
ঠিক
দুপুর বেলা। বাড়ির আঙিনায় চেয়ারে বসিয়ে আপন মমতায় অসুস্থ জয়কে গোসল করিয়ে
দিচ্ছিলেন মা। সংবাদকর্মীদের গাড়ি গিয়ে থামল সেখানে। সংবাদকর্মীদের দেখে
ছেলের মাথায় হাত রেখে কেঁদে উঠলেন মা। বললেন, দীর্ঘ পাঁচ বছর ধরে অসুস্থ জয়
হাঁটতে না পারায় এভাবেই প্রতিদিন তাকে চেয়ারে বসিয়ে গোসল দিতে হয়। জয়ের
চিকিৎসা করাতে এনজিও থেকে ঋণ নিয়ে ছিল পরিবারটি। এখন ঋণের বেড়াজালে বন্দ
হয়ে পড়েছে সেই সন্তানের চিকিৎসা। ঘটনাটি ময়মনসিংহের ঈশ্বরগঞ্জ উপজেলার
বড়হিত ইউনিয়নের বীরপাঁচাশি গ্রামের। নয়া দিগন্ত সংবাদদাতার সাথে কথা হয়
অসুস্থ জয়ের মা লক্ষী রাণীর সাথে। তিনি জানান, জয় এখন হাটতে পারেন না। তার
জন্যে বড় কঠিন কাজ হচ্ছে প্রাকৃতিক কাজে সাড়া দেয়া। ২০০৪ সালের দিকে খেলতে
গিয়ে বা পায়ের উরুতে চোট লাগে জয়ের। জয় তখন ৫ম শ্রেণির শিক্ষার্থী। ওই সময়
এলাকার ডাক্তারের কাছ থেকে ওষুধ এনে খেলে ভালো হয়ে যায়। কিন্তু কিছুদিন পর
উরুতে আবার ব্যাথা দেখা দেয়। জয়কে নিয়ে যাওয়া হয় ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ
হাসপাতালে সেখানে বিভিন্ন পরীক্ষা-নিরীক্ষার পর চিকিৎসক বলেন খুব শিগগিরই
তার হাঁটুতে অপারেশন করতে হবে। দরিদ্র পরিবার ধার-দেনা করে চিকিৎসার টাকা
যোগায়। করা হয় অপারেশন। অপারেশনের পর কয়েক মাস ভালো থাকার পর আবার পা ফুলে
যায়। এমন করে এ পর্যন্ত একই স্থানে পাঁচ বার অপারেশন করা হয়েছে। এখনো সুস্থ
হতে পারেনি জয়। এমন অসুস্থতা নিয়েও লেখা পড়া চালিয়ে যাচ্ছে জয়। জয়
বর্তমানে ঈশ্বরগঞ্জ ডিএস কামিল মাদ্রাসায় কারিগড়ি শাখার নবম শ্রেণির
ইলেক্ট্রিক্যাল ট্রেডের ছাত্র। জয় ময়মনসিংহের চুরখাইয়ে অবস্থিত কমিউনিটি
বেজড মেডিকেল কলেজ বাংলাদেশ-এর অর্থোপেডিক সার্জারি বিভাগের চিকিৎসক মো:
সাইফুল ইসলামের অধীনে চিকিৎসা নিচ্ছে। ডাক্তার বলছেন, পা’টা কেটে ফেলা হতে
পারে। এমতাবস্থায় তার চিকিৎসার জন্যে লক্ষাধিক টাকার প্রয়োজন। দেড় শতক
জমিতে একটি ঘর ছাড়া জয়ের বাবা লিটনের আর কোনো সম্বল নেই। জয়কে চিকিৎসা
করাতে গিয়ে কয়েক লাখ টাকার ঋণে পড়তে হয়েছে হতদরিদ্র অটোবাইক চালক বাবা
লিটনের। তিনি আরো জানান, সন্তানকে চিকিৎসা করাতে এনজিও থেকে ঋণ নিয়েছিলেন।
এখন ঋণের বেড়াজালে বন্দি হয়ে পড়েছে সেই সন্তানের চিকিৎসা। অসুস্থ ছেলেকে
দেয়া এলাকাবাসীর অল্প কিছু চিকিৎসা সহায়তাও চলে যাচ্ছে ঋণের কিস্তিতে। গত
শনিবার আশা’র স্থানীয় ব্রাঞ্চের মাঠকর্মী এসে কিস্তির টাকার জন্যে চাপ দিলে
তাকে কিস্তির টাকা পরিশোধ করতে বাধ্য হয় জয়ের বাব লিটন সাহা।
তিনি জানান,
ছেলের চিকিৎসা করাতে বাধ্য হয়ে প্রথমে পপি’র থেকে ঋণ নেন। পরে তাদের
কিস্তির চাপে পড়ে একে একে ঋণ তুলেন গ্রামীণ ব্যাংক, ব্র্যাক ও আশা থেকে।
ব্র্যাক থেকে ২৫ হাজার, গ্রামীণ থেকে ২০ হাজার, আশা থেকে ৪০ হাজার ও পপি
থেকে ৩০ হাজার টাকার ঋণ নেন। এভাবে ঋণের বেড়াজালে আটকে পরে জয়ের পরিবার।
এখন ঋণের বেড়াজালে পড়ে জয়ের চিকিৎসা অনিশ্চয়তায় পড়ে গেছে। এ বিষয়ে
ঈশ্বরগঞ্জ থিয়েটারের সভাপতি ও মানবাধিকার কর্মী আবুল কাশেম জানান,
দারিদ্র্যের চক্র থেকে বেরিয়ে আসার জন্য স্বাবলম্বী হতে অনেক মানুষ স্থানীয়
এনজিওগুলো থেকে ঋণ নেয়। কিন্তু দেখা যায়, স্বাবলম্বী হওয়ার বদলে ঋণের
কিস্তির টাকা পরিশোধ করতে তারা হিমশিম খাচ্ছে। এমনও দেখা গেছে, একটি এনজিওর
ঋণের কিস্তি পরিশোধ করতে গিয়ে আরেকটি এনজিওর নতুন ঋণের জালে জড়িয়ে পড়ছে।
সেই ঋণের বেড়াজাল থেকে তাদের আর বেরিয়ে আসা হয় না। এনজিওগুলোর কিস্তি
পরিশোধের ক্রমাগত তাগিদের কারণে অনেকে বাধ্য হয়ে ঘরের টিনের চাল, ঘরবাড়ি,
এমনকি ভিটেমাটি পর্যন্ত বিক্রি করতে বাধ্য হচ্ছে। অনেকে ঋণ পরিশোধ না করতে
পেরে ভয়ে বাড়ি ছেড়ে পালিয়ে যাচ্ছে। এনজিওগুলো যেন গরিবের রক্ত শোষণের
যন্ত্রে পরিণত হয়েছে। ঋণ দেয়ার ক্ষেত্রে অনেক এনজিও সঠিক নিয়মকানুন অনুসরণ
করে না বলে অভিযোগ রয়েছে। এমনও দেখা গেছে, কাগজে-কলমে ১০ শতাংশ সুদের কথা
বলা হলেও এনজিওগুলো ৩০ থেকে ৪০ শতাংশ পর্যন্ত সুদ নিচ্ছে। দরিদ্র মানুষ আরও
দরিদ্র হচ্ছে। এ বিষয়ে আশার ঈশ্বরগঞ্জ ব্রাঞ্চ ম্যানেজার ময়েজ উদ্দিন
জানান, আশার সদস্যদের মধ্যে যাদের ৪ বছর বয়স হয়েছে তাদের বেলায় ৫০%, যাদের
বয়স ৬ বছর তাদের, ৭৫% ও যাদের বয়স ৮ বছর হয়েছে তাদের ১০০% চিকিৎসা ভাতার
বিধান রয়েছে। তাও সংশ্লিষ্ট সদস্য কিংবা তার স্বামী এই চিকিৎসা ভাতা পাবেন।
সন্তনদের বেলায় এটা প্রযোজ্য নয়।
No comments:
Post a Comment