দেশের সরকারি চিনিকলগুলোতে এখনো চলতি
মৌসুমের চিনি উৎপাদিত হচ্ছে। কারখানার গুদামে পড়ে আছে আগের মৌসুমের চিনিও।
কিন্তু ডিলাররা এসব চিনি তুলছেন না, বাজারেও তা বিক্রি হচ্ছে না। সরকারি
চিনিকলে উৎপাদিত চিনির বিক্রয়মূল্য শিল্প মন্ত্রণালয় তিন বছরে চার দফায়
কমিয়েছে। তাতেও কাজ না হওয়ায় সম্প্রতি চিনি আমদানিতে শুল্কও বাড়িয়েছে
সরকার। কিন্তু কোনো পদক্ষেপেই সরকারি চিনির বিক্রি বাড়েনি। ফলে চিনি নিয়ে
বিপাকে পড়েছে বাংলাদেশ চিনি ও খাদ্য শিল্প করপোরেশন (বিএসএফআইসি)।

বিপাকে পড়েছেন চিনিকলগুলোতে কর্মরত ২০ হাজার শ্রমিক-কর্মচারী এবং পাঁচ লাখ আখচাষিও। শ্রমিকেরা পাচ্ছেন না নিয়মিত বেতন। আর করপোরেশনের কাছে চাষিদের পাওনা ২০০ কোটি টাকাও আটকে আছে।
এ বিষয়ে কথা বলতে একাধিকবার করপোরেশনের চেয়ারম্যান মাহমুদুল হক ভুইয়ার সঙ্গে মুঠোফোনে যোগাযোগের চেষ্টা করেও কথা বলা যায়নি। আর করপোরেশনের সচিব এ এস এম আবদার হোসেন এ বিষয়ে মন্তব্য করতে রাজি হননি।
বাংলাদেশ ট্যারিফ কমিশনের হিসাবে, দেশে বছরে চিনির চাহিদা ১৪ থেকে ১৫ লাখ টন। চট্টগ্রাম কাস্টমসের তথ্য অনুযায়ী, চলতি অর্থবছরে এখন পর্যন্ত দেশে ১৬ লাখ ৪৮ হাজার টন অপরিশোধিত চিনি আমদানি হয়েছে।
মজুত বাড়ছে, বিক্রি নেই: দেশের রাষ্ট্রমালিকানাধীন ১৫ চিনিকলে এ বছর ১৭ এপ্রিল পর্যন্ত চিনি মজুত আছে দুই লাখ ২১ হাজার ৮৫১ টন। এর মধ্যে চলতি ২০১৩-১৪ আখ মাড়াই মৌসুমে উৎপাদিত চিনির পরিমাণ এক লাখ ২৬ হাজার ৬২০ টন। বাকি চিনি আগের মৌসুমের। করপোরেশনের একটি সূত্র জানিয়েছে, মজুত থাকা চিনির বাজারমূল্য প্রায় এক হাজার ২০০ কোটি টাকা।
এত বিশাল মজুত চিনির মধ্যে চলতি অর্থবছরের সাড়ে নয় মাসে বিক্রি হয়েছে মাত্র ২৩ হাজার টন। এর ক্রেতা হলো সেনা ও নৌবাহিনী, পুলিশ এবং বিজিবি। এই সময়ে ডিলাররা কোনো চিনিই তোলেননি।
ডিলারদের দাবির পরিপ্রেক্ষিতে গত ৯ ফেব্রুয়ারি শিল্প মন্ত্রণালয় চিনির দাম কমিয়ে প্রতি কেজি ৪০ টাকা নির্ধারণ করে। কিন্তু এতেও ডিলাররা চিনি তোলেননি। তাঁদের অভিযোগ, সরকার চিনির দাম কমানোর পরই বেসরকারি মিল মালিকেরা তাঁদের চিনির দাম আরও কমান। ফলে চিনি তুললে লোকসান গুনতে হতো তাঁদের।
শিল্প মন্ত্রণালয়ের প্রস্তাবের পরিপ্রেক্ষিতে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) ৬ এপ্রিল পরিশোধিত ও অপরিশোধিত চিনি আমদানিতে শুল্ক বাড়িয়ে প্রজ্ঞাপন জারি করে। প্রতি টন অপরিশোধিত চিনি আমদানিতে অতিরিক্ত ৫০০ টাকা শুল্ক নির্ধারণ করা হয়। কিন্তু এতেও বেসরকারি মিল মালিকদের চিনির দাম বাড়েনি, বরং আরও কমে গেছে। বর্তমানে ঢাকার পাইকারি বাজারে প্রতি কেজি ৩৮ টাকা ৭০ পয়সা এবং চট্টগ্রামে ৩৯ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। প্রতি কেজিতে ৫০ পয়সার মতো কমেছে।
করপোরেশন সূত্র বলছে, শুল্ক বাড়ানোর পর থেকে ১৭ এপ্রিল পর্যন্ত করপোরেশনের মাত্র এক হাজার ১০০ টন চিনি বিক্রি হয়েছে।
জানতে চাইলে বাংলাদেশ চিনি ডিলার অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, ‘৪০ টাকা দর বেঁধে দিয়েছে। যাতায়াত ও মুনাফা দুই টাকা রেখে আমাদের তা বিক্রি করার কথা। কিন্তু বাজারে চিনির পাইকারি দর ৩৮ টাকা। তাহলে আমরা কীভাবে এই চিনিটা বিক্রি করব? আমরা চার হাজার ডিলার তিন বছর ধরে এ অবস্থায় আছি। জামানত হিসেবে চিনি করপোরেশনে আমাদের ৪০ কোটি টাকা পড়ে আছে। ওই টাকাটা ব্যাংকে রাখলেও তো কিছু সুদ পেতাম।’
করপোরেশনের একাধিক কর্মকর্তা বলেন, বর্তমানে যে অবস্থা চলছে তাতে করপোরেশনকে লাভজনক করার কোনো সুযোগ নেই। সরকারকে হয় ভর্তুকি দিয়ে একে চালাতে হবে, নইলে চিনি আমদানিতে উচ্চ হারে শুল্ক আরোপসহ বেশ কিছু কঠোর পদক্ষেপ নিতে হবে।
চার দফা কমেছে বিক্রয়মূল্য: করপোরেশন সূত্র বলছে, ২০১১ সালের সেপ্টেম্বর থেকে এ পর্যন্ত চিনির বিক্রয়মূল্য চার দফায় কমানো হয়েছে। দাম কমালে চিনি বিক্রি হবে—এমন পর্যবেক্ষণ থেকে দাম কমানো হলেও কোনো ফল হয়নি।
২০১১ সালের ২৬ সেপ্টেম্বর সরকারি চিনির দাম নির্ধারণ করা হয় ৬০ টাকা কেজি। সে বছরই আরেক দফা চিনির দাম কমিয়ে ৫৫ টাকা করা হয়। পরের বছর ১৯ জুলাই সরকার চিনির দাম নির্ধারণ করে ৫০ টাকা। সর্বশেষ এ বছর নির্ধারণ করা হয় ৪০ টাকা।
করপোরেশন সূত্র বলছে, চলতি মৌসুমে প্রতি কেজি চিনি উৎপাদনে খরচ পড়েছে ৭৭ টাকা। কিন্তু বিক্রয়মূল্য নির্ধারণ করা হয়েছে ৪০ টাকা। করপোরেশনের একজন কর্মকর্তা বলেন, এতে এক কেজি চিনিতে ৩৭ টাকা লোকসান গুণতে হবে। কিন্তু চিনি বিক্রি না হওয়ায় পুরোটাই এখন লোকসান হচ্ছে।
আবার গত বছর আখের মূল্য বাড়ানো হয়। এতে চিনিকলগুলোতে এক টন আখ সরবরাহ করে আড়াই হাজার টাকা পান চাষিরা, যা এর আগে ছিল দুই হাজার ২২৩ টাকা। আবার সরকার দফায় দফায় বিদ্যুৎ, ডিজেলসহ অন্যান্য জ্বালানির দাম বাড়িয়েছে। প্রতিবছরই বাড়ছে কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতনও। এসব কিছুই উৎপাদন ব্যয় বাড়িয়ে দিচ্ছে বলে করপোরেশনের কর্মকর্তারা জানান।
মজুত
সরকারি ১৫ চিনিকলে ২ লাখ ২১ হাজার টন
বিক্রি
সাড়ে ৯ মাসে ২৩ হাজার টন
কারণ
বাজারে চিনির দাম কম হওয়ায় ডিলাররা সরকারি চিনি তুলছেন না
চিনিকলগুলোতে কর্মরত ২০ হাজার শ্রমিক-কর্মচারীর বেতন অনিয়মিত হয়ে পড়েছে
পাঁচ লাখ আখচাষির পাওনা ২০০ কোটি টাকা আটকে আছে
ব্যবসা করে নিচ্ছে বেসরকারি চিনিকলগুলো
No comments:
Post a Comment