Sunday, November 29, 2015

উচ্চশিক্ষা মানের বেহালদশা গবেষণা বরাদ্দ নেই ৩৮ বিশ্ববিদ্যালয়ে

শিক্ষা দান ও নতুন জ্ঞান সৃষ্টিই হলো বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর মৌলিক কাজ। এই জ্ঞান সৃষ্টির জন্য সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন গবেষণা। সারা বিশ্ব গবেষণাকে প্রাধান্য দিয়ে যখন উচ্চশিক্ষা দিচ্ছে, ঠিক তখন বাংলাদেশে উচ্চশিক্ষার উল্টো চিত্র। ২০১৪ সালের সরকারি ও বেসরকারি ১১৫টি বিশ্ববিদ্যালয়ের মধ্যে ৩৭টি গবেষণা খাতে কোনো বরাদ্দ রাখেনি। এর মধ্যে বেসরকারি ২৭টি আর সরকারি ১১টি। যা মোট বিশ্ববিদ্যালয়ে ৩২% বেশি। এসব কারণে ইউজিসি সর্বশেষ বার্ষিক প্রতিবেদনে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের স্নাতকদের মান নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন। বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ে গবেষণার এমন বেহাল দশাকে উদ্বেগজনক মন্তব্য করেছেন শিক্ষাবিদরা। সম্প্রতি বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশন (ইউজিসি) ৪১তম বার্ষিক প্রতিবেদনে এসব চিত্র উঠে এসেছে। গত বৃহস্পতিবার প্রেসিডেন্ট আবদুল হামিদের কাছে প্রতিবেদনটি পেশ করা হয়েছে। বার্ষিক প্রতিবেদনে ২০১৪ সালের উচ্চশিক্ষার সার্বিক চিত্র তুলে আনা হয়েছে। সেখানে গবেষণা অংশে বলা হয়েছে, ২০১৪ সালে ৮০টি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষা কার্যক্রম পরিচালিত করেছে। এর মধ্যে ৩৭টি বিশ্ববিদ্যালয় গবেষণা খাতে কোনো বরাদ্দ রাখেই না। ২০১৩ সালে ১৯টি বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষণা খাতে কোনো বরাদ্দ ছিল না। আর ৩৫টি সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের মধ্যে ১০টিতে ছিল না গবেষণা খাতের কোনো বরাদ্দ। এ গবেষণা না রাখার পিছনে দুটি কারণকে চিহ্নিত করেছে শিক্ষা মন্ত্রণালয় ও ইউজিসি। সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে অপ্রতুল বরাদ্দ আর বেসরকারিগুলোতে অর্থসংক্রান্ত আইনের দুর্বলতা। ইউজিসির প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, সার্বিকভাবে ২০১৪ সালে গবেষণা খাতে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর ব্যয় ২০১৩ সালের তুলনায় বেড়েছে। ২০১৩ সালে গবেষণায় বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর ব্যয় ছিল ৫৮ কোটি টাকা, যা ২০১৪ সালে বেড়ে দাঁড়ায় ৬৯ কোটি ৮৫ লাখ টাকায়। এর মধ্যে সর্বোচ্চ একাই ব্যয় করেছে ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয় ৩৯ কোটি ৯২ লাখ টাকা।এ বিষয়ে ইউজিসির সাবেক চেয়ারম্যান ড. একে আজাদ চৌধুরী মানবজমিনকে বলেন, গবেষণা ছাড়া কোয়ালিটি ধরে রাখা খুব কঠিন। গবেষণার জন্য টাকা দরকার এটা কে শোনে। সরকার বা বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের মালিকরা যদি না শোনে এখানে মঞ্জুরি কমিশনের কী করার আছে। সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে যে বরাদ্দ দেয়া হয়, তার ৮০ থেকে ৮৫ ভাগ টাকা চলে যায় শিক্ষক-কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতন বরাদ্দ বাবদ। এরপর অবকাঠামোসহ মৌলিক কিছু কাজ করতে হয় প্রতি বছর। তাছাড়াও বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে চাপ প্রয়োগ করা যায় না অর্থসংক্রান্ত আইনের কারণে। আর এ নিয়ে সংসদে একটি আইন পাস করার জন্য উদ্যোগ নেয়া হলে এমপিদের তোপের মুখে কয়েকবার বাদ পড়েছে।গবেষণায় বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের চিত্র : ট্রাস্টের অধীনে পরিচালিত হলেও বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলো এখন লাভজনক প্রতিষ্ঠানে পরিণত হয়েছে। দেশে বর্তমানে ৮৫টি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের অনুমোদন রয়েছে। এরমধ্যে ২০১৪ সালে ৮০টি শিক্ষা কার্যক্রম চালিয়েছে। এর মধ্যে ২৭টি বিশ্ববিদ্যালয় গবেষণা খাতের কোনো বরাদ্দ রাখেনি। যা মোট ৩৩ দশমিক ৭৫ ভাগ। আর ৩৯টির কোনো গবেষণা প্রকল্প ছিল না। করেনি কোনো প্রকাশনা বা সাময়িকী প্রকাশ। বাকিরা নামমাত্র গবেষণা খাতে বরাদ্দ রেখে দায় সেরেছে। সব বিষয়ে মোট বরাদ্দের অর্ধেক ব্যয় করেছে একটি বিশ্ববিদ্যালয়। বরাদ্দ না রাখার মধ্যে ছিল প্রথম ক্যাটাগরির কয়েকটি বিশ্ববিদ্যালয়। আর মাত্র ৫টি বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষণা খাতে বরাদ্দ নিয়ে সন্তোষ প্রকাশ করেছে ইউজিসি। ব্র্যাক, ইন্ডিপেনডেন্ট, স্টামফোর্ড, আমেরিকা ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি ও ইউনিভার্সিটি অব লিবারেল আর্টস অব বাংলাদেশ সন্তোষজনক বরাদ্দ রেখেছে। যেসব বিশ্ববিদ্যালয়ে কোনো বরাদ্দ ছিল না সেগুলো হলো, সিটি ইউনিভাসিটি, ইস্টার্ন ইউনিভার্সিটি, রয়েল ইউনিভার্সিটি, সিলেট ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি, সেন্ট্রাল উইমেন্স ইউনিভার্সিটি, পিপলস ইউনিভার্সিটি, বিজিসি ট্রাস্ট, অতীশ দীপঙ্কর, দারুল ইহসান, ইউরোপিয়ান ইউনিভার্সিটি, এক্সিম ব্যাংক কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়, ঈশাখাঁ ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি, নর্থ ওয়েস্টার্ন ইউনিভার্সিটি, ফেনী ইউনিভার্সিটি, ব্রিটিনিয়া ইউনিভার্সিটি, চিটাগাং ইন্ডিপেনডেন্ট, নটরডেম, টাইমস, নর্থবেঙ্গল ইন্টারন্যাশনাল, ফারইস্ট ইন্টারন্যাশনাল, রাজশাহী সাইন্স অ্যান্ড টেকনোলজি, শেখ ফজিলাতুন্নেছা মুজিব ইউনিভার্সিটি, কক্সবাজার ইন্টারন্যাশনাল, রণদা প্রসাদ সাহা ইউনিভার্সিটি, জার্মান ইউনিভার্সিটি, গ্লোবাল ইউনিভার্সিটি এবং সিসিএন বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়।গবেষণায় সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের চিত্র : সম্পূর্ণ সরকারি অর্থায়নে চললেও সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে চলছে গবেষণার বেহাল দশা। ২০১৪ সালে ৩৫টি বিশ্ববিদ্যালয়ের মধ্যে ১১টিতে ছিল না কোনো গবেষণা বরাদ্দ। যা সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের ২৮% বেশি। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় (ময়মনসিংহ), বুয়েট, জাহাঙ্গীরনগর ছাড়া বাকিদের ছিল না উল্লেখযোগ্য কোনো বরাদ্দ। এছাড়াও ১৪টি বিশ্ববিদ্যালয় এক বছরে কোনো প্রকাশনা দেখাতে পারেনি। দেশের একমাত্র মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয় বঙ্গবন্ধু মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়ে ছিল না কোনো বরাদ্দ। বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়গুলো ছিল বরাদ্দের দিক থেকে পিছিয়ে। যেসব বিশ্ববিদ্যালয় গবেষণা খাতে বরাদ্দ রাখেনি সেগুলো হলো ইসলামি বিশ্ববিদ্যালয় কুষ্টিয়া, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়, পটুয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়, নোয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়, সিলেট কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়, পাবনা বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি, বাংলাদেশ টেক্সটাইল, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেরিটাইম, জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় এবং বাংলাদেশ উন্মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয়।  
এ বিষয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজি বিভাগের অধ্যাপক সৈয়দ মনজুরুল ইসলাম মানবজমিনকে বলেন, শিক্ষাদান ও নতুন জ্ঞান সৃষ্টি করাই হলো উচ্চশিক্ষা। এই দুটি বিষয় নিশ্চিত করতে দরকার প্রচুর গবেষণা। কিন্তু বাংলাদেশে উচ্চশিক্ষায় গবেষণার অবস্থা খুবই খারাপ। বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলো গবেষণা নেই বলে চলে। ইউজিসি যেসব তথ্য দিচ্ছে তাতে উচ্চশিক্ষার অবস্থা খুবই বেহাল বলে মনে হচ্ছে। এটাকে আমি উদ্বেগ ও আতঙ্কজনক বলে মনে করি। তিনি বলেন, গবেষণা ছাড়া একটি বিশ্ববিদ্যালয় চিন্তাই করা যায় না। নতুন জ্ঞান সৃষ্টি করতে না পারলে প্রাইমারি, মাধ্যমিক স্কুলের সঙ্গে বিশ্ববিদ্যালয়ের কোনো তফাৎ থাকে না।ইউজিসি চেয়ারম্যান বলেন, বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় আইন-২০১০ অনুযায়ী প্রত্যেকটি বিশ্ববিদ্যালয় তাদের বার্ষিক বাজেটের একটি উল্লেখযোগ্য অংশ গবেষণা কাজে ব্যয় করার কথা। কিন্তু উচ্চশিক্ষার এ প্রতিষ্ঠানগুলো এই বাধ্যবাধকতা মানছে না। আমি তাদের চাপ দিতে পারি না। কারণ, আইনে অর্থসংক্রান্ত দুর্বলতা রয়েছে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইমেরিটাস প্রফেসর সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী বলেন, গবেষণা খাতে কোনো বরাদ্দ নেই বা গবেষণা করেনি এগুলো বিশ্ববিদ্যালয়ে মানা যায় না। কারণ, বিশ্ববিদ্যালয় মানে হচ্ছে জ্ঞান সৃষ্টি করা। সেখানে গবেষণা না করে জ্ঞান সৃষ্টি সম্ভব নয়। আর বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর যথেষ্ট টাকা থাকার পরও গবেষণায় ব্যয় না করা দুঃখজনক।

No comments:

Post a Comment