একাত্তরের নৃশংসতা অস্বীকার করে পাকিস্তানের দেয়া অসত্য বক্তব্যে তীব্র
প্রতিক্রিয়া তৈরি হয়েছে বাংলাদেশে। দল-মত নির্বিশেষে সবাই ওই বক্তব্যের
প্রতিবাদ জানিয়েছেন। পাকিস্তানের সঙ্গে কূটনৈতিক সম্পর্ক পুনর্বিবেচনারও
আহবান জানানা হয়েছে। দেশটির সঙ্গে বাংলাদেশের কূটনৈতিক সম্পর্ক বর্তমানে
সর্বনিম্ন পর্যায়ে পৌঁছেছে বলে মনে করেন সরকারের তথ্যমন্ত্রী হাসানুল হক
ইনু। ‘পাকিস্তান শত্রু রাষ্ট্রে অবতীর্ণ হয়েছে’ মন্তব্য করে রাতে বিবিসি
বাংলাকে তিনি বলেন- সে কারণে দেশটির সঙ্গে কূটনৈতিক সম্পর্কের বিষয়টি
পুনর্বিবেচনা করা উচিত। এ নিয়ে সরকার গভীরভাবে আলোচনার পাশাপাশি
পাকিস্তানের পদক্ষেপ পর্যবেক্ষণ করছে বলেও জানিয়েছেন তথ্যমন্ত্রী। এদিকে
পাকিস্তানের বক্তব্য নিয়ে সেগুনবাগিচার পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে গতকাল এক
পর্যালোচনা বৈঠক হয়েছে। বৈঠকের বিষয়ে পররাষ্ট্র দপ্তরের তরফে আনুষ্ঠানিক
কিছু বলা হয়নি, তবে সূত্র জানিয়েছে- কিভাবে পাকিস্তানকে জবাব দেয়া উচিত তা
নিয়ে সেখানে আলোচনা হয়েছে। ওদিকে ইসলামাবাদে নিযুক্ত বাংলাদেশের ভারপ্রাপ্ত
হাইকমিশনারকে তলবের পর পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শাহরিয়ার আলম এমপি
তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়ায় গণমাধ্যমকে বলেন, সম্প্রতি যে দু’টি বিষয় সামানে
আনার চেষ্টা করছে পাকিস্তান, তা পুরোপুরি অসত্য। তারা এ নিয়ে এত দিন কোনো
কথা বলেনি। স্বাধীনতা যুদ্ধকালে পাকিস্তানি বাহিনী এখানে যে নৃশংসতা
চালিয়েছে তা দেশি-বিদেশি সবাই জানেন উল্লেখ করে প্রতিমন্ত্রী বলেন, তারপরও
তারা অসত্য বক্তব্য দিয়ে চলেছে। দ্বিতীয়ত; ১৯৭৪ সালে নয়া দিল্লিতে
বাংলাদেশ, ভারত ও পাকিস্তানের মধ্যে সম্পাদিত ঐতিহাসিক ত্রিদেশীয় চুক্তির
বিষয়টি পাকিস্তান ‘বিকৃতভাবে’ উপস্থান করেছে তাদের বিবৃতিতে, যা অত্যন্ত
দুঃখজনক। একাত্তরে পাকিস্তানি বাহিনীর অপরাধে সহযোগিতার দায়ে বাংলাদেশ
জাতীয়তাবাদী দল বিএনপির নেতৃত্বাধীন জোটের দুই প্রভাবশালী নেতা সালাউদ্দিন
কাদের চৌধুরী ও আলী আহসান মোহাম্মদ মুজাহিদের মৃত্যুদ- কার্যকরের পর
প্রতিক্রিয়া দেখায় ইসলামাবাদ। দেশটির বেশ ক’জন রাজনৈতিক নেতৃত্বের বিবৃতি
ছাড়াও পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্রের বরাতে আনুষ্ঠানিক বিজ্ঞপ্তিতে
প্রকাশ করা হয়। বাংলাদেশ ওই বিবৃতি ও বিজ্ঞপ্তির ‘কড়া প্রতিবাদ’ জানায়।
ঢাকায় নিযুক্ত দেশটি হাইকমিশনারকে তলব করে বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে
পাকিস্তানের নগ্ন হস্তক্ষেপ বন্ধে প্রতিবাদ নোট দেয়া হয়। ওই নোটের জবাব
দিতে ইসলামাবাদে রাষ্ট্রদূতের দায়িত্বে থাকা পলিটিক্যাল কাউন্সিলর ও
চ্যান্সারি প্রধান মৌসুমী রহমানকে ডেকে নেন পাকিস্তান পররাষ্ট্র দপ্তরের
এসএস অ্যান্ড সার্ক বিভাগের মহাপরিচালক। সেই সঙ্গে মন্ত্রণালয়ের ওয়েবসাইটে
এক বিবৃতি দিয়ে একাত্তরের নৃশংসতা অস্বীকার করে দেশটির সরকার। বাংলাদেশের
ভারপ্রাপ্ত দূতকে ডেকে নেয়ার ঘটনাকে ‘তলব’ না বলে পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী
শাহরিয়ার আলম গণমাধ্যমকে জানান, কাউন্সিলর সেখানে গিয়েছিলেন, বাংলাদেশের
বক্তব্যের জবাবে তাদের পাকিস্তানের একটি ডকুমেন্ট গ্রহণ করেছেন তিনি।
সেখানে একাত্তরের স্বাধীনতা সংগ্রাম এবং পরবর্তীতে সম্পাদিত ত্রিদেশীয়
চুক্তির বিষয়ে পাকিস্তান যে ‘সত্য থেকে বিচ্যুতি’ হয়ে কথা বলছে
মন্ত্রণালয়ের প্রতিনিধিকে তা বলা হয়েছে বলে জানানো হয়। গণহত্যার দায় অস্বীকার, পাকিস্তানের আরেক ঐতিহাসিক পাপ এদিকে
বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে গণহত্যা, নির্বিচার ধ্বংসযজ্ঞ ও অগণিত নারী
নির্যাতনের দায় অস্বীকার করা পাকিস্তানের আরেক ঐতিহাসিক পাপ বলে মন্তব্য
করেছেন সেক্টর কমান্ডারস্ ফোরামÑমুক্তিযুদ্ধ ’৭১ এর মহাসচিব হারুন হাবীব।
এক বিবৃতিতে তিনি বলেন, বাংলাদেশে গণহত্যা ও বর্বরতার দায় অস্বীকার করে
পাকিস্তান এটি আবার প্রমাণ করেছে যে তারা ইতিহাস থেকে আজও কোনো শিক্ষা
গ্রহণ করেনি। পাকিস্তান সরকারের এই ধরনের বিবৃতি ইতিহাসেরই চরম বিকৃতি নয়
কেবল, একই সঙ্গে নির্লজ্জ মিথ্যাচারের শামিল বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
বিবৃতিতে হারুন হাবীব বলেন, ১৯৭১ সালে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে হানাদার
পাকিস্তান বাহিনী ও তাদের স্থানীয় সহযোগীরা যে বর্বরতা চালিয়েছে পাকিস্তান
সরকার অস্বীকার করলেও তা সারা বিশ্বেই বিংশ শতাব্দীর নিকৃষ্টতম গণহত্যা ও
নারী নির্যাতন হিসেবে স্বীকৃত ও গ্রন্থিত। এমন কি পাকিস্তানের সরকার কর্তৃক
নিয়োজিত হামিদুর রহমান কমিশনের রিপোর্টেও এই ভয়াবহ গণহত্যার দায় স্বীকার
করা হয়েছে এবং দোষী সামরিক ব্যক্তিদের বিচারের কাঠগড়ায় দাঁড় করাবার সুপারিশ
করা হয়েছে। কিন্তু পাকিস্তান সে বিচার করেনি। তিনি আরও বলেন, পাকিস্তান
সরকারের এই দায় অস্বীকারের ঘটনাটি এমন সময়ে ঘটেছে যখন সে দেশেরই বিবেকবান
নাগরিকরা বারংবার তাদের দেশের সেনাবাহিনীর হাতে সংগঠিত মানবতাবিরোধী
অপরাধের জন্য পাকিস্তান সরকারকে বাংলাদেশের কাছে ক্ষমা প্রার্থনার আহ্বান
জানিয়েছেন। ফোরাম মহাসচিব বলেন, বাংলাদেশের ঐতিহাসিক যুদ্ধাপরাধ বিচার শুরু
হবার পর থেকেই পাকিস্তান সরকার ও দেশটির বিভিন্ন মহল বিরূপ সমালোচনা করে
আসছে, যা শুধু নিন্দনীয়ই নয় একই সঙ্গে বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে সরাসরি
হস্তক্ষেপের শামিল। তাদের ধারাবাহিক বক্তব্যÑবিবৃতিতে এটিই প্রমাণ করে যে,
৪৪ বছর পরও বাংলাদেশের স্বাধীন-সার্বভৌম অস্তিত্ব মেনে নিতে ব্যর্থ হয়েছে
পাকিস্তান। কাজেই এমন একটি দেশের সঙ্গে বাংলাদেশের কূটনৈতিক সম্পর্ক রাখার
কোনো যৌক্তিকতা থাকতে পাওে না বলে হারুন হাবীব মন্তব্য করেন। পাকিস্তানি সৈন্যবাহিনী গণহত্যা চালিয়েছে: বিএনপি একাত্তরে
যুদ্ধাপরাধ নিয়ে পাকিস্তানের বক্তব্যের প্রতিবাদ জানিয়ে বিএনপির মুখপাত্র ও
আন্তর্জাতিক বিষয়ক সম্পাদক ড. আসাদুজ্জামান রিপন বলেন, পাকিস্তানি
সৈন্যবাহিনী জেনোসাইড ঘটিয়েছে। তাদের এসট্রোসিটি ছিল। ইসলামাবাদের কথায়
সত্যকে আড়াল করা যাবে না। গতকাল বিএনপির কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে এক সংবাদ
সম্মেলনে তিনি এসব কথা বলেন।
Subscribe to:
Post Comments (Atom)

No comments:
Post a Comment