। পারিবারিক সংঘাতজনিত
কারণে ২৪% নির্যাতন হয়েছে। এ ছাড়া বিবাহবহির্ভূত সম্পর্কের কারণে ৮%, যৌন
উদ্দেশ্যে ৬%, যৌন ইচ্ছা চরিতার্থ করার ক্ষেত্রে বাধা প্রদানের কারণে ৮%,
অনিয়ন্ত্রিত ক্রোধজনিত ৪%, সম্পত্তির সংঘাতজনিত ৫%, মাদকাসক্তিজনিত ২%,
দারিদ্র্যজনিত প্রেক্ষাপট ১%, এবং অন্যান্য ১০%। পুরুষের বহুবিবাহ ও
বিবাহবহির্ভূত সম্পর্কও বিশেষ করে স্ত্রীর ওপর ভয়াবহ ধরনের নারী নির্যাতনের
প্রেক্ষাপট তৈরি করে দিচ্ছে। নথিভুক্ত নির্যাতনের ঘটনা বিশ্নেষণে দেখা
গেছে, নারীদের মধ্যে অর্থনৈতিক দিক দিয়ে পিছিয়ে পড়া অর্থাৎ দরিদ্র নারীরাই
(৬৬%) সবচেয়ে বেশি নির্যাতনের শিকার হয়েছেন। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে,
গণধর্ষণের ঘটনা ২০১৬ সালের চেয়ে ২০১৭ সালে বেশি নথিভুক্ত হয়েছে। ২০১৭ সালে
দেশে ১০২ জন নারী ও শিশু গণধর্ষণের শিকার হয়েছেন। এর মধ্যে ৩ বছর বয়সের কম
বয়সী একটি শিশুও রয়েছে। শিশুরা বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই নিকটাত্মীয় বা আশপাশের
পরিচিত মানুষ দ্বারাই যৌন নির্যাতনের শিকার হচ্ছে। বয়সভিত্তিক বিশ্নেষণে
আরও দেখা যায়, ২০ থেকে ৩০ বছর বয়সী নারীদের ক্ষেত্রে শারীরিক নির্যাতনের
ঘটনা বেশি ঘটেছে। ব্র্যাকের পর্যবেক্ষণে দেখা যায়, নির্যাতনের শিকার নারীরা
পারিবারিক, সামাজিক ও আইনগত নানা জটিলতার কারণে সহজে আইনগত পদক্ষেপ গ্রহণ
করতে চান না। ব্র্যাকের সামাজিক ক্ষমতায়ন, সমন্বিত উন্নয়ন ও জেন্ডার
জাস্টিস অ্যান্ড ডাইভারসিটি কর্মসূচির পরিচালক আন্না মিন্জ সমকালকে বলেন,
ব্র্যাক সামাজিক ক্ষমতায়ন কর্মসূচি ২০১৭ সালে মোট ১০ হাজার ৫৯৬টি নারী
নির্যাতনের ঘটনা নথিভুক্ত করেছে; যার অধিকাংশই পারিবারিক নির্যাতনের ঘটনা।
দেশে পারিবারিক নির্যাতন রোধে সুনির্দিষ্ট আইন থাকলেও আইনের ব্যবহার না
থাকা এবং সাধারণ মানুষের অজ্ঞতার কারণেই পারিবারিক নির্যাতনের মাত্রা দিন
দিন বাড়ছে। নারীর ওপর নির্যাতনের ফলে নির্যাতনের শিকার নারী যেমন
ক্ষতিগ্রস্ত হন তেমনি ক্ষতিগ্রস্ত হন পরিবারের অন্য সদস্যরাও।
আর এর
ক্ষতিকর প্রভাব পড়ে পুরো সমাজের ওপর। তিনি বলেন, এক জরিপে দেখা গেছে, নারী
নির্যাতনের কারণে বছরে দেশের মোট জিডিপির ২.১৩ শতাংশ ক্ষতি হচ্ছে। এ
অবস্থায় পারিবারিক নির্যাতনের সঙ্গে জড়িত মানুষগুলোকে নির্যাতনের ক্ষতিকর
দিকগুলো বোঝাতে হবে এবং এ বিষয়ে আইনে যে শাস্তির বিধান আছে সে সম্পর্কে
সচেতনতা সৃষ্টি করে তা জানিয়ে তাদের এ ধরনের আচরণ থেকে বিরত রাখতে হবে।
নির্যাতনের শিকার নারীকে এ বিষয়ক আইন সম্পর্কে জানার সুযোগ সৃষ্টি করে দিতে
হবে। নারী নির্যাতনকারীর অধিকাংশই যেহেতু পুরুষ তাই নারী নির্যাতনবিরোধী
সরকারি-বেসরকারি সব কর্মকাণ্ডে পুরুষদের সম্পৃক্ত করতে হবে। তত্ত্বাবধায়ক
সরকারের সাবেক উপদেষ্টা অ্যাডভোকেট সুলতানা কামাল সমকালকে বলেন, নারী
নির্যাতন বন্ধে দেশে অনেক কঠোর আইন করা হয়েছে। আইনে মৃত্যুদণ্ডের বিধান
পর্যন্ত রয়েছে। তবে আইন থাকলেই তো সব হয় না। আইন তো নিজে নিজে কার্যকর হয়
না। আইনকে কার্যকর করতে হয়। আইনের ব্যবস্থাপনায় দুর্বলতা রয়েছে। নির্যাতন
কমাতে পুরুষতান্ত্রিক মানসিকতা পরিবর্তন না হলে নির্যাতন বন্ধ হবে না। কারণ
পরিবার মনে করে, নারী নির্যাতন বলে কিছু নেই। এ সংক্রান্ত মামলার রায়ে দশ
শতাংশের সাজা হয় না। মামলার তদন্তেও নানা অবহেলা থাকে। তিনি আরও বলেন, এখন
নারী সচেতন হয়েছেন, প্রতিবাদী হয়েছেন। একই কর্মক্ষেত্রে নারী বেশি সাফল্য
দেখাচ্ছেন। ফলে পুরুষরা এখন নারীকে প্রতিপক্ষ ভাবছেন। এটা চ্যালেঞ্জ হিসেবে
দাঁড়িয়েছে। এ ক্ষেত্রে রাষ্ট্র নারীর পাশে না থাকলে নারী আরও অবহেলা ও
নির্যাতনের শিকার হবেন।
No comments:
Post a Comment