চট্টগ্রামে বঙ্গ অসম উৎকল আন্তর্জাতিক
সাহিত্য-সাংস্কৃতিক সম্মেলন সম্পন্নমাকে বৃদ্ধাশ্রমে নয়, মাতৃভাষাকে
বিসর্জন নয়, এই হোক আমাদের প্রতিনিয়ত পথ চলার আদর্শ
*সোহেল মুহাম্মদ ফখরুদ-দীন*
ভারত
বাংলাদেশের শতাধিক কবি সাহিত্যিক গবেষক শিাবিদ সাংবাদিক চট্টগ্রামে ভাষা
সম্মেলনে একত্রিত হয়ে এই শপথে পথ চলার অঙ্গীকারবদ্ধ হয়েছেন “মাকে
বৃদ্ধাশ্রমে নয়, মাতৃভাষাকে বিসর্জন নয়, এই হোক আমাদের প্রতিনিয়ত পথ চলার
আদর্শ”। সম্মেলনের সমাপনী পর্বে জন্ম দাত্রী মা ও প্রিয় মায়ের ভাষাকে
সার্বজনীন শ্রদ্ধা ও ভালবাসায় লালন পালনের জন্য কবি সাহিত্যিকদের ঐক্যবদ্ধ
হওয়ার জন্য আহবান জানান। গত ২১ ফেব্র“য়ারি সারাদিনব্যাপী বিশাল উৎসাহ ও
উদ্দীপনার মাধ্যমে মাতৃভাষা বাংলাকে প্রকৃত চর্চায় ছাত্র-ছাত্রীদের কাছে
এবং বর্তমান প্রজন্মের সকলের কাছে পৌঁছে দেওয়ার ল্েয “মাতৃভাষা মধুর হোক
সর্বআঙ্গিনায়” এই শ্লোগানকে সামনে রেখে অমর একুশের ভাষা শহীদদের স্মরণে
চট্টগ্রাম ইতিহাস চর্চা কেন্দ্রের আয়োজনে ও ভারতীয় জাতীয় সাহিত্য প্রকাশন
ট্রাষ্ট্রের সহযোগিতায় চট্টগ্রামে প্রথম বারের মত বঙ্গ অসম উৎকল
আন্তর্জাতিক সাহিত্য-সাংস্কৃতিক সম্মেলন ২০১৬ প্রত্যাশী অডিটরিয়ামে
চট্টগ্রাম ইতিহাস চর্চা কেন্দ্রের উপদেষ্টা বিশিষ্ট প্রাবন্ধিক শিাবিদ
অধ্যাপক মোহাম্মদ মাসুম চৌধুরীর সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত হয়। সম্মেলনের উদ্বোধন
করেন ভারতীয় জাতীয় সাহিত্য প্রকাশন ট্রাস্টের সাধারণ সম্পাদক বিশিষ্ট
কথাসাহিত্যিক, কবি ও অনুবাদক শ্রী শক্তিময় দাশ। প্রধান অতিথি হিসেবে
উপস্থিত ছিলেন ভারতের জাতীয় অধ্যাপক নিখিল ভারত বঙ্গীয় সাহিত্য সম্মেলন
পশ্চিমবঙ্গ রাজ্য শাখার সভাপতি ড. সুশীল ভট্টাচার্য (ডি.লিট)। চট্টগ্রাম
ইতিহাস চর্চা কেন্দ্রের সভাপতি ইতিহাস গবেষক ও বঙ্গ অসম উৎকল আন্তর্জাতিক
সাহিত্য-সাংস্কৃতিক সম্মেলন উদযাপন কমিটির সদস্য সচিব সোহেল মো.
ফখরুদ-দীনের সঞ্চালনায় দিনব্যাপী এই সম্মেলনে বিশেষ অতিথি হিসেবে বক্তব্য
রাখেন সার্ক কালচারাল ফোরাম ভারতের সভাপতি কবি হরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তী,
দৈনিক পূর্বদেশের ব্যবস্থাপনা সম্পাদক আলহাজ্ব মুজিবুর রহমান সিআইপি,
চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাচ্য ভাষা ও সংস্কৃতি বিভাগের প্রাক্তন
চেয়ারম্যান প্রফেসর ড. জিনবোধি ভিু, লেখক গবেষক ও সময়ের আলো পত্রিকার
সম্পাদক মোঃ কামাল উদ্দিন, বিশিষ্ট কথাসাহিত্যিক জয়ন্ত কুমার বরদলৈ,
বিশিষ্ট কবি ও সাহিত্যিক শেওয়ালি বরবরা, শিাবিদ ড. নির্মল কুমার বর্মন,
ইতিহাস গবেষক কবি এ.বি.এম ফয়েজউল্লাহ, ভাষা গবেষক ড. এম.এ মোক্তাদির,
বিশিষ্ট কবি সাংবাদিক গবেষক বিশ্বজিৎ সেন, কুষ্টিয়া নজরুল একাডেমীর সভাপতি
কবি আবদুর রশিদ চৌধুরী, বিশিষ্ট চিকিৎসক ডা. এম.এ তাহের জামান, মওলানা
মোহাম্মদ আবেদ আলী, আলহাজ্ব সৈয়দ আমান উল্লাহ, সুফী গবেষক এস.এম সিরাজ
উদ-দৌলা, রাণীবন্দর দিনাজপুরের কবিতা পরিষদের সভাপতি কবি লুৎফর রহমান,
প্রাবন্ধিক লায়ন এ.কে. জাহেদ চৌধুরী, লেখক মোস্তফা আনোয়ারুল ইসলাম, লেখক
গবেষক মোঃ আবদুর রহিম, কবি ও কথাসাহিত্যিক দিপালী ভট্টাচার্য, সাংবাদিক
লেখক নুর মুহাম্মদ রানা, কবি সাহিত্যিক মানিক লাল মজুমদার, কবি মাহবুব
শাহ্, বরিশাল সাহিত্য পরিষদের সভাপতি কবি দিনেশ মন্ডল, বরিশাল রবীন্দ্র
নজরুল স্মৃতি একাডেমীর সভাপতি কবি মাসুম আহমদ রানা, গবেষক লায়ন ডা. বরুণ
কুমার আচার্য বলাই, বিশিষ্ট পুঁথিগবেষক ইসহাক চৌধুরী, সিরাজগঞ্জ সাহিত্য
পরিষদের সভাপতি মুক্তিযোদ্ধা কবি মান্না রায়হান, সাংবাদিক সোহেল তাজ,
পশ্চিমবঙ্গের বিশিষ্ট কবি প্রশান্ত মানিক, পশ্চিমবঙ্গের বিশিষ্ট কবি ও
শিাবিদ তাপস পাল, কলকাতার বিশিষ্ট আবৃত্তি শিল্পী রঞ্জিত কুমার যস, শিাবিদ ও
কবি শিখা পাল, কবি সুনীল করন, প্রখ্যাত সংগীত শিল্পী সুশ্রী ঘোষ, কবি
অঞ্জন চন্দ্র, কবি শৈবাল মুখার্জী, কবি ও কথাসাহিত্যিক সুধাংশু শেখর ঘোষ,
কবি ও শিাবিদ জয়ন্ত কুমার বরদলৈ, কবি শ্রী রঘুনাথ বরবরা, কবি কনিকা বরদলৈ,
কবি শেওলালি বরবরা, কবি মিস্ কল্যাণী বরুয়া, কবি রাজেন্দ্র নাথ ওঝা, কবি ও
কথাসাহিত্যিক দ্বিজেন্দ্র নাথ পাঠক, শিাবিদ সাহিত্যিক ও কবি সঙ্গীতা বরুয়া
শইকীয়া, ভারতের বিপ্লবী কবি সমরেন্দ্র দাশ গুপ্ত, বিশিষ্ট লেখক গবেষক ও কবি
শক্তি পুরকাইত, আসাম বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ক্যামেলিয়া তরাজ, পূর্ব
মেদিনিপুরের বিশিষ্ট ইতিহাস গবেষক অধ্যাপক গোবিন্দ প্রসাদ, বিশিষ্ট
কথাশিল্পী ও কবি রবীন্দ্রনাথ ভৌমিক, বিশিষ্ট শিাবিদ ড. নির্মল কুমার বর্মন,
বিশিষ্ট সাহিত্যিক দেবাশিস্ মাঝি, কবি ও কথাসাহিত্যিক আরিফ চৌধুরী, কবি
আসিফ ইকবাল, ইমরান সোহেল, মুক্তিযোদ্ধা অমর দত্ত, সংগঠক কবি সজল দাশ, কবি
মেহেরুননেসা, তালুকদার জসিম উদ্দিন, শিল্পী সৈকত সুমন, সংগীতশিল্পী জামাল
উদ্দিন, সংগীতশিল্পী হানিফ চৌধুরী, মানবাধিকার কর্মী জয়নল আবেদিন লিটন,
মানবাধিকার সংগঠক সেলিম উদ্দিন চৌধুরী, প্রদীপ কুমার মিশ্র, মোহাম্মদ
সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী, শহীদুল আলম, আলমগীর অপু, ফারুক আহমদ, মহিউদ্দিন
চৌধুরী ইসা, ডাঃ ফাতেমা আক্তার রুমা, মোহাম্মদ সেলিম, মোহাম্মদ নুরুল আমিন
প্রমূখ। সভায় উদ্বোধনী বক্তব্যে ভারতীয় জাতীয় সাহিত্য প্রকাশন ট্রাস্টের
সেক্রেটারী বিশিষ্ট কথাসাহিত্যিক অনুবাদক শক্তিময় দাশ বলেছেন, মাতৃভাষা
বাংলার জন্য পৃথিবীতে বাঙালিরাই একমাত্র জাতি যারা জন্মদাত্রী মা, মায়ের
প্রিয়ভাষার রার জন্য হাসতে হাসতে রাজপথে রক্ত দিয়ে ইতিহাস সৃষ্টি করেছে।
জান্তা পাকিস্তানিদের অস্ত্রের বিরুদ্ধে নিরস্ত্র বাঙালি মায়ের দামাল
ছেলেরা কালো রাজপথকে রক্তাক্ত লাল করেছে, তবুও নিজের মায়ের ভাষা কেড়ে নিতে
দেয় নি। বাঙালি জাতি হিসেবে এর চাইতে গর্বের আর কি হতে পারে? তিনি আরো
বলেন, দুঃখের বিষয় হলেও সত্য যে, আজকে বাংলা ভাষাকে নিয়ে বাঙালির ছেলেরাই
কটা করছে। এটি শুধু দুঃখের নয়, লজ্জারও বটে। আমাদের উচিত প্রত্যেক
মাতৃভাষাকে স্ব স্ব অবস্থানে সম্মানের সহিত মর্যাদা অধিষ্ঠ করা। আমাদের শিা
প্রতিষ্ঠানে মায়ের ভাষাকে মর্যাদার সহিত প্রাধান্য দিতে হবে। বাংলা
সাহিত্যকে মর্যাদা ও শ্রীবৃদ্ধির জন্য বাংলা মায়ের প্রকৃত ভাষাকে আরো
সুন্দরভাবে এই প্রজন্মের ছাত্র-ছাত্রীদের হাতে তুলে দিতে হবে। প্রধান
অতিথির বক্তব্যে ভারতের রাষ্ট্রপতি পুরস্কার প্রাপ্ত জাতীয় শিক ও নিখিল
ভারত বঙ্গীয় সাহিত্য সম্মেলন পশ্চিমবঙ্গ রাজ্য শাখার সভাপতি ড. সুশীল
ভট্টাচার্য বলেছেন, বঙ্গ অসম উৎকল আন্তর্জাতিক এ ভাষা সম্মেলন বাঙালি
জাতিকে আজ সমৃদ্ধির পথে আরো একধাপ এগিয়ে নিয়ে গেল। ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলনের
সূতিকাগার মাস্টারদা সূর্যসেনের প্রিয় চট্টগ্রামে চট্টগ্রাম ইতিহাস চর্চা
কেন্দ্র এই আয়োজন সত্যিকার প্রশংসার দাবি রাখে। আজ বাংলার এই চট্টগ্রামে
৪৩জন ভারতীয় কবি সাহিত্যিকদের আগমনে বাংলা ভাষা সম্মেলনকে শ্রীবৃদ্ধি
করেছে। তিনি আরো বলেন, বায়ান্নের ভাষা আন্দোলনের সূত্র ধরে বাংলার
স্বাধীনতা। বাঙালি জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান মহান ভাষা
আন্দোলন থেকে শুরু করে স্বাধীনতা আন্দোলনের মাধ্যমে বাঙালিকে বিশ্ব দরবারে
মর্যাদা দান করেছেন। তাঁরই যোগ্য কন্যা বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ
হাসিনা বাংলা ভাষাকে জাতিসংঘের প্রাতিষ্ঠানিক ভাষা ও আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা
রূপে সমগ্র পৃথিবীতে পালনের উদ্যোগের মাধ্যমে বাংলা ভাষাকে সমগ্র পৃথিবীতে
নতুন করে নন্দিত ইতিহাস সৃষ্টি করেছেন। ফলে অমর একুশে ফেব্র“য়ারি আজ
আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা রূপে স্বীকৃত। আমাদের এই বাংলা ভাষায় সাহিত্য
সংস্কৃতিকে এগিয়ে নিতে কবি সাহিত্যিকদের নিরলস পরিশ্রম ও ভূমিকা রাখতে হবে।
সার্ক কালচারাল ফোরাম ভারতের সভাপতি কথাসাহিত্যিক হরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তী
বলেছেন, আমাদের সকলের উচিত স্ব স্ব মাতৃভাষাকে সম্মানের সহিত লালন ও পালন
করা। পৃথিবীতে অনেক জাতি ও ুদ্র ুদ্র গোষ্ঠী আজ তাদের আদি ভাষাকে হারিয়ে
ফেলেছে। অসচেতনতার কারণে তাদের প্রিয় মাতৃভাষা আজ কবরে নিমজ্জিত। আমরা
বাঙালি জাতি আমাদের ভাষা সাহিত্য ও সংস্কৃতিকে নিজের মায়ের মতো লালন ও পালন
করতে হবে। মাকে যেমন বৃদ্ধাশ্রমে পাঠানো উচিত নয়, তেমনি প্রিয় মায়ের
ভাষাকে বিসর্জন দেওয়া আমাদের নীতি নৈতিকতার পরিপন্থী। তাই আসুন আমরা বাংলা
ভাষাকে সম্মান করি। মর্যাদা দিই এবং এই প্রজন্মের সকলকে প্রিয় মায়ের ভাষা
শেখাতে ও রা করতে পারদর্শী করে গড়ে তুলি। সম্মেলনে ভারতের পশ্চিমবঙ্গ,
আসাম, উৎকল থেকে আগত শিল্পীরা সংগীত ও নৃত্য পরিবেশন করেন। সভা শেষে কবি
সম্মেলনে ভারতীয় ৪৩ জন ও বাংলাদেশের ৭০ জন বিশিষ্ট কবি সাহিত্যিক, গবেষক,
কথাশিল্পী, গল্পকার গণ তাঁদের নিজ নিজ রচিত লেখা ও কবিতা পাঠ করেন। সভার
শুরুতে অমর একুশের চেতনায় আমার ভাইয়ের রক্তে রাঙানো একুশে ফেব্র“য়ারি গান
এবং বাংলাদেশের জাতীয় সংগীত ও ভারতীয় জাতীয় সংগীত পরিবেশনের মধ্য দিয়ে সভা
শুরু হয়। বঙ্গ অসম উৎকল সাহিত্য সম্মেলন উৎসর্গ করা হয় বিশ্বকবি
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, অসমীয় কবি সাহিত্যিক লক্ষ্মীনাথ বেজবরুয়া ও বাংলা
প্রাচীন সাহিত্যের দিকপাল মুন্সী আবদুল করিম সাহিত্য বিশারদকে। সম্মেলনে
পাঁচজন বিশিষ্ট কবি গবেষক ও সাহিত্যিককে চট্টগ্রাম ইতিহাস চর্চা কেন্দ্র
অমর একুশে স্মারক সম্মাননা প্রদান করা হয়। স্মারক প্রাপ্ত ব্যক্তিরা হলেন
কুষ্টিয়া নজরুল একাডেমীর সভাপতি কবি সাংবাদিক আবদুর রশিদ চৌধুরী,
পশ্চিমবঙ্গের বিপ্লবী কবিখ্যত সমরেন্দ্র দাশ গুপ্ত, সার্ক কালচারার ফোরাম
ভারতের সভাপতি সাহিত্যিক হরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তী, জাতীয় সাহিত্যে প্রকাশন
ট্রাষ্ট ভারতের সেক্রেটারী ও বিখ্যাত অনুবাদক শক্তিময় দাশ, ভারতীয়
রাষ্ট্রিয় পুরস্কার প্রাপ্ত জাতীয় শিক বিখ্যাত নজরুল গবেষক ড. সুশীল
ভট্টাচার্য (ডি.লিট)।
লেখক:
সভাপতি, চট্টগ্রাম ইতিহাস চর্চা কেন্দ্র
No comments:
Post a Comment