Monday, December 7, 2015

ম্যাজিক

নির্বাচনের দিন যতই এগিয়ে আসছে, ব্যাপারটা ততই ঘোরালো হয়ে উঠছে। ইতিমধ্যে বিএনপি শর্তসাপেক্ষে পৌরসভা নির্বাচনে অংশগ্রহণ করতে রাজি হয়েছে। আওয়ামী লীগ প্রাথমিকভাবে এটা স্বাগত জানিয়েছিল। কারণ বর্তমান সরকারের অধীনে বিএনপি নির্বাচন করলে পরবর্তীতে জাতীয় নির্বাচন বর্তমান সরকারের অধীনে করতে টালবাহানা করতে পারবে না। কিন্তু বিএনপির ১৫ দিন নির্বাচন পেছানোর দাবিকে তারা দুরভিসন্ধিমূলক বলে মনে করছে। যদিও ওয়ার্কার্স পার্টিও ১৫ দিন নির্বাচন পিছিয়ে দিতে চায়। তবে তাদের চাওয়া অবশ্যই দুরভিসন্ধিমূলক নয়, তারা সরকারের অংশ বিধায়। নির্বাচন কমিশন যথারীতি বিএনপির নির্বাচন পেছানোর দাবিতে রাজি হয়নি। আসলে সরকার যেভাবে চায় সেভাবেই তো নির্বাচন হওয়া উচিত। নির্বাচন কমিশন তো আর সরকারের বাইরে নয়। বিশেষত, এবারের পৌরসভা নির্বাচন কমিশনের অফিসারদের বাদ দিয়ে মাঠ পর্যায়ের সরকারি অফিসারদের রিটার্নিং অফিসার বানিয়ে দায়িত্ব সম্পন্ন করার যে আয়োজন করা হয়েছে, তা অভিনব। একে সরকারি নির্বাচন বললে অত্যুক্তি হবে না। নিতান্ত হেরে না গেলে অবশ্যই এ নির্বাচন সরকারের কাছে গ্রহণযোগ্য হবে। দু’চারজন বিশেষজ্ঞ বা বুদ্ধিজীবী টকশোতে কী চেঁচামেচি করলেন, তাতে কিছু যায় আসে না। চাচার ড্রইংরুমে বসে এসব কথা যখন ভাবছি, চাচা জিজ্ঞাসা করলেন, কি ভাবছ? নির্বাচনের কথাই ভাবছি। আমিও সে কথাই ভাবছিলাম, নির্বাচন কমিশন এবারের নির্বাচন নিয়ে কেমন তালগোল পাকিয়ে ফেলেছে। ওদের কাণ্ডকারখানায় অনেকেই বিব্রত। আমি সবিস্ময়ে জানতে চাইলাম, কারা বিব্রত? কমিশন তো সরকারি সিদ্ধান্তের বাইরে কাজ করছে না। নির্বাচন কমিশন এমপিদের ক্ষমতা ও মর্যাদা খাটো করে ফেলতে চাইছে। সে কী কথা? আমি ঠিকই বলছি। এমপিরা চাচ্ছিলেন, তারা নির্বাচনী প্রচারে অংশ নেবেন। ইসি তাতে রাজি নয়। চাচা সরোষে বললেন, এতে যে এমপিদের অধিকার খর্ব করা হচ্ছে, কমিশনকে তা কে বোঝাবে? চাচা! সেদিন টেলিভিশনে দেখলাম, তৃণমূল বিএনপি দল গঠনের ব্যাপারে ব্যারিস্টার নাজমুল হুদা সরকারের সহযোগিতা কামনা করেছেন। সরকারের কি এতে সহযোগিতা করা উচিত? অবশ্যই উচিত। চাচা বললেন, জাতীয় পার্টি যদি সরকারের সহযোগিতায় সংসদে বিরোধী দল গঠন করতে পারে, তাহলে তৃণমূল বিএনপি গঠনে ব্যারিস্টার নাজমুল হুদাকে সরকারের সহযোগিতা দেয়া হবে না কেন? আমি হলফ করে বলতে পারি তৃণমূল বিএনপি খালেদা জিয়ার বিএনপির মতো ধ্বংসাত্মক কার্যকলাপে জড়াবে না। বরং সরকারি দলের নির্দেশ অনুযায়ী চলবে। গণতন্ত্রের স্বার্থে তৃণমূল বিএনপিকে সরকারের সহায়তা দেয়া উচিত। কোন দেশে সরকার কি বিরোধী দল গঠনে সাহায্য করে? অন্য কেউ না করলে তাতে কী আসে যায়? আমরা এমন বিরোধী দল চাই, যারা সরকারকে সব কাজে সহযোগিতা করবে, কখনও বাধা দেবে না। তবে সরকার চাইলে সময় সময় বিরোধী দলের মতো করে তাদের কথা বলা উচিত। এটা কি করে সম্ভব? আমাদের দেশেই তেমন বিরোধী নেতা আছেন, তিনি গাড়িতে সরকারি পতাকা উড়িয়ে মাঝে মধ্যে সরকারবিরোধী কথাবার্তা বলেন। আর সরকার দড়ি টান দিলে তিনি থেমে যান। ব্যারিস্টার নাজমুল হুদাও কি তাই করবেন? আমি তা মনে করি না। বিরোধীদলীয় নেতা হিসেবে সরকার যা বলবে, তিনি তাই করবেন। তার মতো লোক পাওয়া রাজনীতিতে সত্যি দুর্লভ ব্যাপার। তিনি তো আরও কয়েকবার দল গঠন করতে চেয়েছেন! দল গঠন করতে চেয়েছেন। কিন্তু বিরোধী দল তো গঠন করতে চাননি। তাই সরকারের উচিত তাকে মদত দেয়া। বিরোধী দল ছাড়া গণতন্ত্র হয় না। কথাটা সরকারের নীতিনির্ধারকরা কি বোঝেন না? অবশ্যই বোঝেন। বোঝেন বলেই সংসদে জাতীয় পার্টিকে বিরোধী দল হিসেবে বসানো হয়েছে। কিন্তু সংসদের বাইরেও তো একটা বিরোধী দল দরকার। দেশে গণতন্ত্র কায়েম করার স্বার্থেই ব্যারিস্টার নাজমুল হুদা এগিয়ে এসেছেন। ব্যারিস্টার নাজমুল হুদা গণতন্ত্র কায়েম করবেন? কেন? চাচা বিরক্ত হয়ে তাকালেন আমার দিকে। বললেন, সন্দেহ আছে নাকি তোমার? তাকে তুমি কতটুকু চেন? গণতন্ত্রের জন্যই তো বিএনপির মতো একটা অগণতান্ত্রিক দলকে ছেড়ে এসেছেন। কিন্তু বিএনপি নামটা তো ছাড়তে পারলেন না! এটা হচ্ছে তার রাজনীতির পরিপক্বতার প্রমাণ। এ নামটা রেখেছেন যাতে ধানের শীষ প্রতীকটি পাওয়া যায়। বিএনপি যদি নির্বাচনে না দাঁড়ায় তাহলে তো কোনো ঝামেলা নেই। কিন্তু খালেদার বিএনপি নির্বাচন করার ঘোষণা দিয়েই ঝামেলা সৃষ্টি করেছে। চাচা! এবারের নির্বাচনটা কেমন হবে? গত কয়েক বছরে নির্বাচন কমিশন খুব পারদর্শিতা দেখিয়েছে। সেবার ঢাকা ও চট্টগ্রামের তিন মেয়রের নির্বাচন তো খুবই সফল। মেয়রত্রয় তো এখন জনগণের নয়নের মণি। কেউ তো তাদের কর্তৃত্বের ব্যাপারে প্রশ্ন তুলছে না। আওয়ামী লীগের উচিত এই নির্বাচন কমিশনের মেয়াদ থাকতে থাকতে জাতীয় নির্বাচনটা সেরে ফেলা। সেটা কি করে সম্ভব? গণতন্ত্রের স্বার্থে সবই সম্ভব। সবাই তো দেশের মঙ্গল চায়। আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় থাকলে দেশের মঙ্গল নিয়ে কাউকে আর ভাবতে হবে না। আমরা ২০২১ সালের মধ্যে মধ্য আয়ের দেশ হয়ে যাচ্ছি। ভাবতে পারো? তবে যে বিশেষজ্ঞরা বলেছেন ২০২০ সালের আগে বাংলাদেশ স্বল্প আয়ের দেশের তালিকা থেকে বেরোতে পারবে না। চাচা উত্তেজিতস্বরে কী যেন বলতে যাচ্ছিলেন। এ সময়ে ম্যাজিক আলীর আগমন ঘটলো। ঘরে ঢুকেই তিনি বললেন, আপনারা যে আমার ছেলের বিয়েতে যাননি সেজন্য ধন্যবাদ জানাচ্ছি।  মানে? আমি সবিস্ময়ে জিজ্ঞাসা করলাম। বিয়েটা শেষ পর্যন্ত হয়নি। কেন? কারণ কি? দুটো বড় কারণ আছে। একটা হলো, বিয়ের ব্যাপারে লাস্ট মোমেন্টে আমার ছেলে বেঁকে বসলো। মেয়েটা খুব মোটা আর বেজায় কালো বলে কি? আমাকে সেকথা বলেনি। আমাকে বলেছে, সে কোনো রাজনীতিকের মেয়ে বিয়ে করবে না। তাহলে তো আপনার খুব মুসিবত হয়ে গেল। আপনি তো মোটা ও কালো মেয়ের সঙ্গে ছেলের বিয়ে দিতে চেয়েছিলেন আত্মীয়তার সুবাদে আগামী পৌরসভার নির্বাচনে ক্ষমতাসীন দলের মনোনয়ন পাওয়ার জন্য। কথাটা এখন বলতে লজ্জা হচ্ছে। ম্যাজিক আলী লজ্জিতকণ্ঠে বললেন, আসলে তাই। কিন্তু বিয়ে ভেঙে যাওয়ায় আপনার পৌরসভা নির্বাচন করা অসুবিধাজনক হয়ে গেল না? মেয়ের বাবা নিশ্চয়ই খুব ক্ষেপে গেছেন। তা ক্ষেপে যেতে পারেন। কিন্তু আমাকে মনোনয়ন দেয়ার ব্যাপারে তার হাতে কোনো ক্ষমতাই নেই। তাহলে ক্ষমতা কার হাতে? ক্ষমতা এখন ক্ষমতাসীন দলের কেন্দ্রে কেন্দ্রীভূত হয়ে গেছে। ভাগ্যিস ছেলেটা বিয়ে করতে রাজি হয়নি। একবার বিয়ে হয়ে গেলে ফেঁসে যেতাম। একটু দম নিয়ে ম্যাজিক আলী বললেন, মেয়ের বাবাকে আমি অনেক বিশ্বাস করেছিলাম। কিন্তু তিনি আমার সঙ্গে বিট্রে করেছেন। কিভাবে বিট্রে করলেন? আমার জিজ্ঞাসা। তিনি নিজেই এখন মেয়রের পদে নির্বাচনে দাঁড়াচ্ছেন। কিন্তু এ রকম কোনো কথা ছিল না। কথা ছিল তার মেয়ের সঙ্গে আমার ছেলের বিয়ে দিয়ে আমরা পরস্পর বেয়াই হয়ে যাবো। ফলে আত্মীয়তার সুবাদে তিনি আমাকে নির্বাচনের জন্য ক্ষমতাসীন দলের মনোনয়ন এনে দেবেন। যাহোক, শেষপর্যন্ত আমি বেঁচে গেলাম। মানে আমার ছেলে ঐ মোটা কালো মেয়ের হাত থেকে বেঁচে গেল। কিন্তু আপনার নির্বাচন? চাচা জানতে চাইলেন। আমি অন্য উপায় বের করেছি। কি উপায়? আমি বিএনপি থেকে নির্বাচনে দাঁড়াব। বিএনপি থেকে মনোনয়নে আপনার গ্যারান্টি কি? আমার এলাকায় বিএনপির কোনো ক্যান্ডিডেট নেই। আগে যারা ছিল তাদের অর্ধেক জেলে আর বাকি অর্ধেক পলাতক। ওখানে বিএনপি বলতে এখন একমাত্র আমি। আপনি বিএনপি করেন নাকি? চাচার জিজ্ঞাসা। করি না। তবে ওরা আমাকে মনোনয়ন দেবে। যেসব স্থানে বিএনপির কোনো প্রার্থী নেই সেসব স্থান হায়ার করে বিএনপি প্রার্থী যোগাড় করছে। আমাকেও তারা হায়ার করবে। কিন্তু বিএনপি থেকে মেয়র হয়ে আপনার লাভ কি? কিছুদিন পরেই তো অতীতের নাশকতার মামলায় আপনাকে জেলে যেতে হবে। তারপর মন্ত্রণালয় থেকে আপনাকে বরখাস্ত করা হবে। না। তা করা হবে না। এবার পৌরসভার নির্বাচনে যারা জয়যুক্ত হবেন, তাদের ব্যাপারটা একটু অন্যরকম। কী রকম? চাচা জানতে আগ্রহ প্রকাশ করলেন। ম্যাজিক আলী হাসিমুখে বললেন, এবার যারা বিএনপির টিকিটে নির্বাচিত হবে, তাদের ব্যাপারে সরকারের ভূমিকা হবে আলাদা। আলাদা বলতে কি বোঝাতে চাইছেন? সরকার তাদেরকে ভয় দেখিয়ে বা প্রলোভন দেখিয়ে দলে টেনে নেবে। পত্রিকাতে তেমনটিই লিখেছে। কাউকে আর বরখাস্ত করার দরকার হবে না। তার মানে আপনি মেয়র নির্বাচিত হলে আপনাকে ক্ষমতাসীনরা বুকে টেনে নেবে। ইচ্ছা করলেই আপনি দল বদল করতে পারবেন নাকি? দল বদল করলে আপনার মেয়র পদ বাতিল হয়ে যাবে না? ম্যাজিক আলী জানালেন, দল বদল করলে পদ বাতিলের ব্যাপারটা কেবল সংসদ সদস্যদের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য। পৌর মেয়রদের ব্যাপারে প্রযোজ্য নয়। তারা নির্বাচিত হয়ে ইচ্ছামতো দল বদল করতে পারবেন। মেয়র হওয়ার পর আপনাকে ভয় দেখালেই কি আপনি বিএনপি ছেড়ে ক্ষমতাসীন দলে চলে যাবেন? আমি জিজ্ঞাসা করলাম। ভয় দেখাবার কথা বলছেন কেন স্যার! আমাকে প্রলোভন দেখালেই যথেষ্ট। ক্ষমতাসীনদের সঙ্গে একটু ভালো দর কষাকষি করতে পারলে আমাকে আর কিছু করে খেতে হবে না। মানে হচ্ছে, রাজনীতি এমন একটা পেশা, বুদ্ধি কাজে লাগাতে পারলে খাওয়া-পরার জন্য অন্য কিছু করতে হয় না। যতটুকু বুঝতে পারলাম, আপনি বিএনপির মনোনয়ন নিয়ে নির্বাচন করে মেয়র হয়ে আওয়ামী লীগে যোগ দেবেন এবং ক্ষমতাসীনদের মেয়র হয়ে যাবেন। এই তো? চাচা বললেন। জ্বি। আপনাদের আশীর্বাদ পেলে তাই হবো। ম্যাজিক আলী হাসিমুখে বললেন, রাজনীতিতে ম্যাজিক কাকে বলে, একবার দেখিয়ে দিতে চাই স্যার।

No comments:

Post a Comment