Wednesday, January 27, 2016

চার বছরের কাজ ১০ বছরেও হয়নি, ব্যয় বেড়ে দ্বিগুণ by সাঈদা ইসলাম

চট্টগ্রাম ওয়াসার কর্ণফুলী পানি সরবরাহ প্রকল্পের মেয়াদকাল ছিল চার বছর। কিন্তু তিন দফায় পাঁচ বছর সময় বাড়িয়েও কাজ শেষ করা যায়নি। সর্বশেষ এই প্রকল্পের মেয়াদ নতুন করে আরও দেড় বছর বাড়ানো হয়েছে। সময় বাড়ানোর সঙ্গে প্রকল্পের ব্যয়ও প্রায় দ্বিগুণ হয়েছে। ৯৬৩ কোটি টাকার প্রকল্প এখন ১ হাজার ৮৪৮ কোটি ৫২ লাখ টাকায় গিয়ে দাঁড়িয়েছে।
চট্টগ্রামের রাঙ্গুনিয়ার পোমরা
এলাকায় কর্ণফুলী পানি সরবরাহ প্রকল্পের জন্য
শোধনাগার তৈরির কাজ চলছেl ছবি: সংগৃহীত
দৈনিক ১৪ কোটি লিটার পানি উৎপাদনের লক্ষ্যে এ প্রকল্পটি হাতে নেওয়া হয়। উদ্দেশ্য ছিল চট্টগ্রামে পানির সংকট দ্রুত মোকাবিলা করা। কিন্তু প্রকল্প বাস্তবায়নে ধীর গতির কারণে মানুষের দুর্ভোগ দিনে দিনে আরও বেড়েছে। চট্টগ্রাম নগরে দৈনিক পানির চাহিদা ৫০ কোটি লিটারের বেশি। কিন্তু ওয়াসা সরবরাহ করে গড়ে ১৮-১৯ কোটি লিটার, যা চাহিদার ৪০ শতাংশেরও কম। ৯৬টি গভীর নলকূপ এবং মদুনাঘাট পানি শোধনাগার প্রকল্প থেকে এই পানি সরবরাহ করা হয়। ১৯৮৮ সালের পর চট্টগ্রাম ওয়াসা নতুন কোনো প্রকল্প বাস্তবায়ন করেনি।
চট্টগ্রাম নগরের পানির সংকট নিরসনে ২০০৬ সালের মে মাসে কর্ণফুলী পানি সরবরাহ প্রকল্পের অনুমোদন দেয় জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটি (একনেক)। ২০১০ সালের জুনের মধ্যে প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হওয়ার কথা ছিল। কিন্তু চার বছরের এই প্রকল্পের কাজ এখন ১০ বছর ধরে চলছে।
বারবার সময় বাড়িয়েও কাজ শেষ করতে না পারা এবং ব্যয় দ্বিগুণ হওয়ার বিষয়ে কর্ণফুলী পানি সরবরাহ প্রকল্পের পরিচালক ও ওয়াসার প্রধান প্রকৌশলী মো. জহুরুল হক প্রথম আলোকে বলেন, ২০০৬ সালে যখন প্রকল্পটি নেওয়া হয়, তখন ওই সময়ের বাজারদর বিবেচনা করে সম্ভাব্য ব্যয় নির্ধারণ করা হয়েছিল। কিন্তু যখন কাজ শুরু হয়েছে, তখন স্বাভাবিকভাবেই সবকিছুর দাম বেড়ে গেছে। এ ছাড়া প্রকল্পে আরও কিছু কাজ বাড়ানো হয়েছে। তিনি বলেন, ‘যেভাবেই হোক এই বছরের মধ্যে প্রকল্পের কাজ শেষ করা হবে। আমরা জানি, নগরবাসী অধীর আগ্রহে এই প্রকল্পের দিকে চেয়ে আছে।’
ওয়াসা সূত্র জানায়, তিনটি প্যাকেজে (ভাগে) কর্ণফুলী পানি সরবরাহ প্রকল্পের কাজ চলছে। প্রথম প্যাকেজে রাঙ্গুনিয়ার পোমরায় কর্ণফুলী নদীর তীরে সাড়ে ৩১ একর জমির ওপর পানি শোধনাগার নির্মাণের কাজ চলছে। দ্বিতীয় প্যাকেজে রয়েছে রাঙ্গুনিয়া থেকে নগরের বিভিন্ন এলাকায় ৭৭ কিলোমিটার সরবরাহ ও বিতরণ পাইপলাইন নির্মাণ এবং তৃতীয় প্যাকেজে রয়েছে দুটি রিজার্ভার (জলাধার) তৈরির কাজ। ওয়াসার কর্মকর্তাদের দাবি, দ্বিতীয় ও তৃতীয় প্যাকেজের কাজ প্রায় শেষ। শোধনাগার তৈরির কাজের ৭৮ শতাংশ শেষ হয়েছে।
ওয়াসা সূত্র জানায়, ২০১০ সালের জুনে কাজ শেষ না হওয়ায় একনেকে প্রকল্পের মেয়াদ ও ব্যয় সংশোধিত হয়। প্রথমে মেয়াদ বাড়ানো হয় ২০১২ সালের জুন পর্যন্ত। এতে প্রকল্প ব্যয় বেড়ে হয় দেড় হাজার কোটি টাকা। কিন্তু নির্ধারিত সময়ে কাজ শেষ না হওয়ায় ২০১৩ সালের ডিসেম্বর এবং পরবর্তী সময়ে ২০১৫ সালের জুন পর্যন্ত মেয়াদ বাড়ানো হয়। কিন্তু ওই সময়ের মধ্যেও ওয়াসা প্রকল্পের কাজ শেষ করতে পারেনি। সর্বশেষ গত বছরের সেপ্টেম্বর মাসে একনেকে প্রকল্পের মেয়াদ ২০১৬ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত বাড়ানো হয়। নির্ধারিত সময়ে কাজ শেষ না হওয়ায় প্রকল্পের ব্যয় বেড়ে গিয়ে দাঁড়ায় ১ হাজার ৮৪৮ কোটি ৫২ লাখ টাকা। এই টাকার মধ্যে জাপানের আন্তর্জাতিক সহায়তা সংস্থা জাইকা দিচ্ছে ৯৪০ কোটি ৩০ লাখ টাকা, সরকারের ব্যয় ৮৮৪ কোটি ২২ লাখ টাকা আর বাকি ২৪ কোটি টাকা দিচ্ছে ওয়াসা।
দীর্ঘ ১০ বছর ধরে কর্ণফুলী পানি সরবরাহ প্রকল্পের কাজ চলার বিষয়ে জানতে চাইলে চট্টগ্রাম ওয়াসার ব্যবস্থাপনা পরিচালক এ কে এম ফজলুল্লাহ প্রথম আলোকে বলেন, ‘শোধনাগার তৈরির জমি পেতে আমাদের খুব ঝামেলা হয়েছে। ওখানেই গেছে তিন বছর। তারপর মাটি পরীক্ষা, নকশা প্রণয়নের পর আন্তর্জাতিক দরপত্র আহ্বান শেষে কাজ শুরু করেছি। এর মধ্যেই রাজনৈতিক অস্থিরতায় দুই দফায় অনেক দিন কাজ বন্ধ ছিল। স্থানীয় কিছু সমস্যাও ছিল।’
বর্তমান মেয়াদের মধ্যে প্রকল্পের কাজ শেষ হবে কি না তা জানতে চাইলে চট্টগ্রাম ওয়াসার ব্যবস্থাপনা পরিচালক বলেন, ‘আমরা ঠিকাদারদের চাপের মুখে রেখেছি। এই মার্চের মধ্যে কাজ শেষ করার জন্য তাদের সময় বেঁধে দেওয়া হয়েছে।’
ওয়াসা সূত্র জানায়, শোধনাগার তৈরির কাজ যৌথভাবে করছে চায়না ন্যাশনাল টেকনিক্যাল ইমপোর্ট অ্যান্ড এক্সপোর্ট করপোরেশন ও বেইজিং সাউন্ড এনভায়রনমেন্টাল ইঞ্জিনিয়ারিং কোম্পানি লিমিটেড (সিএনটিআইসি-বিএসইইসি) নামের দুটি চীনা ঠিকাদার প্রতিষ্ঠান। শুরুতে প্রতিষ্ঠান দুটি দেশীয় উপঠিকাদার দিয়ে কাজ করাচ্ছিল। কিন্তু উপঠিকাদারের কাজের অগ্রগতি সন্তোষজনক ছিল না। পরে আইনি লড়াইয়ের মাধ্যমে ২০১৪ সালের আগস্টে উপঠিকাদারকে বাদ দিয়ে চীনা ঠিকাদারেরা নিজেরাই কাজ শুরু করেন।
প্রকল্পের পাইপলাইন তৈরির প্যাকেজের কাজ করেছে জাপানি ঠিকাদার প্রতিষ্ঠান কুবোতা-মারুবেনি। এ ছাড়া নগরের নাসিরাবাদ ও বাটালী পাহাড়ের ওপর দুটি জলাধার তৈরির কাজ করেছে দক্ষিণ কোরিয়ার ঠিকাদার প্রতিষ্ঠান কোলন গ্লোবাল করপোরেশন। এ দুটি প্যাকেজের কাজ ৯৯ শতাংশ শেষ হয়েছে বলে দাবি করছেন ওয়াসার কর্মকর্তারা।
প্রকল্পের দীর্ঘসূত্রতা এবং ব্যয় বেড়ে যাওয়ার বিষয়ে অর্থনীতিবিদ ও ইস্ট ডেল্টা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য মুহাম্মদ সিকান্দার খান প্রথম আলোকে বলেন, স্থানীয় রাজনৈতিক নেতাদের কারণে রাঙ্গুনিয়ার এই প্রকল্পের জমি অধিগ্রহণ করতে ওয়াসার অনেক সময় লেগেছে। এ ছাড়া ওয়াসারও কিছু ব্যর্থতা ছিল। পুনর্বাসনের ব্যবস্থা না করেই তারা জমি অধিগ্রহণ করতে চেয়েছিল। একটি প্রকল্পের বিভিন্ন ধাপের পরম্পরা ঠিকভাবে এগিয়ে নিতে পারেনি তারা। এ কারণে সময় ও ব্যয় বেড়েছে। এই ব্যয় বাড়ার বোঝা প্রকারান্তরে সাধারণ মানুষের ঘাড়ে এসেই পড়বে। এর সঙ্গে দীর্ঘ সময় ধরে পানি না পাওয়ার ভোগান্তি তো আছেই।

No comments:

Post a Comment