Friday, February 26, 2016

ঘাতকদের ফাঁসি কার্যকর দেখে মরতে চাই- পিলখানা ট্রাজেডি দিবসে স্বজনদের আর্তি

রাজধানীর বনানী কবরস্থানে পিলখানা ট্রাজেডিতে
নিহত সেনা কর্মকর্তাদের কবরে বৃহস্পতিবার
ফুলেল শ্রদ্ধা জানান স্বজনরা
অর্থ আর বাড়ি-গাড়ি দিয়ে সন্তানের শূন্যস্থান কখনও পূরণ হয় না। আর্তনাদ করে কথাগুলো বলছিলেন পিলখানা ট্রাজেডির নির্মম শিকার শহীদ মেজর মো. মমিনুল ইসলাম সরকারের পিতা মফিজুল ইসলাম সরকার (৮৭)। বৃহস্পতিবার ৪ মেয়েকে নিয়ে ছেলের কবর জিয়ারত করতে এসেছিলেন তিনি।
শহীদ কর্নেল গুলজার উদ্দিন আহমেদের কবর ছুঁয়ে কাঁদছিলেন স্ত্রী জেসমিন আহমেদ ও বড় বোন দিলরুবা খাতুন। কবরের বুকে বেড়ে ওঠা সবুজ ঘাস টেনে বিলাপ করছিলেন। দু’হাত তুলে মোনাজাতের সময় ফুঁপিয়ে কাঁদতে শুরু করেন তারা। জেসমিন আক্তারের সঙ্গে শহীদ গুলজারের প্রসঙ্গ তুলতেই অঝোরে কাঁদতে শুরু করেন। এ কান্নার যেন শেষ নেই। পাশে ননদ দিলরুবা খাতুন কিছুতেই সান্ত্বনা দিতে পারছিলেন না। দিলরুবা খাতুন বললেন, আমার ভাইয়ের কোনো তুলনা হয় না। এমন সাহসী আর দেশপ্রেমিক অফিসারকে কোন উদ্দেশ্যে হত্যা করা হল। সেই রহস্য বের করা জরুরি। গোটা জাতি আজ জানতে চায় কী ছিল তাদের অপরাধ। এ দিনটিকে ‘শহীদ সেনা দিবস’ ঘোষণা এবং শহীদদের স্মরণে স্মৃতিস্তম্ভ নির্মাণের দাবি জানালেন তিনি।
শহীদ মেজর সৈয়দ ইদ্রিস ইকবালের স্ত্রী ডা. তাসলিমা রফিক ছোট্ট দু’সন্তানকে নিয়ে স্বামীর কবরের পাশে বিলাপ করছিলেন। দু’সন্তান তাহসিনা ( ৯) ও নুসায়বা (সাড়ে ৭ বছর)। মায়ের কান্না দেখে কাঁদছে ওরাও। কবরস্থানে দায়িত্বরত সেনা সদস্যরা দু’শিশুকে সান্ত্বনা দেয়ার চেষ্টা করছিলেন। ডা. তাসলিমা রফিক জানান, স্বামী শহীদ হওয়ার ৬ মাস পর জন্ম হয় নুসায়বার। খুনিদের মৃত্যুদণ্ডের রায় দেয়া হয়েছে, কিন্তু এখনও সেই রায় কার্যকর হচ্ছে না। রায় কার্যকর জরুরি, কেননা রায় কার্যকর হলে কিছুটা হলেও শহীদ পরিবারের স্বজনরা শান্তি পাবেন। সন্তানরা বলতে পারবে, বাবার খুনিদের বিচার হয়েছে।
রাজিয়া বেগম, বয়স প্রায় ৭২ বছর। শহীদ সেনা কর্মকর্তা মেজর মোস্তফা আসাদুজ্জামানের কবরের পাশে শিশুর মতো কাঁদছেন। পাশে বড় মেয়ে হোসনে আরা পারভীন মাকে সান্ত্বনা দিতে গিয়ে বারবার ব্যর্থ হচ্ছেন। স্টিলের বেড়ায় মাথা ঠুকে বৃদ্ধ মা বলছিলেন, ‘বাবা, বাবারে, তুমি কেমন আছ। তোমারে ছাড়া আর ভালো লাগে না। কখন যে মরে যাই। বাবা তোমায় আমি প্রায় স্বপ্ন দেখি, তুমি আমাকে ডাকছ।’
শহীদ মেজর এসএএম মামুনুর রহমানের ভাই মনিরুজ্জামানের দাবি, ওইদিনের শহীদ সেনা কর্মকর্তাদের স্মরণে স্মৃতিস্তম্ভ তৈরি হোক।
শহীদ কর্নেল কুদরত এলাহীর বাবা হাবিবুর রহমান ছেলের কবরের পাশে দাঁড়িয়ে যেন কান্নার শক্তিও হারিয়ে ফেলেন। পুত্রশোকে তার শরীর কাঁপছিল। চোখের পানি গড়িয়ে পড়ছে। বললেন, এটি পৃথিবীর জঘন্যতম হত্যাকাণ্ড। বিনা অপরাধে তার সন্তানসহ আর্মি অফিসারদের নির্মমভাবে হত্যা করা হয়েছে। এ হত্যাকাণ্ডের নেপথ্যে যারা আছে তাদের বের করতে হবে। রায় কার্যকর করতে হবে। এটা সরকারের সবচেয়ে বড় দায়িত্ব। ছেলে সাকিব রহমান জানান, বাবাসহ সেনা কর্মকর্তা হত্যাকাণ্ডের মূল হোতাদের মুখোশ উন্মোচন করা হোক।
শহীদদের শ্রদ্ধা জানাতে আসা স্বজনদের অনেকেই কথা বলেননি মিডিয়া কর্মীদের সঙ্গে। তাদের চোখে-মুখে শোকের ছায়া স্পষ্ট। প্রিয় মানুষটির কবরে ফুল দিয়ে কেউ কেউ দীর্ঘক্ষণ দাঁড়িয়ে শুধু কেঁদেছেন। যাদের কেউ হারিয়েছেন বাবা, কেউ স্বামী, কেউ ভাইকে।
এদিকে সকাল ৯টায় রাষ্ট্রপতির পক্ষে তার সামরিক সচিব মেজর জেনারেল আবুল হোসেন, প্রধানমন্ত্রীর পক্ষে তার সামরিক সচিব মেজর জেনারেল মিয়া মোহাম্মদ জয়নুল আবেদীন, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর পক্ষে সিনিয়র সচিব ড. মো. মোজাম্মেল হক খান শহীদ সেনা কর্মকর্তাদের কবরে পুষ্পস্তবক অর্পণ করেন।
এরপর সেনাপ্রধান জেনারেল আবু বেলাল মোহাম্মদ শফিউল হক, বিমান বাহিনীর প্রধান এয়ার চিফ মার্শাল আবু এসরার, নৌবাহিনীর প্রধান ভাইস এডমিরাল নিজামউদ্দিন আহমেদ যৌথভাবে পুষ্পস্তবক অর্পণ করেন। পরে বর্ডার গার্ড বাংলাদেশের মহাপরিচালক মেজর জেনারেল আজিজ আহমদ পুষ্পস্তবক অর্পণ করেন। শহীদের আত্মার মাগফিরাত কামনা করে এক মিনিট নীরবতা পালনসহ সশস্ত্র বাহিনীর সদস্যরা স্যালুট প্রদান করেন।
এরপর সাবেক রাষ্ট্রপতি হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ, তার দল জাতীয় পার্টির কো-চেয়ারম্যান জিএম কাদের এবং মহাসচিব রুহুল আমিন হাওলাদারকে সঙ্গে নিয়ে শহীদদের প্রতি ফুল দিয়ে শ্রদ্ধা নিবেদন করেন। এক মিনিট নীরবতা পালন করে শহীদ সেনাদের আত্মার মাগফিরাত কামনায় দোয়া করেন।
বেলা ১১টায় বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার পক্ষে তার দলের স্থায়ী কমিটির সদস্য মাহবুবুর রহমানের নেতৃত্বে একটি প্রতিনিধি দল শহীদদের কবরে ফুল দিয়ে শ্রদ্ধাজ্ঞাপন করেন। এ সময় মাহবুবুর রহমান সাংবাদিকদের বলেন, সেনা অফিসারদের হত্যার ঘটনায় বিচার বিভাগীয় তদন্ত করা জরুরি। পিলখানা হত্যাকাণ্ডের বিচার দীর্ঘ সময় ধরে হচ্ছে, বিচারের নামে প্রহসনও চলছে। সুষ্ঠু বিচার হচ্ছে না। প্রকৃত হত্যাকারী ও ষড়যন্ত্রকারীরা রহস্যের আড়ালে থেকে গেছে। তাই আমরা বিডিআর বিদ্রোহের প্রকৃত রহস্য উন্মোচনে বিচার বিভাগীয় তদন্ত দাবি করছি।

No comments:

Post a Comment