Friday, October 9, 2015

চট্টগ্রামে বেহাল সড়ক অবকাঠামো নাগরিক দুর্ভোগ চরমে by নূরুল মোস্তফা কাজী

সড়ক অবকাঠামোর বেহাল অবস্থা, গ্যাস-বিদ্যুৎ সঙ্কট ও যানজটে বন্দর নগরী চট্টগ্রামে নাগরিক দুর্ভোগ এখন চরম পর্যায়ে। এর ওপর গণপরিবহনের সঙ্কট এবং ভাড়া নিয়ে নৈরাজ্য যেন দুর্ভোগের আগুনে ঘি ঢেলেছে। বছরের পর বছর ধরে দেশের প্রধান বাণিজ্যনগরী চট্টগ্রামে গ্যাসের সঙ্কট বিরাজমান থাকলেও এখন পর্যন্ত সঙ্কট নিরসনের কোনো উদ্যোগ নেই। পেট্রোবাংলার তথ্যানুযায়ী গতকাল বৃহস্পতিবার চট্টগ্রামে দু’টি বিদ্যুৎকেন্দ্র এবং রাষ্ট্রায়ত্ত বৃহৎ সার কারখানা সিইউএফএল শাটডাউনে তথা বন্ধ রাখা হয়েছে। গতকাল চট্টগ্রামে ননগ্রিড বিদ্যুৎকেন্দ্র বাদে ২৮২.৪ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস সরবরাহ করা হয়েছে। ৪ শ’ মিলিয়ন ঘনফুটের অধিক চাহিদার বিপরীতে প্রায় ১২৫ মিলিয়ন ঘনফুট ঘাটতি নিয়ে জোড়াতালি দিয়ে চলছে চট্টগ্রামে গ্যাসের সরবরাহ। ফলে নতুন নতুন শিল্পায়ন যেমন বাধাগ্রস্ত হচ্ছে তেমনি বিদ্যমান শিল্প কারখানার উৎপাদনও দারুণভাবে ব্যাহত হচ্ছে। পাশাপাশি কিছু দিন পরপরই বাসাবাড়ির রান্নার চুলা দিনভর গ্যাসবিহীন থাকছে। এতে অবর্ণনীয় দুর্ভোগ পোহাতে হয় নগরবাসীকে।
এ দিকে গ্যাসসঙ্কটের কারণে চট্টগ্রামের রাউজান তাপ বিদ্যুৎকেন্দ্রের ১ নম্বর ইউনিট এবং শিকলবাহা ৪০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎকেন্দ্র বন্ধ রাখা হয়েছে। পাশাপাশি রাষ্ট্রায়ত্ত চিটাগাং ইউরিয়া ফার্টিলাইজার কোম্পানি লিমিটেড (সিইউএফএল) বছরের বেশির ভাগ সময়ই বন্ধ থাকছে। গ্যাসসঙ্কটে কোনো না কোনো বিদ্যুৎকেন্দ্র বন্ধ থাকার কারণে শিল্প ও বাণিজ্য নগরী চট্টগ্রামে লোডশেডিং থেকেও যেন নিস্তার নেই।
এতে চট্টগ্রামে বিদ্যুৎ যন্ত্রণা দিন দিন অসহনীয় হয়ে উঠছে। বিভিন্ন শিল্প কারখানার তথ্যানুযায়ী ২৪ ঘণ্টায় গড়ে ১০ ঘণ্টা বিদ্যুৎ থাকে না। আবার সাধারণের হিসেবে তা আরো বেশি। ফলে বিদ্যুৎসঙ্কটে চট্টগ্রামের শিল্প কারখানার বেহাল অবস্থা বিরাজ করছে। বিশেষ করে রফতানিমুখী শিল্প কারখানাগুলো প্রতিযোগিতামূলক বাজারে টিকে থাকাই কঠিন হয়ে যাচ্ছে বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা। বেহাল অবস্থা রিরোলিং মিলগুলোর উৎপাদনেরও। একটি সূত্র দাবি করেছে, শুধু বিদ্যুতের লোডশেডিংয়ের চট্টগ্রামের দেড় সহস্রাধিক শিল্প কারখানাকে দৈনিক প্রায় কোটি টাকার ডিজেল পোড়াতে হয় জেনারেটর চালাতে।
পিডিবি সূত্র জানিয়েছে, চট্টগ্রামে দিনের বেলায় ৬ শ’ মেগাওয়াট এবং রাতের বেলায় ৭ শ’ মেগাওয়াট বিদ্যুতের চাহিদা রয়েছে। স্থানীয়ভাবে চট্টগ্রাম পিডিবির পাশাপাশি জাতীয় গ্রিড থেকেও সরাসরি লোডশেডিং করা হয় বলে সূত্র জানায়। এতে দৈনিক লোডশেডিংয়ের পরিমাণ কত তাও হিসাব মিলানো দায় হয়ে পড়েছে।
শিল্প কারখানার পাশাপাশি ঘণ্টার পর ঘণ্টা লোডশেডিংয়ের কারণে বাসাবাড়ির মূল্যবান ইলেকট্রনিক সামগ্রী এবং হিমায়িত খাদ্যদ্রব্য নষ্ট হচ্ছে প্রতিনিয়তই। পাশাপাশি অসহ্য তাপদাহে নরকযন্ত্রণা সইতে হচ্ছে নগরবাসীকে।
এ দিকে অগণন খানাখন্দে বন্দর নগরী চট্টগ্রামের সড়ক যোগাযোগ নেটওয়ার্ক বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে। এর মধ্যে অতি সম্প্রতি নির্মিত সড়কের মাত্র কয়েক মাসের মাথায় বিটুমিনের প্রলেপ ওঠে পুরো সড়ক ন্যাড়া হওয়ার ঘটনাও রয়েছে। নগর ঘুরে দেখা গেছে, কোথাও অসংখ্য ছোট-বড় গর্ত, কোথাও কার্পেটিং উঠে গেছে, কোথাও আবার গ্রামের কাঁচা সড়কের মতো অবস্থা। এমন অবস্থা বন্দর নগরীর কোনো নির্দিষ্ট সড়কের নয়, পুরো শহরের অধিকাংশ রাস্তাই যেন কঙ্কালসার হয়ে গেছে। দীর্ঘ দিন ধরে এ সমস্যা বিরাজ করলেও জীর্ণশীর্ণ সড়কগুলোর সংস্কারকাজ হয়েছে একেবারেই নগণ্য। ফলে প্রতিনিয়তই চরম ভোগান্তিতে পড়তে হচ্ছে এ শহরের বাসিন্দাদের।
সড়ক অবকাঠামোর সঙ্কটের পাশাপাশি ফিটনেসবিহীন যানবাহনের বিরুদ্ধে অভিযান এবং মহাসড়কের স্বল্প দূরত্বের যাত্রীদের বিকল্প যানবাহনের ব্যবস্থা না করেই সিএনজি অটোরিকশা বন্ধ করে দেয়ার কারণে নগর জুড়ে যানবাহনের সঙ্কট লেগেই আছে। ফলে গন্তব্যে পৌঁছতে স্বল্প আয়ের মানুষকে পদে পদে দুর্ভোগ পোহাতে হচ্ছে। অনেকেই বাদুড়ঝোলা হয়ে যানবাহনে চড়ছেন জীবনঝুঁকি নিয়ে।
এর পাশাপাশি গ্যাসসঙ্কটের মধ্যেই গ্যাসের মূল্যবৃদ্ধির প্রভাব পড়েছে নাগরিক জীবনে। গণপরিবহনগুলোর বর্ধিত ভাড়া আদায়ে চরম বিশৃঙ্খল পরিস্থিতি তৈরি হচ্ছে প্রতিনিয়ত। বাস-মিনিবাসগুলোতে ভাড়া নিয়ে পরিবহন শ্রমিকদের সাথে যাত্রীদের নিয়মিত ঝগড়া লেগেই থাকছে।
এ দিকে ভাঙাচোরা রাস্তায় যেমনি ব্যাহত হচ্ছে যান চলাচল, তেমনি যানবাহনের গতি কমে যাওয়াতে সৃষ্টি হচ্ছে যানজট। ফলে জনসাধারণের সময়মতো গন্তব্যে পৌঁছা কঠিন হয়ে পড়েছে। বহদ্দারহাট হতে লালখানবাজার এবং কদমতলী থেকে পুরাতন রেলস্টেশন পর্যন্ত ফাইওভার নির্মাণের ফলে প্রতিনিয়তই এই ভোগান্তির মুখোমুখি হতে হচ্ছে নগরবাসীকে। পাশাপাশি দেশের প্রধান পাইকারি ব্যবসাকেন্দ্র চট্টগ্রামের চাক্তাই-খাতুনগঞ্জের ব্যবসা বাণিজ্যকে স্থবির করে তুলেছে যানজট ও নাজুক সড়ক অবকাঠামো।
চাক্তাই খাতুনগঞ্জের সরু রাস্তায় প্রতিদিন চলাচল করে শত শত পণ্যবাহী গাড়ি। ফলে দিনভর লেগে থাকে যানজট। সরু রাস্তার প্রায় অর্ধেকটা জুড়েই পণ্যবোঝাই ট্রাকের সারি। ফলে বাকি অর্ধেক রাস্তা নিয়ে যানবাহনগুলোকে চলতে হয় শম্বুক গতিতে। ফলে এখানকার ব্যবসা বাণিজ্যে স্থবিরতা বিরাজ করছে বলে ব্যবসায়ীরা জানান।
চট্টগ্রাম নগরীর বেশির ভাগ সড়ক চলাচলের অযোগ্য হয়ে পড়েছে। অসংখ্য খানাখন্দকে ভরা সড়কে প্রতিদিন ঘটছে দুর্ঘটনা। ছবিটি চাক্তাই-ফিরিঙ্গীবাজার ও আগ্রাবাদ অ্যাক্সেস রোড থেকে তোলা : আখতার হোসাইন

No comments:

Post a Comment