নিরাপত্তার
তাগিদে ইউরোপের দেশে দেশে এ বার কি নাগরিকের অধিকারগুলি খর্ব করা হবে?
যেমনটা ৯/১১-র পরে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে হয়েছে? যদি তা হয়, তবে আধুনিক
ইউরোপের প্রাণশক্তি বিপন্ন হতে বাধ্য।
প্যারিসে ১৩ নভেম্বরের সন্ত্রাস সম্ভবত ইউরোপের ৯/১১ হয়ে উঠতে চলেছে। এই আক্রমণ ইউরোপের সামনে দু’ধরনের চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দিয়েছে। কী ভাবে সেগুলির মোকাবিলা করা হয়, কেবল ওই মহাদেশ নয়, দুনিয়ার আরও অনেক দেশের
প্যারিসে ১৩ নভেম্বরের সন্ত্রাস সম্ভবত ইউরোপের ৯/১১ হয়ে উঠতে চলেছে। এই আক্রমণ ইউরোপের সামনে দু’ধরনের চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দিয়েছে। কী ভাবে সেগুলির মোকাবিলা করা হয়, কেবল ওই মহাদেশ নয়, দুনিয়ার আরও অনেক দেশের
ভবিষ্যত্ তার উপরে নির্ভর করছে।
প্রথম চ্যালেঞ্জ নিরাপত্তা সংক্রান্ত। এক দল লোক যখন কোনও আদর্শের নামে ঠান্ডা মাথায় হত্যাকাণ্ড চালায়, নিজেদের জীবনেরও তোয়াক্কা করে না, কী ভাবে জাতীয় নিরাপত্তার প্রচলিত কাঠামোয় তাদের মোকাবিলা করা যায়? প্যারিসের ঘটনা দেখিয়ে দিয়েছে, নজরদারি এবং প্রতিরক্ষার বিরাট আয়োজনও আত্মঘাতী ‘ফিদাইন’ হামলার মহড়া নিতে প্রস্তুত ছিল না। ঠিক যেমন সাত বছর আগের আর এক নভেম্বরে মুম্বইয়ে পাকিস্তানি সন্ত্রাসীদের বিধ্বংসী আক্রমণ ভারতে নিরাপত্তা ব্যবস্থার দুর্বলতা চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিয়েছিল। সে দিন দেশ জুড়ে স্বভাবতই এই দুর্বলতার তীব্র সমালোচনাও শোনা গিয়েছিল।
আজও সামগ্রিক ভাবে ভারতে নিরাপত্তার ব্যবস্থাটি মোটামুটি একই জায়গায় দাঁড়িয়ে। এ দেশের শহরগুলি সন্ত্রাসের মোকাবিলায় অত্যন্ত অপ্রস্তুত। পুলিশ সিসিটিভি ক্যামেরার নজরদারিতে উদাসীন, নাগরিকরাও নিরাপত্তার ঘাটতি সম্পর্কে বিশেষ সচেতন নন। পরিবেশ দূষণ, অশাসন বা দুর্নীতির মতো নিরাপত্তার প্রশ্নেও নিয়তিবাদী ভারতবাসী ধরেই নিয়েছেন, যেমন চলছে, চলবে, এর চেয়ে ভাল কিছু আশা করে লাভ নেই।
ইউরোপের মানুষ কিন্তু প্রত্যাশা করেন যে, তাঁদের দেশের সরকার নাগরিকদের প্রয়োজন এবং চাহিদা মেটাতে অনেক বেশি তত্পর হবে। এই প্রত্যাশাকে অবহেলা করে কোনও সরকারই সেখানে টিকে থাকতে পারবে না। কিন্তু যে কোনও জায়গায় যে কোনও সময়ে ফিদাইন হানার যে আশঙ্কা তৈরি হয়েছে, ফ্রান্স এবং ইউরোপের অন্যান্য দেশের সরকার তাদের নাগরিকদের তা থেকে বাঁচাতে পারবে কি? লাগাতার নজরদারি চালিয়ে এবং বিপুলসংখ্যক গোয়েন্দা ও পুলিশ লাগিয়ে সমস্ত নাগরিককে নিরাপত্তা দেওয়া কি সত্যই সম্ভব?
নিরাপত্তা এই সব আয়োজন নিশ্চয়ই সন্ত্রাসের সম্ভাবনা কমাতে সাহায্য করবে, কিন্তু যত দিন পৃথিবীর কিছু এলাকায় ফিদাইনদের প্ররোচনা, প্রশিক্ষণ এবং প্রকরণ দেওয়ার বিশদ ব্যবস্থা চালু থাকবে, তত দিন সেই বিপদ পুরোপুরি দূর করা অসম্ভব। ইসলামের নামে যে আন্তর্জাতিক সন্ত্রাস চলছে, সিরিয়া, ইরাক, আফগানিস্তান এবং পাকিস্তানের কিছু এলাকা এখন তার প্রধান সূতিকাগার। সন্ত্রাসবাদীদের এই নিরাপদ ঘাঁটিগুলি ধ্বংস না হলে পৃথিবী নিরাপদ হবে না। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও তার ইউরোপীয় সহযোগীরা এই সমস্যাটি সম্পর্কে সচেতন হয়েই এমন কিছু কিছু এলাকায় হস্তক্ষেপ করেছে, যেখানে তাদের আক্রমণের ক্ষমতা আছে, যেমন হতদরিদ্র আফগানিস্তানে এবং সিরিয়া ও ইরাকে। সে সব দেশে তারা সরকার বদলানোর জন্য বদ্ধপরিকর হয়েছে। কিন্তু পাকিস্তান, কাতার, সৌদি আরব কিংবা তুরস্কের মতো দেশগুলি কোনও না কোনও ভাবে সন্ত্রাসের আগুনে ইন্ধন জোগালেও সেখানে কোনও হস্তক্ষেপের চেষ্টা দেখা যায়নি, কারণ তারা আমেরিকা ও ইউরোপের কাছে গুরুত্বপূর্ণ।
মনে রাখা দরকার, ইউরোপও মধ্য প্রাচ্যের এবং এশিয়া ও আফ্রিকার অন্য নানা অঞ্চলের গোলমেলে রাজনীতিতে আকণ্ঠ ডুবে থেকেছে। সিরিয়ায় প্রেসিডেন্ট বাশার আল আসাদকে উত্খাত করার জন্য যখন জঙ্গিদের প্রশিক্ষণ দিয়ে লড়াইয়ে পাঠানো হয়েছিল তখন তারা ছিল ‘ভাল’ সন্ত্রাসবাদী, ঠিক যেমন পাকিস্তান কাশ্মীরে ‘আজাদির সৈনিক’দের পাঠায়। আবার, তুরস্কের কাছে তারাই ‘ভাল’, যারা প্রতিবেশী সিরিয়া ও ইরাকে কুর্দদের বিরুদ্ধে লড়ছে। এরাই পরে ইসলামিক স্টেটের জঙ্গি হবে! তেমনই, সৌদি আরব ও কাতারের ওয়াহাবি শাসকরা বাগদাদে ও দামাস্কাসে বিধর্মীদের গদি থেকে টেনে নামানোর জন্য ‘ভাল’ জঙ্গিদের নিয়োগ করেছিল। এক কথায়, যে যার নিজের স্বার্থ ও সুবিধে মাফিক ‘ভাল’ জঙ্গিদের চিহ্নিত করে তাদের সাহায্য করেছে। রাষ্ট্রপুঞ্জে সন্ত্রাসের নির্দিষ্ট সংজ্ঞা স্থির করার সমস্ত চেষ্টা যে ক্রমাগত বানচাল হয়েছে, এটা তার একটা বড় কারণ। সন্ত্রাসের কোনও একটি সংজ্ঞা স্থির হলে তো আর সন্ত্রাসবাদীদের ভাল এবং খারাপ বলে ভাগ করা যাবে না! মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, এবং ফ্রান্স সহ কিছু ইউরোপীয় রাষ্ট্র এত দিন এই অনৈতিক খেলা চালিয়ে এসেছে। তারা কি এখন নিজেদের বদলাতে পারবে?
আশা কম। প্রবীণ ইউরোপের দুর্বল ও ক্লান্ত নেতারা অনেক কাল যাবত্ আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে সরাসরি নিজেদের জড়াতে চাননি, টাকা দিয়ে দায় সেরেছেন। তাঁরা কি এখন উঠে দাঁড়িয়ে শত্রুর মোকাবিলায় নামতে পারবেন? ভরসা হয় না। তাঁরা সম্ভবত নিজের নিজের দেশের নিরাপত্তায় বেশি টাকা ঢালবেন এবং বিমানবাহিনীর শক্তিবৃদ্ধিতে আরও বিনিয়োগ করবেন। এশিয়া ও আফ্রিকায় বোমাবর্ষণ বাড়বে। ইউরোপের নিরাপত্তা বাড়াতে হয়তো অনেক দেশের শাসকরা আরও টাকা পাবেন। তার বেশি কিছু হবে কি? এখানেই ইউরোপের প্রথম চ্যালেঞ্জ।
দ্বিতীয় চ্যালেঞ্জটিকে সাংস্কৃতিক বলা চলে। ফ্রান্স এবং উদার আধুনিক ইউরোপের অন্য দেশগুলির নাগরিকরা প্যারিসের ভয়াবহ হত্যাকাণ্ডের অভিঘাত কী ভাবে সামলাবেন? প্রথম ধাক্কাটা গিয়ে পড়বে পশ্চিম এশিয়ার বধ্যভূমি থেকে আসতে থাকা শরণার্থীদের উপরে। প্যারিস সন্ত্রাসের পরে ইউরোপের দক্ষিণপন্থীরা অনিবার্য ভাবে অভিবাসনের বিরুদ্ধে আরও বেশি খড়্গহস্ত হয়ে উঠেছেন। শরণার্থীদের বিরুদ্ধে তাঁদের অবস্থান আরও কঠোর হবে। করুণ পরিহাস এই যে, প্যারিস যে জঙ্গিদের শিকার হল, অধিকাংশ শরণার্থী তাদের তাড়নাতেই দেশ ছাড়তে বাধ্য হয়েছেন। তাঁদের ভবিষ্যত্ অন্ধকার। ইউরোপে দক্ষিণপন্থীদের বিরাগের অন্য লক্ষ্যটি হল সেখানকার মুসলিম মানুষজন। আর, এই বিরাগের ফলে তাঁদের মধ্যে বিচ্ছিন্নতাবোধ এবং অসন্তোষ আরও বাড়বে, সেটা আবার এশিয়া এবং আফ্রিকার চরমপন্থী ইসলামি জঙ্গিদের শক্তি বৃদ্ধি করবে।
সবচেয়ে উদ্বেগের কারণ হল, ধর্মীয় ও জাতিগত অসহিষ্ণুতা ইউরোপের উদার সংস্কৃতির ক্ষয় ঘটাবে। যে মানসিকতা আধুনিক ইউরোপকে তার আত্মিক শক্তি দিয়েছে, এই ক্ষয় তার পক্ষে বিপজ্জনক। ৯/১১-র আক্রমণ মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রকে আগের চেয়ে নির্মম এবং সংকীর্ণ করে তুলেছে। নিরাপত্তার খাতিরে প্রণীত নতুন আইন নাগরিকদের ব্যক্তিগত পরিসরের মর্যাদা লঙ্ঘন করেছে, গোটা দেশে বিমানবন্দরগুলিতে তল্লাশি অস্বাভাবিক পর্যায়ে পৌঁছেছে, কুখ্যাত ‘ফিংগার টেস্ট’-এর সম্ভাবনা থেকে কোনও বিদেশি অতিথিই মুক্ত নন। মার্কিন নাগরিকরা নিরাপত্তার খাতিরে এ সবই মেনে নিয়েছেন। কিন্তু তার ফলে এক অর্থে তাঁদের জীবনসংগীত থেমে গিয়েছে। ইউরোপেও কি তা-ই হবে?
প্রথম চ্যালেঞ্জ নিরাপত্তা সংক্রান্ত। এক দল লোক যখন কোনও আদর্শের নামে ঠান্ডা মাথায় হত্যাকাণ্ড চালায়, নিজেদের জীবনেরও তোয়াক্কা করে না, কী ভাবে জাতীয় নিরাপত্তার প্রচলিত কাঠামোয় তাদের মোকাবিলা করা যায়? প্যারিসের ঘটনা দেখিয়ে দিয়েছে, নজরদারি এবং প্রতিরক্ষার বিরাট আয়োজনও আত্মঘাতী ‘ফিদাইন’ হামলার মহড়া নিতে প্রস্তুত ছিল না। ঠিক যেমন সাত বছর আগের আর এক নভেম্বরে মুম্বইয়ে পাকিস্তানি সন্ত্রাসীদের বিধ্বংসী আক্রমণ ভারতে নিরাপত্তা ব্যবস্থার দুর্বলতা চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিয়েছিল। সে দিন দেশ জুড়ে স্বভাবতই এই দুর্বলতার তীব্র সমালোচনাও শোনা গিয়েছিল।
আজও সামগ্রিক ভাবে ভারতে নিরাপত্তার ব্যবস্থাটি মোটামুটি একই জায়গায় দাঁড়িয়ে। এ দেশের শহরগুলি সন্ত্রাসের মোকাবিলায় অত্যন্ত অপ্রস্তুত। পুলিশ সিসিটিভি ক্যামেরার নজরদারিতে উদাসীন, নাগরিকরাও নিরাপত্তার ঘাটতি সম্পর্কে বিশেষ সচেতন নন। পরিবেশ দূষণ, অশাসন বা দুর্নীতির মতো নিরাপত্তার প্রশ্নেও নিয়তিবাদী ভারতবাসী ধরেই নিয়েছেন, যেমন চলছে, চলবে, এর চেয়ে ভাল কিছু আশা করে লাভ নেই।
ইউরোপের মানুষ কিন্তু প্রত্যাশা করেন যে, তাঁদের দেশের সরকার নাগরিকদের প্রয়োজন এবং চাহিদা মেটাতে অনেক বেশি তত্পর হবে। এই প্রত্যাশাকে অবহেলা করে কোনও সরকারই সেখানে টিকে থাকতে পারবে না। কিন্তু যে কোনও জায়গায় যে কোনও সময়ে ফিদাইন হানার যে আশঙ্কা তৈরি হয়েছে, ফ্রান্স এবং ইউরোপের অন্যান্য দেশের সরকার তাদের নাগরিকদের তা থেকে বাঁচাতে পারবে কি? লাগাতার নজরদারি চালিয়ে এবং বিপুলসংখ্যক গোয়েন্দা ও পুলিশ লাগিয়ে সমস্ত নাগরিককে নিরাপত্তা দেওয়া কি সত্যই সম্ভব?
নিরাপত্তা এই সব আয়োজন নিশ্চয়ই সন্ত্রাসের সম্ভাবনা কমাতে সাহায্য করবে, কিন্তু যত দিন পৃথিবীর কিছু এলাকায় ফিদাইনদের প্ররোচনা, প্রশিক্ষণ এবং প্রকরণ দেওয়ার বিশদ ব্যবস্থা চালু থাকবে, তত দিন সেই বিপদ পুরোপুরি দূর করা অসম্ভব। ইসলামের নামে যে আন্তর্জাতিক সন্ত্রাস চলছে, সিরিয়া, ইরাক, আফগানিস্তান এবং পাকিস্তানের কিছু এলাকা এখন তার প্রধান সূতিকাগার। সন্ত্রাসবাদীদের এই নিরাপদ ঘাঁটিগুলি ধ্বংস না হলে পৃথিবী নিরাপদ হবে না। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও তার ইউরোপীয় সহযোগীরা এই সমস্যাটি সম্পর্কে সচেতন হয়েই এমন কিছু কিছু এলাকায় হস্তক্ষেপ করেছে, যেখানে তাদের আক্রমণের ক্ষমতা আছে, যেমন হতদরিদ্র আফগানিস্তানে এবং সিরিয়া ও ইরাকে। সে সব দেশে তারা সরকার বদলানোর জন্য বদ্ধপরিকর হয়েছে। কিন্তু পাকিস্তান, কাতার, সৌদি আরব কিংবা তুরস্কের মতো দেশগুলি কোনও না কোনও ভাবে সন্ত্রাসের আগুনে ইন্ধন জোগালেও সেখানে কোনও হস্তক্ষেপের চেষ্টা দেখা যায়নি, কারণ তারা আমেরিকা ও ইউরোপের কাছে গুরুত্বপূর্ণ।
মনে রাখা দরকার, ইউরোপও মধ্য প্রাচ্যের এবং এশিয়া ও আফ্রিকার অন্য নানা অঞ্চলের গোলমেলে রাজনীতিতে আকণ্ঠ ডুবে থেকেছে। সিরিয়ায় প্রেসিডেন্ট বাশার আল আসাদকে উত্খাত করার জন্য যখন জঙ্গিদের প্রশিক্ষণ দিয়ে লড়াইয়ে পাঠানো হয়েছিল তখন তারা ছিল ‘ভাল’ সন্ত্রাসবাদী, ঠিক যেমন পাকিস্তান কাশ্মীরে ‘আজাদির সৈনিক’দের পাঠায়। আবার, তুরস্কের কাছে তারাই ‘ভাল’, যারা প্রতিবেশী সিরিয়া ও ইরাকে কুর্দদের বিরুদ্ধে লড়ছে। এরাই পরে ইসলামিক স্টেটের জঙ্গি হবে! তেমনই, সৌদি আরব ও কাতারের ওয়াহাবি শাসকরা বাগদাদে ও দামাস্কাসে বিধর্মীদের গদি থেকে টেনে নামানোর জন্য ‘ভাল’ জঙ্গিদের নিয়োগ করেছিল। এক কথায়, যে যার নিজের স্বার্থ ও সুবিধে মাফিক ‘ভাল’ জঙ্গিদের চিহ্নিত করে তাদের সাহায্য করেছে। রাষ্ট্রপুঞ্জে সন্ত্রাসের নির্দিষ্ট সংজ্ঞা স্থির করার সমস্ত চেষ্টা যে ক্রমাগত বানচাল হয়েছে, এটা তার একটা বড় কারণ। সন্ত্রাসের কোনও একটি সংজ্ঞা স্থির হলে তো আর সন্ত্রাসবাদীদের ভাল এবং খারাপ বলে ভাগ করা যাবে না! মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, এবং ফ্রান্স সহ কিছু ইউরোপীয় রাষ্ট্র এত দিন এই অনৈতিক খেলা চালিয়ে এসেছে। তারা কি এখন নিজেদের বদলাতে পারবে?
আশা কম। প্রবীণ ইউরোপের দুর্বল ও ক্লান্ত নেতারা অনেক কাল যাবত্ আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে সরাসরি নিজেদের জড়াতে চাননি, টাকা দিয়ে দায় সেরেছেন। তাঁরা কি এখন উঠে দাঁড়িয়ে শত্রুর মোকাবিলায় নামতে পারবেন? ভরসা হয় না। তাঁরা সম্ভবত নিজের নিজের দেশের নিরাপত্তায় বেশি টাকা ঢালবেন এবং বিমানবাহিনীর শক্তিবৃদ্ধিতে আরও বিনিয়োগ করবেন। এশিয়া ও আফ্রিকায় বোমাবর্ষণ বাড়বে। ইউরোপের নিরাপত্তা বাড়াতে হয়তো অনেক দেশের শাসকরা আরও টাকা পাবেন। তার বেশি কিছু হবে কি? এখানেই ইউরোপের প্রথম চ্যালেঞ্জ।
দ্বিতীয় চ্যালেঞ্জটিকে সাংস্কৃতিক বলা চলে। ফ্রান্স এবং উদার আধুনিক ইউরোপের অন্য দেশগুলির নাগরিকরা প্যারিসের ভয়াবহ হত্যাকাণ্ডের অভিঘাত কী ভাবে সামলাবেন? প্রথম ধাক্কাটা গিয়ে পড়বে পশ্চিম এশিয়ার বধ্যভূমি থেকে আসতে থাকা শরণার্থীদের উপরে। প্যারিস সন্ত্রাসের পরে ইউরোপের দক্ষিণপন্থীরা অনিবার্য ভাবে অভিবাসনের বিরুদ্ধে আরও বেশি খড়্গহস্ত হয়ে উঠেছেন। শরণার্থীদের বিরুদ্ধে তাঁদের অবস্থান আরও কঠোর হবে। করুণ পরিহাস এই যে, প্যারিস যে জঙ্গিদের শিকার হল, অধিকাংশ শরণার্থী তাদের তাড়নাতেই দেশ ছাড়তে বাধ্য হয়েছেন। তাঁদের ভবিষ্যত্ অন্ধকার। ইউরোপে দক্ষিণপন্থীদের বিরাগের অন্য লক্ষ্যটি হল সেখানকার মুসলিম মানুষজন। আর, এই বিরাগের ফলে তাঁদের মধ্যে বিচ্ছিন্নতাবোধ এবং অসন্তোষ আরও বাড়বে, সেটা আবার এশিয়া এবং আফ্রিকার চরমপন্থী ইসলামি জঙ্গিদের শক্তি বৃদ্ধি করবে।
সবচেয়ে উদ্বেগের কারণ হল, ধর্মীয় ও জাতিগত অসহিষ্ণুতা ইউরোপের উদার সংস্কৃতির ক্ষয় ঘটাবে। যে মানসিকতা আধুনিক ইউরোপকে তার আত্মিক শক্তি দিয়েছে, এই ক্ষয় তার পক্ষে বিপজ্জনক। ৯/১১-র আক্রমণ মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রকে আগের চেয়ে নির্মম এবং সংকীর্ণ করে তুলেছে। নিরাপত্তার খাতিরে প্রণীত নতুন আইন নাগরিকদের ব্যক্তিগত পরিসরের মর্যাদা লঙ্ঘন করেছে, গোটা দেশে বিমানবন্দরগুলিতে তল্লাশি অস্বাভাবিক পর্যায়ে পৌঁছেছে, কুখ্যাত ‘ফিংগার টেস্ট’-এর সম্ভাবনা থেকে কোনও বিদেশি অতিথিই মুক্ত নন। মার্কিন নাগরিকরা নিরাপত্তার খাতিরে এ সবই মেনে নিয়েছেন। কিন্তু তার ফলে এক অর্থে তাঁদের জীবনসংগীত থেমে গিয়েছে। ইউরোপেও কি তা-ই হবে?

No comments:
Post a Comment