Saturday, April 12, 2014

চট্টগ্রাম থেকে নিয়ন্ত্রিত হচ্ছে চোরাই সোনার বাজার, নেপথ্যে ৮ চক্র by মহিউদ্দীন জুয়েল

সারা দেশে চোরাই পথে আসা বেশির ভাগ সোনা আসছে দুবাই থেকে। দুবাইয়ের সঙ্গে বাংলাদেশের একটি শক্তিশালী সিন্ডিকেট এসব সোনা প্রশাসনকে ম্যানেজ করে নিয়ে আসছে প্রতিদিন। তবে এসব হোতাদের নাম-ঠিকানা-পরিচয় বেরিয়ে আসার পরও ফাঁক গলে বেরিয়ে যাচ্ছে তারা।

গত ৬ মাসে চট্টগ্রামের শাহ আমানত বিমানবন্দরে ধরা পড়েছে স্বর্ণের ৪০টি বড় চালান। এসব চালান পাচার করতে গিয়ে ধরা পড়েছেন অনেক ব্যক্তি। যাদেরকে জিজ্ঞাসাবাদ করার পর জানা গেছে তাদের আদ্যোপান্ত। এদের বেশির ভাগই রাজনৈতিক ছত্রছায়ায় চার্জশিট থেকে তাদের নাম বাদ দিচ্ছেন। কেউবা চট্টগ্রাম, ঢাকাসহ বিভিন্ন স্বর্ণের দোকানের মালিক।
স্বর্ণের চালান আটক করেছে এমন কয়েকজন গোয়েন্দা কর্মকর্তা জানান, মূলত চট্টগ্রাম থেকে সারা দেশের চোরাই বাজার নিয়ন্ত্রিত হচ্ছে। এই কাজে বন্দর নগরীতে রয়েছে ৭/৮টি চক্র।
গত ২৪শে মার্চ শাহ আমানতের একটি ফ্লাইটে প্রথমে ১০টি সোনার বার পাওয়া যায় সিটের নিচে। এরপর সেখান থেকে গোয়েন্দা কর্মকর্তাদের সন্দেহ হয়। সিদ্ধান্ত হয় পুরো বিমানে চালানো হবে তল্লাশি। অভিযান চালাতে গিয়ে একে একে বিমানের বিভিন্ন জায়গা থেকে পাওয়া যাচ্ছিলো সব সোনার বার। পরে গুণে দেখা যায় মোট ৯২৩টি সোনা। ওজন ১০৭ কেজি। বাজার দাম ৪৫ কোটি টাকা!
চট্টগ্রাম শাহ আমানত আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে ধরা পড়া এটিই স্মরণকালের সবচেয়ে বড় সোনার চালান। সেদিন সকালে দুবাই থেকে আসা বাংলাদেশ বিমানের বিজি-০২৬ ফ্লাইটে তল্লাশি চালিয়ে স্বর্ণগুলো উদ্ধার করা হয়। এই ঘটনায় জড়িত থাকার দায়ে ৭ জনকে আটক করা হয়েছে। পরে পুলিশের জিজ্ঞাসাবাদে তারা জানায়, সোনাগুলো চট্টগ্রাম থেকে ঢাকা নিয়ে যাওয়ার পরিকল্পনা ছিলো। সকাল ১১টা ১০ মিনিটে বিমানটি চট্টগ্রাম শাহ আমানত বিমানবন্দরে অবতরণ করে।
এই সময় গোপন সংবাদের ভিত্তিতে শুল্ক, গোয়েন্দা ও কাস্টমস কর্মকর্তারা বিমানটি ঘিরে ফেলেন। এরপর তারা বিমানে উঠে তল্লাশি শুরু করেন। বিমানের অভ্যন্তরে যাত্রীদের ব্যাগ, সিট ও টয়লেটে তল্লাশি চালিয়ে ৯২৩টি সোনার বার পাওয়া যায়। এরপরই বিমান থেকে সন্দেহভাজন ৭ যাত্রীকে নামিয়ে আটক করা হয়। এরা হলো- হাটহাজারী উপজেলার কাটিরহাট এলাকার বাসিন্দা মো. ইয়াকুব, রাউজান পূর্বগুজরা এলাকার মহিন উদ্দিন, রাউজান উত্তর গুজরা এলাকার নাহিদ তালুকদার, ফটিকছড়ি শাহনগর এলাকার ইমতিয়াজ খান, ফটিকছড়ি রায়পুর এলাকার  পেয়ারুল ইসলাম, মুন্সীগঞ্জ জেলার হালদা এলাকার মনসুর ইসলাম ও ময়মনসিংহ জেলার নান্দাইল থানার কুমারু এলাকার শফিক ইসলাম।
এই বিষয়ে কথা হয় চট্টগ্রাম বিমানবন্দরে নিয়োজিত কাস্টম হাউসের সহকারী কমিশনার মশিউর রহমান মণ্ডলের সঙ্গে। তিনি মানবজমিনকে বলেন, ‘ঘটনা সত্যি। এটি এখন পর্যন্ত স্মরণকালের বড় চালান।’
চট্টগ্রাম বিমানবন্দরের একটি সূত্র জানায়, গত কয়েক মাসে সেখানে সোনা পাওয়া যাচ্ছে বিমানের ভেতর। সিটের কুশনের নিচে। বাথরুমের ওপর। সিটের ফাঁকফোকরে। ব্যাগভর্তি কোটি টাকার সোনা ফেলে সটকে পড়ছে পাচারকারীরা। চট্টগ্রাম শাহ আমানত বিমানবন্দর দিয়ে সোনা পাচার করতে গিয়ে এমনি চিত্র ধরা পড়েছে গোয়েন্দা কর্মকর্তাদের কাছে। ৭ মাসে এখানে ধরা পড়ছে ৮০ কোটি টাকার সোনা। ধরা পড়ছে একের পর এক স্বর্ণের চালান। কোথা  থেকে আসছে এতো সোনা, কারা আনছেন কিংবা কিভাবে পাচার করা হচ্ছে- এসব বিষয়ে জনমনে উঠেছে নানা প্রশ্ন।
সর্বশেষ ৪০টিরও বেশি বড় স্বর্ণের চালান আটক হওয়ার পর পাওয়া গেছে চাঞ্চল্যকর এসব তথ্য। গত এক সপ্তাহের ব্যবধানে বেশ কয়েকটি বড় ঘটনা ফাঁস হয়ে যাওয়ার পর এ নিয়ে নড়েচড়ে বসেছেন বিমানবন্দর কর্তৃপক্ষ। ধারণা করা হচ্ছে,  চোরাকারবারিরা প্রতিদিনই কৌশলে দেশের বাইরে  থেকে কোটি টাকার সোনা বয়ে নিয়ে আসছেন। যা সহজে চোখ এড়িয়ে যাচ্ছে গোয়েন্দা কর্মকর্তাদের।
সম্প্রতি রাতে আমিরাত থেকে আসা একটি উড়োজাহাজে পাওয়া গেছে ৪৮ কেজি সোনা। যার বর্তমান বাজারমূল্য ১৭ কোটি টাকার বেশি। ওইদিন রাত সাড়ে ৮টায় দুবাই ফ্লাইটের সিটের নিচের কুশনের ভেতরে সোনার বারগুলো লুকানো ছিল।
এর আগে গত বছরের ৪ঠা আগস্ট দুবাই থেকে ফ্লাই দুবাই নামে একটি বিমানে করে আসা রাশেদুল ও ইকবাল নামের দু’জন যাত্রীর শরীর তল্লাশি করে ৫৩০  তোলা ওজনের ৫৩টি স্বর্ণবার উদ্ধার করা হয়।
প্রায় ৬ কেজি ১৮৩ গ্রাম স্বর্ণ রয়েছে এসব বারে। যার আনুমানিক বাজারমূল্য ২ কোটি ৫০ লাখ টাকা। গত ১লা সেপ্টেম্বর চারটি সোনার বার ও ৪১০ গ্রাম ওজনের ৬৯টি চেইনসহ একজনকে আটক করে কাস্টমস কর্তৃপক্ষ।
১লা অক্টোবর চট্টগ্রামের শাহ আমানত বিমানবন্দরে  দোহা থেকে আসা বাংলাদেশ বিমানের একটি ফ্লাইট  থেকে ১৪টি সোনার বার উদ্ধার হয়। ২২শে অক্টোবর অপর এক যাত্রীর লাগেজ তল্লাশি করে চার কেজি ওজনের ৪১টি বার উদ্ধার করা হয়।
গত ১৮ই নভেম্বর দুবাই থেকে আসা বাংলাদেশ বিমানের একটি ফ্লাইট (বিজি-০৪৮) যোগে আসা এক যাত্রীর লাগেজ তল্লাশি করে ফটিকছড়ির খায়রুল বশর নামের এক যাত্রীর ব্যাগের ভিতর থেকে ১২৮টি বার উদ্ধার করা হয়। উদ্ধারকৃত স্বর্ণের ওজন ১৫ কেজি বা এক হাজার ২৮০ তোলা। দাম ৬ কোটি ৫০ লাখ টাকা। গত ৩ মাস আগে ১১ই ডিসেম্বর দুবাই থেকে আসা বিমানের টয়লেট থেকে পাওয়া যায় বিপুল  সোনা। যার মূল্য ৮ কোটি টাকা। এগুলোর ওজন ছিল ১৭ কেজি। ফ্লাইটের টয়লেটে পরিত্যক্ত অবস্থায় স্বর্ণগুলো পাওয়া যায়। তবে যাত্রীদের মধ্যে কে বা কারা স্বর্ণের বারগুলো বহন করে এনেছিল সেই সম্পর্কে নিশ্চিত হওয়া যায়নি।
এ স্বর্ণ বহনের সঙ্গে ফ্লাইটের কিংবা বাংলাদেশ বিমানের কেউ জড়িত কিনা তা-ও খতিয়ে দেখা হচ্ছে। ধারণা করা হয়, মধ্যপ্রাচ্যের দুবাই থেকে যাত্রী নিয়ে আসা বাংলাদেশ বিমানের ফ্লাইট বিজি-০৪৬ অবতরণ করলে পাচারকারীরা দ্রুত নেমে পড়ে।
এসময় টয়লেট থেকে পরিত্যক্ত অবস্থায় একটি ব্যাগ উদ্ধার করা হয়। পরে ব্যাগ খুলে থরে থরে সাজানো আনেকগুলো স্বর্ণের বার পাওয়া যায়। ব্যাগে সর্বমোট ১৩৮টি স্বর্ণের বার ছিল।
তারও আগে গত ২৫শে নভেম্বর দুবাই থেকে আসা বাংলাদেশ বিমানের বিজি-০২৬ ফ্লাইট থেকে প্রায় ৭  কেজি ওজনের ৬০টি স্বর্ণের বার উদ্ধার করা হয়েছিল।  কেবল নভেম্বর পর্যন্ত আটক করা হয় ১০টি চালান।
বিমানবন্দর কর্তৃপক্ষের একটি সূত্র জানান, চালান ধরার জন্য অত্যাধুনিক যন্ত্রপাতি না থাকায় নিরাপদ রুট হিসেবে চট্টগ্রাম বিমানবন্দরকে বেছে নিচ্ছে  চোরাকারবারিরা। আর্চওয়ে-মেটাল ডিটেক্টর না থাকা, স্ক্যানার মেশিন নষ্ট হওয়া, আন্তর্জাতিক রুটের সঙ্গে অভ্যন্তরীণ যাত্রীদের একই ফ্লাইটে পরিবহনসহ নানাবিধ সুযোগের কারণে সোনার চোরাচালান  বেড়েছে বলে ধারণা সকলের।
২০শে নভেম্বর বিমানযাত্রী জামাল উদ্দিনের ব্যাগ তল্লাশি করে ৭৫টি সোনার বার আটক করা হয়। যার ওজন প্রায় সাড়ে ৭ কেজি। আটক স্বর্ণের দাম প্রায় ৪  কোটি টাকা। গত ২১শে নভেম্বর ১০ তোলা ওজনের নয়টি স্বর্ণের বার উদ্ধার করা হয়। উদ্ধারকৃত প্রায় ১  কেজি ওজনের সোনার দাম প্রায় ৫০ লাখ টাকা।
চলতি সপ্তাহের গত ৪ঠা ফেব্রুয়ারি উদ্ধার করা হয় ৪৬ লাখ টাকার সোনা। এ ঘটনায় স্বর্ণের ১০টি বারসহ দুই বিমান যাত্রীকে আটক করা হয়। ওইদিন সকাল ১০টায় শুল্ক গোয়েন্দারা ও কাস্টমের সদস্যরা  যৌথভাবে তাদের আটক করেন। এদের মধ্যে রাশেদ নামের একজনের বাড়ি রাউজানে। অপরজন নুরুল আবসার ফটিকছড়ির বাসিন্দা। জিজ্ঞাসাবাদে তারা জানায়, বাংলাদেশ বিমানের ফ্লাইটে (বিজি-০২৮) চট্টগ্রাম পৌঁছার পর লাগেজ তল্লাশির সময় সোনার বারগুলো উদ্ধার করা হয়েছে। যার প্রতিটির ওজন ১০  তোলা করে। সংশ্লিষ্ট একটি সূত্র জানায়, স্বর্ণের  চোরাচালান অত্যধিক বেড়ে যাওয়ায় ৪ মাস আগে উদ্বেগ প্রকাশ করে কর্তৃপক্ষ। একপর্যায়ে এয়ারপোর্ট ম্যানেজারের পিএস মোমেন মুকছেদকে বদলি করা হয়।
নগরীর নিউ মার্কেট, রিয়াজুদ্দিন বাজার, আন্দরকিল্লার কয়েকজন সোনা ব্যবসায়ী জানান, মধ্যপ্রাচ্যের স্বর্ণ নিখাদ। বাংলাদেশে এনে এসব স্বর্ণে প্রতি ভরিতে তিন থেকে চার আনা পর্যন্ত খাদ মেশানো হয়। খাদ মিশিয়ে তা দেশের জুয়েলারিগুলোতে বিক্রি করা হচ্ছে।
ছোট্ট একটি চালান থেকে কমপক্ষে ২০-২৫ লাখ টাকা আয় করা সম্ভব। ইতিমধ্যে বিমানবন্দরের চারটি স্ক্যানারের মধ্যে দু’টি প্রায়ই বিকল থাকছে। ফলে  চেকিংয়ের কাজ বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। সর্বশেষ চলতি মাসের গত ২০শে মার্চ দেড় কোটি টাকার সোনার বার নিয়ে দ্রুত সটকে পড়তে চেয়েছিলো দুই পরিচ্ছন্ন কর্মী। ৩০টি বারের পুরো প্যাকেটটি জামার ভেতর ঢুকিয়ে হেঁটে যেতেই সন্দেহ হয় গোয়েন্দা পুলিশের। তারা ডাক দেয়। আর পুলিশের ডাক পেয়েই পালাতে গিয়ে ধরা পড়ে সোনার বার পাচারকারী পরিচ্ছন্নকর্মীরা। এই ঘটনায় আটক দুই পরিচ্ছন্নতাকর্মী জীবন কুমার ও শুকলালের বিরুদ্ধে থানায় মামলা হয়েছে। ঘটনার সত্যতা নিশ্চিত করেন বিমানবন্দরের নিরাপত্তা কর্মকর্তা নজরুল ইসলাম। তিনি মানবজমিনকে বলেন, ‘সেদিন সকাল ১১টার দিকে দুবাই থেকে বাংলাদেশ বিমানের একটি উড়োজাহাজ ফ্লাইট এসে থামলে তারা দুইজন কৌশলে যাত্রীদের সঙ্গে যোগাযোগ করে। এরপর তাদের কাছ থেকে  চোরাইমাল বুঝে নিয়ে পালাতে গিয়ে ধরা পড়ে। ওদের হাঁটা ছিলো সন্দেহজনক।’
তিনি আরো বলেন, ‘উদ্ধার হওয়া সোনার বারগুলোর ওজন প্রায় সাড়ে তিন কেজি। যার মূল্য দেড় কোটি টাকা।’

No comments:

Post a Comment