Tuesday, December 8, 2015

ক্যানভাসারের কথার লড়াই

রাজধানীর ফুটপাথে গলা চেঁচিয়ে নানা রোগের ওষুধ বিক্রি করেন ক্যানভাসাররা। কিছু মানুষের দুর্বলতার সুযোগে অপচিকিৎসা দিয়ে ক্যানভাসাররা প্রতারিত করছেন তাদেরকে। ধর্মান্ধতা, কুসংস্কার আর ফুটপাথের অপচিকিৎসা ও ভুল চিকিৎসায় মারাত্মক ক্ষতি হওয়ার অভিযোগও পাওয়া গেছে। দেশে অ্যালোপ্যাথিক চিকিৎসার পাশাপাশি গাছ-গাছড়ার ভেষজ চিকিৎসা, হোমিওপ্যাথিক, আয়ুর্বেদিক, ইউনানি এবং আকুপাংচার চিকিৎসাও প্রচলিত আছে। এসব চিকিৎসাও বিজ্ঞানসম্মত এবং সারা বিশ্বেই প্রচলিত আছে। এতকিছুর পরেও ফুটপাথ দিয়ে বিকাল বেলায় হাঁটা যায় না অশিক্ষিত প্রতারক ভুয়া চিকিৎকদের যন্ত্রণায়। রাজধানীর সর্বত্রই এই ভুয়া চিকিৎসক প্রতারকদের দেখা যায়। ফুটপাথের ধারে বৃত্তাকার লোকের মাঝখানে দাঁড়িয়ে নানা ধরনের অঙ্গভঙ্গিতে যাদুমন্ত্রের মতো কথা বলে মানুষকে মুগ্ধ করে। সব রোগের ওষুধ বিক্রি করে এবং ঘণ্টার মধ্যে রোগ সারার নিশ্চয়তা দিয়ে থাকে। যৌনশক্তিবর্ধক ক্যাপসুল, মলম, দাঁতের মাজন, বাতজ্বর, জন্ডিস, ডায়াবেটিস, পেটের পীড়াসহ সর্বরোগের চিকিৎসা প্রদান ও ওষুধ বিক্রি করে এরা। ১০ থেকে ১০০ টাকায় এসব ওষুধ কিনতে নিম্ন আয়ের মানুষগুলো ছুটে যায় তাদের কাছে। এসব চিকিৎসা নেয়ার পর কিডনি, লিভারসহ বিভিন্ন জটিল রোগে আক্রান্ত হচ্ছে সাধারণ মানুষ। বছরের পর বছর চিকিৎসার নামে এমন প্রতারণা ও অপচিকিৎসা অব্যাহত থাকলেও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কোনো নজরদারি নেই এদিকে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, তাদের এসব চিকিৎসার কোনো যৌক্তিকতা নেই। নেই কোনো বৈজ্ঞানিক ভিত্তি।
প্রতিদিন রাজধানীর গুলিস্তান, ফার্মগেট, কারওয়ানবাজার, মগবাজার, সাতরাস্তা, পল্টনসহ বিভিন্ন শপিং সেন্টারের সামনে গাছের বাঁকল, জোঁকের তেল, মলম, ক্যাপসুল, দাঁতের মাজনসহ আরও হরেকরকম ওষুধের পসরা সাজিয়ে বসছেন কবিরাজরা। এরা নিজেকে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক পরিচয় দিয়ে যৌনরোগ, চর্মরোগ, বাতজ্বর, জন্ডিস, ডায়াবেটিসসহ বিভিন্ন রোগের চিকিৎসা দিয়ে থাকেন। একটি হ্যান্ডমাইকে ওষুধের গুণাবলীর বর্ণনা দিয়ে থাকেন তারা। বর্ণনায় আকৃষ্ট হয়ে পথচারীরা কেউ কেউ তার ওষুধও কিনছিলেন। সান্ধ্যকালীন মেলার মতো গণজমায়েত হয়। সেখানে যৌবনশক্তি সালসা, জোঁকের তেল, মান্ডার  তেল, দাউদ-অ্যাকজিমা, বাতের ব্যথা, গ্যাস্ট্রিক আলসার, জন্ডিস, যৌনরোগসহ বিভিন্ন জটিল রোগের চিকিৎসা দিচ্ছেন এসব কবিরাজ। চিকিৎসা বিষয়ে প্রাতিষ্ঠানিক কোনো শিক্ষা আছে কিনা জানতে চাইলে এসব কবিরাজ জানান, আমরা ফুটপাথে চিকিৎসা করছি বলে আমাদের কাছে এসব জিজ্ঞাসা করছেন। শিক্ষা-টিক্ষা এসব কোনো ফ্যাক্টর নয়, ওষুধে কাজ হলেই হলো। চিকিৎসা নিতে আসা রোগী বলেন, আমি এই প্রথমবার এসেছি। লোকজনের কাছ থেকে শুনেছি এরা ভালো চিকিৎসা করেন। অনেকে নাকি ভালো হয়েছেন। তাই নিজের সমস্যা দেখাতে এসেছি। আনন্দ সিনেমা হলের সামনে একজন দাঁড়িয়ে ক্যানভাস করেন, আরেকজন ওষুধ বিক্রি করেন। কোনো পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া ছাড়া শতভাগ গ্যারান্টিসহ তারা নারী-পুরুষের বিভিন্ন গোপন রোগের চিকিৎসা দিচ্ছেন। এসব ওষুধের দাম ২০ থেকে ৫০০ টাকা পর্যন্ত। পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া ছাড়া শতভাগ গ্যারান্টিসহ চিকিৎসা দেয়া প্রসঙ্গে জানতে চাইলে তারা বলেন, ভাই সাইড এফেক্ট তো একটু হবেই। ব্যবসার খাতিরে এসব বলতে হয়। তাছাড়া বড় বড় মেডিকেলেও ভুল চিকিৎসা হয়, সে তুলনায় আমাদের এসব কিছুই নয়। এমন একজন ফুটপাথের ক্যানভাসার হুমায়ুন কবির। তিনি নানা কবিরাজি ওষুধ বিক্রি করেন রাজধানীর বিভিন্ন ফুটপাথে। সম্প্রতি তার সঙ্গে কথা হয় ফার্মগেটে। তার শিক্ষাদীক্ষা ও পরিচয় জানতে চাইলে তিনি ক্ষেপে যান। বলেন, মানুষ উপকার পায় বিধায় আমাদের ক্যানভাস শোনেন এবং ওষুধ নেন। মাঝে মাঝে মঙ্গলবারে (নিউমার্কেট এলাকায় ব্যবসায়ীদের ছুটির দিনে) নিউমার্কেট এলাকায় লতাপাতা নিয়ে ক্যানভাস করে ওষুধ বেচেন মোবারক। তাকে ঘিরে কথা শোনার জন্য কিছু লোক বৃত্তাকারে দাঁড়িয়ে ছিলেন। তারই তৈরি করা সুলভ মূল্যে ওষুধ বিক্রি করার কথা বলে মানুষকে প্রলোভন দিচ্ছিলেন। বলছিলেন, এ ওষুধ খাইলে যৌনক্ষমতা বৃদ্ধি পাবে, পুরনো ব্যথা কমে যাবে। ওষুধ কিনেছে এমন একজন হলেন জসিম উদ্দিন। তিনি বলেন, আল্লাহর ওপর ভরসা করে তিনি এই ওষুধ কিনেছেন। দীর্ঘদিন হাঁটুর ব্যথায় ভুগছেন তিনি। এজন্য ২০ টাকা দিয়ে এক ফাইল ওষুধ নিয়েছেন। এদিকে, ক্যানভাসার থেকে ওষুধ কিনে কোনো উপকার পাননি এমন অভিযোগও করেছেন উপস্থিত অনেকে। তাদের মধ্যে একজন লালবাগের হাবিবুর রহমান। তিনি বলেন, দুই বছর আগে ফুটপাথ থেকে যৌন উত্তেজক ওষুধ কিনে তার উপকারের বদলে ক্ষতি হয়েছে। এর চেয়ে বেশি কিছু বলতে রাজি হননি তিনি। শুধুুুু গুলিস্তান কিংবা পল্টন নয়, নগরীর নিউমার্কেট, মিরপুর, ধানমন্ডি, মোহাম্মদপুর, যাত্রাবাড়ী, খিলগাঁও, মালিবাগ, মহাখালী, কাকরাইল, শান্তিনগরসহ বিভিন্ন অলিগলিতে এ ধরনের ভাসমান চিকিৎসক ও চিকিৎসালয় রয়েছে। এরা ফুটপাথে ক্যানভাস করে ওষুধ বিক্রি করে। তাদের মধ্যে কেউ কেউ নিজের উদ্ভাবিত ও বিভিন্ন কোম্পানির ওষুধ বিক্রি করেন। কেউবা সর্বরোগে কার্যকর বিভিন্ন তাবিজ ও আংটিও বিক্রি করেন। এদের না আছে প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা, না আছে শাস্ত্রজ্ঞান আর সরকারি স্বীকৃতি। আইনে এদের কঠিন শাস্তির বিধান না থাকলেও আইনশৃঙ্খলা নিয়ন্ত্রকদের সামনেই এরা মানুষ ঠকানোর কারবার চালিয়ে যাচ্ছে। গড়ে উঠেছে ভুয়া চিকিৎসালয় ও ভেজাল ওষুধের কারখানা। প্রতারক চিকিৎসক আর ওষুধ কারবারি মিলে চালিয়ে যাচ্ছে এ ব্যবসা। ফুটপাথের এসব কথিত চিকিৎসকের বিভিন্ন যৌন উত্তেজক কথাবার্তা শুনে মনে হয়, পুরো দেশ বুঝি যৌনরোগে আক্রান্ত। এদের কারণে রাস্তায় পরিবার-পরিজন নিয়ে চলাফেরা করার সময় বিব্রতকর পরিস্থিতির মুখোমুখি হতে হয়। আসলে তারা মানুষের দুর্বলতাকে পুঁজি করে চিকিৎসার নামে অপচিকিৎসা চালিয়ে যাচ্ছে। শ্রমজীবী মানুষ প্রতিদিন প্রতারিত হচ্ছে। এ প্রসঙ্গে বিভিন্ন বিশেষজ্ঞরা বলেন, তাদের এসব চিকিৎসার কোনো যৌক্তিকতা নেই, নেই কোনো বৈজ্ঞানিক ভিত্তি। বিশ্বের কোথাও শতভাগ নিশ্চয়তাসহ কোনো রোগের চিকিৎসা নেই। সাধারণ লোকজনের দুর্বলতার সুযোগকে পুঁজি করে তারা চিকিৎসার নামে ভণ্ডামি করছে। তাদের এসব কথিত চিকিৎসা গ্রহণ করে বিভিন্ন জটিল রোগে আক্রান্ত হওয়ার সম্ভাবনা বেশি। প্রতারিত হয় সাধারণ মানুষ। এ বিষয়ে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বিএসএমএমইউ) মেডিসিন অনুষদের ডিন অধ্যাপক ডা. এবিএম আবদুল্লাহ মানবজমিনকে বলেন, এসব চিকিৎসার বৈজ্ঞানিক কোনো ভিত্তি নেই। এসব চিকিৎসায় মানুষের শরীরে নান জটিল রোগ হতে পারে। এছাড়া ফুটপাথের ক্যানভাসাররা মানুষকে বোকা সাজিয়ে প্রতারণা করছে। জনগণকে এ ব্যাপারে  সতর্ক থাকার পরামর্শ দেন তিনি। এ প্রসঙ্গে ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের উপপুলিশ কমিশনার (মিডিয়া ও পাবলিক রিলেশন) মুনতাসিরুল ইসলাম মানবজমিনকে বলেন, কেউ যদি প্রতারিত হয়ে আমাদের কাছে অভিযোগ করে তাহলে আমার ব্যবস্থা নিয়ে থাকি। কিছু লোক যুগ যুগ ধরে এ ধরনের ওষুধ বিশ্বাস করে সেবন করে আসছেন। নিবন্ধিত কোনো ফার্মাসিউটিক্যালের অনুমোদিত না হলে ওষুধ প্রশাসন ব্যবস্থা নেবে।

No comments:

Post a Comment