Sunday, August 30, 2015

ট্টগ্রাম বন্দরের অনিয়ম-দুর্নীতি শুধু তদন্তই হয়!

চট্টগ্রাম বন্দরের অনিয়ম-দুর্নীতি তদন্তে গত আড়াই বছরে চারটি কমিটি হয়েছে। এর বাইরে দুর্নীতি দমন কমিশনও (দুদক) বন্দরের অনিয়ম নিয়ে অনুসন্ধান করছে। তিনটি তদন্ত কমিটি প্রতিবেদন দিলেও কারও বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। উল্টো বন্দরের কেনাকাটার অনিয়মকে নৌপরিবহনমন্ত্রী শাজাহান খান ‘কাজে ত্রুটিবিচ্যুতির’ বেশি কিছু ভাবতে নারাজ।
বন্দরে গত তিন বছরে ২০টি প্রকল্প ও পণ্য কেনাকাটায় প্রায় ৭৩৩ কোটি টাকা ব্যয় হয়। এর মধ্যে ২৭৫ কোটি টাকার সাতটি প্রকল্প বা পণ্য কেনাকাটায় অনিয়মের অভিযোগ ওঠে।
বন্দর সূত্র জানায়, জাতীয় নদী রক্ষা কমিশনের চেয়ারম্যান আতাহারুল ইসলামের নেতৃত্বে গঠিত কমিটি বিভিন্ন প্রকল্পে কেনাকাটাসহ বন্দর চেয়ারম্যানের অনিয়মের বিরুদ্ধে তদন্ত করে। প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের নির্দেশে চট্টগ্রাম বন্দরের চেয়ারম্যানের অনিয়ম তদন্তে নৌপরিবহন মন্ত্রণালয় এই কমিটি গঠন করে। গত ৯ এপ্রিল প্রতিবেদন জমা দেয় কমিটি। এতে তিনটি পুরোনো জাহাজ ক্রয় এবং কনটেইনার ব্যবস্থাপনায় স্বয়ংক্রিয় পদ্ধতি স্থাপনে অনিয়ম হয়েছে বলে তুলে ধরা হয়।
বন্দর সূত্র জানায়, ২০১৩-১৪ সালে তিনটি পুরোনো জাহাজ কেনা হয় ৪৯ কোটি ৮৫ লাখ টাকায়। দরপত্রের সব শর্ত পূরণ না করেই ঢাকার একটি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান বন্দর কর্তৃপক্ষকে জাহাজ সরবরাহ করে। তদন্ত প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে জাহাজ ক্রয়ে ঠিকাদার নির্বাচনে বড় ধরনের অনিয়ম হয়েছে। জাহাজ ক্রয়ের প্রাক্কলন ব্যয় নির্ধারণের বিষয়টিকে স্বচ্ছ নয় বলে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে।
তদন্ত প্রতিবেদনের বিষয়ে নৌমন্ত্রী নথিতে লিখেছেন, ‘চট্টগ্রাম বন্দরের চেয়ারম্যান রিয়ার অ্যাডমিরাল নিজামউদ্দিন আহমেদের বিরুদ্ধে আনীত অভিযোগের সবগুলো বাস্তব কারণে তদন্ত করা সম্ভব হয়নি। চট্টগ্রাম বন্দরের কাজের পরিধি ব্যাপক বিধায় কোনো কোনো কাজে ত্রুটিবিচ্যুতি হয়ে থাকতে পারে। সে দৃষ্টিকোণ থেকে পুরো বিষয়টি বিবেচনার জন্য প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়কে অনুরোধ জানিয়ে তদন্ত প্রতিবেদন প্রেরণ করা হোক।’ ১২ মে নথিতে সই করেন মন্ত্রী।
এ বিষয়ে নৌপরিবহনমন্ত্রী শাজাহান খান ৩ আগস্ট রাতে প্রথম আলোকে বলেন, ‘আতাহারুল ইসলামের কমিটি অধিকাংশ অভিযোগের সত্যতা পায়নি। শুধু জাহাজসহ দুটো বিষয়ে সত্যতা পেয়েছে। এ কারণে এই দুটো বিষয় তদন্তের জন্য দুদকে পাঠিয়ে দেওয়া হয়েছে।’
তদন্তে দুটো বিষয়ে সত্যতা পেলেও ত্রুটিবিচ্যুতি হিসেবে কেন দেখছেন, তা জানতে চাইলে মন্ত্রী বলেন, ‘এখানে বিষয়টি পরিষ্কার। আপনি ১০টা কাজ করতে গেলে ভুলত্রুটি হতেই পারে। এখানে পুকুরচুরি বা সাগরচুরি হয়নি। কিন্তু কতটুকু ভুলত্রুটি হয়েছে, তা বিবেচনায় নিতে হবে।’ আতাহারুল ইসলামের কমিটির প্রতিবেদন প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে পাঠানো হয়েছে বলে মন্ত্রী বলেন।
তদন্ত প্রতিবেদনের বিষয়ে আতাহারুল ইসলাম মুঠোফোনে ৮ আগস্ট প্রথম আলোকে বলেন, তদন্ত প্রতিবেদনে প্রতিটি বিষয়ের ওপর অবজারভেশন (পর্যবেক্ষণ) আছে। অনেকগুলো বিষয়ে ফিন্যান্সিয়াল অডিট ও পারফরম্যান্স অডিট করার জন্য সুপারিশ করা হয়েছে। তদন্ত প্রতিবেদন নিয়ে এর বেশি কিছু বলতে চাননি তিনি।
বিভিন্ন প্রকল্পে অনিয়ম ও তদন্ত কমিটির প্রতিবেদনের বিষয়ে জানতে চাইলে বন্দরের চেয়ারম্যান রিয়ার অ্যাডমিরাল নিজামউদ্দিন আহমেদ গত রোববার দুপুরে নিজ কার্যালয়ে প্রথম আলোকে বলেন, বন্দরের কেনাকাটায় কোনো অনিয়ম হয়নি। প্রতিটি কেনাকাটা বন্দরের বোর্ড সভার সিদ্ধান্ত নিয়ে করা হয়েছে।
আতাহারুল ইসলামের কমিটির প্রতিবেদনের বিষয়ে বন্দর চেয়ারম্যান বলেন, ‘পুরোনো তিনটি জাহাজ কেনা ও কনটেইনার ব্যবস্থাপনায় স্বয়ংক্রিয় পদ্ধতি নিয়ে কোনো আইন লঙ্ঘন হয়নি। আর এককভাবে আমি কেন দায়ী হব? চেয়ারম্যান হিসেবে এককভাবে সিদ্ধান্ত নিয়ে কোনো কেনাকাটা করা হয়নি। যেসব কেনাকাটা করা হয়েছে, তা বন্দরের প্রয়োজনেই করা হয়েছে।’
বন্দরের কনটেইনার ব্যবস্থাপনায় স্বয়ংক্রিয় পদ্ধতিতে অনিয়মের অভিযোগ নিয়ে নৌ মন্ত্রণালয় ২০১২ সালের নভেম্বরে আরেকটি তদন্ত কমিটি গঠন করে। পরের বছরের ফেব্রুয়ারিতে কমিটি অন্তর্বর্তীকালীন প্রতিবেদন জমা দেয়। এতে প্রকল্পের সঙ্গে জড়িত দুই কর্মকর্তাকে দায়ী করা হলেও বন্দর কোনো ব্যবস্থা নেয়নি। পূর্ণাঙ্গ তদন্ত প্রতিবেদনও এখন পর্যন্ত জমা দেয়নি। তদন্ত কমিটির আহ্বায়ক নৌ মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব নাসির আরিফ মাহমুদের সঙ্গে মুঠোফোনে যোগাযোগ করা হলে তিনি মন্ত্রণালয়ের সচিবের সঙ্গে কথা বলার পরামর্শ দেন।
টেট্টাপড (নদীর স্রোত প্রতিরোধে ত্রিকোণাকৃতির পাথরের কাঠামো) প্রকল্পের নামে চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের ২৪ কোটি টাকা আত্মসাতের পরিকল্পনা-সংক্রান্ত বিষয়ে নৌপরিবহন মন্ত্রণালয় গত মে মাসে আরেকটি তদন্ত কমিটি গঠন করে। মংলা বন্দরের চেয়ারম্যান রিয়ার অ্যাডমিরাল আর ইউ আহমেদের নেতৃত্বে দুই সদস্যের কমিটি গত ২৯ জুলাই প্রতিবেদন জমা দেন। প্রতিবেদনে বলা হয়, টেট্টাপড প্রকল্পের ক্রয়প্রক্রিয়া অনুমোদনের আগে বিশেষজ্ঞ ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের মতামতসহ সম্ভাব্যতা সমীক্ষা করা যেত।
বন্দরের বিভিন্ন অনিয়মের অভিযোগ তদন্ত করতে নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়-সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটি গত বছরের ৩০ এপ্রিল সাংসদ এম এ লতিফকে আহ্বায়ক করে তিন সদস্যের একটি উপকমিটি গঠন করে। কমিটিকে সুনির্দিষ্ট সাতটি অভিযোগের তদন্ত করতে বলা হয়। এই সাতটি হলো বন্দরে লোক নিয়োগে অনিয়ম, অ্যাম্বুলেন্স শিপ ক্রয়, এক্সকাভেটর ক্রয়, কনটেইনার জাহাজ ক্রয়, সিটিএমএস ও ভিটিএমআইএস প্রকল্প এবং ১৬ কোটি টাকার যন্ত্রপাতি ক্রয়ে অনিয়মের অভিযোগ। কমিটিকে গত বছরের ৩০ জুলাইয়ের মধ্যে প্রতিবেদন জমা দিতে বলা হয়।
তদন্ত কমিটির আহ্বায়ক সাংসদ এম এ লতিফ প্রথম আলোকে বলেন, তদন্ত প্রতিবেদনের কাজ প্রায় শেষ। শিগগিরই সংসদীয় কমিটির সভাপতির কাছে প্রতিবেদন হস্তান্তর করা হবে। অনিয়ম পেয়েছেন কি না, তা জানতে চাইলে বিস্তারিত কিছু বলতে চাননি তিনি।
গত মে মাসের দ্বিতীয় সপ্তাহে বন্দরের জাহাজ ও যন্ত্রপাতি কেনাসহ নয়টি বিষয় নিয়ে অনুসন্ধান শুরু করেছে দুদক। দুদকের উপপরিচালক শেখ ফানাফিল্লাহ সরেজমিনে বন্দরে এসে কর্মকর্তাদের সঙ্গে কথা বলেন। কেনাকাটা-সংক্রান্ত নথিপত্রও সংগ্রহ করেন। নিয়মানুযায়ী, দুদকের অনুসন্ধানে অভিযোগ প্রমাণিত হলে মামলা করা হয়।
তদন্তের বিষয়ে শেখ ফানাফিল্লাহ কোনো মন্তব্য করতে চাননি।

No comments:

Post a Comment