Tuesday, May 6, 2014

বিনিয়োগ বোর্ড-বেসরকারীকরণ কমিশন একীভূত করার উদ্যোগ by সুজয় মহাজন

স্থবিরতা কািটয়ে অর্থবহ ও কার্যকর করতে রাষ্ট্রায়ত্ত দুই প্রতিষ্ঠান বেসরকারীকরণ (প্রাইভেটাইজেশন) কমিশন এবং বিনিয়োগ বোর্ডকে একীভূত করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে৷ এ জন্য মিন্ত্রপরিষদ বিভাগের অতিরিক্ত সচিব মো. মঈন উদ্দিনকে আহ্বায়ক করে সাত সদস্যের একটি আন্তমন্ত্রণালয় কমিটি গঠন করা হয়েছে। ৮ মে সকালে কমিটির প্রথম বৈঠক অনুষ্ঠিত হবে বলে কমিটির আহ্বায়ক মো. মঈন উদ্দিন প্রথম আলোকে জানান। 
এর আগে গত ৩০ এপ্রিল এ-সংক্রান্ত পূর্ণাঙ্গ কমিটি গঠন করে প্রজ্ঞাপন জারি করেছে মিন্ত্রপরিষদ বিভাগ। কমিটিকে তিন মাসের মধ্যে মিন্ত্রপরিষদ সচিবের কাছে পূর্ণাঙ্গ প্রতিবেদন জমা দিতে বলা হয়েছে। প্রজ্ঞাপনে বলা হয়েছে, বিনিয়োগ বোর্ড ও বেসরকারীকরণ কমিশনের বিদ্যমান আইন ও সংশ্লিষ্ট অন্যান্য বিষয় পর্যালোচনা করে সংস্থা দুটিকে একীভূত করে নতুন একটি প্রতিষ্ঠান গঠনের জন্য আইনের খসড়া প্রণয়ন করবে কমিটি। পাশাপাশি একীভূত প্রতিষ্ঠানের জন্য একটি সমন্বিত সাংগঠনিক কাঠামোরও খসড়া তৈরি করবে৷ এর আগে গত মার্চে প্রধানমন্ত্রীর দপ্তর থেকে দুই সংস্থাকে একীভূত করার কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য মন্ত্রিপরিষদ বিভাগকে নির্দেশ দেওয়া হয়। এরই পরিপ্রেক্ষিতে ৬ এপ্রিল মিন্ত্রপরিষদ বিভাগ একটি আন্তমন্ত্রণালয় কমিটি গঠন করে। পরবর্তী সময়ে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়, বিনিয়োগ বোর্ড, জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়, বেসরকারীকরণ কমিশনের সদস্যদের অন্তর্ভুক্ত করে ৩০ এপ্রিল পূর্ণাঙ্গ কমিটির গেজেট প্রকাশ হয়।জানতে চাইলে কমিটির আহ্বায়ক মঈন উদ্দিন গতকাল প্রথম আলোকে বলেন, ‘বেঁধে দেওয়া সময়ের মধ্যে আমরা আমাদের কাজ শেষ করার চেষ্টা করব৷’ মূলত দীর্ঘদিন ধরে বিনিয়োগ বোর্ড ও বেসরকারীকরণ কমিশনের কর্মকাণ্ডে একধরনের স্থবিরতা বিরাজ করছে৷ নিয়মিত কাজের বাইরে গত পাঁচ বছরে বলতে গেলে এই দুই সংস্থার উল্লেখযোগ্য কোনো কর্মকাণ্ডই চোখে পড়েনি৷ এ কারণে এসব সংস্থার প্রয়োজনীয়তা নিয়েই প্রশ্ন দেখা দেয়৷ এমনকি সরকারের একাধিক মন্ত্রণালয়ের অসহযোগিতার কারণে কাঙি্ক্ষত কর্মকাণ্ড পরিচালনা করতে না পেরে একপর্যায়ে বেসরকারীকরণ কমিশন টিকিয়ে রাখার যৌক্তিকতা নিয়েই প্রশ্ন তোলেন সংস্থাটির সাবেক চেয়ারম্যান মির্জা আবদুল জলিল৷ ২০১২ সালের সেপ্টেম্বর মাসে প্রথম আলোকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে তিনি এমন প্রশ্ন তোলেন। জানা গেছে, সরকারি গুরুত্বপূর্ণ এই দুটি সংস্থা দীর্ঘদিন ধরে পরিচালনা করছেন প্রেষণে আসা কর্মকর্তারা৷ কর্মচারী পর্যায়ে নিজস্ব জনবল থাকলেও উচ্চপর্যায়ের অধিকাংশই প্রেষণে নিযুক্ত৷ সংস্থা দুটির কর্মকাণ্ডের স্থবিরতার এটিও একটি বড় কারণ বলে মনে করেন সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের অনেকে৷ উল্লেখযোগ্য কোনো কর্মকাণ্ড না থাকলেও ক্ষমতাসীন বর্তমান সরকারের গত শাসনামল থেকে বিনিয়োগ বোর্ডে মন্ত্রীর পদমর্যাদায় একজন নির্বাহী চেয়ারম্যান ও বেসরকারীকরণ কমিশনে প্রতিমন্ত্রীর পদমর্যাদায় একজন চেয়ারম্যানকে নিয়োগ দিয়ে রাখা হয়েছে৷ এর মধ্যে বেসরকারীকরণ কমিশনের চেয়ারম্যান পদে পরিবর্তন আনা হলেও বিনিয়োগ বোডের্র নির্বাহী চেয়ারম্যান হিসেবে সৈয়দ আবদুস সামাদ বহাল রয়েছেন৷ প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের সাবেক মুখ্য সচিব মোল্লা ওয়াহিদুজ্জামান বর্তমানে বেসরকারীকরণ কমিশনের চেয়ারম্যান পদে দায়িত্ব পালন করছেন৷
বেসরকারীকরণকে উৎসাহিত করতে ১৯৯৩ সালে তৎকালীন বিএনপি সরকারের শাসনামলে বেসরকারীকরণ বোর্ড প্রতিষ্ঠা করা হয়৷ ২০০০ সালে এটিকে কমিশনে রূপ দেওয়া হয়৷ বোর্ড ও কমিশন মিলিয়ে এই সংস্থাটির প্রায় ৭৫টির বেশি রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠান বেসরকারি খাতে হস্তান্তর করা হয়েছে৷ ২০০৯ সালে আওয়ামী লীগের নেতৃত্বাধীন সরকার ক্ষমতা গ্রহণের পর থেকে কমিশনের কাজ বলতে গেলে স্থবির হয়ে পড়ে৷ এ সময় বেসরকারীকরণ নিয়ে কমিশন শিল্প এবং বস্ত্র ও পাট মন্ত্রণালয়ের মধ্যে টানাপোড়েন তৈরি হয়৷ এভাবেই কেটে যায় সরকারের পুরো পাঁচটি বছর৷ ওই পাঁচ বছরে ১১ প্রতিষ্ঠান বেসরকারি খাতে হস্তান্তর-প্রক্রিয়া সম্পন্ন করা হয়৷ বিগত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আমলেই যেগুলোর বেসরকারীকরণের প্রক্রিয়া গুছিয়ে রাখা হয়েছিল৷ জানা গেছে, বেসরকারীকরণ কমিশনে বর্তমানে কর্মকর্তা-কর্মচারীর সংখ্যা ৭৫ জন৷ রাজধানীর সচিবালয়-সংলগ্ন পরিবহন পুল ভবনে কমিশন কার্যালয় অবস্থিত৷
বিনিয়োগকে উৎসাহিত করার লক্ষ্যে ১৯৮৯ সালে বিনিয়োগ বোর্ড গঠন করা হয়৷ সংস্থাটির অনুমোদিত কর্মকর্তা-কর্মচারীর পদ রয়েছে ২৯৬টি৷ কর্মকর্তাদের বেশির ভাগই প্রেষণে নিযুক্ত৷ প্রধানমন্ত্রী নিজে বিনিয়োগ বোডের্র চেয়ারম্যানের দায়িত্ব পালন করেন৷ রাজধানীর দিলকুশায় জীবন বিমা ভবনে বিনিয়োগ বোডের্র প্রধান কার্যালয়৷ এ ছাড়া চট্টগ্রাম, খুলনা, সিলেট ও রাজশাহীতে বিভাগীয় কার্যালয় রয়েছে৷ ২০০৯ সালের পর থেকে বোডের্র উল্লেখযোগ্য কোনো কর্মকাণ্ডই চোখে পড়েনি৷ এ সময় দেশি-বিদেশি বিনিয়োগ বাড়াতে বিনিয়োগ বোডের্র বাড়তি কোনো পদক্ষেপ চোখে পড়েনি৷ এমনকি বিনিয়োগ-প্রক্রিয়াকে সহজীকরণেও কোনো পদক্ষেপ গৃহীত হয়নি।
বিগত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সময় বিনিয়োগ বোর্ডে একীভূত সেবা বা ওয়ান স্টপ সার্ভিস চালু করা হলেও সমন্বয়হীনতায় সেটির কার্যক্রমও স্থবির হয়ে পড়েছে, বরং নিয়মিত কর্মকাণ্ডের মধ্যেই বিনিয়োগ প্রবৃদ্ধি ঘটেছে।

No comments:

Post a Comment