Monday, May 19, 2014

১৮ বছর পর লাল-সাদার উৎসব

দীর্ঘ প্রতীক্ষার অবসান। ১৮ বছর পর শিরোপা। প্রথম নয়, দশম। তবুও এর স্বাদ অবশ্যই ভিন্ন। নতুন প্রজন্মের কাছে এ এক আলাদা উচ্ছ্বাস। ১৯৯৬-এর তরুণরা এখন প্রৌঢ়। এখনকার তরুণ অ্যাটলেটিকো-সমর্থকদের কাছে গত দশকটি ছিল কেবলই হতাশার। এখন গর্বের নতুন উপলক্ষ্য তৈরি হলো তাদের। গত শনিবার রাত উৎসবের নগরীতে পরিণত হয়েছিল মাদ্রিদ। রেফারির শেষ বাঁশি বাজানোর পর মাদ্রিদের রাস্তায় নামে মানুষের ঢল।
রিয়াল মাদ্রিদ আর বার্সেলোনা ভিন্ন কোন লা লীগার শিরোপা জিতলো ৯ বছর পর। সর্বশেষ ২০০৩-২০০৪ মওসুমে শিরোপা জিতে আলোচনায় এসেছিল ভ্যালেন্সিয়া। ১৯৯৫-৯৬ মওসুমে শেষবার চ্যাম্পিয়ন হয়েছিল অ্যাটলেটিকো। সেবার ভিসেন্তে কালদেরনের ক্লাবটিতে খেলা দিয়েগো সিমিওনিই এখন কোচ হিসেবে দলকে শিরোপা জেতালেন। এবার রিয়াল মাদ্রিদকে হারিয়ে চ্যাম্পিয়ন্স লীগের শিরোপা জেতার অপেক্ষায় সিমিওনি। ১৯৫১ সালের পর লা লিগায় এই প্রথম শেষ ম্যাচে মুখোমুখি দুই দলের খেলায় শিরোপা নির্ধারণ হলো। সেবার সেভিয়ার সঙ্গে লড়াইয়ে শিরোপা জিতেছিল অ্যাটলেটিকোই। এবারও বার্সেলোনাকে পেছনে ফেলে শিরোপা নিজেদের করে নিলো সিমিওনির শিষ্যরা। ৩৮ ম্যাচে ৯০ পয়েন্ট পাওয়া অ্যাটলেটিকোর চেয়ে ৩ পয়েন্ট করে কম পেয়েছে গত দশকের দুই চ্যাম্পিয়ন বার্সেলোনা ও রিয়াল মাদ্রিদ। তবে গোল পার্থক্যে রিয়াল মাদ্রিদকে ছাড়িয়ে রানার্সআপ বার্সেলোনাই। ২০০৭-০৮ মওসুমের পর এই প্রথম ট্রফিশূন্য মওসুম শেষ করলো দলটি। এই মওসুমে ছয়বারের মোকাবিলায় একবারও অ্যাটলেটিকোকে হারাতে পারেনি বার্সেলোনা। বরং একবার তারা হেরেছে চ্যাম্পিয়ন্স লীগের সেমিফাইনালে।
শনিবার এক পয়েন্টের খেলার শুরুতেই বড় দুটি ধাক্কা খান সিমিওনি। পায়ের পেশীর চোট কাটিয়ে এই ম্যাচে দলে ফিরেছিলেন দলটির মূল ভরসা দিয়েগো কস্তা। কিন্তু ১৪ মিনিট খেলা হওয়ার পরই তাকে তুলে নিতে বাধ্য হন কোচ দিয়েগো সিমিওনি। আর ২৩তম মিনিটে আঘাত পেয়ে মাঠ ছাড়েন মিডফিল্ডার আরদা তুরানও। ফলে রক্ষণাত্মক খেলা শুরু করে অ্যাটলেটিকো। সুযোগ কাজে লাগিয়ে ৩৪তম মিনিটে চিলিয়ান স্ট্রাইকার আলেক্সিস সানচেজের অসাধারণ এক গোলে এগিয়ে যায় বর্তমান চ্যাম্পিয়নরা। সেস ফাব্রিগাসের উঁচু পাস ডি বক্সের মাঝে বুক দিয়ে নামিয়েছিলেন লিওনেল মেসি। আর তা থেকে বল পেয়ে কাছে দাঁড়ানো সানচেজ কাউকে কিছু বোঝার আগেই দুর্দান্ত এক শটে  গোলপোস্টের উপরের ডান কোনা দিয়ে লক্ষ্যভেদ করেন। ঘুরে দাঁড়াবার মন্ত্রে উজ্জীবিত অ্যাটলেটিকো দ্বিতীয়ার্ধের শুরুতেই আক্রমণে যায়। ডানপ্রান্ত থেকে কোকের কর্নারে জোরালো হেডে গোল করেন ডিফেন্ডার দিয়েগো গদিন। ১-১ সমতার পর আবারো রক্ষণভাগ সামলাতে জোর দেয় অ্যাটলেটিকো। ফলে আক্রমণে প্রভাব বিস্তার করতে শুরু করে স্বাগতিকরা। ৬২তম মিনিটে আক্রমণের ধার বাড়াতে কোচ জেরার্দো মার্তিনো অনুজ্জ্বল পেদ্রোর বদলি হিসেবে মাঠে নামান চোট কাটিয়ে ফেরা ব্রাজিলের তারকা নেইমারকে। পরের মিনিটেই ছয় গজ বক্সের মাঝ থেকে দারুণ এক ভলিতে বল জালে পাঠিয়েছিলেন  মেসি। কিন্তু পরিষ্কার অফসাইডের কারণে গোলটি বাতিল হয়ে যায়। এরপর নেইমার- মেসি জুটি আপ্রাণ চেষ্টা করেও কোন ফল আদায়ে ব্যর্থ হন।

লা-লীগায় গত আসরগুলোর শীর্ষ তিন দল
মওসুম    প্রথম    দ্বিতীয়    তৃতীয়
২০১৩-১৪    অ্যাটলেটিকো (৯০)    বার্সেলোনা (৮৭)    রিয়াল মাদ্রিদ (৮৭)
২০১২-১৩    বার্সেলোনা (১০০)    রিয়াল মাদ্রিদ (৮৫)    অ্যাটলেটিকো (৭৬)
২০১১-১২    রিয়াল মাদ্রিদ (১০০)    বার্সেলোনা (৯১)    ভ্যালেন্সিয়া (৬১)
২০১০-১১    বার্সেলোনা (৯৬)    রিয়াল মাদ্রিদ (৯২)    ভ্যালেন্সিয়া (৭১)
২০০৯-১০    বার্সেলোনা (৯৯)    রিয়াল মাদ্রিদ (৯৬)    ভ্যালেন্সিয়া (৭১)
২০০৮-০৯    বার্সেলোনা (৮৭)    রিয়াল মাদ্রিদ (৭৮)    সেভিয়া (৭০)
২০০৭-০৮    রিয়াল মাদ্রিদ (৮৫)    ভিয়ারিয়াল (৭৭)    বার্সেলোনা (৬৭)
২০০৬-০৭    রিয়াল মাদ্রিদ (৭৬)    বার্সেলোনা (৭৬)    সেভিয়া (৭১)
২০০৫-০৬    বার্সেলোনা (৮২)    রিয়াল মাদ্রিদ (৭০)    ভ্যালেন্সিয়া (৬৯)
২০০৪-০৫    বার্সেলোনা (৮৫)    রিয়াল মাদ্রিদ (৮০)    ভিয়ারিয়াল (৬৫)
২০০৩-০৪    ভ্যালেন্সিয়া (৭৭)    বার্সেলোনা (৭২)    দেপর্তিভো (৭১)
২০০২-০৩    রিয়াল মাদ্রিদ (৭৮)    সোসিয়েদাদ (৭৬)    দেপর্তিভো (৭২)
২০০১-০২    ভ্যালেন্সিয়া (৭৫)    দিপর্তিভো (৬৮)    রিয়াল মাদ্রিদ (৬৬)
২০০০-০১    রিয়াল মাদ্রিদ (৮০)    দিপর্তিভো (৭৩)    মায়োর্কা (৭১)
বাঁধভাঙা জোয়ারের মতো সে ঢল গিয়ে মেশে এক মোহনায়- নাম তার নেপচুনা ফাউন্টেইন। দলটির জার্সির রঙ লাল আর সাদায় রঙিন হয়ে যায় মাদ্রিদের রাস্তা। আবালবৃদ্ধবনিতার মিছিলে সবচেয়ে উচ্চারিত হয় যে নাম তা ছিল সিমিওনি। হাজারো কণ্ঠে ধ্বনিত হয় ওলে, ওলে, ওলে, চোলো সিমিওনি। মানজানারেস নদীর তীরে সমুদ্রদেবতা নেপচুনের বিশাল মূর্তির পাদদেশ ছেয়ে যায় মানুষে মানুষে। সন্দেহাতীতভাবেই আর্জেন্টাইন তারকা দিয়েগো সিমিওনি কিংবদন্তির নায়কে পরিণত হয়েছেন। ১৯৯৬ সালে শেষ যখন অ্যাটলেটিকো মাদ্রিদ শিরোপার স্বাদ পায় তখন সিমিওনি ছিলেন দুর্দান্ত খেলোয়াড়। আর এবার মাঠের বাইরের কারিগর। শিরোপা নয়, গেম বাই গেম বা প্রতিটি খেলায় ভাল করার কৌশল নিয়ে দলকে নিয়ে যান তিনি সাফল্যের শিখরে। বার্সেলোনার মাঠ ন্যু ক্যাম্পে প্রায় এক লাখ দর্শকের সামনে বুক চিতিয়ে লড়াই করা চাট্টিখানি কথা ছিল না। প্রতিপক্ষের তালিকায় বিশ্বসেরা দুই তারকা লিওনেল মেসি ও নেইমার। তাদের কোচও আর্জেন্টাইন। এর মধ্যে প্রথমার্ধে এক গোলে পিছিয়ে পড়া। অ্যাটলেটিকো শিবিরে স্বস্তি ছিল না মোটেও। কিন্তু দ্বিতীয়ার্ধের শুরুতে দিয়েগো গদিনের  জোরালো এক হেডে খেলায় ফেরে দলটি। লা লিগার ফাইনালে পরিণত হওয়া এই শেষ খেলায় অ্যাটলেটিকোর দরকার ছিল এক পয়েন্ট আর বার্সেলোনার তিন। শেষ পর্যন্ত সমতায় শেষ হওয়া খেলায় শেষ হাসিটা অ্যাটলেটিকোর। রিয়াল মাদ্রিদ সর্বাধিক ৩২ বার এ শিরোপা জয় করে। বার্সেলোনা করে ২২ বার।

No comments:

Post a Comment