Wednesday, February 24, 2016

বেসিক ব্যাংক কেলেংকারিতে বাচ্চুর নাম আছে

সংসদে অর্থমন্ত্রী
বেসিক ব্যাংকের ঋণ কেলেংকারিতে প্রতিষ্ঠানটির সাবেক চেয়ারম্যান শেখ আবদুল হাই বাচ্চুর সংশ্লিষ্টতা দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) না পেলেও পেয়েছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক ও নিরীক্ষা প্রতিষ্ঠান। মঙ্গলবার জাতীয় সংসদে এ তথ্য জানিয়েছেন অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত। এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘বাংলাদেশ ব্যাংক ও বেসিক ব্যাংক কর্তৃক নিয়োগকৃত বহিঃনিরীক্ষক প্রতিষ্ঠানদ্বয়ের দাখিলকৃত কার্যভিত্তিক নিরীক্ষা প্রতিবেদনে অনিয়মিত ঋণ মঞ্জুর, নিয়োগ ও পদোন্নতিতে তৎকালীন পরিচালনা পর্ষদের চেয়ারম্যান আবদুল হাই বাচ্চুর সংশ্লিষ্টতা ছিল বলে উল্লেখ রয়েছে।’ অর্থমন্ত্রীর অনুপস্থিতিতে তার পক্ষে প্রতিমন্ত্রী এমএ মান্নান প্রশ্নের জবাব দেন।
২০০৯ থেকে ২০১২ সালের মধ্যে রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকটির গুলশান, দিলকুশা ও শান্তিনগর শাখা থেকে মোট সাড়ে তিন হাজার কোটি টাকা ঋণ অনিয়মের মাধ্যমে বিতরণের অভিযোগ ওঠার পর তার তদন্তে নেমেছিল দুদক। ৪ বছর তদন্তের পর গত বছরের সেপ্টেম্বরে দুদক ১৮টি মামলা করলেও বাচ্চুকে আসামি করা হয়নি, যদিও ব্যাংকটির কর্মকর্তা-কর্মচারীদের অভিযোগের আঙুল ছিল তার বিরুদ্ধে। এ নিয়ে পোস্টারও বের করেছিলেন তারা। সাবেক সংসদ সদস্য বাচ্চুকে ২০০৯ সালে বেসিক ব্যাংকের চেয়ারম্যান পদে নিয়োগ দেয় সরকার। ২০১২ সালে তার নিয়োগ নবায়নও হয়েছিল। কিন্তু ঋণ কেলেংকারির অভিযোগ উঠলে ২০১৪ সালে ব্যাংকটির ব্যবস্থাপনা পরিচালক কাজী ফখরুল ইসলামকে অপসারণ করার পর চাপের মুখে থাকা বাচ্চু পদত্যাগ করেন। তখন অর্থমন্ত্রী বলেছিলেন, পদত্যাগ করলেই পার পাবেন না বাচ্চু। তদন্তে দোষ প্রমাণিত হলে তার বিরুদ্ধেও ব্যবস্থা নেয়া হবে। এরপর দুদকের তদন্তে বাচ্চু পার পাওয়ায় তাতে অসন্তুষ্ট অর্থ মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় কমিটি নিজেই তদন্তের উদ্যোগ নেয়। সেলিম উদ্দিনের প্রশ্নের জবাবে অর্থমন্ত্রী আরও জানান, বেসিক ব্যাংকের ঋণ কেলেংকারির সঙ্গে ২৭ জন কর্মকর্তা, ৫৬টি ব্যবসায়িক ও আটটি সার্ভেয়ার প্রতিষ্ঠান জড়িত থাকার বিষয়টিও প্রতিবেদনে এসেছে।
জড়িত ব্যক্তিরা হলেন : ব্যাংকের সাবেক ব্যবস্থাপনা পরিচালক একেএম সাজেদুর রহমান ও কাজী ফখরুল ইসলাম, সাবেক অতিরিক্ত ব্যবস্থাপনা পরিচালক শেখ মঞ্জুর মোরশেদ, সাবেক উপব্যবস্থাপনা পরিচালক ফজলুস সোবহান ও কনক কুমার পুরকায়স্থ, সাময়িক বরখাস্তকৃত উপব্যবস্থাপনা পরিচালক এ মোনায়েম খান, উপব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. সেলিম, মহাব্যবস্থাপক জয়নুল আবেদিন চৌধুরী ও মোজাম্মেল হোসেন, সাময়িক বরখাস্ত মহাব্যবস্থাপক খন্দকার শামীম হোসেন, মহাব্যবস্থাপক মনিরুজ্জামান, গোলাম ফারুক খান, চাকরিচ্যুত মহাব্যবস্থাপক মোহাম্মদ আলী, সাবেক উপমহাব্যবস্থাপক কোরবান আলী, উপমহাব্যবস্থাপক ওমর ফারুক, চাকরিচ্যুত উপমহাব্যবস্থাপক শিপার আহমেদ, সাময়িক বরখাস্ত উপমহাব্যবস্থাপক এসএম ওয়ালিউল্লাহ, সহকারী মহাব্যবস্থাপক জহির উদ্দিন, ইমরুল ইসলাম, আবদুস সবুর, আবদুস সাত্তার খান, পলাশ দত্ত গুপ্ত, ইকরামুল বারী, সাবেক সহকারী মহাব্যবস্থাপক সরোয়ার হোসেন, ব্যবস্থাপক মুহিবুল হক, চাকরিচ্যুত উপব্যবস্থাপক এসএম জাহিদ হাসান ও উপব্যবস্থাপক এনএ তোফিকুল আলম।
জড়িত ৫৬টি প্রতিষ্ঠান হল : আজাদ ট্রেডিং, ভাসাবি ফ্যাশন, তাহমিনা ডেনিম, লাইফ স্টাইল ফ্যাশন মেকার, ইউকে বাংলা ট্রেডিং, তাহমিনা নিটওয়্যার, ফারশি ইন্টারন্যাশনাল, খাদিজা অ্যান্ড সন্স, লিটল ওয়ার্ল্ড, এআরএসএস এন্টারপ্রাইজ, আমিরা শিপিং এজেন্সি, এশিয়ান শিপিং বিডি, এসএফজি শিপিং লাইন, মনিকা ট্রেডিং ইন্টারন্যাশনাল, ফার্স্ট অ্যান্ড বেস্ট ট্রেড ইমপেক্স, ট্রেড হাউজ, এশিয়ান ফুড ট্রেডিং, সুরমা স্টিল অ্যান্ড স্টিল ট্রেডিং, সিলভার কম ট্রেডিং, সিনট্রেক্স, বি আলম শিপিংলাইনস, এসএল ডিজাইনার, তানজিনা ফ্যাশন, ফিয়াজ এন্টারপ্রাইজ, নাহার গার্ডেন, এলআর ট্রেডিং, সৈয়দ ট্রেডার্স, রুদ্র স্পেশালাইজড কোল্ড স্টোরেজ, নিউ অটো ডিফাইন, টেলিউইজ ইন্টারন্যাশনাল, ডায়নামিক ট্রেডিং, আহমেদ ওয়েলস মিলস, বিথী এন্টারপ্রাইজ, ওমারেল্ড স্পেশালাইজড কোল্ড স্টোরেজ, এমারেল্ড অটো ব্রিকস, প্রোপেল ইন্টারন্যাশনাল, আরআই এন্টারপ্রাইজ, গুঞ্জন অ্যাগ্রো এরামেটিক অটো রাইস মিল, হক ট্রেডিং, ভয়েস এন্টারপ্রাইজ, হাসিব এন্টারপ্রাইজ, এসওএস ব্রাদার্স, আলী কন্সট্রাকশন অ্যান্ড সাপ্লায়ার্স, বাশার এন্টারপ্রাইজ, এমারেন্ড ওয়েল, সিমেক্স, আরকে ফুডস, সৈয়দ রিয়েল এস্টেট অ্যান্ড ডেভেলপারস, রিলায়েন্স শিপিংলাইনস, সৈয়দ কনস্ট্রাংকস, নীল সাগর অ্যাগ্রো ইন্ডাস্ট্রিজ, নীল সাগর অ্যাগ্রো ইন্ডাস্ট্রিজ (ফিড মিল ইউনিট), পারমা ইঞ্জিনিয়ারিং ওয়াকর্স ও এমারেল্ড ড্রেস, বর্ষণ অ্যাগ্রো ইন্ডাস্ট্রিজ ও আজবিহা অ্যাগ্রো ইন্ডাস্ট্রিজ।
জড়িত সার্ভেয়ার প্রতিষ্ঠানগুলো হল : এসবি সার্ভে ফার্ম, রূপসা সার্ভেয়ার, পিএসআর, বিডিএস এডজাস্টার, ইউনিক সার্ভে সার্ভিস ব্যুরো, প্রফেশনাল অ্যাসোসিয়েটস, দেশ পরিদর্শন কোং ও আইএইচএস ইন্সপেকশন।
অর্থমন্ত্রী জানান, কেলেংকারির কারণে সরকার ২০১৪ সালের ৬ জুলাই বেসিক ব্যাংকের তৎকালীন পরিচালনা পর্ষদ ভেঙে একজন অভিজ্ঞ ব্যাংকারকে চেয়ারম্যান করে নতুন পরিচালনা পর্ষদ নিয়োগ দেয়। বাংলাদেশ ব্যাংক ২০১৪ সালের ২৫ মে বেসিক ব্যাংক কেলেংকারিতে জড়িত তৎকালীন ব্যবস্থাপনা পরিচালক কাজী ফখরুল ইসলামকে অনিয়ম ও দুর্নীতির দায়ে চাকরি থেকে অপসারণ করে। এছাড়া দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) প্রাথমিক অনুসন্ধান শেষে বিভিন্ন থানায় ৫৬টি ঋণগ্রহীতা প্রতিষ্ঠান, ৮টি সার্ভেয়ার প্রতিষ্ঠানের ১১ জন মালিক/কর্মকর্তা এবং ২৭ জন ব্যাংক কর্মকর্তার বিরুদ্ধে এফআইআর দাখিল করে। মামলাগুলো বর্তমানে তদন্তনাধীন রয়েছে।
খেলাপি ঋণ : এদিকে দেশের বিভিন্ন ব্যাংকে খেলাপি ঋণের পরিমাণ ৭৪ হাজার ৭৬৯ কোটি টাকা বলে জানিয়েছেন অর্থমন্ত্রী। আবদুল ওয়াদুদের এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, সিআইবি ডাটাবেজে রক্ষিত ডিসেম্বর ২০১৫ পর্যন্ত মাসভিত্তিক পঞ্চাশ হাজার টাকা ও তদূর্ধ্ব বকেয়া স্থিতিসম্পন্ন ঋণ হিসাব এবং দশ হাজার টাকা ও তদূর্ধ্ব স্থিতি সম্পন্ন খেলাপি ক্রেডিট কার্ড হিসাবের ভিত্তিতে দেশের বিভিন্ন ব্যাংকে খেলাপি ঋণের পরিমাণ ৭৪ হাজার ৭৬৯ কোটি টাকা। এছাড়াও দেশের তফসিলি ব্যাংকগুলো কর্তৃক বিতরণকৃত কৃষি ও পল্লী ঋণের মধ্যে জানুয়ারি ২০১৬ ভিত্তিক খেলাপি ঋণের পরিমাণ ৪ হাজার ৫১৯ কোটি ২৪ লাখ টাকা।
করদাতা : এসএম আবুল কালাম আজাদের আরেক প্রশ্নের জবাবে অর্থমন্ত্রী বলেন, বর্তমানে দেশে ই-টিআইএনধারী করদাতার সংখ্যা ১৮ লাখ ৬১ হাজার ৬৮২ জন। এর মধ্যে ব্যক্তি পর্যায়ের করদাতা ১৭ লাখ ৭৬ হাজার ৪০১ জন এবং প্রাতিষ্ঠানিক পর্যায়ের ই-টিআইএনধারীর সংখ্যা ৮৫ হাজার ২৮১ জন।
বৈদেশিক ঋণের দেনা শোধ হয়েছে : ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ সরকার টানা দুই মেয়াদের ৭ বছরে সব বৈদেশিক ঋণ পরিশোধ করেছে বলে জানিয়েছেন অর্থমন্ত্রী। নিজাম উদ্দিন হাজারীর প্রশ্নের জবাবে তিনি এ তথ্য জানান। অর্থমন্ত্রী বলেন, জানুয়ারি ২০০৯ থেকে ৩০ জুন ২০১৫ তারিখ পর্যন্ত মোট বৈদেশিক ঋণ পরিশোধ করা হয়েছে ৬ হাজার ৬৮১ দশমিক ৯০ মিলিয়ন মার্কিন ডলার সমপরিমাণ ৫০৫,৬২৩ দশমিক ২০ কোটি টাকা। এর মধ্যে আসল বাবদ ৫,৪০৬ মিলিয়ন মার্কিন ডলার সমপরিমাণ ৪০৯,৬০২ দশমিক ৪০ কোটি টাকা এবং সুদ বাবদ ১,২৭৫ দশমিক ৯০ মিলিয়ন মার্কিন ডলার সমপরিমাণ ৯৬,০২০ দশমিক ৮০ কোটি টাকা।

No comments:

Post a Comment