Monday, August 10, 2015

ঘূর্ণিঝড় ও বন্যায় কক্সবাজারে ক্ষতি: ঘর নেই, ভিটায় ফিরতে পারছে না লাখো মানুষ by আব্দুল কুদ্দুস

বন্যাদুর্গত কয়েক হাজার মানুষ আশ্রয় নিয়েছে পেকুয়ার
এবিসি সড়কে। সড়কের দুপাশে পলিথিন ও বাঁশের
চাটাই দিয়ে তৈরি তাদের অস্থায়ী ঘর -প্রথম আলো
কক্সবাজারে পেকুয়া উপজেলার উজানটিয়া ইউনিয়নের সমুদ্র উপকূলীয় গ্রাম মালেকপাড়া। এখানকার বেড়িবাঁধের পাশে তৈরি মাটির ঘরে স্ত্রী ও পাঁচ ছেলেমেয়ে নিয়ে জেলে সলিম উল্লাহ্র সংসার। সলিম সমুদ্রে মাছ ধরতে গেলে পরিবারের অন্য সদস্যদের পোনা ধরে বাড়তি আয় করতে হয়। নইলে সংসারে দেখা দেয় টানাপোড়েন। গত ৩১ জুলাই ঘূর্ণিঝড় কোমেনের প্রভাবে সামুদ্রিক জলোচ্ছ্বাসে সলিমের ঘরটি ভেঙে যায়। এরপর পরিবারের সদস্যদের নিয়ে সলিম ওঠেন পাশের একটি আশ্রয়কেন্দ্রে। এখন ঘূর্ণিঝড় কেটে গেছে, সাগরও শান্ত। কিন্তু সলিমদের বাড়ি ফেরা হচ্ছে না। তিনি বলেন, মাথা গোঁজার ঠাঁয় নেই বলেই এখানে পড়ে আছি। নতুন করে ঘর তৈরি করব, সেই সামর্থ্য নেই। সরকারিভাবেও কোনো সাহায্য পাচ্ছি না।’
সলিমের মতো সামুদ্রিক জলোচ্ছ্বাসে এই উজানটিয়া ইউনিয়নের টেকপাড়া, মৌলভীপাড়া, মালেকপাড়ায় অন্তত কয়েক শ ঘরবাড়ি মাটির সঙ্গে মিশে গেছে। ভিটেবাড়ির চিহ্ন বলতে দাঁড়িয়ে আছে কিছু নারকেলগাছ।
উজানটিয়া ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান এম শহিদুল ইসলাম জানান, কোমেনের আঘাতে এই ইউনিয়নের ৩ হাজার ২০০ ঘরবাড়ি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
পাশের ইউনিয়ন মগনামার অবস্থা আরও খারাপ। জোয়ারের পানিতে এই ইউনিয়নের কাকপাড়া, বোর্ডিংপাড়া, সাতঘরপাড়া, দরদরিঘোনা, পশ্চিমকূল, আফজালিয়াপাড়ার দুই হাজার ঘরবাড়ি ভেঙে গেছে।
মগনামা ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান শহিদুল মোস্তফা চৌধুরী জানান, এখানকার ৯০ শতাংশ মানুষ মৎস্যজীবী। সমুদ্রে মাছ আহরণ, উপকূলে চিংড়িঘের ও লবণ উৎপাদন করেই সংসার চালান তাঁরা।
এখন আয়–রোজগার বন্ধ। ঘরবাড়ি তৈরি করার মতো সামর্থ্য কারও নেই।
সরেজমিনে দেখা যায়, পেকুয়ার এবিসি সড়কের দুই পাশে পলিথিনের ঝুপড়ি ঘর তৈরি করে থাকছে শ খানেক পরিবার। সহায়-সম্বল হারিয়ে মানুষগুলো আশ্রয় নিয়েছে এখানে। ঘর ভেঙে যাওয়ায় ফিরতে পারছে না ভিটায়।
পাশের উপজেলা চকরিয়ায় বন্যার পানিতে ডুবে প্রায় সাত হাজার ঘরবাড়ি বিধ্বস্ত হয়েছে। আংশিক ভেঙে গেছে আরও ৩৫ হাজার ঘরবাড়ি। গৃহহীন দেড় লাখ মানুষ এখনো খোলা আকাশের নিচে মানবেতর জীবন কাটাচ্ছে।
উপজেলা পরিষদ চেয়ারম্যান জাফর আলম জানান, বন্যায় এই উপজেলায় চার লাখের বেশি মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এর মধ্যে গৃহহীন দেড় লাখ মানুষকে পুনর্বাসনের চেষ্টা চলছে। রামু উপজেলায়ও বন্যার ক্ষত একেবারে দগদগে। রামুর পশ্চিম চাকমারকূল গ্রামের মাহবুবুর রহমান ও রিজিয়া বেগম জানান, ২৮ জুলাই সন্ধ্যায় বাঁকখালী নদীর স্রোতে তাঁদের বাড়ি বিলীন হয়। এরপর থেকে ছেলেমেয়েদের নিয়ে একটি আশ্রয় কেন্দ্রে পড়ে আছেন।
রামু উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান রিয়াজ উল আলম জানান, বন্যায় এই উপজেলায় অন্তত ১০ হাজার ঘরবাড়ি বিলীন হয়েছে। আংশিক ক্ষতি হয়েছে আরও ১০ হাজার ঘরবাড়ি। গৃহহীন মানুষগুলো পুঁজির অভাবে ঘুরে দাঁড়াতে পারছে না।
কক্সবাজার সদর, টেকনাফ, উখিয়া ও কুতুবদিয়া উপজেলায়ও হাজারো ঘরবাড়ি মাটির সঙ্গে মিশে গেছে।
জেলা প্রশাসনের (প্রাথমিক ক্ষয়ক্ষতির তালিকা) তথ্যমতে, এবারের বন্যায় জেলার ৬৬টি ইউনিয়নে সম্পূর্ণ ভেঙে গেছে ২৫ হাজার ৬২২টি ঘরবাড়ি। আংশিক ভেঙে গেছে আরও ৮৪ হাজার ৫০০টি ঘরবাড়ি। ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে ৭ লাখ ১৫ হাজার মানুষ। এর মধ্যে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের সংখ্যা ৩ লাখ ৬৬ হাজার ৮০০ জন এবং আংশিক ক্ষতিগ্রস্ত ৩ লাখ ৫৯ হাজার ১৫৫ জন। এ ছাড়া ২ লাখ ৪৯ হাজার ৪১২ জন হারিয়েছে তিন কোটি টাকার গবাদিপশু, হাঁস-মুরগি। নষ্ট হয় ৯ কোটি ৪০ লাখ টাকার ফসল। জেলা প্রশাসক মো. আলী হোসেন জানান, ঘূর্ণিঝড় ও বন্যায় ক্ষতিগ্রস্তদের মধ্যে ত্রাণ তৎপরতার পাশাপাশি গৃহহীন লোকজনকে পুনর্বাসনের প্রস্তুতি চলছে। এ ব্যাপারে সরকার আন্তরিক।

No comments:

Post a Comment