Tuesday, February 9, 2016

জেলে ছিলাম, নির্বাচনে যাইনি

রাজধানীর গুলশানে ইমানুয়েলস কনভেনশন সেন্টারে আসন্ন পৌরসভা ও
ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচন এবং সাংগঠনিক বিষয়ে তৃণমূল নেতাদের সঙ্গে
যৌথসভায় জাতীয় পার্টির চেয়ারম্যান সাবেক রাষ্ট্রপতি হুসেইন মুহম্মদ
এরশাদ, কো-চেয়ারম্যান জিএম কাদের, মহাসচিব রুহুল আমিন
হাওলাদার,সাবেক প্রতিমন্ত্রী অ্যাডভোকেট সালমা ইসলাম এমপিসহ
যৌথ মতবিনিময় সভায় এরশাদ
পার্টিকে হত্যার চক্রান্ত সফল হবে না : জিএম কাদের * এরশাদের নেতৃত্বেই জাতীয় পার্টি এগিয়ে যাবে : অ্যাডভোকেট সালমা ইসলাম
জাতীয় পার্টির চেয়ারম্যান সাবেক রাষ্ট্রপতি হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ বলেছেন, ‘আমি ৫ জানুয়ারির নির্বাচনে যাইনি। আমি হাসপাতালে ছিলাম। জেলে ছিলাম। আমার  স্ত্রী (রওশন এরশাদ) নির্বাচনে গিয়েছে। জেল থেকে এসে দেখি আমার দল নির্বাচনে গিয়েছে। জেলে বসে আমি রওশনকে প্রতিদিন চিঠি লিখেছি। প্রতিটা চিঠিতে বলেছি, নির্বাচনে যেও না। নির্বাচনে গেলেও মন্ত্রিত্ব  নিও না। কিন্তু সে মন্ত্রিত্ব নিয়েছে। সেই থেকে সর্বনাশ শুরু। মন্ত্রীরা আমার ললাটে কলঙ্ক এঁকে দিয়েছে। মন্ত্রিত্ব না নিলে আমার দল আকাশে উঠে যেত।’
রাজধানীর গুলশানে ইমানুয়েলস কনভেনশন সেন্টারে সোমবার দলের জেলা, মহানগর, উপজেলা ও পৌরসভার সভাপতি-সাধারণ সম্পাদকদের সঙ্গে মতবিনিময় সভায় তিনি এ হুশিয়ারি জানান। ১৯ এপ্রিল অনুষ্ঠিতব্য জাতীয় পার্টির কেন্দ্রীয় কাউন্সিল এবং আসন্ন ইউনিয়ন পরিষদ (ইউপি) নির্বাচন উপলক্ষে এ সভার আয়োজন করা হয়। সভায় সংসদে বিরোধীদলীয় নেতা ও পার্টির প্রেসিডিয়াম সদস্য রওশন এরশাদ সভাপতিত্ব করেন।
সভায় হুশিয়ারি দিয়ে এরশাদ বলেন, ‘যারা দলের শৃংখলা ভঙ্গ করছেন, তাদের পরিণতি কী হয়, আপনারা দেখবেন। জনগণ তাদের প্রত্যাখ্যান করবে।’ এরশাদ কারও নাম উল্লেখ না করে বলেন, ‘আজকের এ যৌথসভায় না আসার জন্য জেলা নেতাদের ফোন করা হয়েছিল। কিন্তু কেউ তাদের কথা শোনেনি। সবাই এসেছে। আজ প্রমাণিত হয়েছে, তাদের ফোনের কোনো মূল্য নেই।’
রোববার জাতীয় পার্টির সংসদীয় দলের একটি অংশ সিদ্ধান্ত নেয়, বিরোধীদলীয় নেতা ও পার্টির সিনিয়র প্রেসিডিয়াম সদস্য রওশন এরশাদকে কো-চেয়ারম্যান করা না হলে তারা দলের কোনো রাজনৈতিক কর্মসূচিতে অংশ নেবেন না। বিষয়টির প্রতি ইঙ্গিত করে এরশাদ বলেন, ‘যারা আমার স্থানে আসতে চান তাদের উদ্দেশে বলছি তাদেরও বয়স হয়েছে। নতুন প্রজন্মের হাতে ক্ষমতা ছেড়ে দিন। উপলব্ধি করতে হবে, জাতীয় পার্টির সম্ভাবনার দরজা খুলেছে। সেই দরজা দিয়ে প্রবেশ করতে হবে। আমি আপনাদের উদ্দেশে বলছি, আমি অতীতেও মুক্ত মানুষ ছিলাম না, এখনও নেই।’
জিএম কাদেরকে দলের কো-চেয়ারম্যান নিযুক্ত করার কথা তুলে এরশাদ বলেন, ‘আমার ছোট ভাইকে যোগ্য উত্তরসূরি হিসেবে নির্বাচন করেছি। আমি বেশিদিন নেই। আমার বিশ্বাস আমার অবর্তমানে সে পার্টির হাল ধারতে পারবে।’
স্ত্রী রওশনের উদ্দেশে এরশাদ বলেন, ‘নতুন প্রজন্মের হাতে ক্ষমতা দিয়ে দিন। আমাদের দিন শেষ হয়ে গেছে।’ দলের কো-চেয়ারম্যান ও মহাসচিব পদে সাম্প্রতিক রদবদলের সিদ্ধান্তে আমৃত্যু ‘অটল’ থাকার কথা বলেন তিনি। এরশাদ বলেন, ‘একটি দলের গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হল শৃংখলা। এটা যারা ভঙ্গ করেছে, আমাদের কাছে তাদের কোনো মূল্য নেই।’ তিনি বলেন, ‘অনেকে ষড়যন্ত্র করেছে জাতীয় পার্টিকে নিঃশেষ করার জন্য। কিন্তু সফল হয়নি। কারণ জনগণ আমাদের ভালোবাসে।’ পার্টি চেয়ারম্যান বলেন, ‘তিন বছর আগে বর্ধিত সভা হয়েছিল, আর দুই বছর আগে প্রেসিডিয়াম বৈঠক। একটা দল বাঁচে কী করে? এখনও যে জাতীয় পার্টি আছে তার কৃতিত্ব সম্পূর্ণ তোমাদের।’
বর্জনের হুমকি দেয়া ‘রওশনপন্থী’ নেতাদের উদ্দেশে তিনি বলেন, ‘আসুন, এসে দেখে যান, এই সভা কেমন হচ্ছে, কারা কারা এসেছে এখানে।’ নেতাকর্মীদের উপস্থিতিতে দলে ‘প্রাণ ফিরে আসছে’ মন্তব্য করে এরশাদ বলেন, ‘আমি খুবই আনন্দিত। আমার মৃতপ্রায় সন্তান আজ প্রাণ ফিরে পেয়েছে, সামনে এগিয়ে চলছে। আমি এ দলের পিতা, আমার চেয়ে বেশি আনন্দ আর কে পেতে পারে? আমার সব পাওয়া হয়ে গেছে।’
দিনব্যাপী এ সভায় দলের তৃণমূল কর্মীরা ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া প্রকাশ করেন। দলকে দালালমুক্ত করতে এরশাদের প্রতি আহবান জানান তারা। এছাড়া দলীয় রাজনীতি স্পষ্ট করা ও মন্ত্রিসভা থেকে বের হয়ে আসার জন্য জোর দাবি তোলেন তারা। তিন মন্ত্রীকে বহিষ্কারেরও দাবি তোলেন তৃণমূলের নেতাকর্মীরা। এমনকি বিরোধীদলীয় নেতা রওশন এরশাদ সম্পর্কেও ক্ষোভ প্রকাশ করেন জাতীয় পার্টির জেলা পর্যায়ের নেতারা। এসব সমালোচনার জবাবে এরশাদ বলেন, আমি ৫ জানুয়ারির নির্বাচনে যাইনি।
এ সময় মন্ত্রিপরিষদ থেকে বেরিয়ে আসার অপারগতা প্রকাশ করে নেতাকর্মীদের উদ্দেশে এরশাদ বলেন, তারা আমার মন্ত্রিসভায় নেই। শেখ হাসিনার মন্ত্রিসভায় আছে। তোমাদের এটা বুঝতে হবে। জিয়াউদ্দিন বাবলুকে মহাসচিব করা প্রসঙ্গে এরশাদ বলেন, জেলখানা থেকে বেরিয়ে দেখি আমার দলের মহাসচিব আরেকজন। আমি তাকে মহাসচিব করিনি। সে মহাসচিব হয়েছে। তাকে বাদ দেয়াও আমার পক্ষে সহজ ছিল না। আমার শক্তি ছিল না। এ সময় নেতাকর্মীদের উদ্দেশে এরশাদ আরও বলেন, আমার পথটা গোলাপের মতো সহজ নয়। অনেক কণ্টকাকীর্ণ। তবুও সব দায়-দায়িত্ব আমার। জেলে গেলে আমি যাব। ফাঁসি হলে আমার হবে। তিনি বলেন, আমি কোনো ভুল করিনি। আমি শৃংখলিত। আজও আমার নামে মামলা আছে। মামলার বিচার আইন দ্বারা হয় না। তোমরা জানো কিভাবে বিচার হয়।’
আলোচনায় অংশ নিয়ে পার্টির প্রেসিডিয়াম সদস্য ও ঢাকা-১ আসনের সংসদ সদস্য অ্যাডভোকেট সালমা ইসলাম বলেন, সাবেক রাষ্ট্রপতি এরশাদই জাতীয় পার্টির প্রাণ। তিনিই দেশের মানুষের আশা-আকাক্সক্ষার প্রতীক। তার নির্দেশেই জাতীয় পার্টির নেতাকর্মীদের কাছে চূড়ান্ত নির্দেশ। তাই এরশাদের নির্দেশ মেনেই জাতীয় পার্টিকে শক্তিশালী করতে হবে। সামনে এগিয়ে নিতে হবে। আগামী নির্বাচনের জন্য দলকে প্রস্তুত করতে হবে। তিনি জিএম কাদের কো-চেয়ারম্যান এবং এবিএম রুহুল আমিন হাওলাদারকে মহাসচিব করায় এরশাদকে অভিনন্দন জানিয়ে বলেন, এ সিদ্ধান্ত সময়োপযোগী। নেতাকর্মীরা এ সিদ্ধান্তে খুশি। এতে করে দল এগিয়ে যাবে। অ্যাডভোকেট সালমা ইসলাম আরও বলেন, জিএম কাদের এবং এবিএম রুহল আমিন হাওলাদারের নেতৃত্বে জাতীয় পার্টি সামনে আরও গতিশীল হবে। দল আরও শক্তিশালী হবে। তিনি দেশ ও দেশের মানুষের ভাগ্যের পরিবর্তন নিশ্চিত করতে বিভেদ ভুলে জাতীয় পার্টির নেতাকর্মীদের ঐক্যবদ্ধ হয়ে কাজ করার আহবান জানান।
অ্যাডভোকেট সালমা ইসলাম বলেন, কো-চেয়ারম্যান এবং মহাসচিবের নেতৃত্বে দলটির শীর্ষপর্যায় থেকে শুরু করে তৃণমূল পর্যন্ত ঢেলে সাজাতে হবে। দলের ভেতরে কোনো অনৈক্য ও বিভেদ থাকলে দূর করতে হবে। দলটির নেতাকর্মীদের মধ্যে ঐক্য ও বন্ধন তৈরি করে আগামী নির্বাচনের জন্য প্রস্তুতি নিতে হবে। অ্যাডভোকেট সালমা ইসলাম আরও বলেন, জাতীয় পার্টিকে দালালমুক্ত করতে হবে। দেশের গণতন্ত্র ফিরিয়ে আনতে কোনো আপস করা চলবে না।  
এরশাদের বক্তব্যের আগে তৃণমূলের নেতারা একে একে বক্তব্য দিয়ে তাদের ক্ষোভ প্রকাশ করেন। পঞ্চগড় জেলা সাধারণ সম্পাদক আবু সালেহ বলেন, আমাদের অস্পষ্ট রাজনীতির কারণে পৌরসভা নির্বাচনে ভরাডুবি হয়েছে। প্রার্থী নির্বাচনে আর কোনো পক্ষপাতিত্ব চলবে না।  স্যার (এরশাদ) আপনার একটা দোষ আছে। যারা আপনার ক্ষতি করে, তারাই আপনার কাছে জায়গা পায়। বেইমানরা জাতীয় পার্টিকে ধ্বংস করে দিয়েছে। রওশনের উদ্দেশে এ নেতা বলেন, আপনি দলের সঙ্গে বেইমানি করলে ইতিহাস আপনাকে ক্ষমা করবে না।
ঢাকা মহানগর দক্ষিণের সাধারণ সম্পাদক জহিরুল আলম রুবেল বলেন, আমরা সাধারণ মানুষ থেকে অনেক দূরে। দেশের কোনো বড় রাজনৈতিক দল আমাদের শক্তিশালী করবে না। এই আশা করাও ভুল।
চুয়াডাঙ্গা জেলা সভাপতি সোহরাব হোসেন বলেন, সরকারে আছি। দরকারে নেই। এই অভিশাপ থেকে আমরা মুক্তি চাই। আজকে যারা এ অনুষ্ঠানে আসেনি তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে হবে। মন্ত্রীরা নিজেদের জন্য কাজ করে। পার্টির জন্য কিছু করেনি।
নীলফামারী জেলা সাধারণ সম্পাদক সাজ্জাদ পারভেজ বলেন, জাতীয় পার্টিতে কিছু দালাল আছে, যারা আওয়ামী লীগের হয়ে কাজ করে। তারা জয় বাংলা, জয় বঙ্গবন্ধু বলে স্লোগান দেয়। এটা দেখলে আমাদের কষ্ট হয়। এছাড়া আরও অনেকেই দলীয় শৃংখলা ভঙ্গকারীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়ার দাবি তোলেন।
এর আগে জিএম কাদের তার বক্তব্যে বলেন, আসন্ন ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচন জাতীয় পার্টির জন্য টেস্ট পরীক্ষা। তিনি বলেন, জাতীয় পার্টিকে পানিতে ফেলে তলিয়ে দিয়ে হত্যা করার চেষ্টা করা হচ্ছে।  আমাদের প্রতিপক্ষরা পার্টিকে হত্যা করে লালসালু পরিয়ে মাজার বানাতে চান। কিছু লোক মাজার বানিয়ে পয়সা আয় করার চিন্তাও করছেন। কিন্তু  সে চক্রান্ত সফল হবে না।
এছাড়া বক্তব্য দেন পার্টির মহাসচিব এবিএম রুহুল আমিন হাওলাদার, প্রেসিডিয়াম সদস্য এমএ মান্নান, এমএ সাত্তার, সাইদুর রহমান টেপা, এসএম ফয়সল চিশতি, মীর আবদুস সবুর আসুদ, সোলায়মান আলম শেঠ, মাহমুদুল ইসলাম, মহসিন রশিদ, তাজ রহমান, মাসুদ পারভেজ সোহেল রানা, এমএ কাশেম, গোলাম কিবরিয়া টিপু, সুনীল শুভ রায়, ভাইস চেয়ারম্যান নাসরিন জাহান রত্না, এটিএম গোলাম মাওলা চৌধুরী, সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব অ্যাডভোকেট রেজাউল ইসলাম ভূঁইয়া, যুগ্ম-মহাসচিব নুরুল ইসলাম নুরু, গোলাম মোহাম্মদ রাজু, জহিরুল ইসলাম জহির, আলমগীর শিকদার লোটন, আরিফ খান, কেন্দ্রীয় নেতা সুলতান মাহমুদ, অনন্যা হোসাইন মৌসুমী, মোবারক হোসেন আজাদ, বেলাল হোসেন, আবু সাঈদ স্বপন, ইসহাক ভূঁইয়া, সৈয়দ ইফতেখার আহসান হাসান, মিজানুর রহমান মিরু।

No comments:

Post a Comment