Thursday, November 26, 2015

ভিসা পেলেও ছাড়পত্র মিলছে না লিবিয়ার

শ্রমিক চাহিদা আছে, আছে নিয়োগের বৈধ ক্ষমতাপত্র। দূতাবাস সত্যতা নিশ্চিত হওয়ার পর ভিসাও ইস্যু করেছে। কিন্তু সরকারি নিষেধাজ্ঞায় লিবিয়া যাওয়ার ছাড়পত্র পাচ্ছেন না দেশের কয়েক হাজার শ্রমিক। তাদের তরফে নিয়োগকারী এজেন্সি এবং এজেন্সিগুলোর সংগঠন বায়রার প্রতিনিধিরা সরকারের সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় ও কর্তাব্যক্তিদের কাছে ধরনা দিচ্ছেন। কিন্তু ফল মিলছে না। উল্টো এজেন্সিগুলোর তৎপরতায় বিদ্যমান নিষেধাজ্ঞা আরও জোরদার করার উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। নিষেধাজ্ঞা ফের হালনাগাদ করা সংক্রান্ত পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের বিশেষ নির্দেশনা প্রবাসীকল্যাণ মন্ত্রণালয়ে গত সপ্তাহেই পৌঁছেছে বলে বিভিন্ন সূত্র নিশ্চিত করেছে। সূত্র মতে, দীর্ঘদিন ধরে যুদ্ধবিধ্বস্ত লিবিয়ায় বাংলাদেশীদের ভ্রমণে নিষেধাজ্ঞা জারি রয়েছে। সম্প্রতি দেশটির অবস্থার খানিক পরিবর্তনে সেখানে বাংলাদেশ থেকে কর্মী পাঠাতে পারে কি না, সেই মতামত জানতে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে চিঠি পাঠায় প্রবাসীকল্যাণ মন্ত্রণালয়। চিঠিতে বিদেশে কর্মী প্রেরণকারী এজেন্টদের সংগঠন বায়রা প্রদত্ত তথ্যের উদ্ধৃতি দিয়ে দেশী রিক্রুটিং এজেন্সিগুলোর অনুকূলে পাঠানো লিবিয়ান বিভিন্ন নিয়োগকারী প্রতিষ্ঠানের চাহিদাপত্রের সত্যতা এবং কর্মীদের চাকরির নিশ্চয়তা যাচাই করে ঢাকাস্থ লিবিয়ান দূতাবাস ইতিমধ্যে ৪-৫ হাজার বাংলাদেশীকে ভিসা দিয়েছে। তারা সরকারের ছাড়পত্রের অপেক্ষায় রয়েছে। ওই কর্মীদের প্রত্যেকের জন্য বায়রা লাইফ ইন্স্যুরেন্স কোম্পানি ১ থেকে ৫ লাখ টাকার জীবন বীমা করানোর অঙ্গীকার করেছে। এ অবস্থায় লিবিয়ায় পুনরায় কর্মী পাঠানো শুরু করা যায় কি না তা জানতে চায় প্রবাসীকল্যাণ মন্ত্রণালয়। এদিকে ওই চিঠি পাঠানোর আগেই বায়রার পক্ষ থেকে পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রীসহ মন্ত্রণালয়ের বিভিন্ন পর্যায়ে চিঠি পাঠিয়ে নিষেধাজ্ঞা তুলে নেয়ার জন্য অনুরোধ জানানো হয়। পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রীর নির্দেশনা মতে মন্ত্রণালয়ের আফ্রিকা অনুবিভাগ দেশটির সর্বশেষ অবস্থার বিষয়ে ত্রিপলী থেকে তিউনেশিয়ায় (সাময়িকভাবে) স্থানান্তরিত বাংলাদেশ দূতাবাসের কাছে বিস্তারিত রিপোর্ট চায়। সরকারের দায়িত্বশীল একটি সূত্র মতে, রাষ্ট্রদূত প্রায় দুই পৃষ্ঠার একটি রিপোর্ট দিয়েছেন। সেখানে তিনি দেশটিতে থাকা বাংলাদেশীদের নানা অসুবিধার কথা জানিয়েছেন এবং নতুন করে কর্মী প্রেরণ না করার সুপারিশ করেছেন। মন্ত্রণালয় ওই রিপোর্ট পাওয়ার পর দেশটিতে বাংলাদেশীদের ভ্রমণে বিদ্যমান নিষেধাজ্ঞা আরও জোরদার করার সিদ্ধান্ত নেয় বলে জানানো হয়েছে। সূত্র মতে, পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় গত সপ্তাহেই ফিরতি চিঠিতে দিয়েছে প্রবাসীকল্যাণ মন্ত্রণালয়কে। সেখানে বলা হয়েছে- বিভিন্ন মিলিশিয়ার অন্তর্দ্বন্দ্বে লিবিয়ায় দীর্ঘদিন ধরে যুদ্ধাবস্থা বিরাজ করছে। দেশটির স্বাভাবিক জীবনযাত্রা স্থবির হয়ে পড়েছে। এ অবস্থায় নিরাপত্তা বিধানকল্পে পরিস্থিতি স্বাভাবিক না হওয়া পর্যন্ত বাংলাদেশীদের লিবিয়া ভ্রমণের ওপর আরোপিত নিষেধাজ্ঞা অব্যাহত থাকবে। লিবিয়ার বিষয়ে সরকারের সিদ্ধান্তের বিষয়ে দৃষ্টি আকর্ষণ করা হলে পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শাহরিয়ার আলম মানবজমিনকে নিষেধাজ্ঞা জোরদারের বিষয়টি নিশ্চিত করেন।  বলেন, দেশটির অবস্থা এখনও বিপজ্জনক পর্যায়ে রয়েছে। দেশটির বাংলাদেশ দূতাবাস ছাড়াও আশপাশের দেশগুলোতে থাকা মিশনগুলো রিপোর্ট পাঠাচ্ছে জানিয়ে সরকারের ওই প্রতিনিধি বলেন, আমরা নিয়মিতভাবে পরিস্থিতি পর্যালোচনা করছি। দেশটিতে কর্মী প্রেরণের অনুকূল পরিবেশ এখনও নেই। যারা সেখানে রয়ে গেছেন তারা নানা রকম অসুবিধায় রয়েছেন। এ জন্য নতুন কাউকে না পাঠানোর বিষয়ে আগের সিদ্ধান্ত বহাল রয়েছে বলে জানান তিনি।
বায়রার আবেদন: লিবিয়াগামী কর্মীদের ছাড়পত্র প্রদানের বিষয়ে বাংলাদেশ অ্যাসোসিয়েশন অব ইন্টারন্যাশনাল রিক্রুটিং এজেন্সিস (বায়রা) নবনিযুক্ত প্রবাসী কল্যাণ মন্ত্রী নূরুল ইসলাম বিএসসি এবং পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শাহরিয়ার আলম এমপি বরাবর দুটি আবেদন করেছে। প্রায় অভিন্ন ভাষায় সংগঠনটির পক্ষ থেকে লিবিয়ার শ্রমবাজারে বাংলাদেশীদের সম্ভাবনা এবং কয়েক হাজার কর্মীর ভিসা পাওয়ার পরও ছাড়পত্র না পাওয়ার বিড়ম্বনার কথা তুলে ধরা হয়েছে। আবেদনে বলা হয়-  লিবিয়ার বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান বাংলাদেশ থেকে কর্মী নিয়োগের বিষয়ে যে চাহিদাপত্র এবং ক্ষমতাপত্র দিয়েছে সেটি স্বনির্ধারণী প্রক্রিয়ায় যাচাই করেছে ঢাকাস্থ লিবিয়ান দূতাবাস। তারা এর সত্যতা পেয়ে ৪-৫ হাজার ভিসা ইস্যু করেছে। ভিসা পাওয়ার পরও দেশটিতে রাজনৈতিক অস্থিরতা বিরাজমান; গত দুই থেকে আড়াই মাস যাবৎ কোন কর্মী প্রেরণের চেষ্টা করা হয়নি। বর্তমানে পরিস্থিতির উন্নতি ঘটেছে এবং স্বাভাবিক অবস্থা বিরাজ করছে জানিয়ে বায়রা সরকারের সংশ্লিষ্ট দুই প্রতিনিধিকে জানায়, যেসব প্রতিষ্ঠান কর্মী নেয়ার চাহিদাপত্র দিয়েছিল তারা রিক্রুটিং এজেন্সিগুলোকে কর্মী প্রেরণের জন্য চাপ দিচ্ছে। ভিসা হওয়ার পরও কর্মী পাঠাতে না পারায় লিবিয়ান প্রতিষ্ঠানগুলোর কাজে বিঘ্ন ঘটছে জানিয়ে বায়রার আবেদনে বলা হয়, যেসব কর্মী ভিসা পেয়েছেন তাদের মেয়াদ স্বল্প সময়ের মধ্যে উত্তীর্ণ হয়ে যাবে। এতে প্রতিটি কর্মী আর্থিক ও সামাজিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হবেন। ফলে তারা হতাশায় নিমজ্জিত হবেন এবং দেশ বিপুল বৈদেশিক মুদ্রা থেকে বঞ্চিত হবে। বায়রার আবেদনে জীবনবীমার বিষয়টিও উল্লেখ করা হয়। সেই সঙ্গে কোন রকম অস্বচ্ছতা বা বীমা করা ছাড়া কোন কর্মী প্রেরণ না করার দৃঢ় অঙ্গীকার ব্যক্ত করা হয়। আবেদনে দেশের বিদ্যমান বেকারত্ব বিবেচনায় ভিসা পাওয়া কর্র্মীদের ছাড়পত্র প্রদানের সুযোগ দেয়ার আবেদন জানায় বায়রা।দূতাবাসের রিপোর্টে যা বলা হয়েছে: তিউনিশিয়ায় অবস্থানরত লিবিয়ায় বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূত মেজর জেনারেল শহীদুল হক সর্বশেষ যে রিপোর্ট পাঠিয়েছেন সেখানে তিনি পুরো পরিস্থিতি ব্যাখ্যা করেছেন। বিভিন্ন সূত্রে প্রাপ্ত তথ্য মতে, ওই রিপোর্টে দেশটিতে থাকা বাংলাদেশীদের ৪টি অসুবিধার কথা তুলে ধরেন তিনি। জানান, ২০১১ সাল থেকে দেশটিতে যুদ্ধাবস্থা বিরাজমান থাকায় বর্তমানে অনেক প্রতিষ্ঠান বন্ধ হয়ে গেছে। সরকারি প্রকল্পগুলোতেও স্থিতাবস্থা চলছে। সেখানে কাজের সুযোগ কমে এসেছে। দ্বিতীয়ত, বাংলাদেশী যারা আছেন, তারা অল্পসংখ্যক কোম্পানিতে কাজে আছেন। কিন্তু তাদের ৬ মাস থেকে ১ বছরের বেতন নেই। তৃতীয়ত, শ্রমিকদের নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ রয়েছে। অনেকে অস্ত্রধারী ডাকাতদের কবলে পড়ে সর্বস্ব হারিয়েছেন। চতুর্থ এবং সর্বশেষ, যে বিষয়ে রিপোর্টে দৃষ্টি আকর্ষণ করা হয়েছে তাহলো- এত অসুবিধার পরও যারা কাজ করছেন এবং কিছু আয় রোজগার করছেন তারা দেশে অর্থ প্রেরণ করতে পারছেন না।

No comments:

Post a Comment