Thursday, February 18, 2016

সম্পদশালীর সংখ্যা মাত্র ১১ হাজার!

এনবিআরের তথ্য
দেশে সম্পদশালীর সংখ্যা মাত্র ১১ হাজার। ২ কোটি থেকে ৩০ কোটি টাকা সম্পদের মালিক এসব বিত্তবানের কাছ থেকে গত কর বর্ষে আদায় হয়েছে ২৫৪ কোটি টাকা। আয়কর বিভাগের হিসাবে এক বছরের ব্যবধানে দেশে ২ কোটি টাকার বেশি সম্পদের মালিক হয়েছেন ৭৭৯ জন। এদের কাছ থেকে অতিরিক্ত কর আদায় করা হয়েছে ৪৬ কোটি টাকা। তবে প্রায় ১৬ কোটি জনসংখ্যার এ দেশে ২ কোটি টাকার বেশি সম্পদের মালিকদের এমন সংখ্যায় বিস্ময় প্রকাশ করেছেন খোদ আয়কর কর্মকর্তারাই। সঠিকভাবে কর দিলে এ সংখ্যা বহুগুণ বাড়তে পারে বলে তারা দাবি করেছেন।
‘সারচার্জ’ বা ‘সম্পদ কর’ আরোপের পর গত ২ কর বর্ষে বিত্তশালীদের কাছ থেকে কর আদায় বাড়ছে। ব্যক্তির সম্পদের ভিত্তি মূল্যের ওপর এ কর আদায় করা হয়। ২০১৪-১৫ অর্থবছরে বিত্তশালীদের কাছ থেকে বেশি কর আদায়ের জন্য ৪টি স্তরে সারচার্জ আরোপ করা হয়। ২ কোটি টাকার বেশি কিন্তু ১০ কোটি টাকার কম সম্পদশালীর জন্য নির্ধারিত করের অতিরিক্ত ১০ শতাংশ সারচার্জ হিসেবে ধার্য করা হয়। একইভাবে ১০ কোটি টাকার বেশি কিন্তু ২০ কোটি টাকার কম সম্পদশালীদের জন্য ১৫ শতাংশ, ২০ কোটি টাকার বেশি কিন্তু ৩০ কোটি টাকার কম সম্পদশালীদের জন্য ২০ শতাংশ, ৩০ কোটি টাকার বেশি সম্পদশালীদের জন্য ২৫ শতাংশ সারচার্জ নির্ধারণ করা হয়।
জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) সাম্প্রতিক এক প্রতিবেদনের তথ্য মতে, ২০১৪-১৫ অর্থবছরে সারচার্জ দিয়েছেন ১০ হাজার ৯৩১ জন। এদের কাছ থেকে নির্ধারিত করের অতিরিক্ত কর আদায় করা হয়েছে ২৫৪ কোটি টাকা। গত অর্থবছরে সারচার্জ দিয়েছিলেন ১০ হাজার ১৫২ জন। আদায় হয়েছিল ২০৮ কোটি টাকা। অর্থাৎ গত এক বছরে ২ কোটি টাকার বেশি সম্পদের মালিক হয়েছেন ৭৭৯ জন। এদের কাছ থেকে অতিরিক্ত কর আদায় করা হয়েছে ৪৬ কোটি টাকা।
এদের মধ্যে কর অঞ্চল-৫ এর অধিক্ষেত্রভুক্ত করদাতাদের মধ্যে সর্বোচ্চ ৭৮৫ জন সারচার্জ দিয়েছেন। এ কর অঞ্চলে করদাতা হিসেবে নিবন্ধিত রয়েছেন পত্রিকার সম্পাদক ও প্রকাশক, রিয়েল এস্টেট ব্যবসায়ী, ইন্স্যুরেন্স কোম্পানির ও এনজিওর ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা। এরপরেই রয়েছে কর অঞ্চল-৬ এর করদাতারা। সারচার্জ দিয়েছেন ৭৫৬ জন। এ কর অঞ্চলে করদাতা হিসেবে নিবন্ধিত রয়েছেন ধানমণ্ডি, ঝিগাতলা, কলাবাগান, পান্থপথের বাড়িওয়ালা এবং বেসরকারি ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তারা। তৃতীয় অবস্থানে রয়েছে কর অঞ্চল-২ এর করদাতারা। এই কর অঞ্চলে  ৭২২ জন করদাতা সারচার্জ দিয়েছেন। এ  কর অঞ্চলে করদাতা হিসেবে নিবন্ধিত রয়েছেন গার্মেন্টের পরিচালক ও পুরান ঢাকার বাসিন্দারা।
প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী ঢাকায় সারচার্জ দিয়েছেন ৭ হাজার ৭৪৪ জন, চট্টগ্রামে ১ হাজার ৭৪৮, খুলনায় ৩০৬, রাজশাহীতে ৯০, বরিশালে ৮৬, সিলেটে ২৩৪, নারায়ণগঞ্জে ১৮৪, গাজীপুরে ৯৬, কুমিল্লায় ২৫৫, ময়মনসিংহে ৭০ ও বগুড়ায় ৮১ জন। আর সবচেয়ে কম সারচার্জ দিয়েছেন রংপুরের বাসিন্দারা। মাত্র ৬৭ জন।
গত ৩০ নভেম্বর পর্যন্ত ব্যক্তিশ্রেণীর করদাতাদের আয়কর রিটার্নের সঙ্গে জমা দেয়া সম্পদ বিবরণীর তথ্য থেকে এ প্রতিবেদন তৈরি করা হয়েছে। প্রতি বছরের ৩০ সেপ্টেম্বর রিটার্ন জমা দেয়ার নিয়ম থাকলেও চলতি কর বর্ষে ৩০ নভেম্বর পর্যন্ত সময় বাড়ানো হয়েছিল।
এনবিআরের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারাদের মতে, কর কর্মকর্তার স্বল্পতা ও আইনি দুর্বলতার কারণে সঠিকভাবে সারচার্জ করা সম্ভব হচ্ছে না। সারচার্জ আদায় করা হয় সম্পদের ভিত্তি মূল্যের ওপর। অর্থাৎ কোনো ব্যক্তি ১০ বছর আগে একটি বাড়ি অথবা ফ্ল্যাট যে দামে কিনেছিলেন সেই মূল্যের ওপর সারচার্জ দেবে। আবার বর্তমানে যে সব বাড়ি-ফ্ল্যাট-জমি কেনাবেচা হচ্ছে তা থেকেও যথাযথভাবে সারচার্জ পাওয়া যাচ্ছে না। কারণ এসবের নিবন্ধনের সময় প্রকৃত মূল্যের চেয়ে কম মূল্য দেখানো হয়। এক্ষেত্রে সিটি কর্পোরেশন, ওয়াসা, ডেসকোসহ সরকারি সেবা সংস্থাগুলোর কাছ থেকে সেবার নেয়ার আগে আয়কর রিটার্নের প্রাপ্তি স্বীকারপত্র জমা দেয়ার বিধান বাধ্যতামূলক করলে কর ফাঁকি অনেকাংশে কমবে। সারচার্জ আদায় বাড়াতে সরকারি সব সংস্থাকে একত্রে কাজ করতে হবে বলে মনে করেন তারা।
অর্থনীতিবিদ ও পলিসি রিসার্স ইন্সটিটিউটের (পিআরআই) নির্বাহী পরিচালক ড. আহসান এইচ মনসুরের মতে, সারচার্জ আদায় বহুগুণ বেড়ে যাবে যদি বর্তমান বাজার মূল্য অনুযায়ী সম্পদের দর নির্ধারণ করা হয়। এছাড়া অনলাইনে ভূমি ও গাড়ি রেজিস্ট্রেশন বাধ্যতামূলক হলে সারচার্জ আদায় বাড়বে বলে মনে করেন তিনি।
এনবিআরের সাবেক চেয়ারম্যান আবদুল মজিদের মতে, অর্থনীতির আকার অনুযায়ী সারচার্জ আদায়ের হার নগণ্য। অনেক সম্পদশালী করের আওতার বাইরে রয়েছেন। আবার যারা কর দিচ্ছেন তারাও সঠিকভাবে সম্পদের হিসাব দিচ্ছেন না। সারচার্জ আদায় বাড়াতে খাতভিত্তিক মনিটরিং বাড়ানোর পরামর্শ দেন তিনি।

No comments:

Post a Comment