Friday, February 19, 2016

সার্ক অঞ্চলে বিদেশী বিনিয়োগ বাড়ানোর উদ্যোগ

অর্থমন্ত্রীদের বৈঠকে সিদ্ধান্ত
বাংলাদেশসহ সার্ক অঞ্চলে বিদেশী বিনিয়োগ (এফডিআই) সম্প্রসারণের উদ্যোগ নেয়া হচ্ছে। এ লক্ষ্যে সদস্য দেশগুলোর মধ্যে অশুল্ক বাধা দূর, শুল্ক হার হ্রাস ও সংবেদনশীল তালিকা কমিয়ে আনার সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে। পাশাপাশি সার্ক অঞ্চলে ভৌত যোগাযোগ ব্যবস্থা উন্নয়ন করা হচ্ছে। তবে এ অঞ্চলের এফডিআই সম্ভাবনার ওপর একটি সমীক্ষা করতে এশীয় উন্নয়ন ব্যাংককে (এডিবি) দায়িত্ব দেয়া হয়েছে। কাঠমান্ডুতে অনুষ্ঠিত সার্ক দেশগুলোর অর্থমন্ত্রী ও সচিবদের সপ্তম বৈঠকে এসব সিদ্ধান্ত হয়েছে। ওই বৈঠকে উল্লেখিত সিদ্ধান্তের একটি সারসংক্ষেপ অর্থ মন্ত্রণালয় থেকে পাঠানো হয়েছে মন্ত্রিপরিষদ সভায়। সংশ্লিষ্ট সূত্রে পাওয়া গেছে এসব তথ্য। মন্ত্রিপরিষদ সভার সারসংক্ষেপে বলা হয়, সার্ক উন্নয়ন ব্যাংক প্রতিষ্ঠা না করার পক্ষে একমত পোষণ করা হয়েছে। এক্ষেত্রে প্রয়োজনে সার্ক উন্নয়ন তহবিলকে পরবর্তীকালে ব্যাংকে উন্নীত করা যেতে পারে। অবশ্য সার্ক দেশগুলোর সচিবদের সুপারিশের আলোকে এ সিদ্ধান্ত হয়। পাশাপাশি বৈঠকে সার্ক দেশগুলোর মধ্যে অর্থায়ন নিয়েও আলোচনা হয়। বিশেষ করে অভিন্ন মুদ্রা চালু প্রসঙ্গে বাংলাদেশের অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত সেখানে ব্যক্তিগত অভিমত প্রকাশ করেন।
সার্ক দেশগুলোতে এফডিআই বাড়ানো প্রসঙ্গে জানতে চাইলে বিনিয়োগ বোর্ডের নির্বাহী সদস্য নাভাস চন্দ্র মণ্ডল যুগান্তরকে বলেন, সার্ক অঞ্চলের বিনিয়োগ সম্প্রসারণের উদ্যোগের বিষয়ে কোনো দিকনির্দেশনা বিনিয়োগ বোর্ডে এখন পর্যন্ত আসেনি। তবে এ ধরনের সিদ্ধান্ত হয়ে থাকলে এটি প্রথমে যাবে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে। সেখান থেকে আসবে বিনিয়োগ বোর্ডে।
সারসংক্ষেপে আরও উল্লেখ করা হয়, সার্ক অর্থমন্ত্রীদের সম্মেলন উদ্বোধন করেছেন নেপালের প্রধানমন্ত্রী সুশীল কৈরালা। প্রধানমন্ত্রী এই অঞ্চলের মধ্যে সহযোগিতা আরও দৃঢ় করতে সার্ক অর্থনৈতিক ইউনিয়ন গঠন, ভৌত অবকাঠামো, জ্বালানি ও জ্ঞান বিনিময়ের ওপর গুরুত্বারোপ করেন।
অর্থমন্ত্রীদের বৈঠকে দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে দীর্ঘমেয়াদে বিনিয়োগ বাড়ানো নিয়ে আলোচনা হয়। বিশেষ করে এ অঞ্চলের ভৌত অবকাঠামো নির্মাণের ক্ষেত্রে অর্থায়ন ঘাটতি মোকাবেলায় সদস্য দেশগুলোর মধ্যে বিনিয়োগ সম্প্রসারণের বিষয়ে ঐকমত্য পোষণ করা হয়। পাশাপাশি সার্ক উন্নয়ন তহবিলের সামাজিক বাতায়নকে আরও শক্তিশালী ও সর্বাপেক্ষা সাশ্রয়ী ব্যবস্থা গ্রহণের মাধ্যমে এ অঞ্চলের প্রবাসী আয় স্থানান্তরের গুরুত্ব দেয়া হয়। সার্ক অঞ্চলে ভৌত যোগাযোগ ব্যবস্থা উন্নয়ন এবং বৈশ্বিক অর্থনৈতিক মন্দার বিষয়ে সজাগ থাকা এবং আঞ্চলিকভাবে একটি পর্যবেক্ষণ ব্যবস্থা গড়ে তোলার সিদ্ধান্ত নেয়া হয়।
এশীয় উন্নয়ন ব্যাংকের (এডিবি) এক গবেষণায় দেখা গেছে, বিশ্বের মোট জিডিপিতে দক্ষিণ এশিয়ার অবদান তিন শতাংশ। বৈদেশিক বিনিয়োগের অনুপাত এক দশমিক সাত শতাংশ। রফতানি খাতের অবদান এক দশমিক নয় শতাংশ। যদিও বিশ্বের মোট জনসংখ্যার ২৫ শতাংশ দক্ষিণ এশিয়ায় বাস করছে। আর বিশ্বের মোট গরিবের মধ্যে ৪০ শতাংশ এ অঞ্চলে রয়েছে। যাদের মধ্যে ২৯ শতাংশ মানুষ দৈনিক ৭৮ টাকার (এক ডলার) নিচে আয় করছে।
সার্ক অর্থমন্ত্রীদের বৈঠকে সদস্য দেশগুলোর ঘাটতি অর্থায়ন মোকাবেলা, দারিদ্র্য দূরীকরণ, বিদেশী বিনিয়োগ বৃদ্ধি নিয়েও আলোচনা হয়েছে। বিদেশী বিনিয়োগের দিক থেকে সার্ক দেশগুলোর অবস্থান তুলে ধরা হল।
বাংলাদেশ : বিনিয়োগ বোর্ডের সর্বশেষ তথ্য মতে, ২০১৫-১৬ অর্থবছরে অক্টোবর থেকে ডিসেম্বর এই তিন মাসে দেশী ও বিদেশী বিনিয়োগ আগের তিন মাসের (জুলাই-সেপ্টেম্বর) তুলনায় ৪৮ দশমিক ৯৬ শতাংশ বেড়েছে। বিদেশী বিনিয়োগের ক্ষেত্রে দেখা গেছে, অক্টোবর থেকে ডিসেম্বর এই তিন মাসে ২৬টি বিদেশী বিনিয়োগের প্রস্তাব নিবন্ধিত হয়েছে। এক্ষেত্রে প্রস্তাবিত বিনিয়োগের পরিমাণ ১১৩৮ কোটি টাকা। আগের তিন মাসে বিদেশী বিনিয়োগের প্রস্তাব নিবন্ধিত হয় ৪০টি। বিনিয়োগের পরিমাণ ৮৪৩ কোটি টাকা। ওই হিসাবে বিদেশী বিনিয়োগ বেড়েছে প্রায় ৩৫ শতাংশ। ২০১৪-১৫ অর্থবছরের অক্টোবর থেকে ডিসেম্বর এই তিন মাসের তুলনায় বিদেশী বিনিয়োগ বেড়েছে ৭১ দশমিক ২২ শতাংশ। বিনিয়োগ বোর্ডের তথ্য মতে, চলতি অর্থবছরের অক্টোবর থেকে ডিসেম্বর পর্যন্ত দেশী ও বিদেশী বিনিয়োগের মধ্যে ইঞ্জিনিয়ারিং শিল্প খাতে মোট বিনিয়োগের ২৫ দশমিক ৯৮ শতাংশ এসেছে। রসায়ন খাতে এসেছে ২২ দশমিক ২৮ শতাংশ, সেবা খাতে আসে ১৫ দশমিক ২২ শতাংশ এবং কৃষিভিত্তিক শিল্প খাতে ১৩ দশমিক ৯৮ শতাংশ।
ভারত : সার্ক অঞ্চলের সবচেয়ে বড় দেশ ভারতের বার্ষিক প্রবৃদ্ধির গড় ৮ শতাংশ। উৎপাদন, আবাসন ও যোগাযোগ খাতে উন্নয়ন তাদের প্রথম লক্ষ্য। দেশটির অটোমোবাইল খাত এখন উঠতির দিকে। এর প্রবৃদ্ধির পরিমাণ ২০ শতাংশ, যা তাদের অর্থনীতির প্রধান খেলোয়াড়। জিডিপিতে বার্ষিক অবদান ৪ শতাংশ। পাশাপাশি যোগাযোগ খাতে উন্নয়ন করে বিদেশী বিনিয়োগ পাওয়ার ক্ষেত্রে অনেকটাই এগিয়ে গেছে। নেপাল, শ্রীলংকা ও পাকিস্তানে অটোমোবাইল ক্ষেত্রে বিনিয়োগ করতে সক্ষম হয়েছে দেশটি, যা বৈঠকে আলোচনা হয়।
নেপাল : এদিকে নেপালে সবচেয়ে বেশি বিনিয়োগ রয়েছে ভারতের। যার পরিমাণ মোট বিদেশী বিনিয়োগের ৬২ দশমিক ২ শতাংশ। নেপাল পোশাক রফতানি করছে সার্কভুক্তসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশে। এছাড়া দেশটির অর্থনীতিতে বিনিয়োগের অন্যতম সেক্টরগুলো হচ্ছে কার্পেট, উলেন দ্রব্য এবং কৃষিপণ্য। নেপালের সুবিধা হচ্ছে এখানে ভারত ছাড়াও বিশ্বের শক্তিশালী অর্থনীতির অংশীদাররা বিনিয়োগে আগ্রহী। নেপালে ভারত, জাপান, যুক্তরাষ্ট্র, কোরিয়া ও যুক্তরাজ্যের বিনিয়োগ আছে ৯৭ দশমিক ৫ শতাংশ।
শ্রীংলকা : শ্রীলঙ্কার স্থিতিশীল রাজনৈতিক অবস্থার পর থেকে বিদেশী বিনিয়োগ সন্তোষজনক হারে বাড়ছে। বড় শিল্পাঞ্চল নির্মাণ, বিদ্যুৎ, যোগাযোগ ও বন্দর প্রতিষ্ঠায় বিনিয়োগ এসেছে। দেশটির জিডিপিতে কৃষির অবদান ১৬ দশমিক ৮ শতাংশ, সার্ভিস সেক্টরের ৫৬ দশমিক ২ শতাংশ। তাদের অর্থনীতি এখনও নিয়ন্ত্রিত হচ্ছে পোশাক রফতানির মাধ্যমে।

No comments:

Post a Comment