Friday, October 9, 2015

চট্টগ্রামে কথিত গ্রেনেড বিস্ফোরণে নিহতের নাম জাভেদ নয় রানা, পরিবারের দাবি পরিকল্পিত হত্যাকাণ্ড

চট্টগ্রামে পুলিশের হাতে আটক অবস্থায় গ্রেনেড বিস্ফোরণে নিহতের নাম জাবেদ নয়, তার নাম রানা। পুরো নাম তৌফিকুল ইসলাম রানা। সরেজমিন গত বুধবার নিহতের বাড়ি কিশোরগঞ্জের কটিয়াদী পৌরসভার ৯ নম্বর ওয়ার্ডের বেথইর গ্রামে গেলে এ তথ্য পাওয়া যায়। বিকেলে গিয়ে দেখা যায় গ্রামজুড়েই নিস্তব্ধতা। সদ্য কৈশোর পেরোনো নম্র ভদ্র গ্রামের এ ছেলেটি একটি জঙ্গি সংগঠনের একটা অঞ্চলের ‘সামরিক প্রধান’ এ খবরে হতবাক গ্রামবাসী। আত্মীয়স্বজন ও পরিবারের লোকজন দাবি করছে ‘মেধাবী ছাত্র’ রানাকে জেএমবি সাজিয়ে পরিকল্পিতভাবে হত্যা করা হয়েছে। গ্রামে ঢোকার সময় প্রথমেই দেখা হয় এলাকার পৌর কাউন্সিলর মুর্শিদ উদ্দিনের সাথে। তিনি বলেন, আমি সাড়ে ১৩ বছর ধরে এ এলাকার কাউন্সিলর। রানাকে আমি ভালো করেই চিনি। তার মতো নম্র ভদ্র ছেলে আমাদের এলাকায় কমই আছে। সে কোনো রকমের উচ্ছৃখল ছিল না। ছোট সময় থেকেই সে কোনো ঝুট-ঝামেলায় যায়নি। এখন বলা হচ্ছে সে জেএমবির ‘সামরিক শাখার প্রধান’ এটা বিশ্বাসযোগ্য নয়।
ঈদ উপলক্ষে গত ২৪ সেপ্টেম্বর রানা গ্রামের বাড়িতে আসে। ৬ দিন কাটিয়ে সে আবার চট্টগ্রাম চলে যায়। ওখানেই সে টেক্সটাইল ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজে পড়াশোনা করত। কলেজে ছুটি পেলেই সে বাড়ি চলে আসত। মাসে দু-একবার সে বাড়িতে আসত। বেথইর গ্রামের কলেজছাত্র আনোয়ার হোসেন (১৮) জানান, বাড়িতে এলে তার সাথেই মূলত আড্ডা দিতো রানা। আনোয়ার বলেন, গত ঈদের ছুটিতেও বাড়িতে এসে সে আমার সাথেই বেশি আড্ডা দিয়েছে। সে পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ পড়ত, কিন্তু কোনো দিন জেএমবির কথা আমাদের কাছে বলেনি। তার মনোভাবও এরকম ছিল বলে মনে হয়নি। এলাকার সেলুন মালিক শীতল বর্মণ জানান, বাড়িতে এলে রানা মাঝেমধ্যে তার সেলুনে এসে বসতো। গত ঈদেও তার সাথে দেখা হয়েছে, সেলুনে এসেছে। শীতল রানাকে ভালো ছেলে বলে দাবি করেন। গতকাল রানার বাড়িতে গিয়ে দেখা যায় তার বৃদ্ধ বাবা জজ মিয়া, মা ফাতেমা বেগম, বড় বোন শিরিন ইয়াসমিনসহ বাড়ির সবাই নির্বাক। পারিবারিক সূত্রে জানা গেছে, সাত ভাই-বোনের মধ্যে রানা ছিল ষষ্ঠ। সবার বড় বোন শিরিন ইয়াসমিন কটিয়াদীর ডা: আব্দুল মান্নান মহিলা কলেজের লাইব্রেরিয়ান। দ্বিতীয় বোন পারভীন গৃহিণী। তৃতীয় বোন জেসমিনও গৃহিণী। এর পরে ভাই সাজ্জাদ হোসেন ঢাকায় একটি প্রিন্টিং কারখানায় চাকরি করেন। আরেক ভাই কনক মিয়া দুবাই প্রবাসী। রানার ছোট জেমিল আক্তার এ বছর এইচএসসি পাস করেছে। বাবা মো: জজ মিয়া (৬৭) বাড়ির সামনে একটি মুদি দোকান দিয়ে ব্যবসা করছেন। কৃষি জমিও আছে। মা গৃহিণী। মধ্যবিত্ত পরিবার। তাদের পরিবারের সবাই আওয়ামী লীগের সমর্থক বলে জানা গেছে।
বড় বোন শিরিন ইয়াসমিনের সাথে কথা হয় এ প্রতিবেদকের। শিরিন বলেন, আমাদের সাত ভাই বোনের মধ্যে রানা ছিল মেধাবী। তাই আমার ইচ্ছাতেই রানাকে আমি টেক্সটাইল ইঞ্জিনিয়ারিংয়ে ভর্তি করাই। রানা এলাকার রইছ মাহমুদ উচ্চবিদ্যালয়ে অষ্টম শ্রেণী পর্যন্ত পড়ে। পরে কটিয়াদী ভোকেশনাল ইনস্টিটিউটে ভর্তি করানো হয় তাকে। ২০০৯ সালে সেখান থেকে এসএসসি পাস করলে চট্টগ্রামের টেক্সটাইল ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজে তাকে ভর্তি করাই। রানা সেখান থেকে আইএসসি শেষে নারায়ণগঞ্জে একটি টেক্সটাইল মিলে ইন্টার্নি করে। বিএসসিতে ভর্তি হওয়ার প্রস্তুতি হিসেবে সে কোচিং করছিল। সেই সাথে টিউশনিও করত। শিরিন ইয়াসমিন বলেন, প্রতি মাসে তাকে পড়ালেখার খরচ হিসেবে আমরা বাড়ি থেকে টাকাপয়সা পাঠাতাম। বেশির ভাগ আমিই দিতাম টাকা। আমাদের স্বপ্ন ছিল রানা পড়ালেখা শেষে চাকরি করে সংসারের হাল ধরবে। শিরিন ইয়াসমিন বলেন, আমার ভাই জেএমবির সাথে কোনোভাবেই জড়িত ছিল না। তাকে পরিকল্পিতভাবে পুলিশ হত্যা করেছে। সে যদি জেএমবি হতো, পুলিশ এটা প্রমাণ করতে পারতো। কিন্তু তাকে সামরিক শাখার প্রধান সাজিয়ে পুলিশ তাকে ঠাণ্ডামাথায় হত্যা করেছে। আমরা প্রধানমন্ত্রীর কাছে এর বিচার চাই। রানা দু-এক দিন পরপরই বাড়িতে ফোন দিয়ে বৃদ্ধ মা-বাবাসহ বাড়ির লোকজনের খোঁজখবর নিতো। সর্বশেষ তার ছোট বোন জেমিল আক্তারের সাথে কথা হয় রানার। জেমিল বলেন, ভাইয়ার শেষ কথাগুলো এখনো আমার কানে বাজছে। সে বলেছিল, এই আমাকে ভাই নয়, ইঞ্জিনিয়ারসাব ডাকবি। আমি বিএসসি পাস করেই বড় চাকরি করব। তখন তো আমাকে স্যার স্যার করতে হবে।

No comments:

Post a Comment