Wednesday, January 13, 2016

জ্বালানির দাম কমেছে, ভাড়া কমেনি উড়োজাহাজের by একরামুল হক

উড়োজাহাজের জ্বালানি জেট ফুয়েলের দাম গত চার বছরে এক-তৃতীয়াংশের বেশি কমেছে। এতে উড়োজাহাজ কোম্পানিগুলোর আয় বাড়লেও যাত্রীদের কোনো লাভ হচ্ছে না। জ্বালানির দামের সঙ্গে সমন্বয় করে এখন পর্যন্ত অভ্যন্তরীণ ও আন্তর্জাতিক রুটের কোনো উড়োজাহাজ কোম্পানিই ভাড়া কমায়নি।
দেশে জেট ফুয়েলের দাম সমন্বয় করে বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশন (বিপিসি)। আন্তর্জাতিক বাজারের সঙ্গে সমন্বয় করে সর্বশেষ গত বছরের ২৪ ডিসেম্বর বিপিসি জেট ফুয়েলের দাম লিটারে ছয় টাকা কমায়। এখন ঢাকার শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে জেট ফুয়েলের দাম প্রতি লিটার ৬২ টাকা এবং চট্টগ্রামের শাহ আমানত আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে ৬১ টাকা। আমদানি করা জেট ফুয়েল সড়ক ও নৌপথে চট্টগ্রাম থেকে ঢাকায় সরবরাহ করা হয়। সে কারণে চট্টগ্রামের তুলনায় ঢাকার বিমানবন্দরে জেট ফুয়েলের দাম লিটারে সব সময় এক টাকা বেশি থাকে।
ভাড়া কেন কমানো হচ্ছে না, তা জানতে চাইলে বেসরকারি বিমান সংস্থা নভো এয়ারের বিপণন বিভাগের প্রধান সোহেল মজিদ প্রথম আলোকে বলেন, ‘ফ্লাইট পরিচালনায় আমরা আগে বিপুল লোকসান গুনেছি। সেই লোকসান এখন সমন্বয় করে আনছি। এ কারণে ভাড়া কমানো যাচ্ছে না।’
কয়েক বছর ধরেই অভ্যন্তরীণ রুটে উড়োজাহাজে যাত্রী পরিবহন ধীরে ধীরে বাড়ছে। বেসামরিক বিমান পরিবহন কর্তৃপক্ষের উপপরিচালক প্রশান্ত চক্রবর্তী বলেন, ২০১৩ সালে ৬ লাখ ৪৮ হাজার ১৯ জন, ২০১৪ সালে ৬ লাখ ৮৫ হাজার ১৯৫ জন এবং ২০১৫ সালের ৩০ জুন পর্যন্ত ৩ লাখ ৫৯ হাজার ৭২৯ জন যাত্রী আকাশপথে ভ্রমণ করেছেন।
ভাড়া না কমানোর বিষয়ে রিজেন্ট এয়ারওয়েজের প্রধান পরিচালন কর্মকর্তা আশিষ রায় চৌধুরী প্রথম আলোকে বলেন, ‘আন্তর্জাতিক রুটের উড়োজাহাজগুলো নিজ দেশ থেকে কম দামে জ্বালানি নিয়ে আসছে। ওই দেশগুলোর তুলনায় আমাদের দেশে জেট ফুয়েলের দাম এখনো ১৫-২০ টাকা বেশি। এ ছাড়া উড়োজাহাজের অবতরণ (ল্যান্ডিং) খরচও আমাদের দেশে অনেক বেশি। অথচ প্রতিবেশী দেশে অভ্যন্তরীণ রুটের ল্যান্ডিং খরচ নেই। এসব বিবেচনায় ভাড়া কমানোর সুযোগ নেই।’
বিপিসি সূত্র জানায়, ২০১২ সালের ১ মার্চ ঢাকায় জেট ফুয়েলের দাম ছিল প্রতি লিটার ৯৩ টাকা। একই বছরের ১২ জুন লিটারে ৫ টাকা কমে তা ৮৮ টাকা হয়। এরপর ২০১৪ সালের ১৬ এপ্রিল জেট ফুয়েলের দাম আরও কমে চট্টগ্রামে ৮৩ টাকা ও ঢাকার জন্য ৮৪ টাকা নির্ধারণ করা হয়। আর ২০১৫ সালে চার দফা জেট ফুয়েলের দাম কমানো হয়। বছরের শুরুতে দাম ছিল প্রতি লিটার (ঢাকায়) ৭৪ টাকা। ডিসেম্বরে এসে তা হয় ৬২ টাকা। ২০১২ সালে অভ্যন্তরীণ রুটে বিভিন্ন গন্তব্যে উড়োজাহাজগুলো যে ভাড়া নিত, জেট ফুয়েলের দাম এক-তৃতীয়াংশ কমে আসার পরও যাত্রীদের কাছে ওই হারেই ভাড়া আদায় করছে বলে অভিযোগ রয়েছে।
জানতে চাইলে বিপিসির পরিচালক (অর্থ) এ বি এম আজাদ প্রথম আলোকে বলেন, ‘সরকারের নির্দেশনা মেনে আমরা জেট ফুয়েলের দাম কমিয়েছি। এখন ঢাকায় এটির দর ৬২ টাকা এবং চট্টগ্রামে ৬১ টাকা। অথচ এই জ্বালানির দর ৯৩ টাকা পর্যন্ত উঠেছিল। কিন্ত জ্বালানির দাম কমলেও অভ্যন্তরীণ রুটে উড়োজাহাজের ভাড়া আর কমানো হয়নি।’
অভ্যন্তরীণ রুটে বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনস ছাড়াও বেসরকারি উড়োজাহাজ সংস্থা নভো এয়ার, রিজেন্ট এয়ারওয়েজ, ইউনাইটেড এয়ারওয়েজ ও ইউএস বাংলা এয়ারলাইনস ফ্লাইট পরিচালনা করে। ঢাকা থেকে চট্টগ্রামে বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনসের ভাড়া সর্বনিম্ন ২ হাজার ৯০০ টাকা। চাহিদা বেড়ে গেলে এই ভাড়া পাঁচ থেকে ছয় হাজার টাকা পর্যন্ত ওঠানামা করে। একই দূরত্বে নভো এয়ারের ভাড়া ৪ হাজার ২০০ টাকা থেকে সর্বোচ্চ ৮ হাজার ২০০ টাকা। রিজেন্ট এবং ইউএস বাংলার সর্বনিম্ন ভাড়া ৩ হাজার ৭০০ টাকা।
ঢাকা-চট্টগ্রাম আকাশ পথে উড়োজাহাজের ভাড়া বেশি দাবি করে বিপিসির পরিচালক (অর্থ) এ বি এম আজাদ বলেন, ‘বাংলাদেশে অভ্যন্তরীণ রুটে উড়োজাহাজ ভাড়া অস্বাভাবিক বেশি। গত বৃহস্পতিবার একটি বেসরকারি বিমান সংস্থা চট্টগ্রাম-ঢাকা রুটে আমার কাছ থেকে ৬ হাজার ৬০০ টাকা ভাড়া নিয়েছে। শুক্রবার ফেরার পথে সেই ভাড়া দিয়েছি ৪ হাজার ৭০০ টাকা।’
এর কারণ জানতে চাইলে নভো এয়ারের বিপণন বিভাগের প্রধান সোহেল মজিদ প্রথম আলোকে বলেন, ‘বাংলাদেশ বিমানের মতো আমরা সব ধরনের সুবিধা পেলে অভ্যন্তরীণ রুটের ভাড়া অনেক কমানো সম্ভব। কিন্তু আমাদের সেই সুযোগ দেওয়া হচ্ছে না। ভারত সরকার নিজ দেশের বিমান সংস্থাগুলোকে অনেক সুযোগ দিয়ে আসছে।’
অ্যাসোসিয়েশন অব ট্রাভেল এজেন্সি অব বাংলাদেশ (অ্যাটাব) সূত্র জানায়, আন্তর্জাতিক বাজারের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে শুধু কুয়েত এয়ারলাইনস ২০১৪ সালের নভেম্বরে ভাড়া কমায়।
জানতে চাইলে অ্যাটাবের সদস্য দিদারুল হক প্রথম আলোকে বলেন, ‘কুয়েত এয়ারলাইনস ঢাকা-কুয়েত রুটে মূল ভাড়া ২৭০ ডলারের সঙ্গে আরও ৫০ ডলার বাড়িয়ে দিয়েছিল, যা জ্বালানি তেলের বাড়তি দর বা ফুয়েল কস্ট হিসেবে আমরা যাত্রীদের কাছ থেকে আদায় করি। জ্বালানির দাম কমতে শুরু করলে ২০১৪ সালের নভেম্বরে বাড়তি ৫০ ডলার আর কুয়েত এয়ারলাইনস নিচ্ছে না।’ তিনি বলেন, ফুয়েল কস্ট না নিতে অন্যান্য বিমান সংস্থাগুলোর সঙ্গে অ্যাটাবের দেনদরবার চলছে। এমিরেটস এয়ারলাইনস ফুয়েল কস্ট প্রত্যাহার করে নেবে বলে প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। ফুয়েল কস্ট আদায় বন্ধ করতে আন্তর্জাতিক রুটের অন্যান্য বিমান সংস্থার সঙ্গেও আলোচনা চলছে।
জেট ফুয়েল প্রতি লিটারে
৯৩ টাকা, ২০১২ (মার্চ)
৮৮ টাকা, ২০১৩
৮৪ টাকা, ২০১৪ (এপ্রিল)
৬২ টাকা, ২০১৫ (ডিসেম্বর)

No comments:

Post a Comment