Sunday, December 6, 2015

চট্টগ্রামে অনড় বিদ্রোহীরা, পিতার জায়গায় কৌশলে পুত্র

চট্টগ্রামে ২০১১ সালে সর্বশেষ অনুষ্ঠিত পৌরসভা নির্বাচনে রাউজানে মেয়র নির্বাচিত হয়েছিলেন বিএনপি সমর্থিত প্রার্থী আবদুল্লাহ আল হাছান। তিনি জাহাজ প্রতীক নিয়ে জিতেছিলেন ৯ হাজার, ৯৭৩ ভোট পেয়ে।  তার নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী এবারের আওয়ামী লীগ প্রার্থী দেবাশীষ পালিত পেয়েছিলেন ৮ হাজার ৬৯৬ ভোট। মাত্র ১২৭৭ ভোটের ব্যবধানে সেবার  পরাজিত হয়েছিলেন তিনি।  এবার দল ক্ষমতায় এলেও জয়ের ব্যাপারে কিছুটা শঙ্কিত দেবাশীষ। কারণ নিজ দুর্গ রাউজানেই দাঁড়িয়ে গেছে তার দলের আরও দুই বিদ্রোহী প্রার্থী। নির্বাচনে গতবারের ভোটের ব্যবধান কমিয়ে আনার পরিকল্পনা করা হলেও সবকিছুই ভেস্তে যাবে যদি ভোট কেটে ফেলে বিদ্রোহীরা। তাই এই নিয়ে ঘুম হারাম ক্ষতাসীন দলের প্রভাবশালী এই প্রার্থীর। যদিও জয়ের ব্যাপারে শতভাগ আশাবাদী বলে জানালেন তিনি।
তবে কেবল রাউজানেই নয়, চট্টগ্রামের ১০ পৌরসভার অন্তত ৪টি এলাকাতেই এখন আওয়ামী লীগের শত্রু আওয়ামী লীগ। মনোনয়ন জমা দিয়েছেন একাধিক প্রার্থী। এদের কেউ নির্বাচন করছেন স্থানীয় এমপিদের ভরসায়। কেউবা ক্ষমতাসীন দলের এমপিদের আশীর্বাদপুষ্ট হয়ে জয়ের ব্যাপারে আড়ালে চালাচ্ছেন প্রচারণা। আবার কৌশলে মনোনয়ন না পেয়ে বাবা দাঁড় করিয়েছেন পুত্রকে।  দলীয় মনোনয়ন নিয়ে যারা নির্বাচন করছেন তাদের অনেকেই তাই এখন বিদ্রোহীদের দমাতে দ্বারস্থ হচ্ছেন আওয়ামী লীগের যুগ্ম মহাসচিব মাহবুবুল আলম হানিফ কিংবা চট্টগ্রাম উত্তর জেলার আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক এমএ সালাম এর কাছে। দ্বারস্থ হচ্ছেন নগর আওয়ামী লীগের আরেক নেতা মহিউদ্দিন চৌধুরী ও মন্ত্রী ইঞ্জিনিয়ার মোশাররফের বাসায়ও।  তবে মনোনয়নপত্র প্রত্যাহারের জন্য আরও কিছুদিন সময় থাকায় দলের সিনিয়র নেতারা আশাবাদী বিদ্রোহীদের অনেকেই নিজেদের সরিয়ে নেয়ার ঘোষণা দেবেন। এ বিষয়ে জানতে চাইলে অনেক প্রার্থীই বলেছেন প্রয়োজনে বহিষ্কার হবেন, তবুও জনগণের আশা-আকাঙ্ক্ষা পূরণে নির্বাচন থেকে সরবেন না।  স্থানীয় সূত্র জানায়, রাউজান ছাড়াও সীতাকুণ্ড, বারৈয়ারহাট ও রাঙ্গুনিয়ায় আওয়ামী লীগের রয়েছেন বিদ্রোহী প্রার্থী। রাউজানে আওয়ামী লীগ থেকে বিদ্রোহী প্রার্থীর তালিকায় রয়েছেন সাইফুল ইসলাম চৌধুরী ও আনোয়ারুল ইসলাম। এবার স্থানীয় এমপি ফজলে করিমের সমর্থন পেয়েও দল থেকে মনোনয়ন পাননি সাইফুল ইসলাম চৌধুরীর পিতা শফিকুল ইসলাম চৌধুরী।  যিনি গতবার আনারস প্রতীক নিয়ে পেয়েছিলেন ৪ হাজার ৪৫৪ ভোট। আর তার সঙ্গে আরেক প্রার্থী আনোয়ার পেয়েছিলেন ২ হাজার ৫৯৫ ভোট। এবার দুই প্রার্থীর ভোটের সঙ্গে দলীয় প্রার্থীর ভোট যোগ করলে হাড্ডাহাড্ডি লড়াই হবে বলে ধারণা স্থানীয়দের।  অন্যদিকে সীতাকুণ্ডে মেয়র প্রার্থী আওয়ামী লীগের শফিউল আলম কিছুতেই মনোনয়ন প্রত্যাহার করবেন না বলে জানান। তিনি বলেন, আমি জনগণের সঙ্গে আছি। দল আমাকে সমর্থন দিচ্ছে। তাই জয় আমার সুনিশ্চিত। নির্বাচন করে সবার প্রত্যাশা পূরণ করবো।  এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, আওয়ামী লীগ থেকে অনেকেই নিজেদের দলীয় প্রার্থী বলে পরিচয় দিচ্ছেন। তারা এখনও কেন্দ্রের কোন কাগজপত্র হাতে পাওয়ার কথা জানাতে পারেননি।  সীতাকুণ্ড আওয়ামী লীগের একটি সূত্র জানায়, এই এলাকায় দল থেকে মনোনয়ন দেয়া হয়েছে পৌর আওয়ামী লীগের সভাপতি বদিউল আলমকে। জেলা কমিটি তাকে একক প্রার্থী হিসেবে কেন্দ্রের কাছে প্রস্তাব দিয়েছে।  কিন্তু প্রথমে শফিউল আলমকে মনোনয়ন দেয়ার একদিন পর তা প্রত্যাহার করে নেয়া হয় বদিউল আলমকে। এই নিয়ে ক্ষোভের সঞ্চার হয়। দ্বিাধাবিভক্ত হয়ে পড়ে আওয়ামী  ভোটব্যাংক। কেবল তাই নয়, এখান থেকে আরও প্রার্থী হয়েছেন সহ-সভাপতি সিরাজ উদ দৌলা।  বারৈয়ারহাট এলাকায় মনোনয়ন পেয়েছেন আওয়ামী লীগের পৌর সভাপতি নিজাম উদ্দিন। যিনি পরিচিত ভিপি নিজাম বলে। মন্ত্রী ইঞ্জিনিয়ার মোশাররফের আশীর্বাদপুষ্ট হলেও  সেখানে চলছে ক্ষোভের আগুন। কারণ এখানে আরও প্রার্থী হয়েছেন পৌর আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক রেজাউল করিম, সহ-সভাপতি ফজলুল করিম। জানতে চাইলে ফজলুল করিম বলেন, দল আমাকে মনোনয়ন দেয়নি সত্য। তবে আমাকে জনগণ চাইছে। তাই নির্বাচন করবো। আমি জিতে প্রয়োজনে দলের কাছে আমার গুরুত্ব তুলে ধরবো।  অন্যদিকে রাঙ্গুনিয়ায় দলীয় মনোনয়ন পেয়েছেন আওয়ামী লীগের ধর্ম বিষয়ক সম্পাদক শাহজাহান সিকদার। কিন্তু তাকে মেনে নেয়নি সেখানকার আরো এক প্রার্থী। ঘোষণা দিয়েছেন নির্বাচন করার। গতকাল শুক্রবার জুমার নামাজের পর রাঙ্গুনিয়ায় ভোট চাইতে দেখা যায় বিদ্রোহী প্রার্থী কামরুল ইসলামকে। তিনি জেলা আওয়ামী লীগের বন ও পরিবেশ বিষয়ক সম্পাদক।  জানতে চাইলে তিনি বলেন, মনোনয়ন প্রত্যাহারের বিষয়ে এখনও কোন কথা হয়নি কারো সঙ্গে। শেষ পর্যন্ত দল আমাকে মূল্যায়ন করবে। আমি নির্বাচন করার মানসিকতা থেকে নেমে পড়েছি।  এই বিষয়ে জানতে চাইলে কথা হয় উত্তর জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক এমএম সালাম এর সঙ্গে। তিনি বলেন, বিদ্রোহীরা মনোনয়ন প্রত্যাহার না করলে বহিষ্কার হয়ে যাবেন। নইলে দল তাদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেবে। তবে আমরা আশা করছি রাউজান, রাঙ্গুনিয়া, সীতাকুণ্ড ও বারৈয়ারহাটে যারা দলীয় প্রার্থীর বিরুদ্ধে দাঁড়িয়েছেন তারা দলের বাইরে যাবেন না।’ তিনি আরও বলেন, নির্বাচনে গতবারের চেয়ে এবার আওয়ামী লীগের অনেক শক্ত প্রার্থী রয়েছেন। তাছাড়া গত ৫ বছর ধরে জনগণের সঙ্গে কাজ করার সুযোগও হয়েছে তাদের। একাধিক প্রার্থীর বিষয়ে দলীয় হাইকমান্ড ভাবছে। সবাই দল থেকে নির্বাচন করতে চাইলে তা তো সম্ভব নয়।’

No comments:

Post a Comment